ঠাম্মার সঙ্গে আমার স্মৃতি বলতে, বেঁচেবর্তে আছে অল্পকিছুই; যেমন একটা অদ্ভুত গন্ধ! যেন ভলিনি মলম, আশ্চর্য প্রাচীন কোনও গাছের স্যাঁতস্যাঁতে, আর সুতিকাপড়ের নরমটুকু একসঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে কেউ। সে-গন্ধ আর কোত্থাও পাইনি এতবছরে। যেমন, একটা ভয়— ঠাম্মা, তুমি সারাজীবন বাঁচবে তো? চলে যাবে না তো? আমি তো দেখেছি— হাতের চামড়া কেমন যেন ঝুলে যাচ্ছে, ভেঙে যাচ্ছে চোয়ালদুটো। মায়ের, বাবার সমস্ত চোখরাঙানি থেকে নিজেকে লুকিয়ে ফেলার, এ-কোটর যেন আরও শুকনো, আরও জীর্ণ হয়ে গেল রোজ। এ-ভয় একদিন কেটে গেল, সত্যিই চলে গেল ঠাম্মা! তারপর থেকে, আশ্রয় হারিয়ে ফেলার ভয় জন্মাতেই দিই না।
ভয়কে হারিয়ে ফেলার ভয়— বড় অদ্ভুত। আর যে-সব অতি সুলভ বিস্ময়ে আমরা অভ্যস্ত, অনেক বছরে— যাকে হারিয়ে ফেলার বদলে, রোজ গায়ে মেখেছি হাওয়ার মতো, তাকেও যে একদিন হারিয়ে ফেলতে হবে, এ-ভাবনা সঙ্গত হলেও, এমনকী মেনে নিলেও ওই আসন্ন মুহূর্তটিকে গোলিয়াথসম মনে হতে বাধ্য।
আরও পড়ুন: বিশ্বকাপের আলো ও অভিবাসীদের অন্ধকার! লিখছেন রোদ্দুর মিত্র…
মেসি চলে যাবেন। রোনাল্ডো চলে যাবেন। শুনছি। মানছি। বারবার যাব-যাব করেও যেন যাচ্ছে না। খেলে চলেছে। অপ্রাসঙ্গিক হতে-হতেও হচ্ছে না। জেন-জি তারকাদের বিশ্বকাপে, সুমনের গান— ‘তিনি বৃদ্ধ হলেন, বনস্পতির ছায়া দিলেন সারাজীবন’— যেন বদলে যাচ্ছে দ্বিবচনে। ২০২৬ ধরলে, ছ’ছটা বিশ্বকাপ নাকি খেলছেন দু’জনে। মিলেনিয়ালদের স্মৃতিবৃক্ষের পাশে দাঁড়িয়ে, পরের জেনারেশন যদি অস্ফুটে মেসিকাকু কিংবা রোনাল্ডোকাকু বলে হাঁক দেয়— এক নিমেষে লোডশেডিং নেমে আসবে পুরনো পাড়ায়। চন্দ্রবিন্দুর গানের মতো, থমকে দাঁড়ানো মুহূর্তেরা মুহূর্তের কাছে ঋনী— হায়! আমাদের ফিফা— আমাদের জুলেরিমে— আমাদের জোগো বোনিতো— আমাদের লাতিন আমেরিকা— আমাদের ট্যাঙ্গো-সাম্বা— আমাদের পর্তুগিজ সংখ্যালঘুর স্বাধীনতাযুদ্ধ— আমাদের নীল-সাদা-হলদে-সবজে পাড়ায়, সমস্ত জার্সির পিছনে ১০ আর ৭ আজন্ম খোদাই হয়ে যাওয়া— একটা আস্ত জেনারেশনের চিরন্তন চাঁদোয়ার নীচে, আড়াআড়ি ভেঙে যাওয়া পৃথিবী-মফস্সলগুলো ভেঙেচুড়ে কেমন বেখাপ্পা গজিয়ে ওঠা হাইরাইজ! আর যা কিছু একটু-একটু করে বদলে গেল এতবছরে, তার পাশে নিঃসঙ্গ মালবেরি গাছদুটো ছিল। সেই যেমন প্যাস্টেলে রঙ করা শেখার পর, সমস্ত গ্রামের দৃশ্যেই থেকে যেত একজোড়া দুঃখী কুঁড়েঘর।
অ্যান্টনি গর্ডন। ব্রিটিশ তরুণ তুর্কী। এ-বছর সই করেছেন কাতালান ক্লাবে। ক্যাম্প ন্যু-এর মিউজিয়ামে ঢুকে, সার দিয়ে সাজিয়ে রাখা ব্যালন ডি অর-গুলো দেখে হাঁ করে আছেন। মেসি-রণ যুগের পর, আধখানা দশক কেটে গেল, একটা ওই সোনার বল জিততে, তারকা-মহাতারকাদের লেগে যাচ্ছে আস্ত জীবন। আর এই দুই অতিমানব মিলে, পনেরো বছরে, তেরো খানা বল বগলদাবা করে ঘরে ফিরেছেন ফি-বছর!


আমাদের মতো ঝগড়া-আমাদের মতো হাতাহাতি-আমাদের মতো টিউশন ফেরত, এল-ক্ল্যাসিকোর স্কোর জেনে, রাস্তাতেই উন্মাদের মতো উচ্ছ্বাসে বা বিষাদে ফেটে পড়ার সাবলীল কৈশোর— আমাদের মতো নিখাদ একটা শূন্য দশক, কত-কত প্রজন্মের কাছে হয়তো স্বপ্ন হয়ে থেকে যাবে। যেমনটা, এইট্টি সিক্স-মারাদোনা, সেভেন্টি-পেলে; সে যদিও একেকটা ব্রাহ্মমুহূর্ত, বইয়ের ভাঁজে-ভাঁজে বসানো এক-একটা জমকালো বুকমার্ক— কিন্তু, রণ-মেসি তো কেবল বুকমার্ক না, একটা অধ্যায়ও না, আস্ত বইখানাই। শেষ চ্যাপ্টারে এসে গেলে, এক-একটা পাতা উল্টানোর গতিবেগ যেমন কমে যায়, যেমন মনে হয়— শেষ হওয়ার আগে আরেকটু ওম লেগে থাক, এ-বিশ্বকাপের আগে তেমনটাই মনে হচ্ছে। মনে পড়ছে, সেই সাইকেলটাকে, যে-প্যাডেলে চাপ দিয়ে আমাদের ডুমুরজলার মাঠে পৌঁছে যেতাম রোজ। অনেক মেসি, অনেক রোনাল্ডো জড়ো হত। তারা কবেই চলে গেছে।
আমাদের মতো ঝগড়া-আমাদের মতো হাতাহাতি-আমাদের মতো টিউশন ফেরত, এল-ক্ল্যাসিকোর স্কোর জেনে, রাস্তাতেই উন্মাদের মতো উচ্ছ্বাসে বা বিষাদে ফেটে পড়ার সাবলীল কৈশোর— আমাদের মতো নিখাদ একটা শূন্য দশক, কত-কত প্রজন্মের কাছে হয়তো স্বপ্ন হয়ে থেকে যাবে।
মেসি বিশ্বজয়ের পর, সবাই ভাবল ওই বুঝি শেষ! মরক্কোর কাছে হারের পর, রোনাল্ডোর ওই কান্না, নিঃসঙ্গ হেঁটে যাওয়া টানেল দিয়ে— তারপরও, ইউরোপীয় ফুটবল থেকে বহু-বহু দূরে থেকেও, লোকদুটো আবার একটা বিশ্বকাপে চলে এল। অঙ্ক বলছে— একজন ৪১ একজন ৩৯। বায়োলজিক্যালি দু’জনের পক্ষেই আর খেলা কার্যত অসম্ভব- তাই যদি ধরে নিই— এ বিশ্বকাপের ফলাফলের পরই যবনিকা নেমে আসবে, যার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছি সকলেই, সে-মুহূর্তে কোন অনুভূতি কাজ করবে? বাতিল রেডিও, ঘরের কোণ থেকে ভাঙাচোরা জিনিসের ঝুড়িতে চিরনির্বাসনে ফেলে দিতে যে মায়া বাধা দেয়, তার চেয়ে ঢের জোরালো মায়ায় বাঁধা এ-বিচ্ছেদ! কৈশোর-প্রাকযৌবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদকে চিরবিদায় জানানোর মতো বড় আমরা হয়ে গেছি। নাদের আলির কাছে, আর এ-প্রশ্ন করিনি যে, কত বড় হব! বিদায়ের পাত্রখানি কি আর কেবল স্মৃতিসুধায় ভরা থাকল হে, তাতে ঠাম্মার ওই গন্ধ লেপে রইল ঠিক, হারিয়ে ফেলার ভয়, কেটে যায় বারবার এসব মুহূর্তে! আর দেখি, আমাদের খরচ হয়ে যাওয়া জীবন, একটু-একটু করে জমা হয়েছে সে পাত্রেই…




