সিঙ্গল: পর্ব ৪

Representative Image

সিঙ্গল থাকা

২০১৭ সাল। তিনটে জিনিস একসঙ্গে ঘটেছে আমার জীবনে। গোঁফ উঠছে ঠিক করে, সবে রেডিওতে কথা বলা শুরু করেছি আর প্রেম করছি। হ্যাঁ ঠিকই পড়েছেন। ‘সদা সিঙ্গল’ ট্যাগটা এমন অবিচ্ছেদ্যভাবে নামের সঙ্গে জুড়ে গেছে, মনেই পড়ে না শেষ কবে প্রেম করেছিলাম। তবে হ্যাঁ, চন্দ্রবিন্দুর কথা ধরে বলতে গেলে, ‘প্রেম একবার এসেছিল নীরবে /ভাবলাম দুধ জমে ক্ষীর হবে।’ যদিও নীরবে নয়, ফেসবুকে এসেছিল। তখনও ‘ও মা গো’ শুরু হয়নি, অগ্নির তখন উসকোখুসকো চুল, পায়ে অধিকাংশ সময়ে হাওয়াই চপ্পল (রাজনৈতিক পান উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়), কাঁধে একটা ব্যাগ, নাকের তলায় গোঁফের রেখা আর চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। সে-অবস্থায় আমায় কারুর পছন্দ হয়েছিল কীভাবে, এখন ভেবেই বিস্মিত হই। যাক গে, জানিয়েছিল সে নাকি রেডিও শুনত। ভাল কথা। তিনবার দেখা হল। একবার ফুচকা খেলাম, একবার অটোর লাইনে দাঁড়ালাম আর শেষদিন হাইল্যান্ড পার্কে কী একটা ছবি দেখেছিলাম, ছবির নামটা এখন মনে নেই। ছবি দেখে লেট করে অফিস ঢুকেছিলাম এটা মনে আছে। আর অফিসে ঢোকার এক ঘণ্টার মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপে ভেসে উঠলো ইংরেজি ভাষায় অমোঘ কিছু শব্দ ‘I don’t think this is working out.’

আচ্ছা গেরো! তখন সবে প্রেমে পড়েছি, এত জোরে বুক ফাটছে যে, মনে হচ্ছে কালীপুজোর রাতে বাজির শব্দদূষণকেও হার মানাবে। হাহাকার চেপে রেখে কারণ জিজ্ঞেস করেছিলাম এবং একটা অদ্ভুত উত্তর পেয়েছিলাম— ‘You are too single on social media.’ বিশ্বাস করুন, এর মধ্যে একটা শব্দও বানিয়ে লিখিনি।

তারপর যত বছর ঘুরেছে আর গোঁফটা পুরু হয়েছে, টের পেয়েছি ‘ভালবাসা’ বোধহয় কিছুটা সামাজিক মাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল। কে কত অ্যাসথেটিক ছবি তুলতে পারে, কে কত ভাল হ্যাশট্যাগ ভাবতে পারে, কে কত ভাল কোরিয়ান হার্ট দেখাতে পারে আঙুল দিয়ে— এই সব মিলিয়েমিশিয়ে কেমন যেন ‘খিচুড়ি সেমুই’ হয়ে গেছে। গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়েছে ধৈর্য ও মনোযোগ কমে যাওয়া। আমরা বিরুদ্ধ স্বর শুনলেই খড়্গহস্ত এবং সবসময়ে মুঠোর মধ্যে স্মার্টফোন নিয়ে জোড়হস্ত। কারোর কথা শোনার সময় নেই, আলোচনা করার সময় নেই, কিন্তু প্রচুর ‘অপনিয়ন’ আছে আমাদের, যা অনেক ক্ষেত্রেই আমার মনে হয় ‘রিল’ থেকে ধার করা, ‘রিয়েলিটি’-র বড় অভাব।

আরও পড়ুন: সাহেবপাড়ায় সিঙ্গল স্ক্রিনের সঙ্গে ছিল রেস্তোরাঁ, পানশালা, ডান্সিং ফ্লোর! লিখছেন গৌতম ঘোষ…

কবীর সুমন আমায় ২০১৬ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন— “বন্ধুবর, শেষ কবে আপনি ‘আমি তোমাকে ভালবাসি’ এই বাক্যটি উচ্চারণ করেছেন?” শুনে অবাক লেগেছিল। বাড়ি ফিরে অনেকক্ষণ ভেবেছিলাম বিষয়টা নিয়ে। সত্যিই তো, এখন প্রেম থেকে শুরু করে বিচ্ছেদ— পুরোটাই সামাজিক মাধ্যমে, দেখিয়ে, জানিয়ে, চেঁচিয়ে। এখানেই হয়েছে এক মহা মুশকিল যেটা শুনলে আপনারা ভাবতে পারেন আমি ‘প্রতিশ্রুতিমূলক’ঢপ মারছি। আমি ভীষণ ছবিবিমুখ, আরও বেশি করে নিজস্বী বিমুখ। এই কথাটা আজ প্রথম স্বীকার করলাম। আমার ছবি তুলতে বিশেষ ভাল লাগে না, খুবই কম ছবি তুলি এবং পছন্দের মানুষজন ছাড়া আজকাল দাঁত বার করতেও ভাললাগে না। যেহেতু আমার কাজের বেশ কিছুটা অংশ সামাজিকমাধ্যম নির্ভর, তাই বোধহয় ইদানিং আরও বেশি বিকর্ষণ অনুভব করছি।

আচ্ছা, সব কথা সবাইকে জানাতেই হবে? আমি আমার কোন বান্ধবীর সঙ্গে কোন কফি চেন-এ বসে কফি খেলাম, হ্যারি পটার-এর কোন বই নিয়ে আড্ডা মারলাম, ‘Ranveer’ আর ‘Ranbir’ নিয়ে তুমুল ঝড় তুললাম— সবটা জানিয়ে করতে হবে? ঢেঁড়া পিটিয়ে? ছোট থেকে বড় হলাম এই জেনে যে, পরস্পরের প্রতি ‘ভ্যালিডেশন’ থাকলে, ‘বিদ্রোহ আর চুমুর দিব্যি’ খাওয়া যায়। এখন পুরোটাই কেমন ‘ছিল রুমাল, হয়ে গেল বেড়াল’ কেস। আর বিশ্বাস করুন, আমি একেবারেই নিজেকে বিচারকের আসনে বসাচ্ছি না। দু’জন প্রেমে আবদ্ধ মানুষ যদি রাস্তাঘাটে, বনে বাদাড়ে, সিনেমা হলে উত্তুঙ্গ প্রেম করে, চুমু খায়, হাত ধরে আমার তো দিব্যি লাগে। কিন্তু প্রেমে পড়ার পর মানুষের জানান দেওয়ার যে একটা অদ্ভুত আস্ফালন, এটা আজকাল আর পোষায় না। তাই বলে ভাববেন না কিন্তু আমার ‘Sid-Kiara’ বা ‘Rashmika-Vijay’ এর ইন্সটাগ্রাম পোস্ট ভাল লাগে না!

আচ্ছা, সব কথা সবাইকে জানাতেই হবে? আমি আমার কোন বান্ধবীর সঙ্গে কোন কফি চেন-এ বসে কফি খেলাম, হ্যারি পটার-এর কোন বই নিয়ে আড্ডা মারলাম, ‘Ranveer’ আর ‘Ranbir’ নিয়ে তুমুল ঝড় তুললাম— সবটা জানিয়ে করতে হবে? ঢেঁড়া পিটিয়ে? ছোট থেকে বড় হলাম এই জেনে যে, পরস্পরের প্রতি ‘ভ্যালিডেশন’ থাকলে, ‘বিদ্রোহ আর চুমুর দিব্যি’ খাওয়া যায়। এখন পুরোটাই কেমন ‘ছিল রুমাল, হয়ে গেল বেড়াল’ কেস।

আসলে কী জানেন, শক্তি-সুনীল-জীবনানন্দ পড়ে বড় হয়েছি তো, তাই বোধহয় ইন্সটা রিলে অডিও বাছাইয়ের থেকে, প্রেমপত্রে কোটেশন ঝরাতে বেশি ইচ্ছে হয়। কিন্তু হৃদয়পুর থেকে নিশ্চিন্দিপুর, অপু-অপর্ণাদের আজকাল আর দেখাই পাই না। কতদিন ‘Archies Gallery’-র পোস্টকার্ড পাই না, কতবার ভেবেছি কাউকে জয় গোঁসাই শুনিয়ে তাঁর বাবা কে মেশোমশাই বলে ডাকব। যাক গে, অনেকগুলো বছর তো এভাবেই কাটিয়ে দিলাম। তাও মাঝেমাঝে বন্ধুদের বিয়েতে পনির ধরতে গিয়ে যখন দেখি আমারই বয়সি নববধূর চোখ চিকচিক করছে, তখন বুকের মধ্যে ওই ‘সদা সিঙ্গল’ আহাম্মকটা টিকটিক করে ওঠে। যদিও পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলে ওঠে ফেলুদাও তো সিঙ্গল ছিল! আর কী চাই!