সিঙ্গল্স
মানুষ যখন গানবাজনা শুরু করেছে, এমনকী, রেকর্ড আসার আগেও যখন মানুষ গানবাজনা করেছে, সে-গান মানুষের প্রাণে এসেছে ভাললাগা থেকে। সে পরিবেশন করেছে, অন্য মানুষের ভাল লেগেছে। এই সরল প্রক্রিয়ায় গোটা বিষয়টা এগিয়েছে। রেকর্ড এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ! অনেক সময়ে, আমরা এমন এক মানুষের গান শুনেছি, সে-পৃথিবীতেই নেই। ধরা যাক, গওহর জানের গান শুনছি, মানুষ তো বলতে পারে, সে ভূতের গান শুনছে, সেই মানুষটা তো আদপে নেই পৃথিবীতে, তাঁর সুর, কণ্ঠ রয়ে গেছে। আমরা ইতিহাসের পাতা ওল্টাচ্ছি যেন।
আমাদের বাংলাতেই, হেমেন্দ্রমোহন বসু (‘কুন্তলীন’ তেল, ‘দিলখোস’-এর কর্ণধার) একটি রেকর্ডিং কোম্পানি খোলেন। এখানে গওহর জান থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ হয়ে ‘সেবক দল’— কে না গেয়েছেন! সেখানেও কিন্তু একটা রেকর্ডে, একটাই গান ছিল।
সে-সময়ে এশিয়া তথা সারা পৃথিবীর রেকর্ড তৈরি হত বেলেঘাটায়। এই গল্পগুলো যে-সময়ের, তার আগেও কিন্তু সিঙ্গল্স ছিল। রবীন্দ্রনাথ বন্দেমাতরম গেয়েছেন, তা তিনবার প্রকাশ পেয়েছে। এই সময়টা ইপি রেকর্ড আসার অনেক আগে।
আরও পড়ুন: আশা ভোঁসলে হয়ে উঠেছিলেন স্বাধীন মেয়েদের কণ্ঠ!
লিখছেন শান্তনু মৈত্র…
তারপর মানুষ ক্রমাগত গান রেকর্ড করতে শুরু করল, রেকর্ডিং-এর চাহিদাও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেল। ঠিক এই সূত্র ধরেই দুটো গান এল, সেখান থেকে চারটে, ছ’টা— এভাবে পরিধিটা বিস্তৃত হতে শুরু করল। এমন রেকর্ডিংও রয়েছে, যেখানে ছ’টা গান আছে। ইপি-তে সাধারণত দুটো কিংবা চারটে গান সম্মিলিত থাকত। এরপর রেকর্ড চলে গেল, অ্যালবাম এল; সেখানে বহু বছর চলেছে দুটো গান। তারপরে চারটে এসেছে। তারপর একটা সময়ে ক্যাসেট এল, যে-ক্যাসেট অনেক বেশি সংখ্যক গান ধরে রাখতে পারে। ক্যাসেটের ক্ষেত্রে একবারে বিনিয়োগ করেই, একসঙ্গে গায়ক-যন্ত্রশিল্পীদের একত্র করে, একসঙ্গে আটটা কিংবা দশটা রেকর্ড করে নেওয়া যেত। আবার ধরা যাক, আশা ভোঁসলে কিংবা লতা মঙ্গেশকর ছ’বছর ধরে দুটো করে রেকর্ড করেছেন, সেগুলিকে একত্রে বারোটা করে একই ক্যাসেটের মধ্যে নিয়ে আসার প্রবণতাও শুরু হল। কিন্তু নতুনদের জন্য তখনও সর্বনিম্ন আটটা গান না হলে, ক্যাসেটটা হচ্ছে না। এরপর এল সিডি। সেটাতেও এরকম আটটা গানের ব্যাপার এল, সেই আটটা গান কখনও হয়তো তিন-চারজন কিংবা একজন লিরিসিস্ট-কম্পোজারই জড়ো করলেন।

সময়ের নিয়মে দেখা গেল— পৃথিবী জুড়েই সিডি আর বিক্রি হতে চাইছে না। ডিজিটাল যুগ এল, এই সময়ে দেখা যাবে, কোনও এক মুহূর্তে মানুষের কোনও পারফর্মেন্স ভাল লাগল, সেটা কয়েকজন জ্যাজ শিল্পীদের গিগ্ও হতে পারে, হতে পারে অন্য কিছু। মানুষ সেটাকে রেকর্ড করছে এবং মুহূর্তের মধ্যে তা নানা জায়গায় ছড়িয়ে যাচ্ছে।
সিঙ্গল্স-এর সুবিধে হল, এককালীন বিনিয়োগ করে, সমস্ত মেধা, শ্রম— সবই একটা গানের মধ্যে কেন্দ্রীভূত করা যায়। সেটাকে তারপর এডিট করে মানুষের কাছে পরিবেশন করা হয়। এমনও হতে পারে, একটা গানেই কেল্লা ফতে! এ-সময়েই হুকলাইন কথাটা আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠল। ধরা যাক, একটা তিন-চার সেকেন্ডের গান, তাকেই প্রতি সেকেন্ড জুড়ে নতুন করে আবিষ্কারের প্রবণতা। দেখতে-দেখতে এমনও হল— গান তৈরি হচ্ছে ফোনের রিংটোনের জন্য।
বর্তমান সময়ে সিঙ্গল্স অনেকটাই আবার অ্যালগরিদমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কোনও গান সোশ্যাল মিডিয়াতে দেওয়া হল, সেটা মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে গেল। অর্থাৎ, এখন আবার অনেকটাই সমাজমাধ্যম-নির্ভর হয়ে পড়ছে। এর ফলে যা হচ্ছে, কোনও গান মানুষের কাছে সাময়িকভাবে আবেদন তৈরি করছে, আবার সেই গানটাকেই মানুষ খানিক পরে ভুলে যাচ্ছে। আবার এর ফলে শ্রোতাদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়ার প্রবণতাও স্পষ্টতর হয়েছে। একটা গানের কিছু অংশ সমাজমাধ্যমে ছেড়ে বুঝে নেওয়া যাচ্ছে, কীভাবে তা শ্রোতাদের প্রভাবিত করছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো এসেও এই প্রবণতা বাড়িয়েছে। গানগুলো জনপ্রিয় হয়ে বেঁচে থাকলে বাঁচল, মরে গেলে মরল। আবার নতুন একটা গান নিয়ে, নতুন নিরীক্ষা শুরু!

কেউ অনেকগুলো সিঙ্গল গাইল, অনেকগুলো প্লে-লিস্টে তার গান চলে এল— গোটা প্রক্রিয়াটায় গান একবারেই মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। আবার আলাদা-আলাদা গানের মুড বা ভাব স্বতন্ত্র, তাকে কোনও একটা নির্দিষ্ট অ্যালবামের থিমের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হচ্ছে না। সিঙ্গল্স হওয়াতে প্রতিটি আলাদা গানের ‘ভাব’, স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখছে।
আসলে সিঙ্গল্স-এর মধ্যে অনেকগুলো গানের একসঙ্গে হেরে যাওয়ার ভয় নেই। এই তুলনাটা করা যায়, রেসের মাঠে যাওয়া মানুষের সঙ্গে। যারা বারবার হেরে যাওয়ার পরেও মাঠে যায়, তাদের সঙ্গে পার্থক্যটা এখানেই, সিঙ্গল্স একবারের তুক্কা খেলা। একবার বিফল হলে আবার নতুন করে তার সূচনা, শুরু থেকে।
আসলে গানের ক্ষমতা কী? আমি আমার জীবনের কথা বলছি। ধরা যাক সলিল চৌধুরী বা আরডি বর্মণের একটা গান, সেটার প্রিলিউড থেকে শুরু করে যখন শেষ হচ্ছে, সেই পর্যন্ত আমরা বিস্ময়ে তাকিয়ে রয়েছি। একটা ‘চোখে-চোখে কথা বলো’, কিংবা ‘কেন কিছু কথা বলো না’ বা ‘আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা’— এগুলো এক-একটা অ্যালবামের গান, কখনও দুটো করে বেরিয়েছে, কখনও চারটে করে বেরিয়েছে— প্রত্যেকটা গানের মধ্যে রয়েছে কম্পোজারের নিজস্ব ছাপ, যাপন এবং শিল্পীর সামগ্রিক সত্তা। এ-সবই থাকে একটা অ্যালবামের মধ্যে। এই গানগুলোর মধ্যে একটা গল্প লেখার চেষ্টা থাকত। আবার এমন অনেক অ্যালবাম হয়েছে, সেটার কোনও গানই হয়তো মানুষের ভাল লাগেনি।
আরডি বর্মণ একবার একটা হিন্দি অ্যালবাম করেছিলেন। সেই প্রথম কোনও হিন্দি গানের অ্যালবাম প্রকাশ করলেন তিনি। গুলজার লিরিক লিখেছিলেন, গেয়েছিলেন আশা ভোঁসলে। নাম, ‘দিল পড়শি’। এই অ্যালবাম শুনলে বোঝা যায়, তিনি এক্সপেরিমেন্ট করছেন অ্যালবামের গানগুলো নিয়ে, কিন্তু তার কাছে যে ছবির গানগুলো আসছে, সেগুলো নিয়ে তা করতে পারছেন না। এই অ্যালবামটা শুনলে বোঝা যাবে, ওঁর ভেতর নতুন কিছু করার ইচ্ছে ও তার আঁচটুকু। এখানে পুরনো বাংলা গানকে গুলজার হিন্দি করছেন এবং অন্য অ্যারেঞ্জমেন্ট-সহ সে এক অসাধারণ ব্যঞ্জনা।
সে-সময়ে, আটের দশকে গুলজার ‘লিবাজ’, ‘ইজাজত’ ছবিগুলো করছেন, সংগীতে রয়েছেন আরডি বর্মণ। অসাধারণ তার ট্র্যাকসমূহ। শুনলে মনে হবে, একজন মানুষ ক্রমাগত একটা সময়ের মধ্য দিয়ে তাঁর যাপনকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। এবং তারপর আবার যখন মাইকেল জ্যাকসন, তাঁর ‘থ্রিলার’ নিয়ে আসছেন, সারা পৃথিবী তাকিয়ে থাকছে সেই একটি ‘থ্রিলার’-এর দিকে।
ক্রমে আমাদের ভারতে, বাংলায় সিঙ্গল্স জনপ্রিয় হতে আরম্ভ করল। এবং এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল কম টাকার লগ্নি। আর শুধু তো টাকা নয়, মানুষের মন-আবেগেরও লগ্নি হয়। সেই লগ্নি কিছুটা হলেও কম। আমার প্রেমের একটি গান তৈরি করতে ইচ্ছে করছে, বা আমি বেদনাহত, একটু ক্ষত-য়, আমি একটা গান তৈরি করছি। সেই গানে এসে যোগ দিচ্ছেন বাদ্যযন্ত্রশিল্পী থেকে প্রোগ্রামার-রা। এভাবে একটি গানে, আমাদের নিজের সঙ্গে নিজের গল্পটা পূর্ণ করার জন্য, অর্ধেক-অর্ধেক হৃদয় এসে জুড়ে যাচ্ছে। এই গানগুলো আসলে একটা আবেগ, একটা গল্প, একটা মোটিফ। গল্প মানে কিন্তু ছোটগল্পও নয়, চার থেকে ছ’লাইনের গল্প। এইরকম গানের যদি ‘হুক’ থাকে, তা ছড়িয়ে পড়বে। ভারত জুড়েই সেরকম কাজ হচ্ছে।

সাত ইঞ্চির ভিনাইল রেকর্ড যখন ছিল, তখন এক-একটি দিকে তিন মিনিটের এক-একটি গান থাকত। যাঁরা দু-আড়াই ঘণ্টার খেয়াল গাইতেন, আলি আকবর খাঁ, বেগম আখতার, বড়ে গুলাম আলি খাঁ, আমির খাঁ— তাঁরা তিন মিনিটের একটি দরবারি গাইছেন। আড়াই ঘণ্টার মাড়োয়া গাইছেন আমির খাঁ, তিন মিনিটে। একপিঠে মাড়োয়া, অন্য পিঠে ললিত। তিন মিনিটে আলাপ, বিলম্বিত, তাকে খেলিয়ে শ্রুতে নিয়ে এসে একটি নির্দিষ্ট তেহাই-তে শেষ হচ্ছে সেই গান। কী অপরিসীম দক্ষতা! রেডিওতে রেকর্ড হলে একটা লাল আলো জ্বলত, একজন হাত দেখাত, কতক্ষণ বাকি তা জানান দিত। তার মধ্যেই গেয়ে যেতে হচ্ছে আমির খাঁ-কে। তাঁর শিল্পের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন তিনি রাখছেন ওইটুকু সময়ের মধ্যেই। পৃথিবী জুড়েই তা হয়েছে। মাইলস ডেভিস, লুই আর্মস্ট্রং যেভাবে বাজাচ্ছেন, গাইছেন— একইভাবে গাইছেন আমির খাঁ। এভাবে আস্তে-আস্তে ছোটগল্প হয়ে উঠল বড় গল্প, সেখান থেকে এল উপন্যাস।
একটি গানে, আমাদের নিজের সঙ্গে নিজের গল্পটা পূর্ণ করার জন্য, অর্ধেক-অর্ধেক হৃদয় এসে জুড়ে যাচ্ছে। এই গানগুলো আসলে একটা আবেগ, একটা গল্প, একটা মোটিফ। গল্প মানে কিন্তু ছোটগল্পও নয়, চার থেকে ছ’লাইনের গল্প। এইরকম গানের যদি ‘হুক’ থাকে, তা ছড়িয়ে পড়বে। ভারত জুড়েই সেরকম কাজ হচ্ছে।
এখন দেখা যাচ্ছে, পনেরো সেকেন্ডের মধ্যে গান শ্রোতাকে ধরে ফেললে তবেই সে-গান জনপ্রিয় হবে, নইলে হবে না। সিঙ্গল্স আসলে আড়াই-তিন মিনিটের মধ্যে শিল্পীকে স্বাধীন করছে, কিন্তু তার মধ্যে রয়েছে অসংখ্য পনেরো সেকেন্ড। ভিনাইলের শৃঙ্খল থেকে এসেছে ডিজিটালের স্বাধীনতা। মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির অর্থনীতি কীভাবে চলছে, তার ওপরেও অনেক কিছু নির্ভর করে। সেই চার-পাঁচের দশকে কিন্তু সিঙ্গল্স দিয়েই শুরু। তারপর এল অ্যালবাম। আবার এই কোভিড-উত্তর সময়ে এসে আবার সিঙ্গল্স-এর দিকে আমরা ঝুঁকে পড়ছি।
সিঙ্গল্স শৃঙ্খল থেকে স্বাধীনতা— শিল্পীকে এই যাত্রাপথের মধ্য দিয়ে যেমন নিয়ে এল, তেমন শ্রোতাকেও। একজন একটা গান এখন তিন সেকেন্ডও শুনতে পারে, আবার তিন মিনিটও শুনতে পারে। তথ্যের স্বাধীনতা, ‘ডেটা’ বিপ্লব। স্মৃতিতে একটা গানের একটা অংশ, একটা প্রিলিউড রয়ে যাবে। সিঙ্গল্স থেকে সিঙ্গল্স-এই আমাদের যাত্রা এসে থেমেছে আপাতত, এভাবেই।




