ভালবাসার স্বীকৃতি
‘আই উইশ আই নিউ হাউ টু কুইট ইউ’…
এর বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায়— ‘ইশ, যদি জানতাম তোমাকে কীভাবে ভুলে থাকতে হয়।’
‘Brokeback Mountain’-এর এই হৃদয়বিদারক বাক্য যেকোনো লিঙ্গ-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মনে দাগ কাটতে পারেনি, সেই ঘটনা ইতিহাসে বোধ হয় বিরল। ভালবাসা থেকে কি সত্যিই বেরিয়ে আসা যায়? হয়তো না। পৃথিবীর বহু মানুষের নিজের ভালবাসাকে অস্বীকার করতে হয়েছে, শুধুমাত্র সমাজের চাপে পড়ে। কেউ তাঁর পরিজন হারিয়েছেন, কেউ-বা লুকিয়েছেন পরিচয়। আবার কেউ সারাজীবন এমন একজনের শোক বহন করে চলেছেন, যাকে হয়তো আইন কখনও তার ‘পরিবার’ বলে স্বীকৃতিই দিতে চায়নি। সত্যি বলতে একজন সমকামী মানুষের কাছে ভালবাসা কখনওই তাঁর শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতির বিষয় ছিল না, বরং সেটি ছিল প্রতিবাদ এবং তাঁর অধিকার দাবির লড়াই। যে-ইতিহাস দীর্ঘ সময় ধরে একটা সম্পর্ককে ‘অবৈধ’ বলে দাগিয়ে এসেছে, আজ সেই সম্পর্কই আইনের চোখে সমান মর্যাদা লাভ করল।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে এই পরিবর্তনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নাম হল নেপাল। সম্প্রতি জানা গিয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে সমলিঙ্গের দম্পতিদের পূর্ণ বৈবাহিক অধিকারের পথে রায় দিয়েছে নেপাল সরকার। যা শুধুমাত্র কেবল এক আইনি সিদ্ধান্ত নয়, বরং এমন হাজারও মানুষের স্বপ্ন, যাঁরা বছরের পর বছর ভালবেসেও রাষ্ট্রের চোখে কখনও জীবনসঙ্গী হিসেবে স্বীকৃতি পাননি।
নিজের উভকামী সত্তার কথা কখনও স্বীকার করেননি অ্যাঞ্জেলিনা জোলি! লিখছেন ভাস্কর মজুমদার…
ভালবাসার ইতিহাস মানুষের জন্মের ইতিহাসের মতোই প্রাচীন। সেই ইতিহাসে বিপরীত লিঙ্গের প্রেম যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে সমলিঙ্গ মানুষের পারস্পরিক মেলবন্ধন। তার উদাহরণ বারবার উঠে এসছে প্রাচীন সাহিত্য, পুরাণ, ভাস্কর্য ও শিল্পকলায়। অথচ, সময়ের সঙ্গে বদলেছে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। একসময়ে যে-সম্পর্ক মানবজীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিল, আজ সেই ভালবাসার সম্পর্কই ঔপনিবেশিক আইন এবং সামাজিক রক্ষণশীলতার ঘেরাটোপের প্রভাবে ধীরে-ধীরে তা ‘অস্বাভাবিক’ অথবা ‘অনৈতিক’ হিসেবে চিহ্নিত হতে শুরু করে। ফলে একপ্রকার ভয় বা আত্মসম্মানের তাগিদে পড়েই সমলিঙ্গের মানুষদের শুধু নিজেদের পরিচয় তো বটেই, পাশাপাশি নিজেদের ভালবাসাকেও লুকিয়ে রাখতে হয়েছে দিনের পর দিন। ভাবুন তো একবার, নিজের শরীর, নিজের মন অথচ তার শাসক নাকি রাষ্ট্র! কিন্তু ভালবাসা কি কখনও আর আইন বা সামাজিক নিয়মের গণ্ডিতে আটকে থাকে? যুগে-যুগে অসংখ্য মানুষ সব বাধা পেরিয়ে নিজের অনুভূতির প্রতি সৎ থেকেছেন। এইবারও তার অন্যথা হয়নি। নেপালের সাম্প্রতিক রায়ও আজ সেই বিষয়টিকে আরও জোরালো করে তুলেছে, ভালবাসার পরিচয় কি মানুষের লিঙ্গে, না কি তার অনুভূতিতে? প্রশ্ন উঠে এসেছে বারংবার।
সমকামিতা কিংবা সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণকে অনেক সময় ‘পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব’ বলে দাবি করা হয়। কিন্তু ইতিহাস বলছে, এক সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। দক্ষিণ এশিয়ার পুরাণসাহিত্য, শিল্পকলা ও স্থাপত্যে লিঙ্গ-পরিচয়ের উপস্থিতি বহু শতাব্দী ধরেই বিদ্যমান। প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থ কামসূত্রে সমলিঙ্গের আকর্ষণ এবং সম্পর্কের কথা উল্লেখ পাওয়া যায়। মধ্যযুগীয় স্থাপত্যেও এই ছাপ স্পষ্ট। তার উদাহরণ আমরা খাজুরাহো ও কোনারক সূর্যমন্দির ভাস্কর্যের উল্লেখ এলেই পাই। শিল্পীর নিপুণ কারুকার্যে মন্দিরের গায়ে স্পষ্টত ফুটে উঠেছে সমকামী অন্তরঙ্গতার মুহূর্ত। ইতিহাসবিদদের মতে, সেই সময়ের সমাজে যৌনতার বহুমাত্রিক উপস্থিতিই এহেন প্রতিফলনের কারণ। একইভাবে মহাভারত-এ শিখণ্ডী কিংবা অর্জুনের বৃহন্নলা রূপ লিঙ্গ এবং সামাজিক পরিচয়ের জটিলতাকে নতুনভাবে ভাবার এক নতুন দৃষ্টিকোণ তৈরি করে দেয়।
১৮৬০ সালে ব্রিটিশ শাসন নতুন আইন প্রণয়ন করে। শুরু হয় ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা (Section 377), যেখানে তথাকথিত প্রকৃতিবিরুদ্ধ যৌন সম্পর্ক’-কে ‘অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করা হয়। স্বাধীনতার পর ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ-সহ একাধিক দেশ দীর্ঘদিন এই ঔপনিবেশিক আইনি কাঠামোর প্রভাব বহন করে চলে। ফলত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই অসম অভ্যাসের কারণে সমাজে বিদ্যমান সমলিঙ্গের সম্পর্কগুলোকে আইনিভাবে বয়কট করা হয়। অপরাধের দোহাই দিয়ে LGBTQA++++ সম্প্রদায়কে সামাজিক বঞ্চনা তো বটেই, পাশাপাশি তাকে ফেলে দেওয়া হয় রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের আতান্তরেও। তবে গত কয়েক দশকে পরিস্থিতির চাকা ঘুরতে শুরু করলে সেই ফাঁকে আইনি রায় এবং আন্দোলনের দ্বারা দক্ষিণ এশিয়ায় ধীরে-ধীরে জন্ম নেয় নতুন আলোচনার। জেন জি শাসনের পরবর্তী সময়ে যে-রায় নেপালে গৃহীত হল, তা আদতে জায়গা করে দিল এক দীর্ঘ ইতিহাসকে।


ভারতীয় প্রেক্ষাপটে দীপা মেহতার ‘ফায়ার’ (১৯৯৬) সিনেমায় দেখা গেছে দুই নারীর সম্পর্কের মেলবন্ধন। যা অবশ্যই সমাজ এবং পরিবারের বিবাহ প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নের মাধ্যমে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিল। অন্যদিকে পাকিস্তানের ‘জয়ল্যান্ড’ (২০২২) যৌন ও লিঙ্গ-পরিচয়কে ঘিরে রক্ষণশীল সমাজ এবং সেই সমাজের ক্ষয়িষ্ণুতাকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরে। উপমহাদেশীয় প্রেক্ষিতে তৈরি চলচ্চিত্রগুলোর মূল সুর একটাই, ভালবাসাকে অনুভব করা নয়, বরং সেই ভালবাসাকে সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়া।
দক্ষিণ এশিয়ায় LGBTQA++++ অধিকারের প্রসঙ্গে নেপাল দীর্ঘদিন ধরেই তুলনামূলকভাবে প্রগতিশীল অবস্থানে রয়েছে। এই পথ চলা সূচনা হয় ২০০৭ সালে, যখন নেপালের সুপ্রিম কোর্ট যৌন ও লিঙ্গ-পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্যকে অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করে। একই সঙ্গে সরকারকে LGBTQA++++ সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষায় প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের নির্দেশ দেয় আদালত। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে এটি ছিল অবশ্যই এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত, যা পরবর্তী সময়ে নেপালের সংবিধানে যৌন ও লিঙ্গবৈচিত্র্যের স্বীকৃতির পথকে সুগম করে। কিন্তু হিসেবমতো এত কিছু সত্ত্বেও থেকে গিয়েছিল মাত্র একটি অপূর্ণতা। তখনও সমলিঙ্গের যুগলদের বিবাহের অধিকার অধরাই ছিল। দীর্ঘ আন্দোলন ও আইনি লড়াইয়ের পর শেষে ২০২৩ সালে নেপালের সুপ্রিম কোর্ট অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে সমলিঙ্গের দম্পতিদের বিবাহ নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। এর ফলে স্থানীয় প্রশাসন নির্দিষ্ট শর্তের মাধ্যমে সমলিঙ্গের বিবাহ নিবন্ধন শুরু করলেও, সেটি পূর্ণাঙ্গ আইনি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ছিল না। উত্তরাধিকার, পারিবারিক সম্পত্তি, সামাজিক নিরাপত্তা, কিংবা অন্যান্য নাগরিক সুবিধার ইত্যাদি প্রভৃতি ক্ষেত্রে নানা অস্পষ্টতা ছিল শুরুর থেকেই বিদ্যমান।
সেই প্রেক্ষাপটকে মাথায় রাখলে ২০২৬ সালের ১৪ জুন নেপালের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায় এক নতুন ইতিহাস তৈরি করে ফেলেছে। আদালত থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, ‘সমলিঙ্গের দম্পতিদেরও বিপরীত লিঙ্গের দম্পতিদের মতো সমান বৈবাহিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।’ এর মানে কী দাঁড়ায়? অর্থাৎ, বিবাহ আর শুধুমাত্র বিপরীত লিঙ্গের মধ্যে আবদ্ধ থাকবে না। যৌন অভিমুখিতার ভিত্তিতে কোনও নাগরিককে আর বৈবাহিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এই রায় কেবল একটি আইনি পরিবর্তন নয়, বরং সংবিধানে উল্লিখিত সমতা, মর্যাদা ও মানবাধিকারের নীতির বাস্তব স্বীকৃতির নিদর্শনও বটে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কগনিটিভ সায়েন্স রিসার্চার এবং ট্রান্স-আন্দোলনকর্মী শীর্ষ বসুকে এই বিষয়ক প্রশ্ন করলে তিনি জানান, “সমলৈঙ্গিক সম্পর্কের রাজনীতিতে আইনি স্বীকৃতি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে আইনানুগ ব্যবস্থার পরিবর্তন দিয়ে সামাজিক মনস্তত্ত্বে পরিবর্তন ঘটানো যায় না। আজও অনেক সম-যৌনসত্তার মানুষ সমাজের কাছে তাঁদের লিঙ্গ-যৌনপরিচয় গোপন করেন তার কারণ সে জানে যে সে একটি সার্বভৌম ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রে বসবাস করেও নিরাপদ নয়। এই ভয়ের কারণ বহুমাত্রিক। প্রধান কারণ ভারত রাষ্ট্র-র সামগ্রিক অবচেতনায় থাকা সমকাম-বিদ্বেষ বা রূপান্তরকাম-বিদ্বেষ। সমলৈঙ্গিক মানুষেরা যে-ধরনের জৈবিক পরিবারে বড় হয়ে থাকেন, বা যে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে কাজ করে থাকেন, সেইসব পরিসর-কে আরও লিঙ্গ-সংবেদী হয়ে উঠতে হবে। সমাজবিজ্ঞানে, শিক্ষাতত্ত্বে, মনস্তত্ত্বে, নৃতত্ত্বে, সমাজবিদ্যায়, ইতিহাসচর্চায় সমলৈঙ্গিকতা নিয়ে, বিশেষ করে বাংলায় সমযৌনসত্তার জীবনযাপন নিয়ে, আরও অনেক কাজ প্রয়োজন। যে-হারে ইংরেজিতে বা অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষায় আবিশ্ব, ‘ক্যুইয়ার-থিওরি’, ‘ফেমিনিস্ট থিওরি’ নিয়ে কাজ হয়েছে, ঠিক সেই হারে বাংলায় এবং বিজ্ঞানে নারীবাদ নিয়ে চর্চা হয়নি। এই চর্চার পরিসর বাড়ালে মানুষের সামগ্রিক লিঙ্গচেতনায় যে বদল আসবে, তা দিয়ে রাষ্ট্রের মোকাবিলা করা সম্ভব হয়ে উঠতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “নেপালে সমলৈঙ্গিক বিবাহ স্বীকৃতি পেয়েছে, সেটি অবশ্যই আশাপ্রদ ও রাষ্ট্রশাসনব্যবস্থার নিরিখে প্রশংসীয়। তবে, এই মর্মে, সমলৈঙ্গিক যৌনজীবনে বিবাহের প্রাসঙ্গিকতা খতিয়ে দেখবার প্রয়োজন আছে। যদি এমন হয় যে সমলৈঙ্গিক বিবাহ, বিসমকামী সম্পর্কে থাকা ‘হেটেরোনর্মেটিভিটি’-র রসায়ন ও তার সংশ্লিষ্ট হিংসার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে, তাহলে সমলৈঙ্গিক বিবাহের সেই মডেল অবশ্যই বর্জনীয়। নেপালের এই সিদ্ধান্ত ভারতের মতো দেশগুলোর বিচারব্যবস্থা বা জনমত-কে তখনই প্রভাবিত করতে পারে, যখন সমাজে প্রকাশ্যে এবং অন্তরালে, সম-যৌন মানুষের ওপর এবং বিশেষ করে, যখন আন্তর্ব্যক্তিক সমযৌন সম্পর্কে আমরা হিংসা, দ্বেষ, হানাহানির ইতিহাস-কে সমূলে উৎপাটিত করতে পারব।”
মজার বিষয় হচ্ছে, নেপালের এই সিদ্ধান্ত কিন্তু শুধুমাত্র দেশটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এটি গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। এই ক্ষেত্রে অবশ্যই উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ঐতিহাসিক রায়ে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা বাতিলের মাধ্যমে সমলিঙ্গের সম্পর্ককে অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দিলেও ২০২৩ সালে সমলিঙ্গের বিবাহের আইনি স্বীকৃতির আবেদন খারিজ করে জানানো হয়, ‘এ বিষয়ে আইন প্রণয়নের দায়িত্ব সংসদের।’ ফলে তা এখনও সিদ্ধান্ত হিসেবে গৃহীত নয়। যার ফলাফলস্বরূপ ভারতে সমলিঙ্গের যুগলরা এখনও বিবাহের আইনি অধিকার থেকে বহির্ভূত। অন্যদিকে বাংলাদেশে এখনও ঔপনিবেশিক আমলের দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা বহাল রয়েছে, ফলে সেখানে সমলিঙ্গের যৌন সম্পর্ক অপরাধ বলেই বিবেচিত। পাকিস্তানেও সমলিঙ্গের সম্পর্ক আইনি স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত। যদিও ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের অধিকার নিয়ে কিছু অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু তা নিতান্তই নগণ্য। সেই দিক দিয়ে দেখতে গেলে বাস্তবতায় নেপালের এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ দক্ষিণ এশিয়ায় সম্পর্কের সমান অধিকার ও বৈবাহিক স্বীকৃতির প্রশ্নে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ভবিষ্যতে এই রায় প্রতিবেশী দেশগুলোর জনমত, মানবাধিকার আন্দোলন এবং আইনি আলোচনায় কতটা প্রভাব ফেলবে, তা অবশ্য সময়ই বলবে।
২০১৮ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ঐতিহাসিক রায়ে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা বাতিলের মাধ্যমে সমলিঙ্গের সম্পর্ককে অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দিলেও ২০২৩ সালে সমলিঙ্গের বিবাহের আইনি স্বীকৃতির আবেদন খারিজ করে জানানো হয়, ‘এ বিষয়ে আইন প্রণয়নের দায়িত্ব সংসদের।’
বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে সমলিঙ্গের এই বিবাহের আইনি স্বীকৃতি অনেকের কাছেই শুধুই ভালবাসার অধিকার বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটি আরও গভীর। একটি সম্পর্কের স্বীকৃতি অনেক মৌলিক নাগরিক অধিকারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একজন দম্পতি হিসেবে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি ছাড়া দীর্ঘদিন একসঙ্গে বসবাস করলেও আইন তাদের পরিবার হিসেবে স্বীকার করে না। ফলে একজন সঙ্গীর মৃত্যুর পর অন্যজন উত্তরাধিকার বা সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন এমন সম্ভাবনাও রয়েছে। এমনকী, জরুরি পরিস্থিতিতে হাসপাতালে চিকিৎসা-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাঁর নাও থাকতে পারে। তাহলে আরও বলি, সম্পর্কে স্বীকৃতি না থাকলে একইভাবে সন্তানের অভিভাবকত্ব, দত্তক গ্রহণ, যৌথ সম্পত্তির মালিকানা, পেনশন, স্বাস্থ্যবিমা বা অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রেও আইন সংক্রান্ত বিষয়ে জটিলতা দেখা দিতে পারে। এই অবস্থা শুধুমাত্র যে-কোনও সম্পর্কে স্বীকৃতি না পাওয়ার ফলে। সমলিঙ্গের ক্ষেত্রে তা অবশ্যই আরও জটিল। বিবাহের অধিকার না থাকলে এসব সুবিধা থেকে সমলিঙ্গের যুগলরা প্রায়ই বঞ্চিত হন, যদিও তাঁদের সম্পর্কের গভীরতা বা একসঙ্গে কাটানো জীবনের দৈর্ঘ্য অন্য যে-কোনও দম্পতির মতোই হতে পারে, তা অবশ্য প্রশ্নাতীত হলেও চিন্তার বিষয় তো বটেই। তাই এক্ষেত্রে নেপালের সাম্প্রতিক রায়কে শুধু ভালবাসার স্বীকৃতি দিয়ে দেখলে বিষয়টিকে যে অসম্মান করা হয়, তা নয়; বরং তাদের এতদিনের লড়াই এবং অধিকারকেও একপ্রকার নস্যাৎ করে দেওয়া হয়। অথচ এটি মূলত সমান নাগরিক অধিকার এবং আইনের চোখে সমানভাবে স্বীকৃতি পাওয়ার লড়াই। এই রায় মনে করিয়ে দেয়, একটি সম্পর্কের মূল্য শুধু আবেগে নয়, সেই সম্পর্ককে রাষ্ট্র কতটা মর্যাদা দেয়, তার ওপরও নির্ভর করে। আইনি স্বীকৃতি তাই কেবল প্রতীকী নয়, এটি মানুষের প্রতিদিনের জীবন, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।



