নতুন বাড়ি
আমি যখন ক্লাস এইট নাকি নাইন, তখন বস্তিবাড়িটা ভেঙে মেজপিসেমশাইয়ের নতুনবাড়িটা তৈরি হয়ে গেছে। বড়পিসেমশাই চলে এল কারখানা বাড়িতেই একটা ঘরে। বিরাটিতে বাড়ি করবে বাবা, ওখানে থেকেই করতে হবে। বিরাটিতেই মহাজতি নগর নামে একটা রিফিউজি কলোনি আছে, জবরদখল করা। অন্যের জবরদখল করা একটা প্লটে, আমরা ভাড়া থাকতে লাগলাম। টিনের চাল, দরমার বেড়া, একটা ঘর, উঠোনের এক ধারে রান্নাঘর। বাড়িতে টিউবয়েল নেই, রাস্তায় একটা টিউবয়েল ছিল, পাম্প করে খাবার জল, রান্নার জল নিয়ে আসতে হত। একটা কুয়ো পায়খানা ছিল, মানে একটা পাতকুয়ো কেটে, তার উপরটা পাকা করে দুটো পা-দানি বসিয়ে দেওয়া, চারদিক টিন দিয়ে ঘেরা। মাথার ওপরে কিছু নেই। স্নান, কাচাকুচি, বাসনমাজার জন্য পুকুর। পুকুরটা কাছেই, মিনিট দু-একের পথ। সমস্ত এঁটো বাসনপত্র নিয়ে পুকুরে যেত মা। পুকুরে জলঢোঁড়া কিলবিল করত। নানাবাড়ির হাঁসগুলো ঘুরত। মাছরাঙা পাখি আসত, বাচ্চারা পুকুর পাড়ের কচু বনে হাগু করে, পুকুরের জলে ছুচু করত। রিফিউজি গৃহবধূরা কাপড়-চোপড় কাচত। ওই পুকুরেই বাসন পরিষ্কার হত।
বাবা বলতেন, আর অল্প ক’টাদিন সবুর কর, নিজেদের পুকুর হবে। নিজেদের পুকুরে নিজেরা স্নান করব। হয়েছিল, বাড়ি হয়েছিল আমাদের, ইটের দেওয়াল, ঢালাই ছাদ। একটা ঘরের মেঝে সিমেন্টের, অন্যটা মাটির। কয়েক বছর পর সিমেন্ট হয়েছিল; কিন্তু সিমেন্ট হওয়ার পরেও, ওই ঘরটাকে মাটির ঘরই বলা হত। বারান্দায় চারপায়া চৌকি। ওটার আবার নাম দেওয়া হয়েছিল কাছারি বারান্দা। গরু ছিল গোয়াল ঘরে, ওখানে দুধের সঙ্গে গোবরও হত। আমাদের নিজস্ব গোবর। মা ঘুঁটে দিত। আমাদের রান্নার জন্য ঘুঁটে কিনতে হত না। বাইরের উঠোনে একটা উনুন করা হয়েছিল, ওখানে শুকনো ডালপালা নারকোল সুপারি শুকনো পাতা এইসব দিয়ে জ্বালানি করে কয়লা বাঁচাত মা।
‘ফেলে আসা দেশের বাড়ির ছেলেমানুষি রেপ্লিকা!’
পড়ুন: উল্টো দূরবিন পর্ব ১৩…
এটা আমাদের নিজেদের বাড়ি হল, কিন্তু আমি তখন হেয়ার স্কুলে পড়ছি। বাবা আমাকে হেয়ার স্কুলে ভরতি করে দিয়েছিলেন। কেন যে ওই স্কুলে দিলেন…বাগবাজারের কাশিমবাজার ইস্কুলে আমি দিব্য ভাল ছিলাম। ক্লাসে সেকেন্ড-থার্ড হতাম। একবার ফার্স্টও হয়েছিলাম। ওখানে আমার বেশ কদর ছিল। স্যরেরা ভালবাসতেন, ভাল ছেলে বলেই আমাকে জানত বন্ধুরা। হেয়ার স্কুলে বেশি ভাল, অতি ভাল ছেলেদের ভিড়ে আমি হারিয়ে গেলাম। যে-অঙ্কগুলি আমি পারি না, ভাল ছেলেদের কাছে সে-সব জলভাত। জ্যামিতির যে-এক্সট্রা গুলো স্যর করাচ্ছেন, সে-সব আমার আয়ত্তের বাইরে। আমি লজ্জা পেতে লাগলাম। আমি ব্যাকবেঞ্চার হতে-হতে, লাস্টবেঞ্চার হয়ে গেলাম। বাবা ভেবেছিলেন, হেয়ার স্কুল ভাল স্কুল, ওই স্কুলে আমার প্রচুর উন্নতি হবে। হল না। বাবা শিক্ষক হয়ে কেন এরকম ভুল করলেন? যাই হোক, আমি স্কুলে পড়ি বলে বিরাটি গেলাম না। আমি আমার মেজপিসিমার বাড়িতে থেকেই স্কুলে যেতাম। আমার পিসিমা-পিসেমশাই বলেছিলেন, বিরাটি থেকে কী করে স্কুলে যাবি? এখানেই থাক। এখানে মানে ১৪ বি গ্যালিফ স্ট্রিট। নতুন বাড়ি।

এর মধ্যে রাঙাদার বিয়ে হয়েছে। এই বিয়েটার কথা তো বলতেই হয়। এই রাঙাদা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে, খড়গপুর আইআইটি থেকে এম টেক পাস করে ফেলেছে, একটা চাকরিও করছে, এই সময়ে বিয়ে ঠিক হয়। পাত্রী বাগবাজারের মেয়ে, অপূর্ব সুন্দরী, বিএ পাস। ডাক্তারের মেয়ে। ডাক্তারের চেম্বার রাজবল্লভ পাড়ায়। চেম্বারেই মাইক্রোস্কোপ দেখেছি, রোগীর রক্ত পরীক্ষা, হিসি-হাগু পরীক্ষা নিজ হাতেই করেন। খুবই জনদরদী ডাক্তার। আদি দেশ ঢাকায়। শক্তি ঔষধালয় ওদের পূর্বপুরুষ তৈরি করেছিল।
রাঙাদার বিয়ে হল, আমরা বরযাত্রী। একটা বাস বোঝাই করে, কালির কারখানার সমস্ত শ্রমিকরা, আমাদের প্রচুর আত্মীয়-স্বজন। বিয়েটা হয়েছিল হাজরা রোডের একটা বাড়িতে। ওটা ওদের নতুন বাড়ি। বাড়ির ছাদে ম্যারাপ। ওখানেই রান্নার ব্যবস্থা। বরযাত্রীদের দেখে কন্যাপক্ষ তো হতবাক! চড়া রঙের ছিটের জামা, কড়া রঙের শাড়ি, নাকে শিকনি ঝরা বাচ্চা-কাচ্চা সব, কারখানার শ্রমিকেরা। ওদেরই শুধু বলা হয়েছিল, কিন্তু ওরা কেউ-কেউ বউ বাচ্চা নিয়ে এসেছে, আর আত্মীয়-টাত্মীয়দের মধ্যে, বেশিরভাগই গরিব। সবাই তো রিফিউজি। মুখে আভিজাত্যের ছাপ নেই। আমাদের নোয়াখালি জেলা, ওদের ঢাকা জেলা। ওদের বংশে অনেকেই উচ্চশিক্ষিত, আমাদের মধ্যে খুবই কম। আমাদের বরযাত্রীদল উঁচু গলায় কথা বলছে, ওদের গলা তীব্র নয়, যাকে বলে পরিশিলিত। ওদের বাড়ির মেয়েদের মাথায় ফুল ঝলোমলো মুখ, কেমন পরী-পরী ভাব। ওই বিয়েতেই প্রথম দেখলাম ভাতের বদলে লুচি এবং মুরগির মাংস। সময়টা ১৯৬৫ সাল। আমাদের বরযাত্রীদলে, কয়েকজন কাকা-জ্যাঠা ধরনের আত্মীয় ছিলেন। ওঁরা তীব্র ব্রাহ্মণ। ওরা জানুবাবু বা জাহ্নবীজীবনের পুত্রের বিবাহ উপলক্ষে এসেছেন, বিবাহকার্য দর্শন এবং দরকারে উপদেশ দান করবেন। ঠাকুর-মাকুরের হাতের রান্না ওঁরা খান না। ওঁরা হয়তো দধি মিষ্টি খাবেন এমনই ভেবে এসেছিলেন, মুরগির মাংস হয়েছে শুনে গুঞ্জন— ‘হুইছেন নি, ইয়ানো কুক্কুট মাংস রান্না হইছে, এবল কী কইত্তাম?’— মানে, শুনছেন, এখানে মুরগির মাংস রান্না হয়েছে এবার কী করব?
অনেকেই নাকি দই-মিষ্টিও খাননি, অনেকেই বলতে তিন-চারজন। তখন মুরগির মাংস ছিল পাঁঠা-খাসির মাংসের চেয়ে দামি। জ্বরজারির পর, মুরগির সুপ খেত বড়লোকেরা। মুরগির ডিমের দাম ছিল হাঁসের ডিমের চেয়ে বেশি। ব্রয়লার শব্দটা তখন একেবারেই অচেনা। এই যে বরযাত্রীদল এদের দেখে হাসাহাসি করছে, রাঙাদার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা ‘আনকালচার্ড’ ভেবেছে। অশিক্ষিত, গাঁইয়া ভেবেছে, পিসেমশাই তো জানতেন ওরা এসব ভাবতে পারে, ভাবাটাই স্বাভাবিক। তা সত্ত্বেও উনি করেছেন। কারখানার শ্রমিকদের নিয়ে গেছেন, কারণ শ্রমিকরা বায়না করেছিল— ‘দাদাবাবুর বিয়েতে বরযাত্রী যাব।’ কন্যাপক্ষের কাছে বলা ছিল— ‘বরযাত্রী বেশি হবে, কোন যৌতুক-পণ এসব কিছু দেবেন না।’ মনে হয় ১০০-র মতো বরযাত্রী হয়েছিল।
রাঙাদার বউভাত হয়েছিল একটা বিয়েবাড়ি ভাড়া করে। সে-সময়ে এরকম বিয়েবাড়ি ভাড়া পাওয়া যেত খুব কম। বাগবাজার স্ট্রিটে এরকম একটা বাড়ি ছিল, মোটেই সাজানো-গোছানো নয়, কোনও ঝাড়বাতি, বউ বসার মঞ্চ, এসব কিছুই ছিল না, কখনও-কখনও কোনও স্কুলবাড়ি ভাড়া করেও বিয়েটিয়ে হত। আমাদের কাশিমবাজার স্কুলেও হত। কোনও রবিবার-সোমবার স্কুলে গেলে, কেমন যেন একটা বিয়েবাড়ির বাসি গন্ধ পেতাম। রাঙাদার বউভাতে, বাড়িভাড়া হলেও ক্যাটারার হয়নি। ঠাকুর আনা হয়েছিল। আত্মীয়-স্বজন এবং কারখানার লোকজন কোমর বেঁধে খেটে দিয়েছিল। আত্মীয়-স্বজন তো কম ছিল না আগেই বলেছি, আত্মীয়দের মধ্যে এক-একজন এক-এক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ থাকত। প্রচুর শবদেহ সৎকার করার স্পেশালিস্ট যেমন, বহু বিয়ে পার করে দেওয়ার স্পেশালিস্টও থাকত। ওরা ঠিকঠাক বলে দিতে পারত, কতজন লোকের জন্য কতটা মাছ, কতটা মাংস, কতটা কাঁচাগোল্লা ইত্যাদি আনতে হবে। তখন ভোজবাড়িতে ‘খাইয়ে লোক’ থাকত প্রচুর। ২০ পিস মাছ বা ৪০ পিস মাছ উদরস্থ করার লোক ছিল প্রচুর। এ-জন্য বিশেষজ্ঞরা বলত, কাঁচা গোল্লাতে একটু মিষ্টি বেশি দিয়ে বানাতে বলতে হবে। আগে কাঁচাগোল্লা, পরে রসগোল্লা তাহলে রসগোল্লা কম টানবে। পোলাও-তে একটু ডালডা মেরে দিলে, মুখ মেরে দেবে— এইসব। এগুলো আমার পরবর্তীকালের অভিজ্ঞতা। রাঙাদার বিয়েতে এসব বিশেষজ্ঞরা আসেনি। তবে নকুলকাকু নামে একজন স্বঘোষিত ভাঁড়ার বিশেষজ্ঞ ছিল। সেই মিষ্টির ঘরটা সামলাত। একজন করিৎকর্মা থাকত রান্নার তদারকিতে, ভাঁজ করা হলুদ চেয়ারে বসে, মাছের পিস নিরীক্ষণ করত। মাংসটা ঠিকমতো সেদ্ধ হলো কি না টেস্ট করত। রাঙাদার বিয়েতে আমার কোনও রোল ছিল না বলে, আমার বেশ দুঃখ ছিল। পিতলের জারে করে জলটুকুও দিতে হয়নি, নইলে বালকদের অ্যাপ্রেন্টিসগিরি হচ্ছে, কলাপাতার কোনায় নুন দেওয়া, লেবু দেওয়া, মাটির গেলাস সেট করে দিয়ে, পিতলের মুখ থেকে জল ঢালা। জলঢালা শেষ হয়ে গেলে আবার জল ঢালা ইত্যাদি। বালিকাদের ডিউটি ছিল বরযাত্রীদের গায়ে গোলাপ জল স্প্রে করা, কিংবা কোথাও-কোথাও একটা করে গোলাপ ফুল হাতে ধরিয়ে দেওয়া। আমার জল দেওয়ার কাজটাও জোটেনি, তবুও আমি মিছেমিছি ছোটাছুটি করেছি।
এই যে বরযাত্রীদল এদের দেখে হাসাহাসি করছে, রাঙাদার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা ‘আনকালচার্ড’ ভেবেছে। অশিক্ষিত, গাঁইয়া ভেবেছে, পিসেমশাই তো জানতেন ওরা এসব ভাবতে পারে, ভাবাটাই স্বাভাবিক। তা সত্ত্বেও উনি করেছেন। কারখানার শ্রমিকদের নিয়ে গেছেন, কারণ শ্রমিকরা বায়না করেছিল— ‘দাদাবাবুর বিয়েতে বরযাত্রী যাব।’ কন্যাপক্ষের কাছে বলা ছিল— ‘বরযাত্রী বেশি হবে, কোন যৌতুক-পণ এসব কিছু দেবেন না।’
যেখানে বেশি লোকজন জড়ো হয়েছে, ওখানে গিয়ে রুমালে কপালের ঘাম মুছেছি, যেন ঘেমে গেছি কাজ করে। রাঙাদার বিয়েতে, কোল্ডড্রিংসের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। একটা ঘরে ড্রামে ভরা বরফের টুকরার মধ্যে, অরেঞ্জ, পাইন্যাপেল কোকাকোলা ইত্যাদি রাখা ছিল। বাদলদার উপর ভার ছিল, চাবি দিয়ে খুলে বোতল হাতে তুলে দেবার। আমি ইনিয়ে-বিনিয়ে দু’চারটে বোতল খোলার দায়িত্ব পেয়েছিলাম। আমাদের গাঁইয়া আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে কেউ-কেউ প্রথম এরকম গ্যাসালো বোতল পানীয়র অভিজ্ঞতা পেলেন। আমার পিসিমার এক মামাতো বোন, একচুমুক খেয়েই তো মুখ থেকে ফুরফুর করে ফেলে দিল। ‘এইসব ক্যামনে খায়! বমি হইব রে…’ আরও কেউ-কেউ পছন্দ করল না। তবে কন্যাযাত্রীরা বেশ ভালভাবেই নিল। না, এ-বাড়িতে মুরগি হয়নি, প্রশ্নই ওঠে না। তবে পোলাও-মাংস, নবীন ময়রার রসগোল্লা জলযোগের দই এবং দ্বারিকের রাবড়ি হয়েছিল।




