‘মেয়েরা মেয়েদের সবচেয়ে বড় শত্রু’— এই কথাটা প্রায় লব্জের মতো হয়ে রয়েছে সামাজিকভাবে। মহিলাদের যাপিত অভিজ্ঞতাতেও তারা বহুবার দেখেছে, মহিলারাই মহিলাদের পোশাক, আচরণ বা চারিত্রিক নানা বিষয় নিয়ে কটূক্তি করছে। কখনও এক মহিলার সাফল্যে ভারাক্রান্ত মন নিয়ে অন্য মহিলার অসহিষ্ণুতার প্রকাশও দেখা গিয়েছে। কিন্তু এই যে একজন মহিলা অন্যজনকে ‘সংস্কৃতিবান’ বা ‘অপসংস্কৃতির এপিটোম’ হিসেবে নির্ণয় করে বিচার করছেন, এই চিন্তাভাবনার শিকড় আসলে কোথায়? কারও বিয়ে হয়নি বলে প্রশ্ন উঠছে, কারও বিয়ে হয়ে গেছে বলে প্রশ্ন উঠছে, কেউ রাতে বাড়ি ফিরলে প্রশ্ন, কেউ নিজের শরীর নিয়ে নিজের মতো সিদ্ধান্ত নিলে প্রশ্ন— কেন আসলে?
প্রশ্নটা যতটা সহজ, উত্তরটাও ততটা শক্ত নয়। মেয়েরা মেয়েদের শত্রু নয়, শত্রু সেই পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো, যা মেয়েদের একে-অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়। এক মহিলার অন্য মহিলার প্রতি ‘আগ্রাসী’ মনোভাব আসলে সেই মহিলা নিজে তৈরি করছেন না, তিনিও আদতে এমন এক সামাজিক কাঠামোয় অবরুদ্ধ, যে কাঠামো তাঁকে ছোটবেলা থেকে শিখিয়েছে ‘মরাল পুলিসিং’ বা নীতিবাগীশতার সহজ পাঠ, কোন মেয়ে কেমন হবে, কীভাবে কথা বলবে, কতটা হাসবে, কখন বাড়ি ফিরবে, কী খাবে, কী খাবে না— এসবেও তার চরিত্র নির্ধারিত থাকে। পিতৃতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো তখনই, যখন পুরুষদের প্রতিটি মহিলাকে আলাদা করে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় না। মহিলারাই একে-অপরকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।
২০২৬ সালে এসে দাঁড়িয়ে এই সমাজে, মহিলা-পুরুষ নির্বিশেষে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বেড়েছে। নারীবাদ নিয়ে যতটা বিপ্রতীপ ধ্যান-ধারণা ছিল, তা অনেকাংশে বদলেছে। কিন্তু লাভের লাভ আদৌ কি হচ্ছে? এই প্রশ্ন তোলার মূল কারণ, সম্প্রতি রাখিবন্ধন উপলক্ষে কৃতী শ্যানন অভিনীত একটি ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনচিত্র ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিজ্ঞাপনে কৃতীকে দেখা যাচ্ছে, সমকালীন ভারতীয়-পাশ্চাত্য পোশাকে। ডিপনেক ব্লাউজ, তার ওপর জড়ানো কেপ এবং সঙ্গে স্কার্ট। কিন্তু সমালোচনার মূল নিশানা পোশাকটি নয়; বরং ব্লাউজের নকশা ও গভীর কাটিং, যা নাকি ভারতীয় ঐতিহ্যের নির্ধারিত শালীনতার দেওয়ালে চিড় ধরাচ্ছে।
আরও পড়ুন: মধ্যবয়সে মাতৃত্ব নিয়ে এত প্রশ্ন কেন?
লিখছেন সঞ্চারী মুখোপাধ্যায়…
পিতৃতান্ত্রিক মনোভাব থেকে এই আপত্তির ছকটা খুব অজানা নয় এখন আর, কিন্তু বর্তমান হিমাচল প্রদেশের মান্ডি লোকসভার সাংসদ তথা অভিনেত্রী কঙ্গনা রানাওয়াত যখন কৃতীর পোশাক নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন এই লেখার প্রথমে তোলা প্রশ্নটিতেই আবার ফিরে যেতে হয়। কী বলছেন কঙ্গনা? তিনি বলছেন, এত ধরনের পোশাকের বিকল্প থাকতে একজন মহিলা তাঁর ভাইকে রাখি পরানোর মতো একটা পবিত্র উৎসবে কেন ‘বিকিনি বা আন্ডারগার্মেন্ট’ জাতীয় পোশাক (কঙ্গনার ভাষায়) পরবেন? কঙ্গনা কিন্তু বহুবার পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন এর আগে, যতদিন না ওঁর রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি হয়েছে। এমনকী, এখন মূল স্রোতের পিতৃতান্ত্রিক রাজনীতির পক্ষে সওয়াল করার পরেও, রামদেব কঙ্গনার ব্যক্তিজীবন নিয়ে ইঙ্গিত করতে ছাড়েন না, তার জবাবও দেন কঙ্গনা। অর্থাৎ, এখানে মহিলা হয়ে মহিলার সঙ্গে শত্রুতার লব্জটার আড়ালে থাকা পিতৃতন্ত্রের অলাতচক্রটা খুব অদৃশ্য নয়। সমাজের ছক যে মহিলা ভাঙছেন, স্বেচ্ছায় বা পেশাগত স্বার্থে, তার বিরুদ্ধে তির শানানোই থাকে পিতৃতন্ত্রর।
কৃতী অবশ্য পরে সেই সমালোচনার জবাব দিয়ে বলেন, উৎসবের আসল অর্থ পোশাকে নিহিত নয়, বরং নিহিত তার আবেগের মধ্যে। সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য কোনও মহিলার পোশাকের ‘নেকলাইনে’ নয়, বরং তার হৃদয়ে থাকে। যদিও পরবর্তীতে ব্র্যান্ডটি বিজ্ঞাপনটি সরিয়ে নিলেও জানায়, তারা মূল চিন্তাভাবনা থেকে সরে যায়নি। ভারতীয় সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের প্রতি তাঁদের সম্মানও, পাশাপাশি, অটুট।
কঙ্গনা রানাওয়াতের বক্তব্যকে শুধুমাত্র একজন অভিনেত্রী-সাংসদের ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে দেখলে আলোচনার একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। কারণ কঙ্গনা নিজেই একসময় এমন এক বিজ্ঞাপন প্রচারের পরিচিত মুখ ছিলেন, যেখানে মহিলাদের স্বাধীনতা এবং প্রচলিত নারী-ধারণাকে ভেঙে ফেলা হয়েছিল। ২০১৬ এবং ২০১৭ সালের রিবকের ‘ফিট টু ফাইট’ প্রচারে শক্তি ও স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে সামনে আনা হয়েছিল তাঁকে। এমনকী, ‘কুইন’-এর মতো তথাকথিত নারীবাদী ছবিতেও আমরা তাঁকে মূল চরিত্রে দেখেছি, যেখানে তাঁর চরিত্র সামাজিক প্রত্যাশা ও নিয়মের বাইরে গিয়ে নিজের স্বাধীন সত্তাকে তুলে ধরেছিল।

তাই আজ এমন একজন যদি অন্য একজন মহিলার পোশাক-সম্পর্কিত এই ধরনের কটাক্ষ করেন, প্রশ্ন উঠবেই। একজন মানুষের রাজনৈতিক এবং মতাদর্শগত যাত্রা কীভাবে তাঁর নিজের পুরনো প্রকাশ্য ভাবমূর্তিকে বদলে দিতে পারে? এই প্রশ্নটিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আরও বড় প্রশ্ন, কীভাবে একজন মহিলার পোশাককে এত সহজে সমাজবিরোধী হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া যায়? কীভাবে বলা যায়, এই পোশাক প্রভাবিত করবে সংস্কৃতিকে?
কারণ, পিতৃতন্ত্র সংস্কৃতির সংজ্ঞায়ন করে নিজের স্বার্থেই। ভারতীয় সংস্কৃতিতে নগ্নতার বহিঃপ্রকাশ শৈল্পিকভাবেই এতকাল ধরে রয়েছে মধ্যপ্রদেশের খাজুরাহো মন্দিরে। মন্দিরসমষ্টির গায়ে খোদাই করা সেইসব অসংখ্য মানবদেহ-ভাস্কর্য প্রমাণ করে, প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতিতে প্রেম, নগ্নতা এবং কামনার প্রকাশনাকে শুধুমাত্র লোকচক্ষুর আড়ালে থাকার বস্তু হিসেবে দেখা হয়নি। বরং, মানুষের শরীর ও তার আকাঙ্ক্ষা যে কোনওভাবেই আমাদের ভারতীয় সংস্কৃতি থেকে কোনও অংশে বিচ্ছিন্ন নয়, তার প্রমাণ হিসেবেই খাজুরাহোর অবস্থান। প্রাচীন ভারতীয় শিল্প এবং তার নিজস্ব নান্দনিকতার মধ্য দিয়েই সেই মেলবন্ধনের অভিব্যক্তি পরিস্ফুট হয়েছে। শুধু খাজুরাহো কেন, আমাদের ধর্মীয় উপাস্য দেবী স্বয়ং মা কালীও তার ব্যতিক্রম নন। কালীকে বহু ধারায় উন্মুক্ত দেহ, এলোকেশী-রূপে কল্পনা করা হয়েছে। সেখানে অনাবৃত শরীর কোনও অশ্লীলতার প্রতীক নয়, বরং তা শক্তির আরেক রূপ। সামাজিক বাঁধন অতিক্রম করার প্রতীকী ভাষার এক অংশ।
এমনকী, ব্রিটিশ আমলে, ঔপনিবেশিক বাংলার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, ঊনবিংশ শতকের আগে শাড়ির সঙ্গে আজকের পরিচিত অর্থে ব্লাউজ কিংবা সায়া পরার চল ছিল না। পরবর্তীকালে তথাকথিত ঔপনিবেশিক ‘ভদ্রসমাজ’, বাঙালি মধ্যবিত্ত মহিলাদের ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতাপুষ্ট সামাজিক রীতিনীতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর তাগিদে পোশাকে ব্লাউজের প্রচলন শুরু হয়।
অর্থাৎ, নগ্নতা বা যৌনতার চিত্রায়ণ ভারতীয় সংস্কৃতির ভাবপ্রবণতাকে ক্ষুন্ন না করে চিরকাল ধরে সসম্মানের সঙ্গে উদযাপিত হয়ে এসছে। বরং, যাঁরা উন্মুক্ত শরীরকে ‘অসংস্কৃতি’ বলে দাগিয়ে দিচ্ছেন, তাঁরা নিজেরাই হয়তো কোথাও গিয়ে ভারতীয় শিল্প-ঐতিহ্যের বহুত্বকে অস্বীকার করে ফেলছেন। আর তখন সংস্কৃতিকে খাটো করার প্রসঙ্গ আর সেই পোশাকের ওপর থাকছে না, বরং পোশাককে ‘সংস্কৃতির বিপরীত’ বলে যে বা যারা চিহ্নিত করছে, তাদের ওপর বর্তে যাচ্ছে।
আর এখানেই গলদ। আমাদের সমাজে এতগুলো বহুল-প্রচলিত ত্রুটির মধ্যে এখনও একটি বিচ্যুতি খুব অদ্ভুতভাবে প্রকট, তা হল মহিলাদের পোশাকশৈলী। মহিলাদের পোশাক পুরুষকে আকর্ষণের জন্য, এমন একটি ধারণা চারিয়ে দেওয়ার বিবিধ চেষ্টা রয়েছে। মহিলার নিজস্ব স্বাচ্ছন্দ্য, সৌন্দর্যবোধ ও আত্মপ্রকাশের অধিকার সেই ধারণার সামনে ফিকে হয়ে যায়। আসলে, যে সমাজ দীর্ঘদিন ধরে মহিলার শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, সেই সমাজে নিজের শরীর নিয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই একটি রাজনৈতিক অবস্থান। একজন মহিলা যখন বলেন, ‘আমার পোশাক, আমার সিদ্ধান্ত’, তখন তিনি শুধু একটি পোশাক বেছে নিচ্ছেন না। বরং তিনি সেই সামাজিক কাঠামোকে, সেই সিস্টেমকে প্রশ্নও করছেন, যে সিস্টেম এতদিন তাঁর শরীরের ওপর অধিকার দাবি করে এসেছে।
আর তাই পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীদের পোশাক পরার স্বাধীনতা কেবল এক আধুনিকতার বাহ্যিক চিহ্ন হয়ে থাকে না, বরং কোথাও কোথাও সংকীর্ণ সমাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষ্যও হয়ে ওঠে।
বিজ্ঞাপনের জগতে নারীদেহ বহুদিন ধরেই বিপণনের শক্তিশালী মাধ্যম। কখনও তাঁর সৌন্দর্য, কখনও বা তথাকথিত ঐতিহ্যবাহী পরিচয়। সবকিছুকেই বাজার তার প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করেছে, নারীদেহের পণ্যায়নের সূত্রে। এবং ঠিক এখানেই পুঁজিবাদ এবং পিতৃতন্ত্র একে-অপরের সঙ্গে মিশে যায়। সমাজতান্ত্রিক নারীবাদ এটিকে নারীর সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করে। পুঁজিবাদ নারীর শরীরকে তার বাজারের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে, আর পিতৃতন্ত্র ঠিক করে সেই শরীরের ‘গ্রহণযোগ্যতা’ ঠিক কতটা। আর তারপর সেই বিজ্ঞাপন দুইয়ের দ্বন্দ্বকে বাজারচলতি দরে বিক্রি করে।
তাই ব্যক্তি-সমালোচনার পাশাপাশি কাঠামোটাকেও বুঝতে হবে। জাতপাত, ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, যৌনতা মানুষকে ভিন্নভাবে রূপায়ণ করলেও নির্বিশেষে সকলের লড়াই সমান। কিন্তু সেই ভিন্নতার মধ্যেও একজন নারী হিসেবে বেঁচে থাকার কিছু অভিজ্ঞতা সংহতির সম্ভাবনা তৈরি করে। এবং সেই সংহতিটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন মহিলা যদি অন্য একজন মহিলার সাফল্যকে ব্যক্তিগত হিসেবে দেখে, তাঁর পোশাককে তাঁর চরিত্রের মাপকাঠি বানানোর পরিবর্তে তাঁর পাথেয় হন এবং বিপরীতে থাকা মহিলাটির স্বাধীনতাকে নিজের জন্য হুমকি না ভাবেন, তাহলেই পিতৃতন্ত্রের তৈরি বিভাজনটা ভাঙতে শুরু করে। তাই আদত উদ্দেশ্য, এই বিভাজনকে চিনে ফেলা এবং তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। একে-অপরের পাশে দাঁড়াতে শেখানোই হোক নারীবাদী রাজনীতির পরিচয়।




