ভারত জুড়ে আপামর জনসাধারণের কাছে সিনেমা এমন এক বিস্ময়, যার জন্য ঘণ্টাতিনেক অনায়াসে ভুলে থাকা যায় রোজকার ক্লান্তি, গ্লানি, বিষন্নতা বা একঘেয়ে জীবনের বাস্তবতা। বড়পর্দার রঙিন দুনিয়ায় প্রেম থেকে শুরু করে, এক হিরোর দশ ভিলেনকে একসঙ্গে কুপোকাত করে দেওয়ার দৃশ্য তাই সাময়িকভাবে হলেও বিশ্বাস করে নিতে ভাল লাগে। কয়েক লহমার আশ্বাস নেমে আসে দু-চোখের পাতায়। স্বপ্ন দেখতে কারই বা না ভাল লাগে?
সিনেমায় যেমন খানিক কল্পনার জগতে বিচরণ করে আসা যায়, তেমন এও সত্য যে, সিনেমা কখনও সমাজবহির্ভূত হতে পারে না। সমাজ সিনেমার দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে, না কি উল্টোটা, সেটা নির্ণয় করাও সহজ নয়। তবে দেখা গিয়েছে, দশকের পর দশক ধরে সমাজ ও সিনেমা— দুইয়ের প্রভাবই পড়েছে একে-অপরের ওপর। কখনও প্রত্যক্ষভাবে, আবার কখনও পরোক্ষভাবে।
আমাদের, কয়েকটি প্রজন্মের বেড়ে ওঠার সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে বলিউড। এই সামাজিক প্রভাবের নীল নকশাটা পরিষ্কার হয়, যখন দেখা যায়, ভারতীয় সমাজের মতোই ভারতীয় ছবি দশকের পর দশক মূলত পিতৃতান্ত্রিক হয়েই থেকেছে, তা ছবির গল্পেই হোক বা পর্দার পিছনের জগতে (কিছু ব্যতিক্রম বাদে)। সাতের দশকের ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’ থেকে শুরু করে, পর্দায় মা, বোন, প্রেমিকা অর্থাৎ বিপদগ্রস্তা নারীদের ত্রাতা হতেই যেন হিরোদের আবির্ভাব! সদ্য মুক্তি পাওয়া গীতু মোহনদাসের ‘টক্সিক’-এরও বেশিরভাগ জুড়ে এই একই উদযাপনের প্রতিফলন, যদিও শেষে গিয়ে এই ছবি একটু আলাদা হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ‘টক্সিক’-এর সূত্রেই উঠে আসে এক অন্য তর্ক। ‘টক্সিক’-এর নামকরণ, টিজারে পৌরুষের বাড়াবাড়ি দেখে যে সন্দেহ দর্শকমনে জেগেছে, তার একটি প্রেক্ষিত রয়েছে।

আরও পড়ুন: কৃতী শ্যাননের বিজ্ঞাপন ঘিরে বিতর্ক আমাদের যে বার্তা দেয়!
লিখছেন কনিনীকা মজুমদার…
নব্বই থেকে বিশ শতকের বলিউডি স্রোত একটু অন্য মোড় নেয়। এই সময়েই মূলত রোম্যান্টিক হিরো বা প্রিন্স চার্মিংয়ের আবির্ভাব। না, সেভাবে নজরকাড়া নয়, হালফিলের পাশের পাড়ার ভীতু ছেলেটার চোখে যে গভীর প্রেম, সেই অনুভূতির শুরু। যেসব ছেলের প্রেমে ব্যর্থ হলে চোখে জল আসে, বৃষ্টি মাথায় প্রেমিকার জন্য অপেক্ষা করতে যাদের ‘ইগো’-তে বাধে না, যে ভালবাসার জন্য কোনওদিন কারও সঙ্গে ঝগড়া না-করা ছেলেটা একাই দশজনের সঙ্গে লড়ে নিতে পারে। না, তাদের কোনও সিক্স প্যাক ছিল না, ছিল না কথায়-কথায় শার্ট খুলে দেহ প্রদর্শনের তাড়া। এই সময়েই দেশের আট থেকে আশি মজেছিল শাহরুখ খানের প্রেমে। মেয়েরা স্বপ্ন দেখত (হয়তো বা এখনও দেখে) একদিন না একদিন শাহরুখের মতো প্রেমিক আসবে, আর ছেলেরা ভাবত, একদিন না একদিন তারা কারও চোখে ঠিক শাহরুখ হয়ে উঠবে। এক সাক্ষাৎকারে করন জোহরকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘এই যে এত মানুষ শাহরুখের প্রেমে আজও, এর রহস্য কী?’— এর উত্তরে জোহর বলেছিলেন, ‘হ্যাভ ইউ সিন দ্যাট ম্যান্স আইজ?’ আসলে সেই সময় নায়কের চোখ বা হাসিই ছিল ইউএসপি— তাদের পেশিবাহুল্য নয়। কিং খান থেকে শুরু করে সইফ আলি খান, আমির খান, অক্ষয় খান্না, বা সলমন খান—এলোঝেলো চুল আর নরম চেহারাতেই মাত হত দর্শক। এমন অবশ্য নয় যে, ছবিতে নায়কের চিত্রায়ণে সমস্যা ছিল না, বা নায়িকা চরিত্রের বিশেষ কোনও অবদান থাকত সেসব গল্পে— তবু পুরুষত্বের নির্লজ্জ আস্ফালন এবং তার উৎকট উদযাপন প্রকট ছিল না।
হালফিলের চেহারা অবশ্য বদলে গিয়েছে অনেকটাই। সে নায়কেরই হোক বা সিনেমায় নায়কের চরিত্র প্রদর্শনেই হোক। ২০১৩ সালে যখন আনন্দ এল রাই তাঁর ছবি ‘রাঞ্ঝনা’র শেষ দৃশ্যে কুন্দনের (ধনুশ) মৃত্যু দিয়ে দর্শকের সহানুভূতি আদায় করতে চেয়েছিলেন, তখন সফলও হয়েছিলেন যথেষ্ট। গোটা ছবিতে ‘স্টকিং’, জোর করে প্রেম আদায় থেকে শুরু করে, নায়িকার বাগদত্তকে হত্যা— কুন্দনের এই এতগুলো অন্যায় দর্শক মাফ করেছিল অনায়াসে। এরপরে যত সময় এগিয়েছে, আক্রমণাত্মক নায়ক চরিত্রের প্রদর্শন ছবিতে বেড়েছে আরও বেশি করে। সমস্যাটা এইসব চরিত্রের প্রদর্শন নিয়ে নয় অবশ্য— সমস্যা হল, গল্পে এদের কেন্দ্র-চরিত্র বানিয়ে তাদের নিয়ে যে উদযাপন, সেইটা নিয়ে। ২০১৭-র তেলুগু ছবি ‘অর্জুন রেড্ডি’ বা তার বলিউড সংস্করণ, ২০১৯-এর ‘কবির সিং’— সন্দীপ রেড্ডি ভাঙ্গা পরিচালিত এই দুই ছবির কেন্দ্র চরিত্র কেবল উগ্র মেজাজধারীই নয়, প্রেমিকার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও শারীরিক আগ্রাসনে বিশ্বাসী। এখন এই কথা উঠতেই পারে, যে সিনেমা তো বাস্তব নয়। সেখানে নায়কের চরিত্র গল্প অনুযায়ী এমন হলে ক্ষতি কী? ক্ষতি আসলে এখানেই যে, ভারতের মতো দেশে সিনেমা যেখানে বাস্তব নয়, সেখানে পুরোপুরি বাস্তব-বহির্ভূতও নয়। আর সেই কারণেই এই ছবির একজায়গায় নায়ক যখন প্রেমের আবেগে নায়িকার গালে বিনা দ্বিধায় চড় বসিয়ে দেয়, গোটা হল ফেটে পড়ে হাততালিতে। অর্থাৎ, প্রেমের এহেন নিদর্শন কেবল পর্দায় নয়, বাস্তবেও স্বাভাবিক। এই নিয়ে সমালোচনা হওয়ার পর পরিচালক নির্দ্বিধায় জানিয়েছিলেন, যে প্রেমে আবেগের বশে চড়-থাপ্পড় মারা যায় না, সেই সম্পর্ককে তিনি প্রেম বলে মানতেই নারাজ। যে পিতৃতান্ত্রিক সমাজে ভারতীয়রা বাস করে, সেখানে মেয়েদের ওপর শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন নিত্য। এমন একটা দেশে বড়পর্দায় এরকম হিংস্র প্রেমের নিদর্শন ভয়ানক প্রভাব ফেলতে বাধ্য।

শুধু তাই নয়, বিগত দশ বছরে বলিউডে এবং দক্ষিণী ছবিতে ‘আলফা’ পুরুষ প্রদর্শনের হুজুগ অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণী ছবির ক্ষেত্রে সমাজের নিচু স্তর থেকে উঠে আসা নায়ক, যারা সমাজে নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছে, আর তার জন্য শারীরিক নির্যাতন থেকে খুনোখুনি করে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়া— কোনওকিছুরই সীমা রাখছে না, তারাই এখন সিনেমার কালো ঘোড়া। এবং এর জন্য, চলচ্চিত্রের মধ্যেও কোনও শাস্তি নয়, বরং জুটছে নিঃশর্ত ভালবাসা ও আনুগত্য। দেখা যাচ্ছে, নায়িকারা এই উগ্র পুরুষত্বেই হয়ে পড়ছে আসক্ত। ২০১৮-র কন্নড় ছবি ‘কেজিএফ: চ্যাপ্টার ১’ ও ২০২২-এ তার সিক্যুয়েল হোক, বা ২০২১-এ মুক্তি পাওয়া তেলুগু ছবি ‘পুষ্পা’-ই হোক— সবেতেই এই উগ্র পুরুষত্বের উদযাপন।
পিছিয়ে নেই বলিউডও। ‘সফট বয়’-এর খোলস ছেড়ে অনেক ছবিই এখন এই ক্ষতিকারক অধিকারবোধকে গল্পের কেন্দ্র করছে। তার সাম্প্রতিক উদাহরণ ‘অ্যানিম্যাল’ (২০২৩) ও ‘ধুরন্ধর’ (২০২৫/২৬) । কিছুদিন আগের এক সাক্ষাৎকারে অভিনেতা ইমরান খান বলেছেন, ‘অপরিণত পুরুষ (ম্যান চাইল্ড) যারা নিজেদের অমীমাংসিত সংঘাত কাটিয়ে উঠতে পারেনি, সেইসব চরিত্রকে কেন্দ্র করে গল্প তৈরি করা হচ্ছে ইদানীং। সেইসব চরিত্রের আবেগজনিত মেজাজকে চলচ্চিত্রের আখ্যানের মাধ্যমে ন্যায্য প্রতিপন্ন করার ক্রমাগত চেষ্টা চলছে।’
তবে অবাক করা এই সব ছবির বক্স অফিস সাফল্য। দর্শকেরা এই ছবি দেখে শুধুমাত্র আনন্দই পাচ্ছেন, তা নয়, অনেক মনোবিজ্ঞানীর মতে, তারা তাদের বাস্তব জীবনের নির্দেশিকা হিসেবে এই ছবিগুলির গল্পগুলোকে মেনে নিচ্ছেন। অর্থাৎ, যতই নির্মাতারা এই ছবিগুলোকে কেবলমাত্র বিনোদনের আধার হিসেবে দেখাতে চান না কেন, এর প্রতিফলন সামাজিক আচরণে প্রভাব ফেলছেই।

এক সাক্ষাৎকারে নাসিরুদ্দিন শাহও জানিয়েছেন যে, পুরুষদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে এবং সেই কারণেই অতি-পুরুষত্ব প্রদর্শনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর ফলে বর্তমান চলচ্চিত্রজগতে নারীদের আবারও প্রান্তিক ভূমিকায় ঠেলে দেওয়া হচ্ছে এবং পুরুষ চরিত্রের কাহিনিতে তাদের অবদান ও গুরুত্ব সীমিত হয়ে পড়ছে (ব্যতিক্রম অবশ্য আছেই, যেমন এর মধ্যেও ‘থাপ্পড়’, ‘লাপাতা লেডিজ’ বা ‘দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান কিচেন’-এর মতো ছবি তৈরি হচ্ছে)। ফলে ‘অ্যানিম্যাল’-এর মতো ছবিকে একেবারে ক্ষতিহীন বিনোদন হিসেবে আর দাগিয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্রের মধ্যে অন্যায্যতাকে আলোকিত করা এবং ক্ষমতা হিসেবে সহিংসতা বেশ কিছু ক্ষেত্রে ভারতীয় সমাজের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এমন গভীর ছাপ ফেলছে, যার দায় এড়ানো অদূর ভবিষ্যতে আরও সমস্যার হবে বলেই আশঙ্কা করা যায়।
বিভিন্ন চলচ্চিত্র সমালোচক থেকে শুরু করে অভিনেতা, পরিচালক, এমনকী অনেক সাধারণ দর্শকও এইসব ছবির প্রতি তাঁদের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করেছেন। তাঁরা দাবি করছেন, মূলধারার গল্পকথনে আধুনিক পুরুষত্বের এমন সব বিকল্প রূপায়ণের প্রয়োজনীয়তা— যা কোমল, সংবেদনশীল ও সহানুভূতিশীল। ভারতের মতো দেশে যেখানে ‘হিরো ওয়ারশিপ’ একধরনের অভ্যস্ত চিত্র— সেখানে নির্মাতাদের কোনও দায় থাকবেই না, এটা মেনে নেওয়া মুশকিল।
সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি বাণিজ্যিক শিল্প আর তাই যে ছবি বেশি ব্যবসা করবে, সেই ধরনের ছবি আরও বেশি করে তৈরি করতে হবে— এই মনোভাব কিছুটা ঠিক হলেও আসলে সিনেমার মূল উদ্দেশ্য যে কেবল অর্থ উপার্জন নয়, সেটা বিস্মৃত হওয়াটাও ঠিক নয়। চলচ্চিত্র জগৎ কেবল সৃজনশীলতাই নয়, তা সমসময়ের রাজনৈতিক, সামাজিক চিত্রকেও উপেক্ষা করতে পারে না। সেক্ষেত্রে বিনোদনের মাধ্যম হলেও তার চিত্রণের প্রতি আরও মনোযোগী হওয়া উচিত। সেই সঙ্গে দর্শকেরও আরও দায়িত্ববান হওয়া জরুরি।




