নেপালের পাহাড়ে আবারও মৃত্যু। নদী ফুলে উঠেছে, রাস্তা হারিয়ে গিয়েছে, বাড়িঘর নিশ্চিহ্ন হয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত। ২৬ অগাস্টের হিমবাহ-ধস থেকে শুরু হওয়া সাম্প্রতিক বিপর্যয়ে, ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নেপালে অন্তত ৯৮৭ জনের মৃত্যুর খবর এসেছে এবং চার হাজারেরও বেশি মানুষ এখনও নিখোঁজ। উদ্ধারকাজও চলছে।
কিন্তু এই বিপর্যয়ের দিকে শুধু মৃতের সংখ্যা দিয়ে তাকালে আসল গল্পটি ধরা পড়বে না। আরও বড় একটি গল্প রয়েছে বরফের নীচে, পাহাড়ের ঢালে, নদীর স্রোতে এবং আমাদের উন্নয়নের চিন্তায়।
নেপালে বিপর্যয় নতুন নয়। ১৯৭১ থেকে ২০১৩ সালের নথিতে ভূমিধসে ৪,৬৫৮ এবং বন্যায় ৩,৫৩৮ জনের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। ওই সময়ে বন্যায় প্রায় ১ লক্ষ ৯৯,৭৩৬টি বাড়ি এবং ভূমিকম্পে ৯১,৮৪৩টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়ার নথিও রয়েছে।
অর্থাৎ, নেপালকে বুঝতে গেলে শুধু আজকের বিপর্যয়ের দিকে তাকালে হবে না। বহু দশক ধরে পাহাড়, বৃষ্টি, নদী, ভূমিকম্প ও মানুষের বসতির মধ্যে এক কঠিন টানাপোড়েন চলছে।

আরও পড়ুন: ক্লাউডবার্স্টই পাহাড় ধ্বংসের অজুহাত?
লিখছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য…
নেপালেই এত বিপদ কেন?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে তার ভূগোলে। নেপাল পৃথিবীর অন্যতম সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলে অবস্থিত। ভারতীয় ভূখণ্ডের ভূত্বক উত্তরদিকে এগিয়ে ইউরেশীয় ভূত্বকের সঙ্গে সংঘর্ষ করছে। এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষ থেকেই হিমালয়ের জন্ম, আবার এই কারণেই অঞ্চলটি ভূমিকম্পপ্রবণ। কিন্তু ভূমিকম্পই নেপালের একমাত্র বিপদ নয়। খাড়া পাহাড়, ভঙ্গুর শিলাস্তর, সরু উপত্যকা, দ্রুতগামী নদী এবং বর্ষাকালে অল্প সময়ে বিপুল বৃষ্টিপাত— সব মিলিয়ে নেপাল একটি বহু-বিপদপ্রবণ দেশ। পাহাড়ে একটি ভূমিধস নদী আটকে দিতে পারে। সেই নদী হঠাৎ বাঁধ ভেঙে দিলে তৈরি হতে পারে আকস্মিক বন্যা। আবার হিমবাহের বরফ বা পাহাড়ের পাথর ভেঙে নদীতে পড়ে সাময়িকভাবে জল আটকে দিয়ে পরে একসঙ্গে সেই জল ছেড়ে দিতে পারে।
অর্থাৎ, বিপদগুলি একা আসে না। একটি বিপদ আরেকটি বিপদকে জন্ম দেয়।
এই কারণেই নেপালের মতো দেশে একটি ছোট প্রাকৃতিক পরিবর্তনও কখনও-কখনও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মহা-বিপর্যয়ে পরিণত হয়। সাম্প্রতিক ঘটনাটিতেও প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণে একটি হিমবাহের অংশ ভেঙে পড়ে নদীর গতিপথ সাময়িকভাবে আটকে দেওয়ার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। তবে ঘটনার পূর্ণ কারণ নিয়ে তদন্ত এখনও চলছে।
তাহলে কি সবটাই জলবায়ু পরিবর্তনের ফল?
এখানে আবেগ নয়, বিজ্ঞান দিয়ে কথা বলা জরুরি। ভূমিকম্পকে সরাসরি বিশ্ব উষ্ণায়নের ফল বলা যায় না। পৃথিবীর ভূত্বকের বিশাল পাতগুলির নড়াচড়া একটি স্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। কিন্তু হিমবাহের দ্রুত গলন, অতিরিক্ত উষ্ণতা, তুষার ও বরফের পরিবর্তন এবং পাহাড়ের ঢালের স্থিতিশীলতা— এসবের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্রের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ সালের পর হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের পর্যবেক্ষণ করা হিমবাহগুলির বরফ ক্ষয়ের হার আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এই অঞ্চলের হিমবাহের মোট আয়তনের প্রায় ১২ শতাংশ কমেছে বলেও সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
এই পরিসংখ্যান শুধু বরফের গল্প নয়। হিমবাহ হল ভবিষ্যতের জলের ভাণ্ডার। বরফ গললে একদিকে সাময়িকভাবে নদীতে বেশি জল আসতে পারে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে হিমবাহ ছোট হয়ে গেলে শুষ্ক মরশুমে নদীর জল সরবরাহ কমে যেতে পারে। আবার গলিত বরফে তৈরি হিমবাহ-হ্রদ বড় হতে থাকলে কোনও দুর্বল প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে আকস্মিক বন্যা নামতে পারে। হিমবাহের পরিবর্তন ইতিমধ্যেই নদীর প্রবাহ এবং পাহাড়ি জনপদের জলনিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলছে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনকে এখানে একমাত্র অপরাধী বলা ঠিক নয়; কিন্তু তাকে উপেক্ষা করাও বিপজ্জনক।

মানুষের ভুল?
এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে অস্বস্তিকর। প্রকৃতি বিপদ তৈরি করে। কিন্তু মানুষ অনেক সময় সেই বিপদের পথ আরও প্রশস্ত করে দেয়। পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি হচ্ছে। নদীর স্বাভাবিক বিস্তারের জায়গায় বসতি তৈরি হচ্ছে। পর্যটনের চাপে পাহাড়ে বাড়ছে নির্মাণ। বনভূমি কমছে। বড়-বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি হচ্ছে সংবেদনশীল পাহাড়ি অঞ্চলে। কোথাও নির্মাণের আগে পাহাড়ের বহনক্ষমতা কতটা, তার যথেষ্ট মূল্যায়ন হচ্ছে কি না, সেটিও প্রশ্নের বিষয়।
পাহাড়ের একটি ঢাল কেটে রাস্তা বানানো মানে শুধু মাটি সরানো নয়। এতে ঢালের স্বাভাবিক ভারসাম্য বদলে যায়, বৃষ্টির জল যাওয়ার পথ বদলে যায় এবং অতি-বৃষ্টির সময় ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। নেপালের ভূমিধসের তথ্য নিয়েও গবেষণায় রাস্তা নির্মাণ এবং ভূমিধসের সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে।
নদীর ক্ষেত্রেও একই কথা। নদী কোনও সরল জলনালা নয়। তারও একটি শরীর আছে, একটি স্বাভাবিক বিস্তার আছে, বর্ষায় বাড়তি জল বহন করার নিজস্ব ব্যবস্থা আছে। সেই জায়গা দখল করে আমরা যদি বাড়ি বানাই, বাঁধ দিই, নদীর গতিপথ সংকুচিত করি, তাহলে একদিন সেই নদীই তার হারানো জায়গা ফিরে নিতে চাইবে। তখন আমরা তাকে বলি— বন্যা। প্রকৃতি হয়তো তাকে বলে— নিজের জায়গায় ফিরে আসা।

হিমালয় কি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে?
‘হিমালয় ধ্বংস হয়ে যাবে’— এমন কথা বলা বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়। কিন্তু হিমালয় দ্রুত বদলে যাচ্ছে, এবং সেই পরিবর্তন অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
হিমালয় শুধু পাহাড় নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার জলব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি। এই পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন নদীগুলির সঙ্গে ভারত, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও চিনের কোটি-কোটি মানুষের জীবন জড়িত। অর্থাৎ, হিমালয়ের বরফের পরিবর্তন কাঠমান্ডুর সমস্যা হয়ে থেমে থাকবে না। তার প্রভাব নদীর স্রোত ধরে বহু দূরে পৌঁছতে পারে। এই কারণেই হিমালয়কে রক্ষা করা মানে শুধু পাহাড়ের গাছপালা বা বরফ রক্ষা করা নয়। হিমালয়কে রক্ষা করা মানে জল রক্ষা করা, কৃষি রক্ষা করা, নদী রক্ষা করা এবং কোটি কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।
সমাধান কোথায়?
সমাধান অবশ্যই আছে। তবে সমাধান শুধু বিপর্যয়ের পরে টাকা দেওয়া নয়। ক্ষতিপূরণ দরকার। যে মানুষ সর্বস্ব হারিয়েছেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাঁর পাশে দাঁড়ানো। কিন্তু ক্ষতিপূরণ কোনও স্থায়ী সমাধান নয়। একটি বাড়ি ভেঙে গেলে টাকা দিয়ে নতুন বাড়ি তৈরি করা যায়। কিন্তু যদি সেই নতুন বাড়িটিও একই বিপজ্জনক জায়গায় তৈরি হয়, তবে আমরা মানুষকে সাহায্য করছি না; পরবর্তী বিপর্যয়ের জন্য অপেক্ষা করছি। একটি রাস্তা ধসে গেলে আবার রাস্তা বানানো যায়। কিন্তু একই পাহাড়ের একই ঢালে, একই ভুল পদ্ধতিতে আবার রাস্তা বানালে সেটি পুনর্গঠন নয়— একই ভুলের পুনরাবৃত্তি।
তাই নীতির পরিবর্তন দরকার। কোথায় বাড়ি হবে, কোথায় হবে না— তা ঠিক করতে হবে বৈজ্ঞানিক ঝুঁকি-মানচিত্রের ভিত্তিতে। নদীর স্বাভাবিক বিস্তারের জায়গা দখল করা বন্ধ করতে হবে। ভূমিধসপ্রবণ পাহাড়ে নির্মাণের আগে ঢালের স্থিতিশীলতা পরীক্ষা করতে হবে। বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে শুধু অর্থনৈতিক লাভ নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ও দুর্যোগজনিত ঝুঁকিও হিসেব করতে হবে।
হিমবাহ ও হিমবাহ-হ্রদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা এবং স্থানীয় মানুষকে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আর বাড়ি-ঘরের ক্ষেত্রেও আমাদের চিন্তা বদলাতে হবে। যে বাড়ি শুধু দাঁড়িয়ে থাকে, সেটি যথেষ্ট নয়। যে বাড়ি দুর্যোগের মধ্যেও মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে, সেই বাড়িই প্রকৃত অর্থে টেকসই বাড়ি।
আমার নিজের গবেষণার সূত্রে পশ্চিমবঙ্গের উপকূলীয় অঞ্চল, গাঙ্গেয় উপত্যকা, মালভূমি ও পাহাড়ি এলাকার ঐতিহ্যবাহী বাড়িঘর নিয়ে কাজ করতে গিয়ে একটি বিষয় বারবার সামনে এসেছে— আমাদের পূর্বপুরুষেরা পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে বাড়ি বানাতেন না; পরিবেশকে বুঝে বাড়ি বানাতেন। স্থানীয় মাটি, বাঁশ, কাঠ, খড়, জলবায়ু, বৃষ্টির ধরন, বাতাসের দিক— সবকিছুকে নির্মাণের অংশ করা হত। আজ আমাদের অতীতে ফিরে যাওয়ার দরকার নেই। কিন্তু সেই স্থানীয় জ্ঞানকে আধুনিক প্রকৌশল, নিরাপত্তা-নিয়ম এবং পরিবেশবিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজন আছে।
আমাদের এমন বাড়ি চাই, যা কম জল ব্যবহার করবে, কম প্রাকৃতিক সম্পদ নষ্ট করবে, কম দূষণ সৃষ্টি করবে, আবার ভূমিকম্প, বন্যা, ঝড় ও অতিবৃষ্টির মতো বিপদেও মানুষকে সুরক্ষা দেবে। প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া স্থাপত্যই আগামী দিনের স্থাপত্য।
শেষ কথা
নেপালের পাহাড়ে আজ যে বিপর্যয় ঘটছে, তা দেখে আমাদের শুধু দুঃখ পাওয়া উচিত নয়। আমাদের শেখা উচিত।
প্রশ্ন করা উচিত— আমরা কোথায় বাড়ি বানাচ্ছি? কীভাবে রাস্তা বানাচ্ছি? নদীকে কতটা জায়গা দিচ্ছি? পাহাড়ের কতটা কেটে ফেলছি? জঙ্গলকে কতটা রক্ষা করছি? আর উন্নয়নের নামে আগামী প্রজন্মের জন্য কী রেখে যাচ্ছি?
কারণ, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত মানুষ জিতবে না। আমরা যত বড় বাঁধ বানাই, যত উঁচু বাড়ি বানাই, যত প্রশস্ত রাস্তা বানাই— একটি পাহাড় ধসের সামনে, একটি নদীর উন্মত্ত স্রোতের সামনে, একটি হিমবাহের পতনের সামনে মানুষের শক্তি কতটা সীমিত, প্রকৃতি বারবার তা মনে করিয়ে দেয়। তাই প্রকৃতিকে বুঝতে হবে। ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, কিন্তু তার আগে ক্ষতি আটকানোর নীতি করতে হবে। পুনর্গঠন করতে হবে, কিন্তু একই ভুল জায়গায় নয়। উন্নয়ন করতে হবে, কিন্তু পাহাড় কেটে নয়; নদী মেরে নয়; জঙ্গল সরিয়ে নয়। কারণ একটি মৃত নদীর ক্ষতিপূরণ হয় না। একটি হারিয়ে যাওয়া পাহাড়ের ক্ষতিপূরণ হয় না। একটি ধ্বংস হয়ে যাওয়া বন ফিরিয়ে আনতে শুধু টাকা যথেষ্ট নয়। আর যে মানুষটি একবার হারিয়ে গেলেন, তাঁর পরিবারের হাতে কোনও ক্ষতিপূরণই তাঁকে ফিরিয়ে দিতে পারে না।
তাই সময় এসেছে উন্নয়নের হিসেব বদলানোর। কত টাকা খরচ হল— তার পাশাপাশি জিজ্ঞাসা করতে হবে, কতটা প্রকৃতি বাঁচল। কত রাস্তা তৈরি হল— তার পাশাপাশি জিজ্ঞাসা করতে হবে, কতটা পাহাড় অক্ষত রইল। কত বাড়ি তৈরি হল— তার পাশাপাশি জিজ্ঞাসা করতে হবে, সেই বাড়িগুলি মানুষকে কতটা নিরাপদ রাখবে।
নেপালের পাহাড় আজ যেন আমাদের কাছে শেষবারের মতো একটি সহজ প্রশ্ন রেখে দিয়েছে, আমরা কি প্রকৃতির কাছ থেকে শুধু নিতে শিখব, না কি তার সঙ্গে বাঁচতেও শিখব? এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে আগামী দিনের পৃথিবী কেমন হবে।




