আমি আমার প্রথম কাহিনিচিত্র করি হায়দরাবাদে, তেলুগু ভাষার ছবি ‘মা ভূমি’। তেলেঙ্গানার কৃষক বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে তৈরি সেই ছবি ছিল এক্কেবারে নতুনদের নিয়ে করা, একেবারে অন্যরকমের ছবি। সেই ছবিটা ব্যাপকভাবে ব্যবসায়িক সাফল্য পায়, একেবারে রমরমিয়ে চলে আর কী! আর এই ছবিটা করার ফাঁকেই আমি আমার প্রথম বাংলা ছবিটা নিয়ে ভাবতে শুরু করি। সমরেশ বসু আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। বহু জুটমিল এলাকায় উনি কাজ করেছেন একটা সময়, সেইসব জায়গায় আমাকে উনি নিয়েও গেছেন। ওঁর ‘শ্রীমতী কাফে’ উপন্যাসটা আমার খুবই ইন্টারেস্টিং লাগত, মনে হত এইটা নিয়ে ছবি করা যায়।
এই উপন্যাসের গল্প একটা কাফে-কে কেন্দ্র করে, রাওলাট আইন থেকে বিয়াল্লিশের আন্দোলন পর্যন্ত সময়ের প্রেক্ষিতে লেখা। বহু বিপ্লবী, স্বাধীনতা সংগ্রামী সেই কাফে-তে আসত। পুলিশ মাঝেমধ্যেই সেই কাফে-তে রেইড করত। কিন্তু এই কাফে-র মালিক, ভজনানন্দ হালদার বা ভজু তাদের আশ্রয় দিত। নৈহাটি স্টেশনের কাছের এই কাফে, ভজু-র বাবা মামলাবাজ মহাদেব হালদার, এই সব মিলিয়ে আশ্চর্য এক গল্প, এবং কাফেকেন্দ্রিক আরও বহু চরিত্রের সমাহার সেই গল্পে। আমার মনে হল, ভজনানন্দ বা ভজু-র চরিত্রটা যদি উত্তমকুমার করেন!
সমরেশদাকে গিয়ে এ-কথা বলতেই সমরেশদা আশ্বাসবাণী দিলেন, ‘কোনও অসুবিধে নেই, আমার খুবই বন্ধুলোক। চলো, কথা বলিয়ে দিচ্ছি।’ উত্তমকুমার আমাকে খানিকটা চিনতেন, কারণ, আমার মামা দীপক বসু ও অভিনেত্রী ললিতা চট্টোপাধ্যায় একে-অপরের অনেকদিনের বন্ধু। ছোটবেলায় মামার বাড়িতে ওঁদের গল্প-আড্ডা হতে দেখেছি অনেক। যা হোক, উত্তমকুমার গল্পটা শুনলেন আমার থেকে। শুনে খুবই উৎসাহী হলেন।বললেন, ‘খুবই ভাল! এখন ইয়ং ছেলেমেয়েদের তো আসা উচিত নতুন আইডিয়া নিয়ে, আমি আর কদ্দিন টানব!’ আমার এখনও মনে আছে সেই কথা।
আরও পড়ুন: উত্তমবাবুর সঙ্গে অভিনয়ের জন্য আত্মবিশ্বাসের প্রয়োজন ছিল! লিখছেন শর্মিলা ঠাকুর…
অসম্ভব এক্সাইটেড হয়ে গেলেন উত্তমকুমার চরিত্রটা শুনে। ততদিনে ‘মা ভূমি’ রিলিজও করে গেছে। আমার প্রথম বাংলা ছবি হতে চলেছিল এইটাই, এবং সেখানে নায়ক উত্তমকুমার। আমারও খুব আনন্দ হচ্ছিল। এর সঙ্গে সেই ছবিতে অভিনেতা হিসেবে ভাবা ছিল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, উৎপল দত্তর কথা, রবি ঘোষকে ভেবেছিলাম একটি দুর্দান্ত চরিত্রে। মমতাশঙ্কর তখন খুব ইয়ং, ওকেও ভেবেছিলাম একটি চরিত্রের জন্য। উত্তমকুমার বললেন, ‘স্ক্রিপ্টটা তুমি ফাইনাল করো। আমরা সবাই মিলে যত্ন করে ছবিটা করব।’ আমিও স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম এই ছবিটা নিয়ে।

এর মধ্যে ‘মা ভূমি’ হয়ে গেল সুপারহিট। ২০০ দিন চলেছিল ছবিটা। আমি আর নীলাঞ্জনা গেলাম ছবির সাফল্য উদযাপন করতে, হায়দরাবাদে। আর সেখানেই খবরটা পেলাম। ভাবলে এখনও মনটা খারাপ হয়ে যায়। ২৪ জুলাই, আমার জন্মদিন, ১৯৮০ সালের সেইদিনই কলকাতা থেকে খবর পেলাম, উত্তমকুমার মারা গেছেন।
স্তম্ভিত, স্তব্ধ হয়ে গেলাম খবরটা শুনে। যাঁকে নিয়ে এমন একটা চরিত্র ভাবলাম, এমন একটা ছবির সম্ভাবনা যাঁকে ঘিরে তৈরি হল, সেই উত্তমকুমারই চলে গেলেন। আমার প্রথম বাংলা ছবির নায়ক হতেন যিনি, সেই উত্তমকুমার!
পরে অনেকে বিভিন্ন অন্য অভিনেতার নাম বলেছেন এই চরিত্রের জন্য, কিন্তু এই চরিত্রে উত্তমকুমারের ইমেজটা আমার কাছে এতটাই নির্বিকল্প হয়ে ছিল, আমি আর দ্বিতীয় কোনও নাম ভাবতেই পারিনি। ফলে, ছবিটাও হয়নি আর। উত্তমকুমার আমার কাছে আমার না-হওয়া ছবির নায়ক হয়ে রয়ে গেলেন।
শতবর্ষ পূর্তি হল উত্তমকুমারের। বয়স বেড়ে গেল আমারও, এখনও সেই আফসোস আমার যায়নি। এখনও মনে হয়, ইশ! একটা ছবি তো অন্তত করতেই পারতাম ওঁকে নিয়ে। বা, উনি বেঁচে থাকলে হয়তো আরও ছবি করতাম।


নায়ক হিসেবে উত্তমকুমার দীর্ঘদিন অমলিন ছিলেন। স্টারডমের আলোকবৃত্তেই ছিলেন। কিন্তু সেই উত্তমকুমারই যখন ভাঙতে শুরু করলেন নিজেকে, তখন তাক লাগিয়ে দিয়েছেন বারবার। নানা চরিত্রে, পার্শ্বচরিত্রে, নিজেকে যেভাবে মেলে ধরেছেন, তা অতুলন। ধরা যাক, ‘যদুবংশ’-র গনাদা। ওই চরিত্রে অভিনয় করা কিন্তু সহজ ছিল না মোটেই! উত্তমকুমারের পক্ষেই সম্ভব ছিল, অমন একটা চরিত্রও অত অবলীলায় ফুটিয়ে তোলা। সেই সময় আমি সবে ডকুমেন্টারি করা শুরু করেছি। ১৯৭২-’৭৩ সাল। ‘যদুবংশ’-র পরিচালক পার্থপ্রতিম চৌধুরী আমার বন্ধু ছিলেন। সেই সূত্রে ‘যদুবংশ’-র শুটিং-ও দেখেছি আমি। একটা জিনিস লক্ষ করেছিলাম উত্তমবাবুর ব্যাপারে, ভাল পরিচালক পেলে, পরিচালকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আছে বুঝতে পারলে, উনি নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিতেন। বলতেন, ‘তোমরা কীভাবে ভাবছ বলো, আমি সেভাবেই অভিনয় করব।’ রিনা, অপর্ণা সেনও আমার বন্ধু ছিলেন দীর্ঘদিনের। আমার মনে আছে, ওঁর সঙ্গে একটি ছবিতে অভিনয় করছিলেন উত্তমকুমার। সেখানে প্রচুর ইংরেজি কথা বলতে হবে ওঁকে। আমি সেদিন স্টুডিওতেই ছিলাম, শুটিং দেখছিলাম। উত্তমকুমার রিনাকে বলেছিলেন, তোমরা তো ইংলিশ মিডিয়ামে পড়েছ, আমার ইংরেজি ঠিকঠাক হচ্ছে কি না, খেয়াল রাখো।
ওঁর শেখার ইচ্ছে ছিল সাংঘাতিক। সত্যজিৎ রায় ‘নায়ক’ ভেবেছিলেন ওঁর ওপর আস্থা রেখেই। তখন তো মহানায়ক তিনি, অথচ নিজেকে ভেঙেই তো ওই অভিনয় করেছেন। একের পর এক ছবি, ‘এখানে পিঞ্জর’ থেকে ‘আমি, সে ও সখা’— অন্যরকমের চরিত্রে উত্তমকুমার অনবদ্য! একজন ভাল অভিনেতার ধর্মই এই, যে তিনি তাঁর বয়সোচিত চরিত্রের খোঁজ করবেন, জোর করে তারুণ্য ধরে রাখবেন না। উত্তমকুমারের মতো স্টার সেটা বুঝেছিলেন বলেই নিজেকে এত ভাঙচুরের মধ্য দিয়ে নিয়ে গেছেন।
ওঁর সঙ্গে কাজ করতে না পারার দুঃখ কোনওদিন যাবে না।




