অমলিন আজও

আমি যখন স্কুলে পড়ি,  হাই স্কুলে পড়ি বা কলেজে পড়ি,  তখন ভিসিআর-এর যুগ। আমাদের গ্রাম, পাবনার কামারহাটে, তখন ইলেকট্রিসিটি ছিল না। সেই সময়ে মাইক বাজানোর যে বড় ব্যাটারি হয়, সেই ব্যাটারি ভাড়া করে, সাদা-কালো টেলিভিশন ভাড়া করে, ভিসিআর ভাড়া করে ক্যাসেট মানে ভিএইচএস ক্যাসেট ভাড়া করে উত্তমকুমারের ছবি দেখা। উত্তমকুমারের ছবি মানে কেবলই উত্তমকুমার নন, উত্তমকুমার মানে সুচিত্রা সেনও বটে, উত্তমকুমার সুপ্রিয়া দেবী বা অপর্ণা সেনও। আর সেই সময়ের আরও যারা বড়-বড় অভিনেতা-অভিনেত্রী, ছবি বিশ্বাস, পাহাড়ী সান্যাল, বিকাশ রায় থেকে শুরু করে উৎপল দত্ত, ছায়া দেবী-সহ আরও অনেকে— এঁদের সবার কাজ দেখা কিন্তু উত্তমকুমারের চলচ্চিত্র মারফতই।

যতদূর মনে পড়ে, একদম গোড়ার দিকে উত্তমকুমারের যে ছবি দেখেছিলাম, তা সম্ভবত, ‘সবার উপরে’। এছাড়াও মনে পড়ে ‘শাপমোচন’, ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ দেখার কথা। মনে পড়ে, উত্তমকুমারের ‘শিল্পী’ ছবির কথা। এই ছবিতে উত্তম-সুচিত্রা জুটির অনবদ্য অভিনয়। উত্তমকুমার এই ছবিতে একজন চিত্রশিল্পীর ভূমিকায়। তার যন্ত্রণা, তার বেদনা, দারিদ্র কোনওকিছুই তাকে তার শিল্পীসত্তা থেকে সরাতে পারে না। আমার পড়াশোনা চারুকলা-য়। ‘শিল্পী’ দেখার পরেই আমার ছবি আঁকার ইচ্ছে জাগে। আমি অনুপ্রাণিত হই ওঁর অভিনীত এই চরিত্রটার দ্বারা, এবং শিল্পী হওয়ার স্বপ্নটা লালন করতে শুরু করি। সেই কারণেই আমার চারুকলায় ভর্তি হওয়া। অন্তত পনেরো থেকে কুড়িবার বোধহয় ওই ছবিটা আমি দেখেছি।

উত্তমকুমারের সিংহভাগ ছবিতেই তাঁর অভিনয়ে কোথাও কোনও খামতি ছিল না! তার মধ্যেও প্রিয় ছবির কথা যদি বলতেই হয়, আমি ‘নায়ক’-এর কথা বলব। তিনি মহানায়ক, কিন্তু নিজের অভিনেতা সত্তাকেই এই ছবিতে, তিনি এগিয়ে রেখেছেন সর্বতোভাবে। একজন নায়ক হয়ে আরেকজন নায়কের চরিত্র করছেন, আমাদের মনে হচ্ছে অভিনয় দেখছিই না, ওই চরিত্রটাকেই দেখছি। একজন নায়ক তো পর্দায় নায়ক, তার বাইরে তো তিনি একজন রক্তমাংসের মানুষই বটে! তাঁরও অতীত আছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা আছে। এই যে পর্দার আড়ালের নায়কের চরিত্র, এই অভিনয়ে উত্তমকুমারের কী অসম্ভব ডিটেলিং! সত্যজিৎ রায়ের নির্দেশনা ও চিত্রনাট্যের সঙ্গে সেই অভিনয়ের সম্মিলনে ওই মণিকাঞ্চনযোগ যেন ঘটে গিয়েছে। এই সম্মিলন এক শতাব্দীতে বারবার ঘটে না।

আরও পড়ুন: আমার না হওয়া বাংলা ছবির নায়ক উত্তমকুমার!
লিখছেন গৌতম ঘোষ…

শুধু উত্তমকুমার কেন, ওই সময়টার কথা ভাবলেই আশ্চর্য লাগে! সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, বিকাশ রায়, রবি ঘোষ ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর রায়, তরুণকুমারের মতো অভিনেতারা উত্তমকুমারের সহ-অভিনেতা হয়েছেন বা পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেছেন— এমন বাঘা-বাঘা অভিনেতাদের দেখলে মনে হয়, কী স্বাভাবিক এঁদের অভিনয়! যাঁকে আমরা ‘ন্যাচারাল অ্যাক্টিং’ বলি। আমরা এত প্রয়াস করি ইদানীং অভিনয়ে, যে সেই চেষ্টাটুকুর দাগ যেন অভিনয়ে একটু হলেও লেগে থাকে। অথচ কী জলের মতো সাবলীল ছিলেন এঁরা! উত্তমকুমার এঁদের পাশাপাশি নিজের নায়ক ইমেজকে ছাপিয়েই অভিনেতা হিসেবে টক্কর দিয়ে গেছেন বারংবার।

‘হারানো সুর’, ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘সন্ন্যাসী রাজা’, ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’— একের পর এক ছবিতে উত্তমকুমার কত রকমের চরিত্র করেছেন! অথচ সেই প্রতিটা চরিত্রের রং তাঁর অভিনয়ের বর্ণচ্ছটায় স্পষ্ট হয়ে থেকেছে। গানে যখন লিপ সিংক করছেন, তখন নেপথ্য কণ্ঠ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ই হন বা মান্না দে বা শ্যামল মিত্র— তাঁদের কণ্ঠ যেন জীবন্ত হত উত্তমকুমারের মধ্য দিয়ে। এত সাবলীল ওঁর লিপ সিংক, যেন মনে হয়, গানটা ওঁর কণ্ঠেই শুনছি। অভিনেতাদের কাছে এটা একটা শিক্ষণীয় বিষয় কিন্তু। ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ দেখলে আমরা ওঁর এই দিকটা বুঝতে পারি। একজন গায়কের চরিত্রে যখন লিপ দিচ্ছেন উত্তমকুমার, তা যে কী অনবদ্য! ‘সাগরিকা’-র কথাও এখানে উঠে আসবে।

আমার মনে পড়ছে ‘ভ্রান্তিবিলাস’-এর কথাও। উত্তমকুমার এবং ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বৈত চরিত্রে। কী অপূর্ব অভিনয় দু-জনেরই। নায়কোচিত চরিত্র, কিন্তু কমিক টাইমিংয়ের কী আশ্চর্য মেলবন্ধন দু-জনেরই! আর সঙ্গে সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়! কী অসম্ভব শক্তিশালী অভিনেত্রী। সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়।

‘পথে হ’লো দেরী’, ‘চৌরঙ্গী’, ‘অগ্নীশ্বর’, ‘দেবদাস’, ‘বিপাশা’, ‘মেমসাহেব’-এর চরিত্রগুলোকে পাশাপাশি রাখলে বিস্মিত হয়ে যেতে হয়। স্যাটা বোস আর অগ্নীশ্বর, দেবদাস আর ‘মেমসাহেব’-এর সাংবাদিক অমিত— একটি চরিত্রের সঙ্গে আর-একটি চরিত্রের দূরত্ব কত দূর ভেবে দেখলে যে-কোনও অভিনেতারই বিস্ময় জাগে। এই চরিত্রগুলি নায়ক, অথচ কী বহুবর্ণীয় প্রকাশ তাদের, কেবল উত্তমকুমারের অভিনয়ের জন্যই সেটা সম্ভব হয়েছে! কী সাবলীল, আবার ততটাই নায়কোচিত এইসব চরিত্রের উপস্থিতি!

সেই সময়ের পরিচালকরাও গল্প বলার সেই কায়দা জানতেন, যা দর্শকের মনে গেঁথে থাকবে। একদম। শুধু অভিনেতা-অভিনেত্রী দিয়ে তো আর ছবি হয় না, একটা ছবি পূর্ণাঙ্গভাবে গড়ে ওঠে নানা মোকামে। তখন সময়টাই ছিল তেমন।

উত্তমকুমারের সহ-অভিনেতাদের কথা একটু আগেই উল্লেখ করেছি। সে ছবি বিশ্বাস হোক বা উৎপল দত্ত, পাহাড়ী সান্যাল হোক বা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়— এঁদের সঙ্গে উত্তমকুমার যখন এক পর্দায় থাকতেন, তখন মনে হত বাঘে-সিংহে যুগলবন্দি চলছে। আর উত্তমকুমারও যত পরিণত হয়েছেন, নায়ক চরিত্র থেকে সরে এসে অন্যরকম চরিত্রে একের পর এক সাক্ষর রেখেছেন তাঁর। তা সে ‘ধন্যি মেয়ে’-ই হোক, বা ‘বাঘবন্দী খেলা’!

আমাদের আগের প্রজন্মও উত্তমকুমারে মজে ছিলেন, যাঁরা বাংলা সিনেমার সেই স্বর্ণযুগে সত্যিই ছিলেন, আমরাও তাঁকে ভুলতে পারি না। ছোটবেলা থেকে যেটুকু অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন দেখেছি, তা উত্তমকুমারের জন্যই। বাঙালির হৃদয়ে রোম্যান্টিক নায়ক হিসেবে, মহানায়ক হিসেবে তাঁর অবস্থান অটুট হলেও, অভিনেতা হিসেবে উত্তমকুমার নিজেকে আরও উচ্চমার্গে অধিষ্ঠিত করেছেন! সকল চরিত্রেই তাঁর সাবলীল অভিনয় প্রতিটি চরিত্রকে অনন্য এক বিশ্বাসের জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে। সেইসঙ্গে বাংলা সিনেমায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে আরোহণ করে নিজেই প্রমাণ করে গেছেন, উত্তমকুমার একজনই।