‘রোজ কত কী ঘটে যাহা তাহা—
এমন কেন সত্যি হয় না আহা!
ঠিক যেন এক গল্প হত তবে—
শুনত যারা অবাক হত সবে…’
‘বীরপুরুষ’ (১৯০৩) কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে-ছেলেটির গল্প বলেন, সে স্বপ্ন দেখেছিল ঘোড়া ছুটিয়ে তুমুল লড়াই করে ডাকাতদের হাত থেকে নিজের মাকে নিজেই উদ্ধার করছে। স্বপ্ন, কল্পনা, বাস্তব, অধিবাস্তব— সব কিছুই মানুষের ব্যক্তিগত ধারণার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এদের পারস্পরিক সম্পর্ক গভীর। কল্পনা আর বাস্তব হাত ধরাধরি করে চলে। আমরা জীবনে যা পেতে চাই, যেমন হয়ে উঠতে চাই— বাস্তবে কখনও তা ঘটে, আবার যা পাওয়া হয় না, আমাদের কল্পনাতে তা থেকে গিয়ে এক অপার আনন্দের উৎস হয়ে উঠতে চায়। একটি দশ বছর বয়সি বালক, যে জানে তার মা-বাবা মৃত, যাকে মাসি-মেসোর কাছে অযত্নে লালিত হতে হচ্ছে, মাসতুতো ভাইটি যাকে খুব জ্বালাতন করে— সে দেখে বহু প্যাঁচা মারফত তাদের এই প্রিভেট ড্রাইভের বাড়িতে প্রতিদিন কিছু চিঠি আসছে, কিন্তু মাসি এবং মেসো সেসব চিঠি হয় ছিঁড়ে ফেলছে আর না হয় পুড়িয়ে দিচ্ছে। মোদ্দা কথা, কোথাও যেন একটা চেষ্টা চলছে, এসব চিঠি থেকে এই হ্যারি পটার ছেলেটিকে যেন দূরে রাখা যায়। তবে কি চিঠিগুলো তার জন্যই আসছে?
প্যাঁচাদের চিঠি হাতে না-পেলেও যেদিন ছেলেটির দশ বছর পূর্ণ হবে, সে-রাতে এক বিশালদেহী, শ্মশ্রুগুম্ফ-সন্নিহিত মানুষ তাদের বাড়ি থেকে দূরে, যেখানে তারা বেড়াতে এসেছে নাকি লুকিয়ে থাকতে, সেখানে এসে উপস্থিত হয়। ভদ্রলোকের নাম হ্যাগ্রিড। সে হ্যারির জন্য জন্মদিনের একটা কেকও এনেছে। আর ওই যেসব চিঠিগুলো হ্যারি হাতে পাচ্ছিল না, তার একটা হ্যাগ্রিড হ্যারিকে দেয়। চিঠিটি আসলে একটি স্কুলে ভর্তি হওয়ার আহ্বান। হগওয়ার্টস স্কুল অফ উইচক্র্যাফ্ট অ্যান্ড উইজ়ার্ডি। জেকে রাউলিং-সৃষ্ট হ্যারি পটার যখন থেকে ওই স্কুলে গেল আর পর পর সাতটি খণ্ড লিখিত হল— সারা পৃথিবী জুড়ে এবং আমাদের বাঙালি জীবনে এক বিরাট পরিবর্তন নেমে এল পড়ার অভ্যাসে।
আরও পড়ুন: পানশালার নর্তকীদের জীবন আসলে কীরকম?
লিখছেন আদিত্য ঘোষ…
পড়ার অভ্যাস বলার কারণ এটাই যে, হ্যারি পটার যখন প্রকাশিত হতে শুরু করল, গত শতকে নব্বই দশকের একদম শেষ দিকে, (১৯৯৭) তখন কেবল টিভির রমরমা। গল্প বলার দায়িত্ব সাহিত্য থেকে সিনেমায় হস্তান্তরিত হয়েছে। পূজাবার্ষিকীতে ছোটদের জন্য লেখা আছে বটে, কিন্তু নতুন নতুন লেখক খুব বেশি উঠে আসছেন না। কিছু ভুঁইফোড় গোয়েন্দা চরিত্র তৈরি হচ্ছে তবে ব্যোমকেশ, ফেলুদা; এমনকী, কাকাবাবুর মতো জনপ্রিয়তা তারা পাচ্ছে না। আবার ছোটদের জন্য যে-সাহিত্য, তা গোয়েন্দা-নির্ভর হতে গিয়ে যে-কোনও লেখকই একটা করে গোয়েন্দা নির্মাণ করছেন, তা-ও একটি সাহিত্যের জন্য খুব ভাল লক্ষণ ছিল না, আজও নয়। ঠিক সেই সময় অপূর্ব প্লট আর ফ্যান্টাসি নিয়ে হাজির হল হ্যারি পটার সিরিজ। ছোটদের সঙ্গে-সঙ্গে বড়রাও বইমুখো হল। বিশ্বজুড়ে প্রকাশনার খোলনলচে বদলে গেল। সিরিজের এক-একটা বই প্রকাশিত হওয়া মানে বিশ্বজোড়া উৎসব! টেলিভিশন ও সিনেমা দেখা মানুষের বইয়ের প্রতি এমন চরম উৎসাহ যেন বহু, বহু বছর পর পৃথিবী দেখল। বাঙালি বাড়িতেও সেইসব দামি বই দু’-একটা করে ঢুকে পড়ছিল।
আবার অন্যদিকে হ্যারি পটার সিরিজে সব থেকে শক্তিশালী ভালবাসার প্রমাণ রেখে যান সেভেরাস স্নেপ। লিলি পটারকে ভালবেসেছিলেন বলে সবসময় হ্যারিকে তিনি রক্ষা করে গেছেন। আপাতভাবে স্নেপ হ্যারিকে পছন্দ করেন না বলে সবাই জানত, কিন্তু তিনিই সারা জীবন লর্ড ভলডেমর্টকে বোকা বানিয়েছেন, ডাম্বেলডোরের প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছেন। প্রাণ দিয়ে রক্ষা করেছেন তাঁর প্রেম লিলি পটারের
সন্তান হ্যারিকে।
২ মে চলে গেল হ্যারি পটার দিবস। এই সিরিজ এত জনপ্রিয়তা পেল কী করে? তার অনেকগুলি কারণ আছে। প্রথমত, বইগুলির ভাষা ভীষণ সাধারণ। আজকে যাঁরা আগাথা ক্রিস্টি, আর্থার কোনান ডয়েল, এমনকী, পি.জি ওডহাউস পড়বেন, তাঁরা উপলব্ধি করবেন সেই ইংরেজি আজকের নিরিখে যথেষ্ট ‘কঠিন’। আমেরিকার জনপ্রিয় লেখকদের ভাষা হয়তো তুলনামূলক কথ্য এবং সহজ (যেমন, সিডনি শেলডন) কিন্তু শিশু-কিশোরদের জন্য সেসব বই নয়। এবং শিশুতোষ সাহিত্য একটা সময় যেন বড্ড বাস্তবঘেঁষা হয়ে যাচ্ছিল। হ্যারি পটার সিরিজ সেসব ভেঙে দিয়েছিল। ফ্যান্টাসি সাহিত্য, অথচ তার প্লট যে কী জোরদার হতে পারে, তা আবারও প্রমাণ করেছিলেন জে কে রাউলিং। এখানে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের একটা নেপথ্যকাহিনি আছে। একটা ম্যাজিক-বিশ্ব, সেখানকার মানুষের মধ্যে শ্রেণি-ভেদাভেদ আছে, ম্যাজিক না-জানা মানুষরা সেখানে ‘মাগল’ বলে পরিচিত, সেখানে পরিবার আছে, দারিদ্র আছে, রাজনীতি আছে, প্রেম-ভালবাসা আছে, স্কুল-কলেজ-হস্টেল আছে; সবটাই আমাদের পৃথিবীর মতো, কিন্তু আমাদের থেকে আলাদা, কারণ ওখানে মানুষের হাতে ওয়ান্ড (জাদুদণ্ড) থাকে, যা আমাদের কারও কাছে নেই। এই যে একটা ওয়ান্ড, যার সব স্পেল (মন্ত্র) আমাদের মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সে-ম্যাজিকের সুবিধা আমাদের নেই, সেই ছুঁতে পেরেও না-পারা দুনিয়ার রহস্যই হ্যারি পটারের প্রতি আমাদের সকলকে তীব্রভাবে আকৃষ্ট করেছিল।

আরেকটা ব্যাপারেও হ্যারি পটার সাহিত্য হিসেবে জনপ্রিয়, তা হল, শিশুমনস্তত্ত্ব ভীষণ গভীরে গিয়ে বোঝা। হ্যারির মা-বাবা মৃত, সে অন্যের কাছে অযত্নে পালিত, অথচ উইসলিদের পরিবারে তার এতটা ভালবাসা পাওয়া, বন্ধুদের সাহচর্য পাওয়া, স্নেপের শাসন পাওয়া এবং সর্বোপরি ডাম্বেলডোরের স্নেহমিশ্রিত সুরক্ষা পাওয়া— এগুলো সারা পৃথিবীতে সমস্ত দুঃখী, একাকী শৈশবকে একটা অচেনা ভরসা দিয়ে যায়। মনুষ্য-আবেগ হ্যারি পটার সিরিজে বিধৃত হয়েছে এমনভাবে, যা মহৎ সাহিত্যগুলোতেও বিরল। শুধু ভালবাসার কথা ধরা যাক। টম রিডলের মা প্রকৃত ‘উইচ’ হওয়া সত্ত্বেও কোনওদিন তাঁর স্বামীর ওপর ম্যাজিক করেননি। উনি বিশ্বাস করতেন, ভালবাসার ওপর কোনও ম্যাজিক চলে না। প্রেম হল সব চেয়ে শক্তিশালী ম্যাজিক।
আবার এই টম রিডল যখন বড় হয়ে লর্ড ভলডেমর্ট হচ্ছে, মা-বাবার ভালবাসাহীন এক অনাথ সেই ছেলেটি যখন সকলকে ঘৃণা করতে ও শাসনে রাখতে চাইছে, এবং হ্যারির মা-বাবাকে মেরে হ্যারিকেও নিধন করতে উদ্যত হচ্ছে, তখন হ্যারির মা লিলি পটারের ভালবাসা হ্যারিকে সুরক্ষা দিচ্ছে। লর্ড ভলডেমর্ট প্রায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে নিজেরই অ্যাভাডা কেডাভ্রা মন্ত্রে। হ্যারি সকলের ভালবাসা পেয়ে ভালবাসতে শিখছে আর ভালবাসাহীন ছিল বলেই লর্ড ভলডেমর্টের হৃদয় ভরা থাকল তীব্র ঘৃণায়। সে নিজে ‘পিওর ব্লাড’ ছিল না বলে সকল মাগল, নিজের পিতা, প্রত্যেক প্রতিদ্বন্দ্বীকে মেরে সর্বময় শাসক হয়ে উঠতে চেয়েছে। ম্যাজিক-বিশ্বের এক বিরাট প্রতিভাবান উইজার্ড হয়েও সে নিজে খুন করেছে এবং আরও অনেক মানুষকে খুনি করে তুলতে চেয়েছে। ড্রেকো মালফয়কে সে বাধ্য করছে ডাম্বেলডোরকে খুন করতে।
আবার অন্যদিকে হ্যারি পটার সিরিজে সব থেকে শক্তিশালী ভালবাসার প্রমাণ রেখে যান সেভেরাস স্নেপ। লিলি পটারকে ভালবেসেছিলেন বলে সবসময় হ্যারিকে তিনি রক্ষা করে গেছেন। আপাতভাবে স্নেপ হ্যারিকে পছন্দ করেন না বলে সবাই জানত, কিন্তু তিনিই সারা জীবন লর্ড ভলডেমর্টকে বোকা বানিয়েছেন, ডাম্বেলডোরের প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছেন। প্রাণ দিয়ে রক্ষা করেছেন তাঁর প্রেম লিলি পটারের সন্তান হ্যারিকে।
হ্যারি পটার সিরিজ যখন চলচ্চিত্রায়িত হয়, তখন আরও জনপ্রিয়তা বাড়ে বইগুলির। ছেলে-মেয়েরা যে পড়ার বইয়ের বাইরেও বই পড়ে, যা করতে বাঙালি অভিভাবকরা তাঁদের সন্তানদের নিদান দিয়ে থাকেন হরবখত, তার একটা স্টেটাস-সিম্বল হয়ে উঠেছিল একসময়, এই হ্যারি পটারের বই। তারপর সিনেমার ক্ষেত্রে জেকে রাউলিংয়ের সাহিত্য নিয়ে আরও ছবি তৈরি হলেও হ্যারি পটার সিরিজের ওই সাতটি বইকে ঘিরে উন্মাদনার মতো আর কিছু তেমন হয়নি। কেবল সাহিত্য রচনা করে ইংল্যান্ডের রানি দ্বিতীয় এলিজ়াবেথের থেকেও জেকে রাউলিংয়ের সম্পত্তির মূল্য বেশি হলেও, হ্যারি সিরিজের মতো ম্যাজিক তিনি আর তৈরি করতে পারেননি।



