স্মৃতি, গন্ধ, স্বপ্ন
জমিদার বাড়ির লোক, সুতরাং সবচেয়ে বড় পিঁড়িটা পেতে দেওয়া হল। ভাত এবং তরকারি, বাটিতে ডাল। উনি তরকারি দিয়ে ভাত মেখে বলতেন, ‘অল্প লবণ’। লবণ ছড়িয়ে নিতেন।
‘হায়-হায় লবণ বেশি নিয়া ফেলাইলাম! অল্প দুগা ভাত!’ ভাত দিয়ে মাখলেন। ‘হায়-হায় শুকনা হইয়া গেল, তরকারি দেন।’ তরকারি দেওয়া হল। আবার ভাত দিয়ে ডাল মাখা হল। ডাল-ভাত কি শুধু খাওয়া যায় নাকি? সুতরাং তরকারি। আবার নুন। নুন বেশি, সুতরাং ভাত আবার ‘শুকনা-শুকনা লাগে’ আবার ডাল!
যদি মাছ থাকত, মাছ আগে, পরে ডাল। মাছের ব্যাপারে বাহানা চলে না এটা সবাই জানে, উনিও জানতেন। উনি আবার বিকেলের লরিতে ফিরে যেতেন। বেলা তিনটে নাগাদ লরিটা ফিরে যেত। সন্ধের পর আবার বিকেলের দুধ আসত কারখানায়। আমি নীলগঞ্জে অসীমদের বাড়িতে দু’তিনবার গিয়েছিলাম। থেকেও ছিলাম দু’তিনদিন করে। কব্জি ডুবিয়ে দুধভাত খেতাম, বাড়িতে অনেকটাই দুধ আসত, অসীমের বাবার ঠিক কী কাজ ছিল জানতাম না। দেখতাম, দু’তিনটে মোটা খাতা ছিল বাড়িতে। গোয়ালঘরের দেখাশুনো, কত ক্যান দুধ যাচ্ছে কারখানায়— তার হিসেবপত্র এইসব হয়তো। ওই ডেয়ারির একটা অফিস ঘর ছিল, ওখানে ম্যানেজার বা ওরকম অফিসার ছিল। অসীমের বাবা বড় ধরনের কাজ করতেন না কিছু — এটুকু বুঝেছিলাম।
ঠাকুমা-দিদিমাদের স্মৃতি যেন অনন্ত কুয়োর জলে চাঁদ পড়ে থাকা!
পড়ুন: উল্টো দূরবিন পর্ব ২৫…
নীলগঞ্জের অনেক স্মৃতি ভিড় করে আসছে, অধিকাংশই গন্ধ নির্ভর। সার-সার গরুদের সমবেত গন্ধ, দুধ দোয়াবার বালতি-বালতি দুধের গন্ধ, ডাঁই করা গোবরের গন্ধ, সবই আলাদা রকম। গোয়ালবাড়ি থেকে সামান্য দূরেই অসীমদের কোয়ার্টার। টিনের চাল, দুটো ঘর। সামনে বারান্দা। লাল সিমেন্ট। ওদের ঘর থেকে একটু দূরের হাম্বা রব সোনা যেত। কখনও-কখনও এক ধরনের হাম্বা রব একটানা শোনা যেত, অসীমের মা বলত, গরু ডাকে… অসীমের বাবা বলত, কাল ব্যবস্থা হবে।
অসীম আমাদের বাড়িতে থাকত আগেই বলেছি। অসীম আমাকে অনেক কিছুই বলেছিল। ওর জ্ঞানের উৎস ছিল ওই ক্যাভেন্টার ডেয়ারি। রাস্তায় কুকুরে-কুকুরে আটকে যাওয়া দেখেছি। দাদুর সঙ্গে রাস্তায় এই দৃশ্য দেখে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। ‘ওদের কী হয়েছে?’ দাদু বলতেন, ‘ওই দিকে চাইও না, চক্ষু খারাপ হয়।’ ‘কেন দাদু?’ জিজ্ঞাসা করলে বলেছেন, ‘এখন জানার দরকার নাই, বড় হইলেই বোঝবা!’ বড় হইলেই বুঝবার মধ্যে একটা রহস্য আছে এরকম অনেক রহস্য ছিল পৃথিবীতে। কিছু রহস্য সেই মাস্টারমশাই দিয়েছিলেন, কিছু কুটুদি, কিছু শিখারা।
মেয়েরা একটু বড় হলেই ওদের বুকটা কেমন যেন হয়ে যায়… রহস্য না? মাঝে-মাঝে মাকে রান্নাঘরে যেতে দেয় না ঠাকুর্মা, রহস্য না? মায়ের নাকি শরীর খারাপ হয়েছে। কিন্তু মা তো শুয়ে থাকত না, অন্যান্য সব রকমের কাজ করত। ছাদের চিলেকোঠায় আমাদের ঢোকা নিষেধ ছিল, ওটা নাকি নোংরা ঘর। ওই ঘরে কিছু হাবিজাবি জিনিসপত্র ছিল ঠিকই, বাতিল আর ভাঙা আসবাবপত্র ইত্যাদি… তাছাড়া কয়েকটা দড়িতে প্রায়ই ঝুলত কিছু ত্যানা-ন্যাকড়া। অনেক পরে কিছুটা বড় হয়ে বুঝেছি ওগুলো কী। বাড়িতে অনেক মহিলা কিনা, ওগুলো ওদেরই গোপন রাখতে হয়।
অসীম রাস্তার কুকুরদের রহস্য বুঝিয়েছিল। বলেছিল, মেয়ে-কুকুর আর ছেলে-কুকুর। বলেছিল বড় হলেই সবাই এই খেলা খেলে। ওদের ডেয়ারিতে গরুর যখন হিট হয়, তখন ওরা ডাকে। গাই গরুকে ষাঁড়ের কাছে নিয়ে যায়। আবার ষাঁড়ের বদলে ইঞ্জেকশনও এসে গেছে। ওর বাবা ইঞ্জেকশনের ব্যবস্থা করে। বাবা বোঝে, কার ষাঁড় দরকার কার ইনজেকশন। এরপর ‘চাপাচাপি খেলা’ করলে বাচ্চা হয়। কুকুরদের খালি এরকম আটকে যায়। গরু-ছাগল, মানুষ— কারও এরকম আটকায় না। ‘মানুষও?’ অসীম বলেছিল, সবার না হলে বাচ্চাই হবে না। আমি ভাবছিলাম, এ মা সব মানুষই! আমার বাবা-মা ও আমি, আমার ভাই-বোন, পিসিমা-মাসিমা ও! ইনজেকশনেও তো হয়, আমার মা ইনজেকশন নিতেই তো হাসপাতালে যায়, আমরাও ইনজেকশনেই হয়েছি।
অসীমদের ওই নীলগঞ্জের ফার্মে কত জাম গাছ। জাম পড়ে থাকত। আমগাছের মঞ্জরী ওখানেই প্রথম দেখেছি। হাটও দেখেছি ওখানে। নীলগঞ্জের হাট। কুমোর পাড়া থেকে গরুর গাড়ি বোঝাই কলসি হাঁড়ি না এলেও, ভ্যানগাড়ি ভরা কলসিহাঁড়ি আসতে দেখেছি। নীলগঞ্জের হাটে গরুও বিক্রি হতে দেখেছি। গরুর মুখ ফাঁক করে গরুর ব্যাপারিরা কুঁজো হয়ে গরুর দাঁত দেখে গরুর বয়স বুঝে নিত। বুঝে নিত গাই গরুটি কতটা তরুণী। বলা যায়, নীলগঞ্জের ওই ক্যাভেন্টরের ফার্ম, হাট— এইসব আমার অনেকটা প্রকৃতি পরিচয় ঘটিয়েছিল।

এর আগে বাগবাজারের মারহাট্টা ডিচ খাল, খালের কচুরিপানা, মাছরাঙা পাখি, খালের জলে ভাসা মরা গরু, গরুর উপরে শকুন, খালপাড়ে ব্যাঙ, ব্যাঙ ধরতে আসা সাপ— এইসব দেখেছি। গঙ্গা, পশ্চিমে জড়ো হয়ে থাকা কালবৈশাখীর মেঘ, ঝড়, ঝড়ের ঝাপটা খেতে-খেতে গঙ্গার ধারে চলতে-চলতে জানা-না জানা অদ্ভুত সব কবিতা বলা প্রলাপ এর মতো। তখন পাঠ্যবইয়ের বাইরে ক’টা কবিতাই-বা জানতাম! স্কুলের আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় যারা ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ করেছিল, বা ‘প্রশ্ন’ বা সুকান্তর ‘ঠিকানা’, এই সব থেকে মিলিয়ে-মিশিয়ে অনেকটাই বানিয়ে কীসব ঝড়ের বাতাসে ভাসাতাম আজ কি আর মনে আছে! তবে যা বলতাম অনেকটা এরকম— পরান আমার নাচিছে আজিকে, হাওয়া ঠিকানা আমার যায় ! ভেসে যায় এই বাতাসে মুক্তি আমার জলের মধ্যে, হাওয়ার মধ্যে ঠিকানা আমার। পতাকা উড়িছে পতাকা উড়িয়েছে হৃদয় আমার চল জোরে চল ঊর্ধ্বে মাদল নিম্নে উতলা ধরণীতল চলরে চলরে চল। তখন তো ‘ঝড় এসেছে ওরে ওরে ঝড়কে পেলেম সাথী’— এইসব গান জানতাম না, তাই ওইসব প্রলাপ বকতাম।
বাল্যকালে প্রকৃতি পেয়েছি আরও এক জায়গায়। সেটা চাঁদপাড়া। বনগাঁ লাইনে। বনগাঁর ঠিক আগের স্টেশনটির নাম চাঁদপাড়া। আমার ঠাকুর্মার ছোট ভাই থাকতেন। এই দাদুকে আমরা ডাকতাম, ‘চাঁদপাড়ার দাদু’। ঠাকুমার চেয়ে বয়সে একটু ছোট, ঠাকুর্মা ‘হরি’ বলেই ডাকতেন, ভাল নাম ছিল— হরিনাথ কাব্যতীর্থ। পূর্ব-পাকিস্তান থেকে বোধহয় ১৯৪৮-৪৯ সালে এসে, এখানে কিছুটা জমি কিনে থিতু হয়েছিলেন।
এই চাঁদপাড়ায় নোয়াখালি জেলা থেকে আসা মোহিনী চক্রবর্তী ঠাকুর নামে একজন ধনী মানুষের, এই অঞ্চলে কিছুটা প্রভাব ছিল। এই অঞ্চলের মানুষের গুরুদের বংশের লোক তিনি। দেশভাগের পর কিছু শিষ্য-শাবকেরা ওদের ঠাকুর বাবাকে ডেকে এনেছিল এই অঞ্চলের ধানকুনি গ্রামে। ওখানে ওই বাড়ির নাম হয়ে যায় ঠাকুরবাড়ি, পূর্ববঙ্গে ওদের গ্রামের নাম ছিল দেবপাড়া। লোকমুখে দেওপাড়া।
এই মোহিনী ঠাকুর দেখতে বড় সুপুরুষ। গৌরবর্ণ, ভরা গলা, প্রায় ছ’ফুটের মতো লম্বা। বেশ ভাল পরিমানে জমিজমা করলেন। বাড়িতে কালীমূর্তি। পূর্ববাংলার চাঁদপুর জেলাতেই মেহার নামে একটি বিখ্যাত কালীবাড়ি আছে, যার প্রতিষ্ঠাতা সর্বানন্দ ঠাকুর। মোহিনী ঠাকুর ওই সর্বানন্দ ঠাকুরের বংশধর ছিলেন। এসব তথ্য ক্রমে জেনেছি। ওই মোহিনী ঠাকুরই সম্ভবত আমার ওই চাঁদপাড়ার দাদুকে এনেছিলেন ডাকুরিয়া গ্রামে।

চাঁদপাড়া স্টেশন থেকে মাটির রাস্তায় মাইলখানেক পথ হেঁটে যেতে হত। বর্ষাকালে ওই রাস্তায় হাঁটা একটা মজার ব্যাপার ছিল সেই ছোটবেলায়। চটি-জুতোটা হাতে নিয়ে একটু শুকনো মাটিতে পা রেখে সার্কাসের ব্যালেন্সের খেলার মতো হাঁটা, কখনও সামলে নেয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হলে, পড়ে যাওয়া। কখনও ভুস করে পায়ের কিছুটা ডেবে যাওয়া… চাঁদপাড়ার দাদু, মানে হরিনাথ কাব্যতীর্থ ঠাকুর্মার ছোটভাই, আগে ঠাকুর্মার অন্য দুই ভাইয়ের কথা বলেছি। উপেন্দ্রনাথ, মানে চিৎপুরের দাদু, বৈকুন্ঠনাথ, মানে পাকিস্তানী দাদু। তিন দাদু তিন রকমের মানুষ। বৈকুণ্ঠনাথ ঠাকুর্মার চেয়ে বড়, সংস্কৃতের বিরাট পণ্ডিত। কম কথা বলতেন, এক্কেবারে বিষয়ী ছিলেন না। খুব দারিদ্র্যে কেটেছে। স্ত্রী মারা গেছেন অকালে। তিনটি পুত্র, যারা আমার কাকু।
এই চাঁদপাড়ায় নোয়াখালি জেলা থেকে আসা মোহিনী চক্রবর্তী ঠাকুর নামে একজন ধনী মানুষের এই অঞ্চলে কিছুটা প্রভাব ছিল। এই অঞ্চলের মানুষের গুরুদের বংশের লোক তিনি। দেশভাগের পর কিছু শিষ্য-শাবকেরা ওদের ঠাকুর বাবাকে ডেকে এনেছিল এই অঞ্চলের ধানকুনি গ্রামে। ওখানে ওই বাড়ির নাম হয়ে যায় ঠাকুরবাড়ি, পূর্ববঙ্গে ওদের গ্রামের নাম ছিল দেবপাড়া। লোকমুখে দেওপাড়া।
গোবিন্দকাকুর কথা আগে বলেছি; অন্য দুই কাকু— নকুলকাকু এবং কেদারকাকু। কেউ বেশি লেখাপড়া করেনি। মেজ-পিসেমশাই জাহ্নবী চক্রবর্তী বড় ছেলেকে নিজের কালির ব্যাবসার সেল্সের কাজে ঢুকিয়ে নিয়েছিলেন এবং নকুলকাকুকে এক বন্ধুর ব্যবসায় কোনও গুদাম দেখাশুনার কাজে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। কেদারকাকু সার্ভেয়ারের ট্রেনিং নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারি চাকরি পেয়ে গিয়েছিলেন। একসময়ে ওরা থাকত, বউবাজার অঞ্চলে চুনাপুকুর লেনের একটা ভাড়া বাড়িতে। একটা মাত্র ঘরে এতজন। ওখান থেকে উঠে যেতে হয়। সেই অগতির গতি জাহ্নবী চক্রবর্তী, ১২ নম্বর গ্যালিফ স্ট্রিটের একটা ঘরে ওদের ঠাই দেন।
আমার মনে পড়ে, ওই একটা ঘরেই ওরা থাকত। জনতা স্টোভে নকুলকাকু রান্না করত। নকুলকাকু-র বিয়ে হল বিরাটিতে। আমরা বেশ ছোট। বরযাত্রী গিয়েছি। সে-সময়ে বরযাত্রীরা কন্যাপক্ষকে বিপদে ফেলে কোনও এক ধরনের তামসিক আনন্দ পেত। মাছ-মাংস ইত্যাদি যতটা খেত, তার চেয়ে বেশি অপচয় করত। যদি টান পড়ে যেত, তাহলে উল্লাস বোধ করত। ওইখানেও ওরকম হয়েছিল। তখনও বাঙালদের বিয়েতে টেবিল-চেয়ার আসেনি। মাটির উঠানেই বসেছি উপরে। উপরে সামিয়ানা। পাটির আসন, কলাপাতা, মাটির গেলাসে জল। রসগোল্লা নিয়ে এল বালতি করে। তখন হাতেই দেওয়া হত। দু’তিনটে একসঙ্গে দেওয়ার প্রথা ছিল। একটা করে দেওয়াটা খুব নিন্দার ছিল। একবার পরিবেশন শেষ। তারপর এ-ধার থেকে ও-ধার থেকে রব উঠল— ‘এই পাতে-এই পাতে’ পরিবেশনকারী দিশেহারা হয়ে বলল, ‘কার-কার রসগোল্লা লাগবে হাত তুলুন!’ ব্যস! ‘হাত তুলতে বলছে! এত বড় অপমান! উঠে যাও সব!’— একজন হাঁকলেন, সবাই উঠে গেল। আমাকেও উঠে যেতে হল। এইসব ছিল… এটা আমি ছয়ের দশকের কথা বলছি।




