ঠাকুমা-দিদিমারা
ঠাকুর্মার সঙ্গে যখন ওই দাদুর বাড়ি যেতাম, বাপের বাড়িতে দু’এক রাত না থেকে ঠাকুর্মা ফিরত না। আমিও থাকতাম, কিন্তু দাদুর সঙ্গে গেলে দাদু ফিরত, কিন্তু আমার জুতোটা লুকিয়ে রাখত রাধি। তখন ‘যেতে নাহি দিব’ করার জন্য, জুতো লুকনোর একটা চল ছিল। কখনও-কখনও আমিও জুতো লুকিয়েছি।
দিদিমার নাম ছিল বিমলা সুন্দরী। আমার ঠাকুর্মা বিমলা বলে ডাকত। আমি ডাকতাম, ‘চিৎপুরের দিদিমা’। এই দিদিমা কয়েকটা রান্না দারুণ করত। একটা হল ‘কুমড়োর ছক্কা’। আসলে এটা ‘কুমড়োর ছোঁকা’। ঘটিদের রান্না কীভাবে যেন শিখেছিলেন। কুমড়ো-আলু একটু বড়-বড় করে কেটে নিয়ে গোটা ছোলা দিয়ে। দাদু খুব ভালবাসতেন। আর ‘শোলে-মূলায়’। শোল মাছ দিয়ে মূলো। আর সন্ধের সময়ে একটা খাওয়া খুব মনে পড়ে। কয়লার উনুনে রুটি ফুলে উঠেছে। ওরকম দুটো গরম রুটির একটায় সর্ষের তেল, কয়েক ফোঁটা নুন, এবং একটা শুকনো লঙ্কা পুড়িয়ে দিয়ে, দুটো রুটিকে পরস্পর ঘষাঘষি করলে, দুটো রুটিতেই নুন-তেল-লঙ্কা লেগে যায়, ব্যস! আর কিছু দরকার নেই, দুটো রুটি দু’জনে…
ঠাকুর্মার আরেক-ভাই, যিনি মেজ, নাম হরিনাথ। উনি পূর্ববাংলার কোনও টোলে ‘কাব্যতীর্থ’ পড়েছিলেন। বড়ভাই বৈকুণ্ঠনাথও সংস্কৃতের পণ্ডিত। শুনেছিলাম, বারানসীতে গিয়ে কোনও টোলে ‘স্মৃতিশাস্ত্র’ পড়েছিলেন। হরিনাথ চাঁদপাড়া গ্রামের কোনও একটি প্রাইমারি স্কুলে পড়াতেন। পূর্বপাকিস্তান থেকে এসে, চাঁদপাড়া গ্রামেই বসবাস শুরু করেছিলেন। কীভাবে চাঁদপাড়া, সেটা আমি ভুলে গিয়েছি। তবে, ছোটভাই উপেন্দ্রনাথ কীভাবে চিৎপুরে সেটা জানতাম। তখন বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। এখন বলা যেতে পারে। দেশভাগের আগে থেকেই উপেন্দ্রনাথের মামাতো দাদা সারদাচরণ কাব্য-ব্যাকরণতীর্থ, ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় চাকরি করতেন। তখন আনন্দবাজারে সাধু বাংলার প্রচলন ছিল। উনি থাকতেন কোম্পানি বাগানের উল্টোদিকে, নতুন বাজারের কাছে একটা গলির ভিতরে, একটা মেসবাড়িতে। মেসে থাকলেও দুপুরবেলায় নিজে ‘স্বপাক’ খেতেন। মানে নিজে রান্না করে খেতেন। তাঁর ডিউটি ছিল রাত্রে। তখন ছাপার পদ্ধতি ছিল একেবারেই আলাদা। সময় সাপেক্ষ। দু-তিনবার প্রুফ দেখতে হত। রাত্রে উনি ফল, দুধ, ইত্যাদি খেয়ে কাজে যেতেন। উনিই উপেন্দ্রনাথকে মেসে নিয়ে এসেছিলেন, আনন্দবাজারের মালিক প্রফুল্ল সরকার উত্তর কলকাতায় থাকতেন। উনি হাটখোলার দত্তবাড়িতে খাতা দেখার চাকরিতে বহাল করে দেন। দত্তদের কলকাতায় অনেক সম্পত্তি ছিল। বাজার, বাড়ি ইত্যাদি। ম্যানেজার ছিল, ভাড়া আদায়ের লোক ছিল। উপেন্দ্রনাথ সম্ভবত হিসেবরক্ষক ধরনের কিছু ছিলেন। উনি ম্যাট্রিক পাশ তো বটেই, সম্ভবত আইএ পড়েছিলেন। কিছুদিন মেসে থেকে, দত্ত বাড়ির কর্মচারী, পরে ব্যাংকে চাকরি এবং আরও পরে দেশ থেকে পরিবার নিয়ে আসেন এবং ওরিয়েন্টাল স্কুলের পাশে, ভাড়া বাড়িটির সন্ধান দেন।
ঘড়ির নীচে গোলাপি ট্রামের টিকিট মানে ছিল ফার্স্ট ক্লাসে চড়ার অহংকার! পড়ুন: উল্টো দূরবিন পর্ব ২৪…
এই সারদাচরণ কাব্য-ব্যাকরণতীর্থ, সংক্ষেপে সারদা ঠাকুরকে দেখতাম— প্রতিদিন সন্ধ্যার সময়ে মেস থেকে চিৎপুরের দাদুর বাড়িতে আসতেন। দিদিমা ঘোমটা টেনে, পিড়িতে বসা ভাসুরঠাকুরকে পাথরের বাটিতে দুধ-খই, বেলের সময়ে বেলপানা, গ্রীষ্মকালে আম-কাঁঠাল, কখনও কলা-সাবু-নারকেল কোরা— এসব ফলার পরিবেশন করছেন। সারদা ঠাকুরের প্রসঙ্গে পরে আসব আবার। তখন দেখতাম, যে-কোনও নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণকেই ঠাকুর বলা হত। যেমন ছিলেন ব্রহ্মময় ঠাকুর (বিখ্যাত কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর বাবা), কামাখ্যা ঠাকুর, বৈকন্ঠ ঠাকুর, মোহিনীমোহন ঠাকুর প্রমুখ।
আমাদের আত্মীয়স্বজনরা সবাই চক্রবর্তী, তবে বিভিন্ন গোত্রের। কেন সবাই চক্রবর্তী, তার কারণ শুনেছিলাম। নোয়াখালির অন্তর্গত ভুলুয়া নামে এক পরগনা ছিল। সেখানকার রাজা উত্তরপ্রদেশ ও রাঢ় অঞ্চল থেকে কিছু বামুন ইমপোর্ট করেছিলেন। ওঁরা বিভিন্ন গোত্রের ছিলেন এবং সবাইকেই ‘রাজচক্রবর্তী’ উপাধি প্রদান করেছিলেন। সে-কারণেই আমাদের আত্মীয়গণ প্রায় সবাই চক্রবর্তী। অল্প কিছু ভট্টাচার্য দেখেছিলাম। অবিভক্ত বাংলায় বিবাহটিবাহ নোয়াখালি-কুমিল্লার মধ্যেই হত। ঢাকা, ফরিদপুর বা ময়মনসিংহর মতন জেলাগুলিকেও ‘বিদেশ’ মনে করা হত। আমি যখন ক্লাস এইট, আমার ছোটকাকুর বিয়ে হয়। তার আগে দাদুকে বলতে শুনেছি, কোনও আত্মীয় এলে বলছেন, ‘ভাল মাইয়ার সন্ধান আছেনি? দ্যাশের মধ্যে?’ হ্যাঁ, তখনও দেশ। দেশ কিন্তু ছাড়ে না। কোনও আত্মীয় এল, দাদুকে প্রণাম করল, দাদু চিনতে পারছে না।

কমবয়সি ছেলেটা মায়ের সঙ্গে ‘আরজিকর হাসপাতাল’-এ এসেছিল, এবার দুপুরের খাওয়াটা এখানেই সারবে। এটা কোনও আশ্চর্যের ব্যাপার ছিল না, এটাই রেওয়াজ ছিল। দাদুর সঙ্গে কথাবার্তার একটা নমুনা তুলে দিচ্ছি।
—কে তুমি?
—আমি নিখিল
—বাপের নাম কী?
—শ্রী যোগেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
—কোন যোগেন্দ্র? খিলপাড়ার যোগেন্দ্র না মাইজদিয়ার যোগেন্দ্র?
— খিলপাড়ার…
এই খিলপাড়া, মাজদিয়া— এসব হচ্ছে ফেলে আসা গ্রামের নাম। এই যোগেন্দ্ররা এখন থাকে হয়তো সোদপুর কিংবা গড়িয়ায়। কিন্তু শামুকের মতো বহন করে চলেছিল ফেলে আসা গ্রাম।
দাদুর এক বোনের কথা মনে পড়ে, নাম হেমাঙ্গিনী। উনি বিধবা ছিলেন, উনি নোয়াখালির ডায়লেক্টে কথা বলতেন না। ‘ঘটি কথা’ বলতেন। শুনেছিলাম, বিয়ের পরপরই পাটনা চলে যান স্বামীর সঙ্গে। পাটনাতেই কাটিয়েছেন। ওঁর স্বামী কী চাকরি করতেন মনে নেই। দমদম পার্কে থাকতেন একটা ভাড়া বাড়িতে। ভাইফোঁটার সময়ে একবার দাদুকে ফোটা দিতেন, আরও একবার কখনও। আমাদের বাড়িতে বিধবাদের জন্য আলাদা বালতি, উনুন, বাসনপত্র— সবই ছিল। কিন্তু ওই দিদিমার বেলায় ওসব দরকার হত না। একই উনুনের রান্না খেতেন; মাছটাছ খেতেন না, তবে মাছের ছোঁয়া লেগে গেলে আপত্তি ছিল না। উনি ছিলেন ব্যতিক্রম, একেবারেই অন্যান্য বিধবা আত্মীয়দের মতো নয়।
আমাদের আত্মীয়স্বজনরা সবাই চক্রবর্তী, তবে বিভিন্ন গোত্রের। কেন সবাই চক্রবর্তী, তার কারণ শুনেছিলাম। নোয়াখালির অন্তর্গত ভুলুয়া নামে এক পরগনা ছিল। সেখানকার রাজা উত্তরপ্রদেশ ও রাঢ় অঞ্চল থেকে কিছু বামুন ইমপোর্ট করেছিলেন। ওঁরা বিভিন্ন গোত্রের ছিলেন এবং সবাইকেই ‘রাজচক্রবর্তী’ উপাধি প্রদান করেছিলেন।
বিধবা আত্মীয়দের কথা মনে পড়ে গেল। সরলা ভইনডি! ঠাকুর্মার কোন বোন… খুব সুন্দরী দেখতে, পাতলা, স্লিম। সরলা ভইনডির ছেলে, কান্তি ঠাকুর। কুঞ্জ ভইনডি। উনিও খুব সুন্দরী ছিলেন। চপলা সুন্দরী নামে একজন ছিলেন, ঠাকুর্মার বেহাইন ছিলেন, দধি। একটু মোটাসোটা, গোলগাল। বড় পিসিমার শাশুড়ি। এঁরা এলে, আলাদা উনুনে রান্না হত। ওঁদের নিরামিষ রান্নার কী যে স্বাদ, ওঁদের রান্না থেকে কিছুটা আমাদের দেওয়া হত। কতসব মজাদার পদ। মটরডাল সেদ্ধ, নারকোল কোরা দিয়ে মেখে গোল্লা করা, কাঁঠালের বিচি সেদ্ধ করে, সরষের তেল, শুকনো লঙ্কা ভাজা দিয়ে মাখা। কচুবাটা, তিলবাটা, থানকুনি পাতা বাটা, গাঁদালি পাতা বাটা— এরকম কতকিছু বাটা। আর ছিল, পাতুরি। লতি, ঝিঙে, শাপলার ডগা, কলমির ডগা— এসব ছাড়াও, কত রকমের পাতুরিও খেয়েছি। কুমড়ো দিয়ে কী একটা পদ করতেন ওঁরা, বলতেন ‘কৌড়গা’। হ্যাঁ, কৌড়গাই তো। এটাই তো মনে আছে। মনে পড়িয়ে দেবে এমন কেউ নেই আর। পাতলা আমের টকের মধ্যে, ডালের বড়া ফেলে দিতেন ছোট-ছোট করে। এঁচোড়-মোচা-থোরের কথা নাই-বা বললাম। এগুলো তো কুলিন পদ। ফেলে দেওয়া অংশ, অংশ মানে যা কিছু ফেলে দেয়, সেইসব ফেলা জিনিসের খেলাঘর তৈরি করার কোনও জুড়ি ছিল না ওঁদের। যে-কোনও তরকারির খোসা, কুমড়োর মাঝখানের অংশ — যাকে বলে বুকা, বাজারে চেঁছে ফেলে দেয়, ওই দিয়ে ঐশ্বর্যময় সুখাদ্য বানাতেন। এইসব ঠাকুর্মা-দিদিমাদের স্মৃতি যেন, অনন্ত কুয়োর জলে চাঁদ পড়ে থাকা। মনের গভীরে থরথরো কাঁপে কেবল। আকাশপ্রদীপ হয়ে ওঁদের স্মৃতির পানে চেয়ে থাকি এই বয়সে এসে।

এইসব বিধবাদের মধ্যে আমার ঠাকুর্মা সধবা। পান খেতেন। বৃহস্পতিবার আলতা পরতেন। কিন্তু বিধবা বোনেরা এলে, আলতা পরতেন না। ওঁরা গল্প করতেন, নোয়াখালি জেলার মেয়েলি ভাষায়। গল্প করার সময়ে ওঁরা কিশোরী হয়ে যেতেন। একজন অন্যজনের গায়ে ঠেলা দিতেন, কিংবা কনুই দিয়ে গুঁতো দিতেন। ওঁরা সম্মোধনে ‘লো’ কিংবা ‘লা’ শব্দ উচ্চারণ করতেন। যেমন ‘কী লা কুঞ্জ, ওরে সরসী! শুনলো তোরে কই…’ রাঢ় অঞ্চলেও ‘লো’-এর ব্যবহার ছিল। গান আছে, ‘বড়লোকের বিটি লো লম্বা-লম্বা চুল।’ ওদের কথার মধ্যে পারস্পরিক মুখ খারাপ ছিল। যেমন, ‘ঢ-অ-অ-ং কোমড়া মুখ পুইড়গা’, ‘ব্যাদ্দপ’, ‘ব্যাতুরিবেত’, ‘বে আইক্যাইল্লা’ ইত্যাদি। এখন একটু ব্যাখ্যার প্রয়োজন। এই কথাগুলি পূর্ববাংলার শ্লীল গালাগালি।
‘ব্যাদ্দপ’ আরবি ‘বেয়াদব’ থেকে এসেছে, ‘বে তরিবত’> ‘ব্যাতুরিবেত’, ‘বে আক্কেল’> ‘বে আইক্যাইল্লা’। পুরুষরা যে-সব গালাগালি দিতেন, তার মধ্যে একটা হলো কুষ্মাণ্ড। পুরুষদের কুষ্মাণ্ড ওদের মুখে হয়ে গিয়েছিল কোমড়া। ঠাকুর্মার কেমন যেন এক দিদি, হাসলে দুই অলৌকিক গোলাপি মাড়ির ভিতর থেকে, আহ্লাদের আলো ঠিকরে আসত। হাসতে-হাসতেই বলেছিলেন— ‘স্বামী কী জানি না’। হাসতে-হাসতে বলেছিলেন, “শ্বশুরবাড়িতে সাজনের ডাঁটা টুকরো করে, ডালবাটা মধ্যে ঢুকিয়ে, বড়া করে ঝোল বানিয়ে দিয়ে বলা হত— ‘এইটা তোর মাছের ঝোল। ভিতরে ডাঁটাগুলোর আঁশ, ওগুলোকেই মাছের কাঁটা ভাবতাম।’
আমার মায়ের নিজের মা ছিল না, মাতৃহারা হয়েছিলেন শৈশবে। আমার মা তখন দাদামশায়ের আরেক-ভাই, মানে মায়ের কাকার বাড়িতে বড় হন। আমার দাদামশাই আবার বিয়ে করেন, উনি মায়ের সৎ মা। মায়ের বাবাকেও দেখেছি, সে-সময়ের পূর্বপাকিস্তান থেকে আসতেন, আমাদের জন্য আমসত্ত্ব আনতেন। হাতে গোটানো সেই আমসত্ত্বে, পাটির ছাপ। আসলে শীতলপাটির উপরে আমের রস ঢেলে, রোদ্দুরে শুকিয়ে আমসত্ত্ব করা হত। আমসত্ত্বের গায়ে পাটির ছাপ লেগে থাকত। আমার মা, আমসত্ত্বের পাটির ছাপের গায়ে হাত বুলাতেন। যেন ফেলে আসা উঠোন। কার গায়ে হাত বুলাচ্ছেন, সেই তুলসিমঞ্চ, ধান সেদ্ধ করার উনুনম আতা গাছে বসা তোতা পাখি, নিম গাছের ঝিরিঝিরি ছায়া সমেত উঠোনটায়।
আরও সব কত, অর্চনা ছিল আমার বয়সি। খুব সুন্দরী। আগে যে কানাই জামাইয়ের কথা বলছিলাম, তাঁর মেয়ে। তিন মেয়ে। কল্পনা, অর্চনা, মণি। এক ছেলে সবার বড়, সুধাংশু। ভবানীপুরে থাকত ওরা। চন্দ্রনাথ চ্যাটার্জি স্ট্রিট। ওদের বাড়িতে গিয়েছি অনেকবার। প্রধানত অর্চনার টানেই। একটা পুরনো বাড়ি, ইঁটগুলো দাঁত খিঁচিয়ে আছে। একটা জংপড়া লোহার দরজা দিয়ে ভেতরে ঢোকার পর, একদিকে সারসার ঘর, তারপর উঠোন; উঠোনে একটা পাতকুয়ো, একটা চৌবাচ্চা। চৌবাচ্চার পাশ দিয়ে একটা ঘর, ওই ঘরের ভিতর দিয়ে আরেকটা ঘর, পিছনে একটু ফাঁকা জায়গা, ওখানে বেশ ক’টা গাছ। কাঠবিড়ালি। বাঙালরা পারত বটে, ঠিক খুঁজে নিয়েছিল। নিশ্চয়ই কোনও এক বড় লোকের বাড়ি ছিল এটা। বছর পাঁচেক আগে একবার খুঁজে বাড়িটার অবস্থান বের করার চেষ্টা করেছিলাম, পাইনি। সেই সুধাংশুদা সাইকেল চালিয়ে, ভবানীপুর থেকে বাগবাজারের গ্যালিফ স্ট্রিটের বাড়িতে আসত। শৈশবে সুধাংশুদা এলে, আমার খুব পুলক হত। কারণ, সাইকেলের রডে বসিয়ে আমাকে সাইকেল চড়াত।
আরও কত আত্মীয়দের মুখ ভেসে আসছে, সবার নাম মনে পড়ে না। ও! অসীম, আর অসীমের মা-বাবা-বোন… পুরো পরিবার। অসীমের মায়ের নাম ছিল প্রিয়বালা। দাদুর কোন ভাইয়ের মেয়ে। মানে আমার পিসি, তার ছেলে অসীম। অসীমের বাবা কাজ করত, কেভেন্টার কোম্পানির ডেয়ারিতে। ডেয়ারিটা ছিল নীলগঞ্জে। বারাকপুর আর বারাসাতের মাঝখানে নীলগঞ্জ। এখন তো দেখি পুরো শহরে মোমো, কেক, পেস্ট্রি বিউটিপার্লার-সহ টাইল্স বসানো মসজিদ, মোবাইলের দোকান… তখন ছিল পুরো গ্রাম। ওদের ওখানে দু’তিনবার গিয়েছিলাম অসীমের সঙ্গে। এই অসীম আমাদের সংসারে এসে থেকেছিল বছর দু’য়েক। কেন কে জানে… সে-সময়ে কারণ জানার বয়স হয়নি। বোধ হয় নীলগঞ্জে ভাল ইস্কুল ছিল না, অসীমের বাবা বোধহয় মাইনেপত্র বেশি পেতেন না, অসীমের মা বলেছিল— ওকে রাখতে, স্কুলে ভরতি করে দিতে। এই অসীমকে আমি ‘চতুষ্পাঠী’ উপন্যাসে একটা বড় চরিত্র দিয়েছিলাম। বিলুর দাদুর চতুষ্পাঠীতে পড়তে আসা গুরুগৃহের ছাত্র। পুরোটাই কাল্পনিক। আমার দাদুর কোনও চতুষ্পাটি ছিল না, আর অসীমকে ভর্তি করা হয়েছিল— কর্পোরেশন স্কুলে। কারণ ওখানে মাইনে লাগত না। আমার কাশিমবাজার স্কুলে তিন টাকা মাইনে ছিল। অসীমের স্কুল ছিল সকালে। সারাদিন থাকত। এতজন লোকে ওই ১২ নম্বর গ্যালিফ স্ট্রিটের বাসায়। আবার একজন জুটল, একেবারে যেন দাদুর দস্তানা। মাঝে-মাঝে ছেলেকে দেখতে সপরিবারে আসত প্রিয়বালা, প্রিয়বালার স্বামী, মানে অসীমের বাবা, অসীমের বোন বাসনা। অসীমকে দেখতে আসা মানে, খেয়ে যাওয়া। হয়তো এক রাত থেকে যাওয়া, কী করে যে এত লোকের স্থান সংকুলান হতে পারত, সেটা এক বিরাট রহস্য। কখনও অসীমের বাবা একাই আসত। ওদের উপাধি রায়চৌধুরী, একসময়ে নাকি জমিদারি ছিল। বলতেন, ‘দশঘর গোয়ালা প্রজা ছিল। এখন আমি গোয়ালঘরে কাজ করি…’ অসীমের বাবার নামটা এখন অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারছি না। জিজ্ঞাসা করে জানব, এমন কেউ বেঁচে নেই। অসীম কোথায় আছে, কেমন আছে— কিচ্ছু জানি না। অসীমের বাবা ওঁর সন্তানকে দেখতে আসতেন সকালেই। লরি করে আসতেন। কারণ সকালবেলা নীলগঞ্জের ডেয়ারি থেকে দুধের ক্যানভর্তি লরি আসত পাইকপাড়ার কারখানায়। ওই কারখানায় দুধকে নানা কায়দা করা হত। পরে জেনেছি, পাস্তুরাইজেশন। বোতলে ভরা হত। কিছু দুধ থেকে মাখন বের করে নেওয়া হত। ক্যাভেন্টারের মাখনও বেশ ভাল ছিল। সকালে আসা মানেই দুপুরে ভাত খেয়ে যাওয়া। উনি খেতে বসলেই, মা-ঠাকুর্মা-পিসিমারা মুখ টিপে হাসতেন। কেন হাসতেন? খাওয়ার ধরনটা ছোট করে বললেই বোঝা যাবে।



