সংবাদ মূলত কাব্য : পর্ব ৪০

ছবি বিভ্রাট

‘যুগান্তর’-এ আমি যোগ দেওয়ার মাসকয়েক পর একে-একে শিক্ষানবিশ সাংবাদিক পদে যোগ দিল সতীনাথ চট্টোপাধ‍্যায়, গৌতম রায়, তন্ময় ভট্টাচার্য ও জয়ন্ত সিংহ। সতীনাথদা আমার থেকে বছরতিনেকের বড় ছিলেন, বাকিরা সমবয়সি। সতীনাথদা আমার চেয়ে বছরতিনেকের বড় ছিলেন, তাঁকে চিনতাম, সতীনাথদা ও তাঁর স্ত্রী সুনেত্রা ঘটককে আগে থেকেই চিনতাম, দু-জনেই ‘পরিবর্তন’ পত্রিকায় এবং অন‍্যত্র চলচ্চিত্র-সংক্রান্ত লেখালিখি করতেন। তখনও ‘যুগান্তর’, ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’-র ওপর অবসানের ছায়াটি পড়েনি, আটের দশকের গোড়ার দিক তখন, শহরতলি ও মফসসল বাংলায় ‘যুগান্তর’-এর কদর ছিল। তখন সবে ১৯৮১ সালে ‘আজকাল’ ও ১৯৮৪ সালে ‘বর্তমান’ সংবাদপত্র দু’টি বের হয়েছে। ‘বসুমতী’ পত্রিকাটির সংকট কাটাতে ওই সময় পশ্চিমবঙ্গ সরকার পত্রিকাটি অধিগ্রহণ করেছিল। এছাড়াও ছিল ‘সত‍্যযুগ’ পত্রিকা। ‘যুগান্তর’-এ আমাদের মতো একঝাঁক অল্পবয়সিদের নেওয়া হয়েছিল পরিকল্পনা অনুযায়ী, মাঝে-মাঝেই তা টের পেতাম। আমরা ছিলাম যেন একটা শিক্ষালয়ে।

সতীনাথদা আমার পরই ‘যুগান্তর’-এ যোগ দিয়েছিলেন, পূর্বপরিচিত, মানিকজোড় বন্ধুত্ব ছিল আমাদের। সমবয়সিদের সঙ্গেও খুবই বন্ধুত্ব হয়েছি। সতীনাথদার স্ত্রী সুনেত্রা ছিলেন ‌মণীশ ঘটক, ঋত্বিক ঘটক, মহাশ্বেতা দেবীর পরিবারের। দক্ষিণ কলকাতার প্রান্তিক অঞ্চলে কোথায় যেন থাকতেন।সতীনাথদারা। দু-তিনবার সেই বাড়িতে গিয়েছি। ওদের ছেলে তখন ছোট, বছরতিনেকের। তার নাম বাবান। বাবানের সঙ্গে একটু ব‍্যাট-বল ঠুকঠুক করে, ওই ব‍্যাটেই লিখে দিয়েছিলাম:


এত ফর্সা বাবান
স্নানে লাগে না সাবান।

আবার একবার অফিসে ঝুলি থেকে একতাড়া ছবি বার করে দেখিয়েছিলেন সতীনাথদা, ছেলের ছবি। বাড়িতে পাখিওলা এসেছে খাঁচায় ভরা হরেক পাখি নিয়ে, সবিস্ময়ে দেখছে বাবান, তার ভাল নাম পরমব্রত। একটা ছবির পিছনে আমি লিখে দিলাম:


অবাক হয়ে পরমব্রত
খাঁচায় দেখে পক্ষী কত!

অকালপ্রয়াত সতীনাথদা। তাঁর মৃত‍্যুর কয়েক বছর পর সুনেত্রাও মারা গেছেন। পরমব্রত এখন চলচ্চিত্র নায়ক। কত তার জনপ্রিয়তা!

বাবা সতীনাথ চট্টোপাধ্যায় ও মা সুনেত্রা ঘটকের সঙ্গে শৈশবের পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়

বাংলায় জঙ্গলের রাজত্ব, ইন্দিরা গান্ধীর বিতর্কিত মন্তব্য উঠে এসেছিল আমার খবরে! পড়ুন ‘সংবাদ মূলত কাব্য’ পর্ব ৪০…

‘যুগান্তর’-‘অমৃতবাজার পত্রিকা’-র রিপোর্টিংয়েও ছিলেন আমাদের সমবয়সি কয়েকজন, যাদের সঙ্গে সখ‍্য ছিল আমার। সঞ্জয় শিকদার, দীপঙ্কর মুখার্জি, গৌতম পাল, অমৃতবাজারের রিপোর্টার মার্কাস দাম, অনেকের কথা মনে পড়ে।
আমরা সমবয়সিরা ছাড়াও ‘যুগান্তর’-এ আমাদের চেয়ে একদশকের মতো বড় কয়েকজন ছিলেন, নন্দগোপাল রায়, শ‍্যামল দে, তপন বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়, সুজয় বিশ্বাস… বয়সের নৈকট‍্যে এইসব অগ্রজের স্নেহসিক্ত বন্ধুত্ব পেয়েছি। তপনদা একবার তাঁর শিশুপুত্রটিকে কোলে নিয়ে অফিসে এসেছিলেন, চোখে কাজল টানা। আমিও তাকে কোলে নিয়েছিলাম। সে এখন খ‍্যাতনামা কবি, শ্রীজাত। ‘উড়ন্ত সব জোকার’ তাঁর কাব‍্যগ্রন্থ।

যুগান্তর-অমৃতবাজার পত্রিকা-য় আমাদের যেতে হত বিকেলবেলা। তিনটের পর। রাত সাড়ে ন’টার পর বাড়ি ফিরতাম। তবে মাসে একটি সপ্তাহ রাতের ডিউটিতে যেতে হত। রাত ন’টায় পৌঁছে ভোরবেলা ফেরা। রাতের ডিউটিতে একজন চিফ সাব এডিটর থাকতেন আরও তিন-চারজন সাব এডিটর নিয়ে, যাদের ভেতর আমাদের মতো অল্পবয়সি একজন থাকতাম। নন্দদা, নন্দগোপাল রায় তখন সদ‍্যই পদোন্নতি পেয়ে চিফ সাব হয়েছেন। আমি ছিলাম তাঁর টিমে, আর ছিলেন শ‍্যামল দে, সুজয় বিশ্বাস, কাজল মিত্র, তাঁরা তখন সাব এডিটর। অমিতদা, দেবুদা (তখন নিউজ এডিটর) আমাকে বলে দিয়েছিলেন, খবরের কাগজে নাইট ডিউটি মানে পাহারা দেওয়ার কাজ। যদি কোনও বড় বা গুরুত্বপূর্ণ খবর আসে, তা কাগজে ধরিয়ে দেওয়া। প্রয়োজনে প্রথম পাতায় কোনও খবর সরিয়ে দিয়ে, বা কাটছাঁট করে ওই খবর ধরিয়ে দেওয়া। এজন‍্য নাইটডিউটি ছিল গভীর নজরদারির। দু-জন রিপোর্টারও থাকতেন নাইট ডিউটিতে। এমনিতে বিকেল থেকে রাত ন’টা, সাড়ে ন’টা পর্যন্ত যাঁরা থাকতেন, তাঁরা, সেই সঙ্গে জয়েন্ট এডিটর, নিউজ এডিটর ও অন‍্যান‍্য সিনিয়ররা পরের সকালের সম্পূর্ণ কাগজটি করে প্রিন্ট অর্ডার দিয়ে যখন চলে যেতেন, তখন আমরা নাইট ডিউটির লোকজনেরা ঢুকতাম। লিখছি, আর এই বয়সে মন টগবগ করছে। অমিতদা, দেবুদা, বড়রা আমাকে বলেছিলেন, নাইটডিউটির চিফ সাব এডিটর হলেন অপরিসীম ক্ষমতার, সুপ্রিম এডিটর, তিনি তৈরি হওয়া সম্পূর্ণ পত্রিকাটি ফেলে দিয়ে নতুন করে আবার কাগজ সাজাতে পারেন। মাঝরাত্তিরে প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি মারা গেলে কী করবে? আগের কাগজ ফেলে দেবে! প্রেসে স্টপ প্রেস বার্তা পাঠাবে, নতুন করে কাগজ সাজাবে।— অমিতদা, দেবুদা আমাকে বলতেন। সবক’টি সংবাদপত্র অফিসে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, নেতা, শিক্ষা, শিল্প-সাহিত‍্য-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্টজনদের জীবনী ও আনুষঙ্গিক তথ‍্য লেখা (এযুগে কম্পোজ) হয়ে আছে।

তিয়েন আন মেন স্কোয়ার

ধরো, রাতদুপুরে একট খবর এল। প্রথম পাতায় দিতেই হবে। কিন্তু প্রথম পাতার কোনও খবর সরানো যাবে না। কী করবে তুমি?— অমিতদা জিজ্ঞেস করেছিলেন আমাকে। ‘যুগান্তর’ লেখা মাস্টহেডটি ডানদিকে বা বাঁ-দিকে সরিয়ে জায়গা করে নেব, মাঝে-মাঝে যেমন হয় আমাদের— বললাম আমি।

অমিত-দেবুদা একযোগে মুচকি হেসে বললেন, মাস্টহেড আজকে সরানো যাবে না। ভারী খবর।

‘তাহলে, তাহলে’, ডামির দিকে নজর করে আমি বললাম, ‘প্রথম পাতার তিন কলাম ছবিটা আমি ফেলে দেব। সেখানে বসবে খবরটা।’

আমাদের দিকে মুখোমুখি বসা প্রথম ডেস্কের বয়স্করা খুশি হলেন। যেন ঝলমল হাওয়া খেলে গেল একটা। চিফ ডিজাইনার শ‍্যামদুলাল কুণ্ডু সকলকে লুকিয়ে পাঞ্জাবির পকেট থেকে তাঁর সোনালি কেস বের করে একটা কিংসাইজ সিগারেট দিলেন আমাকে। বাগবাজারের সাবেকি বাড়ির ব‍্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ধূমপান করলাম।

একরাতে এপি-র খবর এল, পিকিংয়ে( বেজিং) তিয়েন আন মেন স্কোয়ারে বিক্ষোভরত ছাত্রছাত্রীদের জমায়েতে চিনা পুলিশ গুলি চালিয়ে দিয়েছে। বহু হতাহত। স্টপ প্রেসের বদলে রানিং চেঞ্জের বার্তা পাঠালেন নন্দদা ছাপাখানায়। আমার কথায় সম্মত হয়ে নন্দদা প্রথম পাতার চার কলামের ছবিকে কমিয়ে তিন কলাম করে, এক কলামে ছাপলেন তিয়েন আন মেন স্কোয়ারের ছাত্র বিক্ষোভের খবর।

চমকপ্রদ ঘটনা ঘটেছিল ‘যুগান্তর’-এ বাগবাজারের বাড়িতে একবার নাইটডিউটিতে। রাত ন’টায় অফিসে পৌঁছনোর পর পৌনে ১০টা নাগাদ খবর আসে কাঠমাণ্ডু থেকে দিল্লিগামী এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বিমান খালিস্তানি জঙ্গিরা লাহোরে নিয়ে গিয়েছে। কিছুক্ষণের মধ‍্যে এয়ার ইন্ডিয়া ওই বিমান ও পাইলটের ছবি পাঠিয়ে দেয়। প্রথম পাতার খবর সরিয়ে, কাটছাঁট করে আমরা ছবি-সহ এয়ার ইন্ডিয়া-র বিমান ছিনতাইয়ের খবরটি কাগজে সাজিয়ে ফেলি। প্রিন্ট অর্ডার দিতে যাব, তখনই খবর আসে তৎকালে সদ‍্য চালু হওয়া এক লটারির এক কোটি টাকার প্রথম পুরস্কারটি সিঁথির মোড়ে একটি সেলুনের নরসুন্দর তরুণ পেয়েছেন। তাঁর ছবিও এসে যায়। আমরা বিপুল দৌড়ঝাঁপ করে লটারি জেতা নরসুন্দরের খবরটিও প্রথম পাতায় ছবিসহ দিয়ে দিতে সক্ষম হই। মুদ্রণশালায় প্রিন্ট অর্ডারও চলে যায়।

আদালতে অপরাধীরা আত্মসমর্পণ করলে যেমনটি দেখায়, রাতে সেই ভঙ্গিতে আমরা নাইটডিউটিতে হাজির হলাম। কেউ কিচ্ছুটি বললেন না, শুধু দেবুদা বললেন, নন্দ, তোমার একটা চিঠি আছে। ব্রাউন পেপারের খামটি তখনই খুললেন না নন্দদা। ফোলিও ব‍্যাগে রেখে দিলেন। সবাই চলে গেলে চিঠিটা খুলে রাতে আমাদের দেখালেন নন্দদা, শো-কজ লেটার।

নন্দদা, শ‍্যামলদা বাগবাজারের অলিগলিতে থাকতেন। সুজয়দা বরানগর, কাজলদা পাইকপাড়া। ওরা চলে গিয়েছিলেন। আমরা যারা অফিসে থাকতাম তাদের নামে-নামে ছিল বিছানা। ঘুমিয়ে পরদিন ভোরে হাওড়ার বাস ধরতে শ‍্যামবাজার যাচ্ছি, বাগবাজারের চায়ের দোকান থেকে যুগান্তর পাঠরত কতিপয় তরুণ কণ্ঠস্বর ভেসে এল: দেখেছিস পাইলটকে জঙ্গিগুলো মেরে লাট করে দিয়েছে দেখেছিস, ড্রেস খুলিয়ে গেঞ্জি পরিয়ে রেখেছে! আর দ‍্যাখ, সিঁথির নাপিত, লটারি জিতেই সাফারি চাপিয়েছে! তাঁদের কথাবার্তায় অসংসদীয় কয়েকটি শব্দ ছিল। তা তো আর লেখা যায় না। তখনও সিসের প্লেট তৈরি হত ছাপার ক্ষেত্রে। ছবি ব্লক হয়ে বসত। তাতেই পাইলটের ছবি নরসুন্দরের ছবি অদলবদল হয়ে গিয়েছিল!

আদালতে অপরাধীরা আত্মসমর্পণ করলে যেমনটি দেখায়, রাতে সেই ভঙ্গিতে আমরা নাইটডিউটিতে হাজির হলাম। কেউ কিচ্ছুটি বললেন না, শুধু দেবুদা বললেন, নন্দ, তোমার একটা চিঠি আছে। ব্রাউন পেপারের খামটি তখনই খুললেন না নন্দদা। ফোলিও ব‍্যাগে রেখে দিলেন। সবাই চলে গেলে চিঠিটা খুলে রাতে আমাদের দেখালেন নন্দদা, শো-কজ লেটার।

সাবেকি সাহেবিয়ানা ছিল যুগান্তর-অমৃতবাজারের। সাতদিনের ভেতর নন্দদা জবাব পাঠাল, স‍রি। উই আর অল স‍রি। ডিপলি স‍রি।