আত্মীয়-স্বজনেরা
কত যে আত্মীয়-স্বজন ছিল আমাদের! কী করে যেন আজও আমার মুখগুলি মনে পড়ে। ছয়ের দশক। আমি শিশু থেকে বালক, ক্রমশ কিশোর হচ্ছি। তখন অতিথি এলে খাবারের প্লেট দিলে, হ্যাংলার মতো দাঁড়িয়ে থাকি না। আরও ছোট অবস্থায় দাঁড়াতাম, দাঁড়ালে প্লেটের দানাদারটা বা চমচমের অর্ধেকটা আমাকে দিত। সব আত্মীয়দের কিন্তু এরকম প্লেট দেওয়া হত না। যাঁরা সম্পর্কিত জামাই, বা বাড়ির কোনও মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোক, তাঁদের ছিল বিশেষ খাতির। যেমন একজন জামাই ছিল, কানাই। বাবার মামাতো বোনের স্বামী, মানে ঠাকুর্মার মেজদার মেয়ের জামাই। ঠাকুরমার মেজদার নাম বৈকুণ্ঠ স্মৃতিতীর্থ। গুপ্তপ্রেসের পঞ্জিকার অনুমোদক মণ্ডলীর তালিকায় বেশ কিছু পণ্ডিত থাকতেন, বৈকুন্ঠ স্মৃতিতীর্থের নামও থাকত।
আমি ওঁকে ‘পাকিস্তানি দাদু’ ডাকতাম। কারণ, দেশভাগের পরও উনি অনেকদিন পূর্ব পাকিস্তানে থাকতেন। ওই পাকিস্তানি দাদুর বড় ছেলের নাম, বীরেশ্বর। এই বীরেশ্বরকে আমার মেজ পিসেমশাই, তার কালির কোম্পানিতে সেলসম্যানের চাকরি করে দিয়েছিলেন। ধুতি পরা সেলসম্যান এই বীরেশ্বরকাকুকে, আমি গোবিন্দকাকু ডাকতাম; কারণ এই কাকু আমাকে ছোটবেলায় গোবিন্দ বলে ডাকতেন।
ল্যাম্পপোস্টকে জড়িয়ে উত্তমকুমার-অঞ্জনা ভৌমিকের সংলাপ প্র্যাকটিস করা হত!
পড়ুন: ‘উল্টো দূরবিন’ পর্ব ২৩…
যখন ‘উইমকো’ কোম্পানিতে দেশলাই বেচার চাকরিতে ‘আঢ়া’ শহরের একটা বেচুবাবুদের গেস্ট হাউসে আছি, এক ভোরবেলা সেই গোবিন্দকাকু, হাতে কচুরি-জিলিপির চুবড়ি নিয়ে, ‘আমার গোবিন্দ কই…’ বলতে-বলতে হাজির। জিজ্ঞাসা করি, ‘আমি এখানে তুমি জানলে কী করে?’ গোবিন্দকাকু বলল, ‘এই লাইনে বিশ বছর আছি…’
গোবিন্দকাকুর বোন সুশীলা। সুশীলার স্বামী কানাই চক্রবর্তী। তা হলে কানাইবাবু আমাদের বাড়ির জামাই তো। ধুতি পরে আসতেন, ফুলশার্ট। হেমন্ত-দ্বিজেন-রা যেমন। ধুতির কোঁচাটা জামার পকেটে গোঁজা। কবজিতে রিস্ট ওয়াচ, ওয়াচের তলায় শোভা পাচ্ছে, গোলাপি রঙের টিকিট। ট্রামের ফার্স্টক্লাসের টিকিটের রঙ গোলাপি। ঘড়ির তলায় টিকিটটা গুঁজে রাখার গুঢ় অর্থ হল, ‘দেখো আমি ফার্স্টক্লাসে চড়ে এসেছি।’
কানাই জামাই ঘরে এসে, চৌকি বা তক্তাপোশে বসতেন না। এদিক-ওদিক তাকাতেন চেয়ারের জন্য। আমাদের দুটো চেয়ার ছিল, একটা কাঠের আর-একটা লোহার। ও-রকম লোহার চেয়ার আর কোথাও কখনও দেখিনি। চেয়ারের উপরে অনেক সময়ে বালিশ-জামা কাপড় বা এটা-ওটা থাকত। ওটা কেউ এসে পরিষ্কার করে দিলে, উনি উপবিষ্ট হতেন। আর-একজন জামাই, বাবার কীরকম যেন বোনের স্বামী। নাম, গদাধর। উনি খুব ইংরেজি কথা বলতেন। সাহেবি কোম্পানিতে চাকরি করতেন। ফুলপ্যান্টে শার্ট গোঁজা। একবার বড়দিনের আগে কেক এনেছিলেন। ওঁর মুখেই প্রথম ‘মেরি ক্রিস্টমাস’ কথাটা শুনি।
হরেন ঠাকুর নামে একজন আসতেন। দাদুর পিসতুতো ভাই, সুতরাং ঠাকুর্মার সঙ্গে দেবর-বউদির সম্পর্ক। বউদির কাছে আবদার করাই যেতে পারে। ঠাকুর্মার কাছে হাতের পাঁচ আঙুলগুলো বেঁকিয়ে, গোলাপৃতি করে নাচিয়ে বলতেন, ‘ঠারিন, এইটা হইবনি?’ হাসতেন, হাসলে মাড়িতে লেগে থাকা তিনটি মাত্র দাঁত ইলিক-ঝিলিক করত। উনি বোঝাতে চাইতেন, ডিম খাবেন। বামুনবাড়ি, দাদুর বয়সিরা কেউ ডিম খেতেন না। মহিলারা খেত, আমরাও খেতাম, কাকা-পিসিরাও খেত। মুরগির ডিমের প্রশ্নই নেই, হাঁসের ডিম। তাও সুতো দিয়ে নিপুণ ভাগে দু’ভাগ করা। এক-অর্ধেক করে জুটত। আমরা যারা ছোট ছিলাম, তাদের জন্য এক-অর্ধেকের আবার অর্ধেকও হত; মানে, একটা ডিমের চারভাগের একভাগ।
এই ডিম প্রসঙ্গে একটা স্মৃতি মনে এল। আমরা পাঁচজন গোল হয়ে বসেছি। আমার দুই বোন, এক পিসতুতো বোন, আমি আর আমার পিসতুতো ভাই। সকালবেলার জলযোগে আলুসেদ্ধ দিয়ে ভাত মাখা হয়েছে। ঠাকুর্মা মাখা ভাতের গোলা পাকিয়েছেন। আরও যখন ছোট ছিলাম, ঠাকুর্মা এই গোলাগুলি হাতে নিয়ে নাচিয়ে বলতেন, ‘কে খায় কে খায়… বকের ডিম কে খায় কে খায়… কাকের ডিম কে খায় কে খায়… হাঁসের ডিম…’ এই যে শিশু মন, দু’জন ছেলে শিশু, তিনজন মেয়ে শিশু, থালায় একটা হাঁসের ডিম দু’ভাগ করা। তার মানে, একটা ডিম পাঁচজনে খাবে। ঠাকুর্মার হাতে ভাতের গোল্লা ডিম ছুঁত। ডিমের মাঝখানে আলো করে বসে আছে, সোনা-রঙ কুসুম। ঠাকুর্মার হাত ওই ডিম ছুঁত, কুসুম ছুঁত। যেহেতু ভাই-বোনের মধ্যে আমিই সবচেয়ে বড়, আমি ঠিক খেয়াল করতাম— ঠাকুর্মার হাত মেয়েদের বেলায় শুধু কুসুম স্পর্শ করেই, হাঁ মুখে চলে যাচ্ছে। আর ছেলে দু’জনের বেলায়, কুসুম ভাঙছে। মানে, ঠাকুর্মা মেয়ে সন্তানদের তুলনায় ছেলে সন্তানদের বেশি খাতির করছেন। নাতনিদের চেয়ে নাতিদের খাতির বেশি! এটা তো সবসময়েই দেখেছি। মাছের লেজাটা, ছোট টুকরোগুলো সব মেয়েদের। টানাটানির সংসার হলেও, আম আসত ঝুড়ি ভরা, পচা-টচা দাগি আমগুলো মেয়েদের।

যাক গে, হরেন ঠাকুরের কথা হচ্ছিল। তখন আত্মীয়-স্বজন বাড়িতে এলে, দু’এক রাত্তির থেকেই যেত। খেতে বসা হত পিঁড়ি পেতে। দাদু সঙ্গে খেতে বসতেন। তখন তো ডিম দেওয়া যায় না, কোনও এক সময়ে আড়ালে একটা ছোট কাঁসার বাটি এনে ঠাকুর্মা তাঁর দেবরের হাতে…
ঠাকুর্মার ছোট ভাইয়ের নাম ছিল উপেন্দ্রনাথ। চিৎপুর রোডে ‘ওরিয়েন্টাল সেমিনারি’ স্কুলের ঠিক পাশের বাড়িতে থাকতেন। আমরা ডাকতাম, ‘চিৎপুরের দাদু’, লম্বা মানুষ, ধুতি এবং ফুলশার্ট পরতেন। উনি ‘পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক’-এ চাকরি করতেন, আমাদের বাড়িতে প্রায়ই আসতেন। আমার দাদু এবং বাবার সঙ্গে খুব ভাব ছিল। আমার বাবার মামা হন, বাবা ডাকতেন, ‘দুদুমামা’। কেন ‘দুদুমামা’, সেটা বলতে পারব না। এই ‘দুদুমামা’ হচ্ছেন, ‘পাকিস্তানি দাদু’র ছোট ভাই। মেজভাই চাঁদপাড়া নামের একটা গ্রামে থাকতেন। চাঁদপাড়া নিয়ে অনেক কথা আছে। চিৎপুরের দাদু অনেক মজার-মজার কথা বলতেন। যেমন জিজ্ঞাসা করতেন, ‘একটা শেয়ালের পাচ-পাচ লেজ, পাঁচটা শিয়ালের কটা লেজ?’ আমরা কেউ বলতাম, ‘২৫-টা’, কেউ বলতাম, ‘পাঁচটা লেজ হয় নাকি?’ দাদু হেসে বলতেন, ‘পাচ-পাচ নয়, পাছ-পাছ। পিছনে পিছনে।’ এরকম অনেক ছিল। ‘যত কাটে, তত বাড়ে। কী কও দেখি?’ কেউ বলতে পারতাম না। দাদু বলতেন, ‘গর্ত’। বলতেন, ‘টাকা ডবল করে দেব দেখবি?’ দাদু আয়নার সামনে একটা টাকার নোট ধরতেন, বলতেন ‘ওই তো ডবল হয়ে গেছে…’— এইরকম সব।
চিৎপুরের দাদুর বাড়িতে আমি প্রায়ই যেতাম। কখনও দাদুর সঙ্গে হাঁটতে-হাঁটতে। ঠাকুর্মা এতটা পথ হাঁটতে পারত না। বাগবাজার ট্রাম ডিপো থেকে সাত নম্বর বা আট নম্বর ট্রামে করে চলে যেতাম। ট্রামের কন্ডাক্টরদের একটা বেশ খাকি রঙের পোশাক ছিল। ট্রামে মাঝে-মাঝেই চেকার উঠত। চেকারদের দেখতে খুব ভাল লাগত। মাথায় টুপি থাকত। ট্রাম কোম্পানি ছিল ব্রিটিশ কোম্পানির। যুক্তফ্রন্টের আমলে, ট্রাম কোম্পানি সরকারি হয়ে যায়, আর ওই সব আদব-কায়দা চলে যায়। গরানহাটা স্টপেজে নামতাম। কন্ডাক্টর সাহেব ট্রামের দড়ি ধরে তিনবার টানতেন, ড্রাইভারের কেবিনে তিনবার ঘণ্টি বাজত। মানে, ‘সাবধান! তিনবার মানে বয়স্ক, কিম্বা রোগী বা শিশু নামছে মহিলা-সহ।’
চিৎপুরের দাদুর বাড়ির একদিকে ওরিয়েন্টাল স্কুলের দেওয়াল। স্কুলের ঘণ্টা শোনা যেত, টিফিনবেলার কোলাহলও শোনা যেত। ওদের বাড়ির বারান্দায় দাঁড়ালে চিৎপুর রোড। পরে জেনেছি, কলকাতার প্রাচীনতম রাস্তা চিত্তেশ্বরীর মন্দির থেকে জোড়াসাঁকো-বড়বাজার হয়ে ধর্মতলা, গড়ের মাঠ।
ট্রামের কন্ডাক্টরদের একটা বেশ খাকি রঙের পোশাক ছিল। ট্রামে মাঝে-মাঝেই চেকার উঠত। চেকারদের দেখতে খুব ভাল লাগত। মাথায় টুপি থাকত। ট্রাম কোম্পানি ছিল ব্রিটিশ কোম্পানির। যুক্তফ্রন্টের আমলে, ট্রাম কোম্পানি সরকারি হয়ে যায়, আর ওই সব আদব-কায়দা চলে যায়।
দশমীর দিন আমরা ওই দাদুর বাড়ি গিয়েছি কয়েকবার। কারণ, ওই বারান্দায় দাঁড়ালে অনেক বিসর্জনের ঠাকুর দেখা যেত, যেগুলো ভাসানের জন্য যাচ্ছে নিমতলা ঘাটে কিংবা আহিরীটোলার ঘাটে। বারান্দায় দাঁড়ালেই দেখতাম, রাস্তার ওপারে পরপর কতগুলো বইয়ের দোকান, ‘বৈকুন্ঠ বুক হাউস’, ‘সারদা বুক হাউস’, ‘ভৈরব প্রকাশনা’, ‘ডায়মন্ড লাইব্রেরি’ ‘অক্ষয় লাইব্রেরি’ — ইত্যাদি। অনেক সময়ে ওই ফুটপাথে একা-একা হাঁটতাম; দেখতাম, সব বই… ‘মিলন মাধুরী’, ‘প্রাণ বন্যা’, ‘প্রেমের আলেয়া’, ‘পাষাণের কান্না’, ‘যোগ সাধনা’, ‘সচিত্র সেলাই ও কাটিং শিক্ষা’— এরকম কত বই! স্বপনকুমারের বইও ছিল। ‘সহজ ইংরেজি শিক্ষা’, ‘প্রেমপত্র লিখন’— ইত্যাদি। এখন একটা মাত্র দোকান অবশিষ্ট আছে। এগুলোই ছিল বটতলার প্রকাশনা।

‘বিডন স্কোয়ার’-এর এখন নাম হয়েছে ‘রবীন্দ্রকানন’। কারণ ওখানে ছয়ের দশকে ‘রবীন্দ্রমেলা’ হত। আগে নাম ছিল, ‘কোম্পানির বাগান’। আমি দাদু-কাকুদের কাছে ‘কোম্পানির বাগান’-ই শুনেছি। ওখানে ‘দোলনা’ ছিল, ‘স্লিপ’ এবং ‘ঢেকুচ-ঢেকুচ’ ছিল।
চিৎপুরেরদাদুর তিন সন্তান। আমার কাকা হয়। ওঁরা পাঁচুকাকু, নীলুকাকু, রাধি। রাধি ওঁদের মেয়ে। ভাল নাম কল্যাণী। রাধি ছিল আমারই বয়সি। নীলুকাকু আমার চেয়ে তিন-চার বছরের বড়, পাঁচুকাকু ১২-১৩ বছরের বড়, রাধির সঙ্গে আর নীলুকাকুর সঙ্গে আমার খুব ভাব ছিল। নীলুকাকু আমাকে মতি সিংয়ের দোকান চিনিয়েছিল।
কোম্পানি বাগানের ঢোকার গেটের ঠিক উল্টোদিকেই, মতি সিংয়ের দোকান। জানি না, আজ ক’জন মতি সিং কে মনে রেখেছেন। লম্বা দোকান। দেয়ালে সেট করা ফুট দেড়েকের তক্তা, তার তলায় বেঞ্চি। বঞ্চিতে বসে খেতে হত। ওর দোকানের বিখ্যাত আইটেম ছিল। ‘আলুর দোর্মা’ একটা গোটা আলুর মাঝখানে, বেশ বড় একটা সুড়ঙ্গ বানিয়ে ভিতরে মশলা পুরে, পুরো আলুটাকে বেসনে চুবিয়ে ভাজা, তারপর গ্রেভিতে চুবিয়ে দেওয়া। আজকাল ভোজবাড়িতে একে বলে, ‘স্টাফ্ড পটেটো মশালা’। দাম ছিল দু’আনা বা ১২ পয়সা। পরে কুড়িপয়সা, যা তিন আনার সমান ছিল। ছিল শিঙাড়া, সঙ্গে ঘুগনি, চাটনি পেঁয়াজকুচি ফ্রি। ছিল টিকিয়া, খাস্তা কচৌরিও ছিল। আরও দু’একটা আইটেম ছিল, মনে নেই।
চিৎপুরের দাদুর বাড়িতে যাবার একটা বড় আকর্ষণ ছিল মতি সিং। বাড়িতে পয়সা জমাতাম, কবে চিৎপুরের দাদুর বাড়ি গিয়ে ‘আলুর দোর্মা’ সাঁটাব। সেই মতি সিংয়ের এর দোকান বহুদিন নেই। ‘বিডন স্ট্রিট’ ধরে একটু হেঁটে গেলেই ‘গরানহাটা স্ট্রিট’। ওই গলিতে ঢুকে অবাক হয়ে দেখতাম, কত রুপোর মূর্তি শো-কেসে। আর-একটু গেলে ‘মিনার্ভা থিয়েটার হল’, আর তার পাশে দুটো শরবতের দোকান। ছোটবেলায় ওই দোকানের শরবত খাইনি কোনওদিন। বড় হয়ে দেখেছি, দোকান দুটো আছে এবং ওখানে ভাঙ-সিদ্ধির শরবত পাওয়া যায়। মানে শরবতের মধ্যে ভাঙ-সিদ্ধি গুলে দেওয়া হয়। জীবনের দু’বার ওই শরবত খেয়েছি, সেই অভিজ্ঞতা এখানে বলছি না।
চিৎপুরের ওই বাড়িটার পাশে পরপর কয়েকটা সোনা-রুপোর ছোট-ছোট দোকান ছিল। এর উল্টোদিকেই ‘দুর্গাচরণ চ্যাটার্জি স্ট্রিট’, যেটার আরম্ভ একটা মাজার থেকে। পরে জেনেছি, ওই মাজারটা ‘সোনাগাজি’-র মাজার এবং এলাকাটার নাম ‘সোনাগাছি’। দাদুর সঙ্গে যখন হেঁটে-হেঁটে গ্যালিফ স্ট্রিট থেকে চিৎপুর যেতাম, বাগবাজার থেকে নতুন রাস্তায় পড়তাম। ‘গিরিশ অ্যাভিনিউ’কে নতুন রাস্তাই বলা হত। তারপর, বি কে পাল অ্যাভিনিউ দিয়ে চিৎপুর রোড। কিছুটা এগিয়ে গেলে রাস্তার এক ধারে খুব সেজেগুজে থাকা মেয়েদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতাম। দাদু সেই ফুটপাথ নয়, অন্য ফুটপাথ দিয়ে হাঁটতেন। বালক বয়সের কৌতূহলে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘ওরা দাঁড়িয়ে আছে কেন?’ দাদু বলেছিলেন, ‘নগর নটী। এখন বুঝবা না, বড় হইলে বুঝবা।’ কিছু একটা রহস্য ছিল, দাদুকে ঘাঁটাইনি। তার আগেই ঠাকুর্মার সঙ্গে গঙ্গার ধারে হরিসভায় যাবার সময়ে একটা অভিজ্ঞতার কথা বলেছি বোধ হয়।
এই নতুন রাস্তা কাশীপুরের সঙ্গে যুক্ত করার সময়ে কিছু ব্যস্ত এলাকা ভেঙে ফেলতে হয়েছিল। সেই বস্তিতে এরা থাকত। নতুন রাস্তা করা হচ্ছে যখন, তখনও সন্ধ্যার সময়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতাম। এঁদের ঘর ভেঙেছে, কিন্তু নিশ্চিহ্ন ঘরের সামনে তবু… এটা তখন বুঝতাম না। ওদের সাজসজ্জা এতটা চড়া ছিল না। কিন্তু, সেজেগুজেই থাকত। আমি একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম ঠাকুর্মাকে, ঠাকুর্মা জবাব দেয়নি। বলেছিল, ‘ওই দিকে চাইও না।’
অনেক পরে যখন বিএসসি পরীক্ষা হয়ে গেছে, রেজাল্ট বেরোয়নি, তখন শোভাবাজার এলাকায় একটা ছোট জায়গায় মাস দেড়েক কাজ করেছিলাম। ওই ছোট দোকানগুলো থেকে রুপোর টাকা কিনে আনা হত। একটা রুপোর কয়েন ২৫ টাকায় কিনতে হত। সেই ব্রিটিশ আমলের। সেই কয়েন থেকে সিলভার নাইট্রেট ক্রিস্টাল তৈরি করে, ‘বসুমতি’, ‘সরস্বতী প্রেস’, ‘ঈগল লিথো’ এগুলো লিখে এই সব জায়গায় বিক্রি করা হত। তখনকার ছবি ছাপার কাজে এই রাসায়নিকটি লাগত। ওই দোকানগুলিতে রুপোর কয়েন সহজলভ্য ছিল। কারণ, বাবুরা সোনাগাছিতে এসে মৌজ করলে, রুপোর কয়েনের এন্তার ঠং-ঠং হত, সেই কয়েন বেচে দিত। তখন তো এ-সব জানতাম না।
জানতাম না ‘অ্যালেন’-এর মতো রেস্টুরেন্ট ওদের বাসার পাশেই। অনেক পরে জেনেছি, ‘অ্যালেন’-এর চিংড়ির কাটলেটের মাহাত্ম-কথা। অনেকদিন হয়ে গেছে, ‘অ্যালেন’ ওখান থেকে উঠে গেছে। আর ছিল ওখানে পরপর যাত্রাপালার দপ্তর। ‘প্রভাত অপেরা’, ‘তরুণ অপেরা’, ‘নট্য কোম্পানি’, ‘সত্যম্বর অপেরা’, ‘বৈকুন্ঠ যাত্রাসমাজ’— এরকম কতসব…
চিৎপুরের দাদু ব্যাঙ্কে চাকরি করতেন ঠিক কথা, কিন্তু ছয়ের দশকে ব্যাঙ্কের মাইনেপত্র ভাল ছিল না নিশ্চয়ই। ওদের ছিল দুটো মাত্র ঘর। একটা ঘরেই একটা চার পায়া তক্তাপোশ ছিল এবং একটা কাঠের আলমারি, আলমারির গায়ে আয়না ছিল। একটা আলনা। পাঁচুকাকু, নীলুকাকু, রাধিরা মেঝেতে বসেই লেখাপড়া করত। দুটো ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা বাল্ব ঝুলত। ওই ঝুলন্ত বাল্বের কাছাকাছি বসে লেখাপড়া। বিদ্যুতের মিটার বাঁচানোর জন্য দুই ঘরে দুটো বাল্ব ছিল না। রান্না হত বারান্দায়। নীচে ছিল চৌবাচ্চা। ওখানে জল আসত মাঝে-মাঝে। চৌবাচ্চা পরিষ্কার করা হত। সেই সময়ে যদি আমি হাজির থাকতাম, খুব মজা হত। চৌবাচ্চার মধ্যে ঢুকে হুটোপুটি করতাম খুব। চৌবাচ্চার তলায় গুঁজে রাখা ন্যাকড়া খুলে দিলে, জল বেরিয়ে যেত, নারকোলের ছোবড়া দিয়ে চৌবাচ্চার দেওয়াল পরিষ্কার করা হত। কলের জল ঢুকিয়েও পরিষ্কার করা হত। সে এক মজার ব্যাপার।




