মেঘে মেঘে বেলা : পর্ব ৭

প্রশ্ন বিচিত্রা

আমি আমারই মতো, কী আসে যায়!

না, একা দার্জিলিং ঘুরতে যাওয়া নয়। না, পাঁচ হাজার টাকার শাড়িও নয়। এমনকী, এককাপ গরম কফি নিয়ে বারান্দায় আধঘণ্টা নিশ্চিন্তে বসে থাকাও নয়। মাঝবয়সি মেয়েদের সবচেয়ে বড় বিলাসিতা হল— কাউকে কোনও জবাবদিহি না করা। মেয়েদের জীবনটা আসলে একটা লম্বা ভাইভা পরীক্ষা। প্রশ্নকর্তা শুধু বদলাতে থাকে।

ছোটবেলায়— ‘কোথায় যাচ্ছিস?’, ‘ওই ছেলেটা কে?’, ‘এত হাসছিস কেন?’, ‘এত চুপ কেন?’

তারপর বিয়ে। প্রশ্নপত্র বদলে যায়, পরীক্ষক বদলায়, কিন্তু পরীক্ষা বন্ধ হয় না।
‘আজ এত দেরি হল কেন?’
‘মায়ের বাড়ি এত ফোন করতে হয়?’
‘এই সেদিনই লিপস্টিক কিনলে না?’
‘রোজ রাত্তিরেই তোমার মাথা ধরে?’

মাঝবয়সি মা ও সন্তানের সম্পর্ক যেন একটা কমেডি সিরিজ! পড়ুন সঞ্চারী মুখোপাধ্যায়ের কলমে ‘মেঘে মেঘে বেলা’ পর্ব ৬…

তারপর অফিস।
‘আজ একটু আগে বেরোচ্ছেন?’
‘কেন?’
‘ছেলের স্কুলে গার্জেন কল?’
‘আর কাউকে পাঠানো যায় না?’

তারপর সন্তান।
‘মা, আমার গ্রিন টি-শার্টটা কোথায়?’
‘আমাকে চোখ দেখাতে নিয়ে যাচ্ছ না কেন?’
‘আজ কী রান্না?’
‘আগে বলোনি কেন আজ মামার বাড়ি যেতে হবে?’

অদ্ভুত ব্যাপার হল, পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ মনে করে মেয়েরা জন্মগতভাবে কাস্টমার কেয়ার এগজিকিউটিভ। প্রত্যেক প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, প্রত্যেক সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা করা, প্রত্যেক কাজের কারণ জানানো— তাদের ফুলটাইম চাকরির অঙ্গ। এ-কথা মানতেই হবে, যে-কোনও বয়সের ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের যে-কোনও বিষয়ে জবাবদিহি করতে হয় অনেক বেশি।

কিন্তু মেয়েরা একটা বয়সের পর বুঝতে পারে, তার সারা জীবন ধরে এত প্রশ্নের উত্তর না দিলেও চলত। নিজেকে বারবার প্রমাণ না করলেও চলত, নিজেকে সবসময় দোষী ভাবার দরকার ছিল না। তখন সে জবাবদিহি ছাড়তে চায়। কারণ, তার ক্লান্ত লাগে। সারাজীবন ধরে ধেয়ে আসা প্রশ্নবাণের তোড়কে সে পাল্টা-প্রশ্ন করে দ্যাখে, তার নিজত্বকে মূল্য দেওয়া হয়নি বলেই তার প্রতি এত শর-নিক্ষেপ, তাই তার প্রতিটি কাজের বিশদ হিসেব দাখিল করতে হয়েছে।

তাড়াহুড়োয় সে যদি স্বামীর কাছে হাজার টাকা চায়, তখনই তাকে জবাব দিতে হবে, কীসের জন্য? বিশ-বাইশ বছর বিয়ের পর, শারীরিক-মানসিক চেনাচিনির পরও, তাকে বিশ্বাস করে টাকাটা দিয়ে দেওয়া যাবে না? ভাবা যাবে না: সে নিশ্চয় বাজে খরচার জন্য টাকাটা চাইছে না? বেশিরভাগ সময়ে দেখা যায়, টাকাটা হয়তো সে সংসারের জন্য বা ছেলেমেয়ের স্কুলের কিছু কেনার জন্য চাইছে, তবুও জবাবদিহিটুকু করতেই হয়।

একটা প্রশ্ন, তার উত্তরের প্রেক্ষিতে পরের প্রশ্ন, উপ-প্রশ্ন, প্রশ্নের ছলে বাঁকা মন্তব্য, এই চেন-সিস্টেমের চলমান ঘূর্ণি থেকে এক সময় মেয়েরা হাত ঝটকে বেরিয়ে আসতে চায়। হঠাৎ তার মনে হয়, সে আর বাধ্যতামূলক উত্তরে দণ্ডিত হয়ে থাকবে না। এই উপলব্ধিটা খুব নাটকীয় ভাবে হয় না। হঠাৎ বজ্রপাতের ঝলকানি এসে মাথায় সেঁধিয়ে যায় না, ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজনাও বাজে না। একদিন হঠাৎ সে লক্ষ করে, কেউ তাকে যেই জিজ্ঞেস করেছে, ‘কোথায় যাচ্ছ?’, তখন আগের মতো সঙ্গে সঙ্গে স্থান-কাল-পাত্র ব্যাপারে বিস্তারিত জবাব না দিয়ে সে বলে, ‘একটু বেরচ্ছি।’ ‘কোথায় ছিলে?’ ‘এদিক-ওদিক।’ এবং নিজেই অবাক হয়ে দেখে, পৃথিবীটা ভেঙে পড়েনি, আকাশও ঠিক জায়গাতেই আছে।

মাঝবয়সের সবচেয়ে বড় শিক্ষা বোধহয় এটাই— সবাইকে সন্তুষ্ট রাখা কোনও পেশা নয়। যে মেয়েটা সারাজীবন ভেবেছিল, সবাইকে সবটা বুঝিয়ে বলতে পারলেই তাকে বিশ্বাস করা হবে, সে একসময় বুঝতে পারে, অনেকেই বিশ্বাস করতে চায় না। তারা শুধু প্রশ্ন করতে ভালবাসে। আসলে, প্রশ্ন অনেক সময়ই তথ্যের জন্য নয়, নিয়ন্ত্রণের জন্য করা হয়। তাই উত্তরদাত্রীর বিরক্তিও জন্মায় নিয়ন্ত্রণ ভেঙে বেরিয়ে আসতে না-পারার জন্য। একই মানুষকে যদি পঁচিশ বছর ধরে প্রতিটি ছোট সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে হয়, তবে একসময় প্রশ্নগুলো আর প্রশ্ন থাকে না, সেগুলো মশার মতো হয়ে যায়। একটার কামড়ে খুব ব্যথা লাগে না, কিন্তু সারারাত যদি কানের কাছে ভনভন করে, তখন মানুষ মশার ওপর নয়, শব্দটার ওপরই রেগে যায়।

মাঝবয়সের আগে, অনেকেরই এই বিরক্তি জন্মায় না, বা জন্মানোটাকে সে নিজেই অসঙ্গত মনে করে। এর সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হল, একসময় মেয়েরাই বিশ্বাস করতে শুরু করে— হয়তো সত্যিই তাদের প্রতিটি কাজের ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত। তারা ক্ষমা চায় এমন সব কিছুর জন্য, যার জন্য ক্ষমা চাওয়ার কোনও প্রয়োজনই নেই। ‘একটু দেরি হয়ে গেল, সরি।’ ‘আজ নিজের জন্য একটা শাড়ি কিনে ফেলেছি। সরি।’ ‘আজ খুব ক্লান্ত লাগছে, রান্না করতে পারব না… সরি।’ ক্লান্ত হওয়ার জন্যও ক্ষমা চাইতে হয়! যেন পৃথিবীর সমস্ত শক্তির ব্যাটারি চার্জ করে রাখার দায়িত্বও তারই।

অবশ্য সবারই মাঝবয়সে এই চৈতন্যোদয় হবে, তার মানে নেই, কারও এই বোধ আগেও আসতে পারে, কারও কখনওই না আসতে পারে, কেউ ‘মেয়েদের জবাব দিতে হয়’ ধারণার সঙ্গে একমতও না-ই হতে পারে। কিন্তু মাঝবয়স যেহেতু প্রায় সক্কলকেই হিড়হিড় করে আয়নার সামনে টেনে দাঁড় করায়, তাই অনেক মেয়েই একদিন মন দিয়ে ভুরুতে পেন্সিল বোলাতে বোলাতে উপলব্ধি করে, প্রত্যেক ফোন না ধরলেও চলবে। সব মেসেজের উত্তর দিতে হবে না। সবাইকে খুশি না রাখলে তার ফাঁসি হবে না। যে-কোনও বয়সের যে-কোনও আত্মীয় বা বন্ধু ওরাল পরীক্ষা নিলেই তাকে থতমত খেয়ে যথাযথ উত্তর খুঁজতে হবে না, বরং সে একটা মুচকি হাসি দিয়ে লিফটে এক টিপে নেমে যেতে পারে। প্রশ্নকর্তার এতে বুক ধড়ফড় করতে পারে, কারণ সে অভ্যস্ত ছিল বিস্তারিত রিপোর্টে। সেটা সামলে নেওয়ার দায়িত্ব তারই। মেয়েটার নয়।

অতএব এত দিনকাল পাড়ি দিয়ে হঠাৎ বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ মাঝবয়সিটির না-উত্তর বা ছোট্ট, স্লিক, এক-দু-শব্দী উত্তরগুলো আসলে জবাব নয়, ছোট-ছোট স্বাধীনতার ঘোষণা।

এই বদলে যাওয়াটাকে বাইরে থেকে অনেকেই ভুল বোঝে। কেউ বলে, ‘বয়স হচ্ছে তো, খুব একরোখা হয়ে যাচ্ছে।’ কেউ বলে, ‘আগের মতো আর অ্যাডজাস্ট করে না।’ কেউ বলে, ‘জেন-জ়ির হাওয়া লেগেছে।’ আসলে সে জীবনে প্রথমবার নিজের হয়েছে। সে হঠাৎ অসামাজিক হয়ে যায়নি। শুধু বুঝে ফেলেছে, ভালবাসা মানে প্রতিদিন নিজের অস্তিত্বের হলফনামা জমা দেওয়া নয়। বিশ্বাস মানে প্রতিটি খরচের ভাউচার নয়। আর সংসার মানে কোনও অনন্ত অডিট অফিসও নয়।

তাই কোশ্চেন পেপারটা ফেলে, অনায়াসে পরীক্ষার হল-এর বাইরে বেরিয়ে গেলে, তাকে কেউ আটকাতে পারবে না।