ব্রেনে ঝিলমিল লেগে গেছে
‘রিমলি, তোমায় কতবার বলেছি যে ফোন সাইলেন্টে রাখবে না! মায়ের একটা কথাও যদি কানে যায়।’
—মা, আমি তো তখন ক্লাসে! ক্লাসের মধ্যে ফোন বাজলে টিচার রাগ করে! তুমি তো জান, আমার ক্লাস সাড়ে আটটায় শেষ, তাহলে আটটা কুড়িতে ফোন করেছ কেন?
—তোমাদের মতিগতি তো কিছু বুঝি না। হয়তো আগে ছুটি হয়ে গেছে, তোমরা কোথাও টো টো করছিলে!
—তোমরা বলছ কেন? বলো, আমি। আমার ওপর তো বিশ্বাস নেই।
রিমলি ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয় সপাটে। মা কাঁদতে-কাঁদতে তার মায়ের ডায়লগ বলে, ‘এখন বুঝবি না। নিজে মা হলে বুঝতে পারবি কত চিন্তা!’ অতঃপর ফ্যাঁচ-ফ্যাঁচ। একটু আগের সন্দেহপ্রবণ মাতা, পরক্ষণেই অভিমানী।
অবিবাহিত মাঝবয়সি মহিলাও সুখী হতে পারে?
পড়ুন ‘মেঘে মেঘে বেলা’ পর্ব ৫…

মাঝবয়সি মায়েদের নিয়ে বিজ্ঞান এখনও পর্যাপ্ত গবেষণা করেনি। ফলে আমরা এখনও জানি না, কীভাবে একজন মানুষ একই সঙ্গে উদ্বিগ্ন, সন্দেহপ্রবণ, স্নেহশীল, ক্লান্ত, অতি-সক্রিয় এবং কৌতুকপ্রিয় হতে পারে। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত— যদি পৃথিবীর সমস্ত স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান একদিন ধর্মঘট ডাকে, তাহলেও বিনোদন শিল্প ভেঙে পড়বে না। কারণ মাঝবয়সি মায়েরা রয়েছে। তারাই আসল কমেডিয়ান এখন। তবে তারা স্টেজে দাঁড়িয়ে মাইক হাতে কমেডি করে না, তাদের কমেডির মঞ্চ হল রান্নাঘর, ডাইনিং টেবিল, স্কুলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, ডাক্তারখানার ওয়েটিং রুম এবং গভীর রাতের বিছানা, যেখানে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পরও তারা জেগে থাকে।এই কেন জেগে থাকার প্রচুর কারণ আছে, যেগুলো সাধারণ এলেবেলে মানুষ, যারা ঘুরছে-ফিরছে, সিনেমা দেখছে, খেতে যাচ্ছে নিত্যনতুন ক্যাফেতে, তারা বুঝতেও পারবে না। আমি অন্তত এই সব মায়েদের অত্যন্ত সম্ভ্রমের চোখে দেখি। কারণ আমি এই প্রজাতিতে ঢুকে পড়েছি কি না, এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।
এহেন মাঝবয়সি মায়েদের সবচেয়ে বড় প্রতিভা হল, তারা যে-কোনও ঘটনাকে সম্ভাব্য বিপর্যয়ে পরিণত করতে পারে। ছেলে পাঁচ মিনিট বেশি ঘুমোল? নিশ্চয় শরীর খারাপ। দশ মিনিট আগে ঘুম থেকে উঠল? নিশ্চয় কোনও গোপন প্রেম চলছে। ঘরে দরজা বন্ধ করে বসে আছে? ড্রাগ নিচ্ছে না তো? বাইরে বেরিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছে? খারাপ সঙ্গ পেল না তো? অর্থাৎ ছেলে বা মেয়ে যা-ই করুক, মায়ের উদ্বেগের সিরিয়ালের পরবর্তী এপিসোড প্রস্তুত।
আজকালকার মায়েদের সবচেয়ে বড় শত্রু হল গুগল। আগে সন্তান হাঁচি দিলে ঠাকুমা বলত, ‘গরম জল খাওয়াও।’ এখন গুগল বলছে, ‘এটি বিরল ও জটিল রোগের উপসর্গও হতে পারে।’ তারপর শুরু হয় মায়ের মস্তিষ্কের নেটফ্লিক্স সিরিজ। প্রথম এপিসোডে সাধারণ সর্দি। দ্বিতীয় এপিসোডে নিউমোনিয়া। তৃতীয় এপিসোডে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সম্মেলন। আর শেষ এপিসোডে সন্তান বিদেশে চিকিৎসাধীন। বাস্তবে অবশ্য সে পাশের ঘরে বসে ম্যাগি খাচ্ছে। মাঝবয়সি মায়েদের গুগল সার্চ হিস্ট্রি দেখে যে-কেউ ভাববে, তাঁরা হয় গোয়েন্দা, নয় ডাক্তার, নয়তো রাষ্ট্রপুঞ্জের কোনও বিশেষ বিশেষজ্ঞ— ‘টিনএজাররা কেন বেশি ঘুমোয়’, ‘মোবাইল অ্যাডিকশন কীভাবে বুঝবেন’, ‘হঠাৎ চুপচাপ হয়ে গেলে কী করবেন’, ‘ইঞ্জিনিয়ারিং না লিবারেল আর্টস’, ‘সন্তান মিথ্যে বলছে কি না বোঝার উপায়’— একজন সাধারণ মানুষ যেখানে একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে থেমে যায়, মা সেখানে আরও সাতটা প্রশ্নের জন্ম দেয়। এবং অবশ্যই, মায়েদের কল্পনাশক্তিকেও হালকা করে দেখবেন না। বিশেষ করে সন্তান যখন টিন-এজে পৌঁছয়।

একদিন দেখলেন ছেলে/মেয়ে ফোন হাতে নিয়ে হাসছে। ব্যস! মায়ের সিআইডি বিভাগ সক্রিয়। কাকে মেসেজ করছে? মেয়ে না ছেলে? কতক্ষণ ধরে করছে? পড়াশোনা হচ্ছে তো? মেয়েটি বা ছেলেটি কি ভাল? ওদের বাড়িতে ক’টা বাথরুম? এই সম্পর্ক কি বোর্ড পরীক্ষার রেজাল্ট নষ্ট করবে? আর যদি বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়? আবার যদি বিয়ে পর্যন্ত না গড়ায়? তারপর ব্রেক-আপ হলে ছেলে/মেয়ে সামলাতে পারবে? আর যদি ব্রেক-আপ না হয়? তাহলে কি সত্যিই বিয়ে হয়ে যাবে? একটা ‘হি হি’ ইমোজি থেকে মাঝবয়সি মায়ের মস্তিষ্ক যে দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে, নাসা-ও তা পারে না। সবচেয়ে মজার বিষয় হল, সন্তানদের কাছে এইসব উদ্বেগের কোনও অস্তিত্বই নেই। তারা দিব্যি বলবে, ‘মা, ও শুধু ক্লাসমেট।’ কিন্তু মায়ের অভিজ্ঞতা বলছে, পৃথিবীর সমস্ত প্রেমই কোনও একদিন ‘শুধু ক্লাসমেট’ হিসেবেই শুরু হয়েছিল।
তারপর আসে সোশ্যাল মিডিয়া। আমাদের মায়েরা এমন একটা প্রজন্মের মানুষ, যারা প্রেমপত্র থেকে ইনস্টাগ্রামে পৌঁছেছেন। তাই সন্তান যখন হঠাৎ ছবি পোস্ট করে লিখল, ‘My Person’— মায়ের রাতের ঘুম উধাও। এই ‘পারসন’ আবার কে? আগে তো নাম দেওয়া হত। এখন মানুষও নাকি ‘পারসন’ হয়ে গেছে!
মাঝবয়সি মায়েদের কাছে সন্তানের বয়স একটা খুবই বিভ্রান্তিকর বিষয়। যখন সন্তান বাইক চালাতে চায়, তখন সে ‘একেবারে বাচ্চা’। যখন সে রাত দুটো পর্যন্ত ফোন দেখে, তখন সে ‘বড় হয়ে গেছে’। যখন বাজার করতে পাঠাতে হবে, তখন সে ‘যথেষ্ট ম্যাচিওর’। আর যখন নিজের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সে ‘এখনও কিছু বোঝে না’। এই বয়স-নীতি পরিস্থিতি অনুযায়ী বদলায়। এবং আশ্চর্যের বিষয়, মায়ের কাছে এটা পুরোপুরি যুক্তিসংগত।

মানতেই হবে যে, এইসব মায়েদের জীবন আসলে একধরনের স্থায়ী ওভারথিংকিংয়ের কারখানা। সন্তান ফোন ধরছে না। পাঁচ মিনিট। দশ মিনিট। পনেরো মিনিট। তারপর মায়ের মাথায় সম্ভাবনার মিছিল। অ্যাক্সিডেন্ট? ছিনতাই? নেশা? বন্ধুদের সঙ্গে মারামারি? না কি ফোনটাই সাইলেন্ট? শেষের সম্ভাবনাটা সাধারণত সত্যি হয়। কিন্তু মায়েরা সেখানে পৌঁছনোর আগে অন্তত সাতাশটা কাল্পনিক বিপর্যয় পেরিয়ে আসে। মজার ব্যাপার হল, এই মানুষগুলোই আবার নিজেদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি হাসতে পারে। বন্ধুদের আড্ডায় শুনবেন— ‘গতকাল ছেলের ঘর তল্লাশি করতে গিয়ে নিজের হারানো পাসবই খুঁজে পেয়েছি।’ অথবা— ‘মেয়ের ইনস্টাগ্রাম স্টক করতে গিয়ে ভুল করে লাইক দিয়ে ফেলেছি।’ অথবা— ড্রাগ খোঁজার জন্য ব্যাগ ঘাঁটতে গিয়ে অঙ্কের খাতা পেয়েছি। এই আত্মপরিহাসের ক্ষমতাই বোধহয় মাঝবয়সি মায়েদের সবচেয়ে বড় শক্তি। কারণ তাঁরা জানেন, সন্তান মানুষ করা আসলে কোনও বিজ্ঞান নয়। এটা অনেকটা আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মতো। সব তথ্য বিশ্লেষণ করে আপনি একটা ধারণা করতে পারেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বৃষ্টি হবে কি না, সেটা আকাশই জানে।
আর মা? তিনি ছাতা হাতে অপেক্ষা করেন। সন্তানের জন্য। তার ব্যর্থতার জন্য। তার প্রেমের জন্য। তার ভুল সিদ্ধান্তের জন্য। এমনকী, তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ বিপর্যয়ের জন্যও।
আর তাই, আমরা যাকে ক্রমাগত কমেডি ভেবে চলেছি, সেটা আসলে গভীর ভালবাসা। বাইরে থেকে যেটা হাস্যকর মনে হয়, ভেতরে সেটা ভয়। বাইরে থেকে যেটা অতিরঞ্জন মনে হয়, ভেতরে সেটা দায়বদ্ধতা। তারা হাসে, কারণ না হাসলে চিন্তা বাড়বে। তারা ঠাট্টা করে, কারণ না করলে ভয়টা খুব স্পষ্ট হয়ে যাবে। তাই আজকাল সবচেয়ে ভাল কমেডি লিখছে মাঝবয়সি মায়েরা। কখনও স্কুলের গ্রুপে। কখনও বন্ধুর সঙ্গে চায়ের আড্ডায়। কখনও নিজের মাথার ভেতর। আর সেই কমেডির পাঞ্চলাইন প্রায় সবসময় একটাই— ‘আমি শুধু একটু চিন্তা করছি।’ যে বাক্যটার আড়ালে সাধারণত অন্তত তিনটে সম্ভাব্য বিপর্যয়, চারটে অসমাপ্ত দুশ্চিন্তা এবং ইনফিনিটি পরিমাণ ভালবাসা লুকিয়ে থাকে।




