হিয়া টুপটাপ জিয়া নস্টাল : পর্ব ৫১

রংবেরঙের কড়ি

তখন আমার বড়জোর বছর ছয় কি সাতেক বয়স। আঁকার নেশায় পেয়ে বসেছে পুরোপুরি। আঁকার স্কুলে তো ভর্তি করে দিতেই হয়েছে, দিস্তে-দিস্তে আঁকার খাতা, মোমরং আর জলরং নিকেশ করে দিচ্ছি চোখের নিমেষেই, জোগান দিতে মা-বাবা হিমশিম। তবু, ছেলের শিল্পানুরাগ বলে কথা। এইটা আমাদের বাড়িতে বরাবর ছিল। আদ্যন্ত গানবাজনা আর লেখালিখির বাড়ি বলেই বোধহয়, যে-কোনও রকম শিল্পের দিকে কেউ যেতে চাইলে তাকে প্রবল উৎসাহ দেওয়া হত। সে তার বয়স চল্লিশ হোক বা চার। আঁকাআঁকি করে আমি আদৌ কোনও পর্যায়ে পৌঁছতে পারব কি না, ছবি আঁকাই আমার সারাজীবনের কাজ হবে কি না, এই নিয়ে যেমন আমি ভাবতাম না, বাড়িতেও কেউ ভাবতেন না। তাঁদের মনে হত, কোনও একটা শিল্পমাধ্যম নিয়ে যখন মজে আছে, তখন সেই নেশাকে যত দূর সম্ভব প্রশ্রয় দেওয়াটাই কর্তব্য। তখনও ‘কিছু একটা হয়ে উঠতে হবে’ জাতীয় ভাবনা বাচ্চাদের মধ্যে বিশেষ ছিল না, তাদের বাবা-মায়েরাও সে-ধরনের চিন্তা থেকে বিরত ছিলেন। তাই নিজেদের সীমিত রোজগার ভেঙে আমাকে লাগাতার আঁকার সরঞ্জাম জুগিয়ে যাওয়াটা তাঁদের কাছে ‘লগ্নি’ ছিল না। ছিল ‘সমর্থন’। এ-দুয়ের মধ্যে অনেক ফারাক। 

সে যা হোক, যেমন বললাম, স্কুলের পড়াশোনা আর মাঠের খেলাধুলোর বাইরে তখন আমার সময় কাটে কেবলই আঁকা নিয়ে। এমন সময়ে, কাগজে একখানা বিজ্ঞাপন চোখে পড়ল বাবা-র। আঁকার রং প্রস্তুতকারী এক নামী সংস্থার বেশ বড় বিজ্ঞাপন। তাঁদের তৈরি জলরং-ই আমাদের বাড়িতে কিনে আনা হয়, আমার শখ পূরণের জন্য। তাঁরা পাঁচ থেকে পনেরো বছর বয়সি ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে জলরঙে আঁকা ছবি আমন্ত্রণ করে নিচ্ছেন, প্রতিযোগিতার জন্য। কাগজের মাপ বলে দেওয়া আছে, বিষয় হতে পারে যে-কোনও কিছুই, কেবল আঁকাটা হতে হবে তাঁদের প্রস্তুত করা জলরঙেই। বিপণনের দারুণ কায়দা, মানতেই হবে। তাঁদের রঙেই যে আঁকা হয়েছে, তার প্রমাণ কী? না, আগামী হপ্তা থেকে তাঁদের জল রঙের সেট-এর মধ্যে পাওয়া যাবে এই প্রতিযোগিতার ফর্ম, সেটা ভর্তি করে নিজের আঁকা ছবির সঙ্গে পাঠাতে হবে। মোদ্দা কথা, তারপরে যদি তাদের তৈরি রং দিয়ে না-ও আঁকা হয়, প্রত্যেক বাড়িতে একবাক্স করে জলরং কেনা তো হবেই! নইলে ফর্মই যে পাওয়া যাবে না! 

আমাদের মজলিশে কখনও আসতেন জগজিৎ সিং, কখনও বা জাকির হুসেন! পড়ুন শ্রীজাতর কলমে ‘হিয়া টুপটাপ জিয়া নস্টাল’ পর্ব ৫০…

বাবা খুব উৎসাহী হয়ে পরের হপ্তায় নতুন রঙের বাক্স আর বড় সাইজের দু’খানা আর্ট পেপার কিনে এনে আমাকে দিলেন। মায়েরও ভারি উৎসাহ। দেশজোড়া প্রতিযোগিতা, নামি আঁকিয়েরা বিচারক, ছেলের আঁকা যদি সেখানে স্বীকৃতি পায়, সে একখানা ব্যাপার হবে বটে। এর আগে পাড়ার ‘বসে আঁকো’ প্রতিযোগিতায় আমি নাম দিতাম, টুকটাক প্রাইজও পেয়েছি। কিন্তু এত বড় মাপের কোনও প্রতিযোগিতার সুযোগ পাইনি কখনও। আর সত্যি বলতে কী, অত বড় কাগজে আঁকিওনি এর আগে। বাবা দু’খানা কিনে এনেছেন, যদি একখানা আঁকতে গিয়ে নষ্ট হয় তো আরেকটা রইল। 

শুরু হল আমার আঁকা। সাতদিন সময় আছে হাতে, তারপর পোস্টঅফিস থেকে অনেক দূরের ডাকে পাঠাতে হবে। কী আঁকি, কী আঁকি? ভাবতে-ভাবতে মনে হল পাহাড় আঁকি। সন্ধের আকাশের গায়ে বুক চিতিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়, তার পাদদেশে নানারকম গাছপালা, আর একটা মোটে ঘর, যার ভেতরে লন্ঠন জ্বলছে। তখন আমার জীবনে পাহাড় বলতে একমাত্র দলমা রেঞ্জ, জামশেদপুরে মাসি-মেসোর বাড়ির বারান্দা থেকে যাকে স্পষ্ট দেখা যায়। তখন ইন্টারনেট আসতে বহু যুগ দেরি এবং মাঝেমধ্যে ক্যালেন্ডারে পাহাড় পর্বতের ছবি দেখা ছাড়া পাহাড়ের আর কোনও ‘রেফারেন্স’ আমার কাছে নেই। তাই মনে-মনে দলমাকে ভাবতে-ভাবতেই আঁকাটা শুরু করলাম। 

এআই নির্মিত ছবি

শুরু হল আমার আঁকা। সাতদিন সময় আছে হাতে, তারপর পোস্টঅফিস থেকে অনেক দূরের ডাকে পাঠাতে হবে। কী আঁকি, কী আঁকি? ভাবতে-ভাবতে মনে হল পাহাড় আঁকি। সন্ধের আকাশের গায়ে বুক চিতিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়, তার পাদদেশে নানারকম গাছপালা, আর একটা মোটে ঘর, যার ভেতরে লন্ঠন জ্বলছে। তখন আমার জীবনে পাহাড় বলতে একমাত্র দলমা রেঞ্জ, জামশেদপুরে মাসি-মেসোর বাড়ির বারান্দা থেকে যাকে স্পষ্ট দেখা যায়। তখন ইন্টারনেট আসতে বহু যুগ দেরি এবং মাঝেমধ্যে ক্যালেন্ডারে পাহাড় পর্বতের ছবি দেখা ছাড়া পাহাড়ের আর কোনও ‘রেফারেন্স’ আমার কাছে নেই। তাই মনে-মনে দলমাকে ভাবতে-ভাবতেই আঁকাটা শুরু করলাম। 

নতুন করে যে শুরু করব, তার জন্যও সময় নেই আর। পরশুই পোস্ট করতে হবে। হাতে মাত্র একটা দিন। পাহাড়ের ঢালের একেবারে নীচের দিকে ছোট বাড়িটার জন্য জায়গা রাখা ছিল, সেটা এবার এঁকে ফেললাম। একটা দরজা, দুটো জানলা, ভেতর থেকে উজ্জ্বল হলদে আলো দেখা যাচ্ছে, সন্ধে হয়ে আসায় লন্ঠন জ্বালা হয়েছে। ততদিনে আমার নাওয়াখাওয়া প্রায় উবে গেছে। দিনরাত ছবিটার সামনে এসে বসছি, এখানে একটু এই রং লাগাচ্ছি, সেখানে একটু সেই রং বোলাচ্ছি, কিন্তু মন আর ভরছে না। 

শেষ দিন সন্ধেবেলা, আঁকাটা প্যাক করবে বলে বাবা যখন একটা ব্রাউন পেপার আর কাপড়ের শক্ত খাম কিনে বাড়ি ফিরেছে আর আমি বসে-বসে হতাশ হয়ে ছবিটার দিকে তাকিয়ে আছি, তখন মামু এল হঠাৎ আমাদের বাড়ি। আমার মামাকে আমি ‘মামু’ বলে ডাকতাম। লেক গার্ডেন্সের বাড়ি থেকে মাঝেমধ্যে চলে আসতেন আমাদের গড়িয়ার বাড়িতে। কখনও গানবাজনা হত, কখনও আড্ডা। গানের পাশাপাশি মামু নিজে খুব ভাল আঁকতেন, মূর্তি গড়তে পারতেন। সেদিনও সন্ধেয় তেমনই হাজির মামু। আমার খবর নিতে ভেতরের ঘরে এসে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। সে-ঘরের মালিকানা তখন আমার। এদিকে-ওদিকে পেনসিল আর তুলি ছড়িয়ে, রঙের বাক্স, জলের কাপ, সব ছড়ানো। লাল মেঝেয় হাজারও রঙের ছোপ লেগে আছে। আর সেসবের মাঝখানে ছবিটা নিয়ে চুপ করে বসে আছি আমি। বাবা-মা এসে দাঁড়িয়েছেন ততক্ষণে। ব্যাপারখানা কী, তা জানতে চাইলে বাবা-ই খুলে বললেন সব, মস্ত বড় প্রতিযোগিতা, দেশজোড়া আমন্ত্রণ, তারই ফল এই পাহাড়ের ছবি। কাল পোস্ট করতে হবে। 

মামুই আমার ছবির প্রথম ও শেষ ক্রেতা। ছবি নিয়ে বেশি দূর আর এগোনো হয়নি আমার। কিছু নিয়েই হয়নি অবশ্য। মামু পরের হপ্তাতেই সে-ছবি বাঁধিয়ে এনে গানের ঘরের দেওয়ালে যত্ন করে টাঙিয়ে রেখেছিলেন। পছন্দের মানুষজন এলে তাঁদের ছবিটা দেখিয়ে আমার কথা বলতেনও।

মামু সবটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘কোথাও পাঠাতে হবে না। ছবিটা আমি নেব।’ মামু-কে এমনিতেই সবাই বেশ সমীহ করে চলত, তার ওপর এই বাক্যটায় এমন একটা প্রত্যয় আর জোর ছিল যে আমি তো বটেই, বাবা আর মা-ও বেশ থতমত। এসব ক্ষেত্রে আমি শ্রোতা। ছোট থেকে শেখানো হয়েছে, বড়দের কথার মাঝখানে কথা বলতে নেই, সেটা অক্ষরে-অক্ষরে মেনে চলতাম। যদিও আমারই আঁকা ছবি নিয়ে কথা হচ্ছে, তবু চুপ থাকলাম। মামু ছবিটার খুব প্রশংসা করে বললেন, ‘অনেক ছবির মধ্যে এ-ছবি যদি হারিয়ে যায়, তাহলে ক্ষতি হবে। বিচারকদের ওপর আমার কোনও আস্থা নেই। তাই আমি এই ছবিটা হারাতে চাই না। এটা আমার গানের ঘরের দেয়ালে থাকবে। সবাই এসে দেখবে’। আমি তখনও চুপ। মা আর বাবা-ও স্তম্ভিত। মামু অনেকটাই আমাদের অভিভাবক, তাঁর কথার ওপরে কথা চলে না। তাছাড়া তাঁর কাছ থেকে এতখানি স্বীকৃতি পাওয়ার পর প্রতিযোগিতার পরোয়া না-করলেও চলে, এমনটা আমারও মনে হচ্ছিল। 

এরপর মামু একটা কাণ্ড ঘটাল। জিজ্ঞেস করল, ‘ফার্স্ট প্রাইজের জন্য কত দিচ্ছে ওরা?’ বাবা কত বলেছিলেন, আমার এখন আর মনে নেই। কেবল মনে আছে, সেটা শুনে মামু বলেছিলেন, ‘আমি তার চেয়ে এক টাকা বেশি দিয়ে ছবিটা ওর কাছ থেকে কিনতে চাই। ফার্স্ট প্রাইজ ওর পাওয়া না হলেও, এই টাকাটা ওর প্রাপ্য।’ মামু কত বড় মাপের শিল্পী, এই ঘটনা অনেক পরে আমাকে তা বুঝিয়েছিল। শিল্পী তো শুধু শিল্পের সাধনায় হয় না, ওইটুকু এক বালকের খামখেয়ালে ভরা আঁকার প্রতি শিল্পের সম্মান জানিয়ে যাওয়া, এও বড় শিল্পীই পারেন। বাবা-মা’র অনেক বারণ সত্ত্বেও এর অন্যথা হতে দিলেন না তিনি। মামু-র সঙ্গে ট্যাক্সি চেপে আমি আর বাবা চললাম লেক গার্ডেন্স, গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখে উঠলাম ওপরে, মামু ছবিটা রেখে একটা খামে টাকা ভরে আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘ছবিটা আমি তোমার থেকে কিনলাম, কেমন?’ 

মামুই আমার ছবির প্রথম ও শেষ ক্রেতা। ছবি নিয়ে বেশি দূর আর এগনো হয়নি আমার। কিছু নিয়েই হয়নি অবশ্য। মামু পরের হপ্তাতেই সে-ছবি বাঁধিয়ে এনে গানের ঘরের দেওয়ালে যত্ন করে টাঙিয়ে রেখেছিলেন। পছন্দের মানুষজন এলে তাঁদের ছবিটা দেখিয়ে আমার কথা বলতেনও। পরে টুকটাক লেখালিখির খাতিরে এদিকওদিক থেকে অল্পবিস্তর সম্মান আর পুরস্কার পেয়েছি, তাদের নামডাকও আছে হয়তো। কিন্তু আজ বুঝি, সেদিন সন্ধেয় মামু-র হাত থেকে আমার হাতে যে-খামটা এসেছিল, তার মধ্যে টাকার ছদ্মবেশে ভরা ছিল সম্মান, ভরসা, উৎসাহ, আরও অনেক কিছু। 

মামু চলে গেছেন, সে-ও বছর চোদ্দ হল। বাবা-মা-ও নেই আর। আমার মধ্যে থেকে আঁকার ইচ্ছের মতো ওঁরাও একে-একে মিলিয়ে গেছেন। তবু, আজও কখনও যখন লেক গার্ডেন্সের বাড়িটায় যাই, গানের ঘরে ঢুকি, একবার অন্তত চোখ তুলে দেওয়ালে টাঙানো নিজেরই আঁকা ওই ছবিটার দিকে তাকাই। আমিও যে আদৌ পারি কোনও কাজ, ওই ছবিটা এই দেওয়ালে জুড়ে গিয়ে সে-কথা আমাকে বারবার মনে করিয়েছে। হিজিবিজি পাহাড়-মাটি-আকাশের মধ্যে দাঁড়ানো ছোট্ট ঘরটার ভেতরে আজও লন্ঠন জ্বলছে। কে বলতে পারে, ওই ঘরটাই হয়তো আমি, যার ভেতরে সন্ধে নেমে আসছে এখন…