দগ্ধ ইউরোপ

‘ইউরোপে ৩০-৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস গরম পড়েছে, তাই নিয়ে আবার আর্টিকেল! আরে, এ তো আমাদের ডিসেম্বরের মতো গরম! তা নিয়ে এত “হিট ওয়েভ, হিট ওয়েভ” করে কাঁদার কী আছে? প্রথম বিশ্বের সবকিছুতেই বাড়াবাড়ি!’

জুনের শেষ সপ্তাহে ইউরোপের দাবদাহ নিয়ে খবর দেখতে দেখতে অনেক বাঙালির মনেই হয়তো এমন প্রশ্ন জেগেছে। কলকাতা তথা বাংলার মানুষ যখন ৪০-৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস গরমে অফিস যাচ্ছেন, ট্রাম-বাসে চড়ছেন, রাস্তার ধারে বসে এক কাপ চা খাচ্ছেন, তখন খবরের কাগজ, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট— সব জায়গায় ইউরোপের ৩২-৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রেড অ্যালার্ট, স্কুল বন্ধ, বৃদ্ধদের ঘরে থাকার নির্দেশ, রেল পরিষেবা ব্যাহত, এমনকী, মৃত্যুর খবর।
এসব শুনে বাড়াবাড়ি মনে হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু বিষয়টা একটু অন্যরকম।

সুইডেনে নিজের বাড়িতে বসে— যে বাড়িতে মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও আরামে থাকা যায়, সেই ভাবনায় তৈরি— সেই বাড়িতে ২৮-৩০ ডিগ্রি গরমও কখনও-কখনও অসহ্য মনে হয়। কারণ ইউরোপের অধিকাংশ বাড়িঘর তৈরি হয়েছে শীতের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য। কাঠের বাড়ি, মোটা দেওয়াল, বহুস্তরীয় ইনসুলেশন, তাপরোধী জানালা— সবকিছুর উদ্দেশ্য হল বাইরের ঠান্ডা আটকানো এবং ঘরের উষ্ণতা ধরে রাখা।

ফলত, দিনের পর দিন বাইরে যখন ২৫-৩০ ডিগ্রি তাপমাত্রা থাকে, তখন সেই বাড়িগুলোই গরম ধরে রেখে এক-একটা ওভেনের মতো হয়ে ওঠে।

তার ওপর উত্তর ইউরোপের গ্রীষ্মের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। এখানে সূর্য অস্ত যায় রাত দশটা-এগারোটায়, আবার ভোর তিনটের আগেই আলো ফুটে যায়। অর্থাৎ, দিনে আঠারো থেকে কুড়ি ঘণ্টা সূর্যালোক পাওয়ার পর শুধু বাড়ি নয়, রাস্তা, রেললাইন, গাড়ি—সবকিছুই তেতে ওঠে। এখানেই হয়তো কলকাতা আর ইউরোপের গরমের পার্থক্য।

আরও পড়ুন: গ্রেট নিকোবরের অরণ্যছেদনে বিপন্ন কচ্ছপরা?
লিখছেন স্বস্তিক চৌধুরী…

কলকাতার মানুষ ৪০ ডিগ্রি গরমের সঙ্গে লড়াই করতে করতে বড় হয়েছে। কিন্তু ইউরোপের অনেক দেশ এমন দীর্ঘস্থায়ী গরমের জন্য প্রস্তুত নয়। এবারের তাপপ্রবাহে দক্ষিণ ইউরোপের অবস্থা ছিল সবচেয়ে কঠিন। স্পেনে তাপমাত্রা ৪৪-৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল। আন্দালুসিয়ার সেভিল, কর্ডোবা, গ্রানাডার মতো শহরগুলো কার্যত অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়। হাসপাতালগুলোতে হিটস্ট্রোক এবং জলশূন্যতার সমস্যায় রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়। পর্তুগালের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রির কাছাকাছি পৌঁছায়। শুষ্ক আবহাওয়া এবং প্রবল গরমের কারণে দাবানলের আশঙ্কায় সতর্কতা জারি করা হয়।
ফ্রান্সে প্যারিস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা অতিক্রম করে। যে শহর সাধারণত ক্যাফে, রাস্তায় হাঁটা এবং খোলা আকাশের জীবনযাপনের জন্য পরিচিত, সেই শহরেই গরমের কারণে বিশেষ সতর্কতা নিতে হয়।

প্যারিসে আমি যতবার গিয়েছি, খুব কম বাড়িতেই এয়ার কন্ডিশনার দেখেছি। কারণ ইউরোপের বহু দেশেই এসি এখনও দৈনন্দিন জীবনের অংশ নয়। কিন্তু যখন রাতের তাপমাত্রাও স্বস্তি দেয় না, তখন বোঝা যায় পরিস্থিতি কতটা বদলে যাচ্ছে।
জার্মানিতে অতিরিক্ত তাপের কারণে কোথাও কোথাও রেললাইন বেঁকে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। দিনে দীর্ঘ সময় ধরে সূর্যের তাপে রেল অবকাঠামোর ওপর চাপ পড়ে।

নেদারল্যান্ডসের মতো দেশে, যেখানে মানুষ সাধারণত মৃদু গ্রীষ্মে অভ্যস্ত, সেখানেও অস্বাভাবিক গরম মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করেছে। ক্যানালের শহরগুলোতেও সন্ধ্যার পর গরম বাতাসের অনুভূতি হয়েছে। ইংল্যান্ডেও একই ছবি। লন্ডনের বহু বাড়িতে এখনও এসি নেই, কারণ ঐতিহাসিকভাবে তার প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু এখন ব্রিটিশ গ্রীষ্মের সংজ্ঞাই যেন বদলে যাচ্ছে।

ইতালির রোম, ফ্লোরেন্স এবং মিলানের মতো শহরেও তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির কাছাকাছি পৌঁছায়। পর্যটকদের জন্য জল সরবরাহ এবং বিশেষ সতর্কতার ব্যবস্থা করতে হয়। ইউক্রেনের পরিস্থিতি আবার অন্যরকম। যুদ্ধের মধ্যে এই তাপপ্রবাহ মানুষের কষ্ট আরও বাড়িয়েছে। ট্যাংক এবং সামরিক যানগুলোর ভেতরের তাপমাত্রা সৈন্যদের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছে।

অনেকেই প্রশ্ন করেন, ২৫-৩০ ডিগ্রি তাপমাত্রা নর্ডিক দেশে এত কঠিন লাগে কেন? এর একটি কারণ হল, সূর্যের প্রকৃতি। নর্ডিক সূর্যের অন্য রূপ; গ্রীষ্মকালে উত্তর ইউরোপে সূর্য আকাশে অনেকক্ষণ উঁচুতে থাকে। আবার বায়ুদূষণ ও ধোঁয়াশা তুলনামূলক কম হওয়ায় সূর্যের আলো অনেক বেশি সরাসরি এবং তীক্ষ্ণ মনে হয়।

কলকাতার মতো ধোঁয়া, ধুলো বা আর্দ্রতার স্তর এখানে কম। ফলে সূর্যের তেজ অনেক সময় সরাসরি শরীরে এসে লাগে।
নর্ডিক অঞ্চলে বাতাসও অনেক সময় অপেক্ষাকৃত শুষ্ক থাকে। ফলে ঘাম দ্রুত শুকিয়ে যায় এবং শরীর কতটা গরম হয়ে যাচ্ছে, তা সবসময় বোঝা যায় না। রোদে দাঁড়ালে মনে হয় যেন এক ধরনের শুকনো আগুনের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি।

তপ্ত মানচিত্র

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, অতি-বেগুনি বা UV রশ্মি। দিনের দৈর্ঘ্য এত বেশি যে মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে সূর্যালোকে থাকে। ফলে ত্বকে রোদের জ্বালা এবং পোড়া ভাব দ্রুত অনুভূত হয়। তাই নর্ডিক দেশের গরমের দিনে অনেকেরই মনে হয়—
তাপমাত্রা খুব বেশি নয়, কিন্তু রোদটা যেন কামড়ে ধরছে।

এই অস্বাভাবিক গরমের প্রভাব শুধু আবহাওয়ার রিপোর্টে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের ছোট ছোট অভ্যাসেও তার ছাপ পড়ে।
সুইডেনে বছরের এই কয়েক মাস সাইকেলের পেছনে বসিয়ে মেয়েকে নিয়ে বেশ এদিক-ওদিক যাওয়া যায়। এ বছর মেয়েকে স্কুলে দেওয়াও হচ্ছিল সেই বাংলার মফস্বলের বাবাদের মতো—সাইকেলের পেছনে বসিয়ে।

কিন্তু গত এক সপ্তাহের রোদ যেন সেই ছন্দে বাধা দিয়েছে। সুইডেনে সাইকেল চালালে মাথায় হেলমেট পরতেই হয়। প্রচণ্ড রোদের মধ্যে সেই হেলমেট পরে দীর্ঘ পথ সাইকেল চালানো ছোট বাচ্চার জন্য যেমন কষ্টকর, বাবার জন্যও তেমনই।
হঠাৎ মনে হয়, এই দেশেও কি সত্যিই একটা এসির প্রয়োজন হতে পারে?

অথচ কয়েক মাস আগেই জানুয়ারিতে কলকাতায় গিয়ে এক-দুদিন মনে হয়েছিল, একটা হিটার থাকলে মন্দ হতো না!
প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বোধহয় এমনই। একই মানুষ, একই পৃথিবী—কিন্তু ঋতু বদলালে চাহিদাও বদলে যায়।
আমাদের বাড়ির আঙুরগাছের একটা অংশ সামনের বারান্দার ভেতরে খানিকটা ঢুকে গেছে। সেই বন্ধ বারান্দার ভেতরের তাপমাত্রা এমন হয়েছে যে, যে আঙুর সাধারণত আরও দু’মাস পরে আসে, তা এবার অনেক আগেই দেখা দিয়েছে। প্রকৃতি নিজের ক্যালেন্ডারও যেন নতুন করে লিখছে।

এই পরিবর্তন শুধু বাড়ির বাইরেই নয়, বাড়ির রান্নাঘরেও ধরা পড়ে। এই কয়েক সপ্তাহে দেখছি, আমাদের খাবারের তালিকায় মসুর ডাল, লাউজাতীয় সবজি, সালমন, সিবাস, সিব্রিমের মতো মাছের হালকা ঝোল বেড়ে গিয়েছে। প্রবাসী বাঙালি বাড়িতে সপ্তাহে চার-পাঁচ দিন চিকেন হওয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু গরম বাড়লে শরীরও যেন নিজের মতো করে খাবার বেছে নিতে শেখে। পৃথিবী যুগে যুগে প্রমাণ করেছে—খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, ঘরবাড়ি, জীবনযাত্রা—সবকিছুই শেষ পর্যন্ত প্রকৃতিই ঠিক করে দেয়, মানুষ শুধু তার সঙ্গে মানিয়ে নেয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, ইউরোপ বর্তমানে পৃথিবীর দ্রুততম উষ্ণায়নশীল অঞ্চলগুলোর একটি। এখানে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। তাপপ্রবাহ, দাবানল এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে। গ্রেটা থুনবের্গের দেশ সুইডেনে বসে বিশ্ব উষ্ণায়নের এই পরিবর্তনকে খুব কাছ থেকে দেখা যায়। ইউরোপবাসী যেমন ৯-১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে কলকাতা তথা বাংলার মানুষকে দেখে অবাক হয়— এত ঠান্ডায়ও মানুষ কীভাবে থাকে?— ঠিক তেমনই কলকাতাও নিশ্চয়ই ৩৫ ডিগ্রির এই ইউরোপের গরম-গরম খবরকে প্রথমে একটু বাড়াবাড়ি বলেই মনে করবে।

কিন্তু এই গরমের গল্প আসলে শুধু তাপমাত্রার গল্প নয়।
এটি বদলে যাওয়া পৃথিবীর গল্প।
এটি মানুষের অভ্যাস বদলে যাওয়ার গল্প।
এটি প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের নতুন করে মানিয়ে নেওয়ার গল্প।