‘সবুজের অভিযান’ করে শুধুমাত্র গাছ লাগালেই পরিবেশ রক্ষা হয় না। যে-গাছগুলি লাগানো হল, সেগুলিকে বাঁচানোও জরুরি। সম্প্রতি এ-শিক্ষা দিয়েছে— আফ্রিকার ‘গ্রেট গ্রিন ওয়াল’ প্রকল্প। কী এই প্রকল্প? ২০০৭ সালে ‘আফ্রিকান নেশনস’-এর উদ্যোগে, উত্তর আফ্রিকার সাহারা মরুভূমির বিস্তার রোধ করতে, পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল একাধিক গাছ লাগানোর, যা মূলত কাজ করবে এক ধরনের ‘বৃক্ষ-প্রাচীর’ হিসেবে।
জাতিসংঘের ‘মরুকরণবিষয়ক কনভেনশন’ (‘UNCCD’)-এর হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রায় ৪০ শতাংশ স্থলভাগ কোনও-না-কোনও মাত্রায় ভূমি-অবক্ষয়ের শিকার। আফ্রিকা এই সংকটের অন্যতম কেন্দ্র। বিশ্বউষ্ণায়নের প্রকোপে ক্রমপরিবর্তমান জলবায়ু, আফ্রিকার সাহেল ও সংলগ্ন অঞ্চলের উর্বরভূমিকে গ্রাস করছে ক্রমাগত। সাধারণ মানুষের জীবন-চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। সে-কারণে ‘আফ্রিকান ইউনিয়ন’ সিদ্ধান্ত নেয়, কৃত্রিমভাবে এই অঞ্চলে গাছ লাগাতে হবে, যা রোধ করবে সাহারা মরুভূমির বিস্তার। পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানীরা এই প্রকল্পকে বলেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জীবন্ত কাঠামো।’
মূলত, আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা নেওয়া হলেও, সাহেল থেকে জিবুতি পর্যন্ত এই সবুজ-প্রাচীরের বিস্তার, যার মধ্যে রয়ছে— উত্তর আফ্রিকার একাধিক দেশ। এই প্রকল্পর সূচনা ২০০৭ সালে হলেও, এর মূল বীজ রোপিত হয়েছিল সাতের দশকে। ১৯৬৮ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত সাহেল অঞ্চলে ভয়াবহ খরা দেখা দেয়। খরার প্রকোপে সাহেল অঞ্চলের বহু মানুষ প্রাণ হারান, বহু মানুষ নিজেদের বাসস্থান ছেড়ে অন্য অঞ্চলে পাড়ি দেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই, আফ্রিকার অন্য অঞ্চলগুলোতে জনসংখ্যার চাপ বাড়তে থাকে। বিরাট অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়। সে-সময় থেকেই আফ্রিকান ইউনিয়ন-সহ বিশ্বের তাবড় পরিবেশবিদ-বিজ্ঞানীরা, আফ্রিকার এই অঞ্চলে সাহারা মরুভূমির বিস্তার ও সার্বিক মরুকরণ রোধের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেন। আদপে ‘গ্রেট গ্রিন ওয়াল’ প্রকল্পের মূল খসড়া তৈরি হয়েছিল ২০০৫ সালে। সে-বছর নাইজিরিয়ার তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ওলুসেগুন ওবাসাঞ্জো এবং অন্যান্য আফ্রিকান নেতারা একটি দীর্ঘ ‘সবুজ বেষ্টনী’ তৈরির প্রস্তাবনা করেন। ২০০৭ থেকে ‘গ্রেট গ্রিন ওয়াল’ নাম দিয়ে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। পরিকল্পনা করা হয়েছিল— সবুজ বেষ্টনীটির দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৮,০০০ কিলোমিটার, প্রস্থ প্রায় ১৫ কিলোমিটার। শুরুতে সেনেগাল থেকে জিবুতি পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে, ১১-টি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল এই প্রকল্পের আওতায়। দেশগুলি যথাক্রমে— মৌরিতানিয়া, মালি, বুরকিনা ফাসো, নাইজার, নাইজিরিয়া, চাদ, সুদান, ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া। পরবর্তীকালে প্রকল্পর কার্যক্রম বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে, আফ্রিকার ২০-টিরও বেশি দেশ এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত হয়।

কিন্তু পরিকল্পনা যেমনভাবে করা হয়, বাস্তবে নানা কারণে তা সবসময়ে রূপায়িত হয় না; বিশেষ করে তা যখন প্রকৃতির বিরুদ্ধে প্রকৃতিকে বাঁচানোর জন্যই মানুষের লড়াই। যথারীতি হলও তাই! এ-প্রসঙ্গে আসার আগে সাহারা মরুভূমি কেন আয়তনে বেড়ে, আফ্রিকার অন্য উর্বর অঞ্চলকে গ্রাস করছে, বিশেষ করে সাহেল অঞ্চলকেই কেন এই প্রকল্পের কেন্দ্রস্থল হিসেবে বেছে নেওয়া হল, সে-বিষয়ে জানা জরুরি।
‘সাহেল’ শব্দটি এসেছে আরবি ‘সাহিল’ থেকে, যার অর্থ ‘তীর’ বা ‘সীমান্ত’। এটি সাহারা মরুভূমি ও আফ্রিকার সাভানা অঞ্চলের মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ আধা-শুষ্ক অঞ্চল। অর্থাৎ, এর উত্তরে শুষ্ক মরুভূমি এবং দক্ষিণে আর্দ্র সাভানা অঞ্চল। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৫,৪০০ কিলোমিটার। পশ্চিমে সেনেগাল থেকে পূর্বে সুদান ও ইরিত্রিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এই অঞ্চল, পৃথিবীর অন্যতম জলবায়ু-সংবেদনশীল এলাকা। এদিকে, পৃথিবীর বৃহত্তম উষ্ণ মরুভূমি সাহারা, আয়তনে যার বিস্তৃতি ৯.২ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার। বিগত কয়েক শতাব্দী ধরে জলবায়ু-পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাত কমে আসা, দীর্ঘস্থায়ী খরা, অতিরিক্ত কৃষিভূমিচারণ, নির্বিচারে জঙ্গল কাটা— এসব কারণে সাহারার বিস্তার ধীরে-ধীরে দক্ষিণমুখী হতে থাকে। ‘জাতিসংঘ’-র দেওয়া তথ্য বলছে, আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল এমন নানা কারণে পৃথিবীর অন্যতম বিপন্ন পরিবেশগত এলাকা হয়ে উঠেছে।

এখানকার কোটি-কোটি মানুষ কৃষি ও পশুপালনের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু উর্বর জমি দ্রুত অনুর্বর হয়ে যাওয়ায়— খাদ্যসংকট, দারিদ্র এবং অভিবাসনের প্রবণতা বাড়তে থাকে। তাই গাছ লাগালেও— বাৎসরিক কম বৃষ্টিপাত (১০০-৩০০ মিলিনমিটার), ৪৫ ডিগ্রির কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া অতিরিক্ত তাপমাত্রা, সর্বোপরি— অতিরিক্ত ভূ-চারণ করায়, মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ অত্যন্ত কমে যাওয়া— এই প্রকল্পের অগ্রগতির পক্ষে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। ফলত, প্রায় চার লক্ষ চারা রোপণ করা হলেও, তা কয়েক বছরের মধ্যেই মারা যায়। এই ঘটনার ফলে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, এই প্রকল্পকে বাস্তবায়িত করতে গেলে প্রাথমিকভাবে মরুভূমির বিরুদ্ধে নয়, বরং লড়াই করতে হবে জমির অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে।
এই প্রকল্প প্রাথমিকভাবে ব্যর্থ হওয়ার আরও নানা কারণ ছিল। প্রথমত, স্থানীয় প্রজাতির বাইরে বহু গাছ লাগানো হয়, যা মরুভূমি অঞ্চলের তীব্র জলবায়ু সহ্য করতে পারেনি। স্থানীয় অঞ্চলের মানুষরা এ-প্রকল্পর সঙ্গে প্রাথমিকভাবে যুক্ত ছিলেন না, ফলত প্রাথমিক যত্ন না নেওয়াও চারাগুলি মারা যাওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ-অঞ্চলের মানুষের জীবিকা কৃষি-নির্ভর, তাই তাঁদের গবাদি পশুও চারাগুলি খেয়ে প্রভূত ক্ষতি করেছিল। এছাড়া, আন্তর্জাতিক অর্থের জোগান আটকে যাওয়া, মালি, নাইজার, চাদ, সুদান-সহ বহু দেশের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, সামরিক অভ্যুত্থান ও সন্ত্রাসবাদ এই প্রকল্পকে দীর্ঘায়িত করেছিল। এই ব্যর্থতার পেছনে অন্য একটি বৈজ্ঞানিক কারণও রয়েছে। পরিবেশবিদরা বনলছেন, বনভূমির বিস্তার কখনওই সরলরেখায় (লিনিয়ার) মেনে সম্ভব নয়। তাই প্রকল্প বাস্তবায়িত হতে পারছে না। পরিবেশবিদ টনি রিনাউডো, যিনি বিশ্বে ‘ফরেস্ট মেকার’ নামে পরিচিত, বলেছেন— ‘দ্য সলিউশন ওয়াজ নট প্ল্যান্টিং মিলিয়নস অফ ট্রিজ, দ্য সলিউশন ওয়াজ ডিসকভারিং দ্য ফরেস্ট দ্যাট ওয়াজ আন্ডারগ্রাউন্ড’ অর্থাৎ, নতুন গাছ লাগানোর চেয়ে মাটির নীচে বেঁচে থাকা পুরনো শিকড়কে পুনরুজ্জীবিত করাই বেশি কার্যকরী হবে।

টানা তিন বছর ব্যর্থতার পর, বদলানো হয় এই প্রকল্পর পরিকল্পনা-নীতি। শুরু হয়, ‘ইন্টিগ্রেটেড ল্যান্ডস্কেপ অ্যাপ্রোচ’ পদ্ধতিতে গাছ লাগানো। যেখানে সরলরেখা ধরে গাছ লাগানো হলেও, বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া হয় গাছেদের বিস্তার। অর্থাৎ, ‘গ্রেট গ্রিন ওয়াল’-এর ম্যাপ আগের মতো ‘সম্পূর্ণ সরলরৈখিক’ থাকে না। জল সংরক্ষণ থেকে শুরু করে, রোপণ করা হয় স্থানীয় প্রজাতির গাছ, যা সে-অঞ্চলের জলবায়ুর সঙ্গে সাযুজ্য রেখে বেড়ে উঠবে, স্থানীয় কৃষকদের সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি গড়ে তোলা হয় একটা সমান্তরাল স্থায়ী অর্থনীতি, যা কিছুটা হলেও গতি দেয় এই প্রকল্পকে। এছাড়া, ‘এফএমএনআর’ (‘ফার্মার ম্যানেজ্ড ন্যাচেরাল রিজেনারেশন’) পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়, যেখানে পরিবেশবিদ টনি রিনাউডো-র পন্থা অনুসরণ করে শুরু হয়, নতুন চারা লাগানোর পরিবর্তে পুরনো শিকড় থেকে গাছ বৃদ্ধি করা। নাইজারে এই পদ্ধতির মাধ্যমে প্রায় ৫০ লক্ষ হেক্টরেরও বেশি জমি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে এবং ২০ কোটিরও বেশি গাছ পুনরুজ্জীবিত হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা জানিয়েছে।
২০২১ সালে জাতি সংঘ ও বিশ্ব ব্যাঙ্ক আয়োজিত— ‘ওয়ান প্ল্যানেট সামিট’-এ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, ‘গ্রেট গ্রিন ওয়াল’-এর জন্য ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়। ২০৩০ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের লক্ষ্য ১০ কোটি হেক্টর ভূমি পুনরুদ্ধার, জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা, ২৫ কোটি টন কার্বন সংরক্ষণ, এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
শুরু হয়, ‘ইন্টিগ্রেটেড ল্যান্ডস্কেপ অ্যাপ্রোচ’ পদ্ধতিতে গাছ লাগানো। যেখানে সরলরেখা ধরে গাছ লাগানো হলেও, বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া হয় গাছেদের বিস্তার। অর্থাৎ, ‘গ্রেট গ্রিন ওয়াল’-এর ম্যাপ আগের মতো ‘সম্পূর্ণ সরলরৈখিক’ থাকে না।
আসলে ‘গ্রেট গ্রিন ওয়াল’ শুধুমাত্র গাছ লাগানোর প্রকল্প নয়, মৃতপ্রায় বনভূমি উদ্ধারের জন্য মানুষের এক জীবন-মরণ সংগ্রাম। বিগত ২০২০ সালে সাহেল অঞ্চল থেকে প্রায় ২৫ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তখনও তো এই প্রকল্প চলছিল, তাহলে মানুষ বাস্তুচ্যুত হলেন কেন? সঠিক কারণ অজানা। আসলে একটা অঞ্চলের স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়লে, সে-অঞ্চলকে পুনরুদ্ধার করা যথেষ্ট সময় ও শ্রমসাধ্য ব্যাপার। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিদ ইয়াদভিন্দর মালহি এক আলোচনায় মন্তব্য করেন— ‘রেস্টোরেশন ইজ নট সিম্পলি প্ল্যান্টিং ট্রিজ; ইট ইজ রিবিল্ডিং ইকোসিস্টেম্স।’ বাস্তুতন্ত্রেরর পুনর্নির্মাণই এখন এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আশার কথা এই যে, মানুষ হাল ছাড়ে না। মানুষই তো অসাধ্য সাধন করে, এই একুশ শতকে তাঁরা গাছের পাঁচিল বানাচ্ছে। অন্তত কয়েকজন মানুষ তো লড়ে যাচ্ছেন আগামীর জন্য! আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলের এই প্রকল্প যদি সফল হয়, তাহলে তার সুফল আফ্রিকাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সারা বিশ্বর জলবায়ুর ক্ষেত্রেই এক ইতিবাচক নিদর্শন হয়ে থাকবে।



