আত্মবিশ্বাসের প্রতীক

ফুটবলের ইতিহাসে এমন কিছু দল থাকে, যাদের লড়াই শুধু প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নয়; তাদের লড়াই ভাগ্যের বিরুদ্ধে। পরিস্থিতির বিরুদ্ধে। অবহেলার বিরুদ্ধে। এমনকী কখনও-কখনও, পুরো ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে সেনেগালকে দেখে ঠিক সেই কথাটাই মনে হল। মাঠে তারা খেলল বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে, কিন্তু বাস্তবে যেন তাদের লড়তে হল আরও অনেক কিছুর সঙ্গে। বিশ্বকাপের আগে থেকেই যেন একের পর এক পরীক্ষা অপেক্ষা করছিল ‘লায়ন্স অফ তেরঙ্গা’-দের জন্য।

খানিকটা পিছিয়ে যাই। কয়েক মাস আগেই তারা জিতেছিল আফ্রিকা কাপ অফ নেশনস। মরক্কোর বিরুদ্ধে সেই ফাইনাল ছিল রুদ্ধশ্বাস। কিন্তু ম্যাচের এক বিতর্কিত পেনাল্টি-সিদ্ধান্তকে ঘিরে তৈরি হয় তীব্র উত্তেজনা। পরে দীর্ঘ প্রশাসনিক বিতর্কের পর CAF সেই ম্যাচ নিয়ে তদন্ত করে এবং সেনেগালের জেতা চ্যাম্পিয়নশিপ শিরোপা বাতিল করে মরক্কোকে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করে। ঘটনাটি নিয়ে আজও আফ্রিকার ফুটবলমহলে বিতর্ক থামেনি। অনেক সেনেগাল সমর্থকের কাছে সেটি শুধু একটি ট্রফি হারানো নয়, তাদের সম্মান হারানোর অনুভূতিও।

আরও পড়ুন: ইরানের নিরন্তর যুদ্ধ ছিল মাঠের বাইরে! লিখছেন রোদ্দুর মিত্র…

এরপর সামনে আসে আরও এক অস্বস্তিকর খবর। জাতীয় দলের কোচ প্রকাশ্যে জানান, দীর্ঘদিন তাঁর বকেয়া পারিশ্রমিক দেওয়া হয়নি। পরে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে, একাধিক ফুটবলারের প্রাপ্য বোনাস নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। একটি দেশের জাতীয় দল যখন বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নেয়, তখন তাদের চিন্তা থাকে প্রতিপক্ষকে নিয়ে। কিন্তু সেনেগালের বেলায়? দলের ফুটবলারদের চিন্তা করতে হয়েছে নিজেদের প্রাপ্য নিয়েই! অবিশ্বাস্য যা, তবুও তারা মাঠে নেমেছে। হাসিমুখে। দেশের পতাকা বুকে নিয়ে।

বিতর্ক পিছু ছাড়েনি। বিশ্বকাপ খেলতে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর, বিমানবন্দরে অতিরিক্ত নিরাপত্তা-তল্লাশি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরে তাদের আবাসন নিয়েও আলোচনা শুরু হয়। মাঠে নামার আগেই যেন বার বার মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছিল যে, এই পথটা তাদের জন্য অন্যদের মতো সহজ নয়। কিন্তু ইতিহাস? ইতিহাস বলে, সেনেগাল কোনওদিনই সহজ রাস্তার দল ছিল না। নয়ের দশকের শেষ দিকে আফ্রিকার ফুটবল যখন নতুন করে নিজের পরিচয় তৈরি করছে, তখন সেনেগালও নিজের ভিত গড়ছিল। নীরবে।

তারপর এল ২০০২। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ। প্রতিপক্ষ, তৎকালীন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স। পৃথিবী ভেবেছিল, এটা হবে চ্যাম্পিয়নদের আরেকটি সহজ জয়। কিন্তু পাপা বুবা দিয়োপের সেই এক গোল শুধু একটি ম্যাচ জেতায়নি, আফ্রিকান ফুটবলের আত্মবিশ্বাস বদলে দিয়েছিল। তারপর বহু উত্থান-পতন। হতাশা। আবার ফিরে আসা। কিন্তু সেই বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে সেনেগাল প্রমাণ করেছিল, বড় হওয়ার জন্য বড় ইতিহাস লাগে না। সাহসই যথেষ্ট।

২০২৬। নকআউট পর্বে সামনে বেলজিয়াম। ছিয়াশি মিনিট পর্যন্ত স্কোরবোর্ড বলছিল— সেনেগাল ২, বেলজিয়াম ০। তবে ফুটবল যে কখনও-কখনও নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করবে, এতে আর আশ্চর্য কী! ম্যাচ বদলাতে শুরু করল। অতিরিক্ত সময়। তারপর এল সেই বিতর্কিত পেনাল্টি। ফুটবলে অনেক সিদ্ধান্তই বিতর্ক তৈরি করে, এই সিদ্ধান্তও তার ব্যতিক্রম নয়। অনেকের কাছে তা ছিল ৫০-৫০ পরিস্থিতি, যা আবারও সেনেগালের বিপক্ষে গেল। শেষ বাঁশি বাজল। স্কোরবোর্ডে লেখা রইল পরাজয়।

কিন্তু সত্যিই কি সেনেগাল হেরেছে? একটা দল, যারা প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা, আর্থিক সমস্যা, বিতর্ক, সমালোচনা, মানসিক চাপ ইত্যাদি এই সব কিছু নিয়েও বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বুক চিতিয়ে লড়ে, তাদের কি শুধু ফলাফলের হিসেবে বিচার করা যায়? যায় না। সেনেগাল আবারও মনে করিয়ে দিল, ফুটবল শুধু ট্রফির গল্প নয়। ফুটবল চরিত্রেরও পরীক্ষা। এই দলের ফুটবলারদের চোখের জল শুধুই একটা ম্যাচ হারার কান্না নয়। ওই কান্নার মধ্যে মিশে আছে অপূর্ণ স্বপ্ন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। দেশের জন্য সব কিছু উজাড় করে দেওয়ার তৃপ্তি। আর আছে আবারও ফিরে আসার প্রতিজ্ঞা। সাদিও মানে, কালিদু কুলিবালি, এদুয়ার মেন্ডি, ইদ্রিসা গানা গেইয়ের মতো ফুটবলাররা সেনেগালকে শুধু একটি শক্তিশালী দল বানাননি, গোটা আফ্রিকার আত্মবিশ্বাসের প্রতীক বানিয়েছেন।

সিংহেরা পরাজয়ে মাথা নত করে না। তারা ক্ষত বয়ে নিয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে। কারণ ইতিহাস বলে— সবচেয়ে ভয়ংকর সিংহ সে-ই, যে একবার আহত হয়েছে, কিন্তু হাল ছাড়েনি। সেনেগালও হয়তো এভাবেই একদিন ফিরে এসে ঐতিহাসিক কিছু ঘটিয়ে ফেলবে না, কে বলতে পারে!