‘মহাযুদ্ধ আর মন্বন্তরের পটভূমিতে তাঁর বিকাশ’— নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় সম্পর্কে এ-কথা বলেছিলেন জগদীশ ভট্টাচার্য। কেমন কালো সেই সময়? জগদীশ ভট্টাচার্য লিখছেন, ‘সেদিন সর্বগ্রাসী যুদ্ধের তাণ্ডবে ভেঙে পড়েছে জীবনের খেলাঘর। ভারতের বুকে সাম্রাজ্যবাদের নাভিশ্বাস উঠেছে; সঙ্গে সঙ্গে শবলুব্ধ গৃধ্রদের ঊর্ধ্বস্বর বীভৎস চিৎকারে মুখরিত হয়ে উঠছে আকাশ-বাতাস; একদিকে যুদ্ধের জুয়াখেলায় কাগজিমুদ্রার ছিনিমিনি, অন্যদিকে চোরাকারবার আর কালোবাজারের নারকীয় অনাচারে পর্যুদস্ত দিনযাত্রা; সারা বাংলা জুড়ে নিরন্ন বিবস্ত্র নরনারীর গগনভেদী হাহাকার, আর তারই বুকে বসে মুনাফাশিকারী মজুতদার ও ব্যবসায়ীদের দানবীয় অট্টহাসি। মহাপ্রলয়ের সন্ধিলগ্নে যেন নরক গুলজার!’
আর নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় নিজে কী লিখছেন? গল্প লেখার মূল স্রোতের সন্ধান করতে বসে, নিজের ‘সাহিত্যে ছোটগল্প’-র প্রায় গোড়াতেই বলে বসছেন, মানুষের ইতিহাস যবে থেকে আরম্ভ হয়েছে, সেই শুরুর দিনটি থেকেই গল্পের সূত্রপাত। বলছেন, ‘প্রস্তর যুগের পাহাড়ের কালো গুহার ভিতর বড়ো বড়ো কাঠের কুঁদো জ্বালিয়ে আমাদের শিকারজীবী পিতৃপুরুষেরা গোল হয়ে বসেছে একসঙ্গে; আগুনের রক্তাভ আলোয় শৈল-প্রাকারে তাদেরই আঁকা হরিণ ও বাইসন শিকারের বিচিত্র চিত্রকলা রচনা করেছে অপরূপ পরিবেশ। বাইরে ফার্ণজাতীয় দীর্ঘ তরুণ ঘন অরণ্যে ঝড়ের হাওয়া মাতামাতি করছে আর বনের কলরোলকে ছাপিয়ে ভেসে আসছে ক্ষুধাতুর নরখাদক হিংসার জন্তুর গর্জন। সেই সময় ভিতরের ঘনীভূত নিরাপত্তার মধ্যে বসে কথাকুশল প্রাজ্ঞেরা গল্প বলে চলেছে।’

আরও পড়ুন: কেবল শিল্পী নন, সাধক ছিলেন অরুণ দত্ত! লিখছেন মধুরিমা দত্তচৌধুরী…
এখানে আমি আলাদা করে নজরটান দেব ‘শিকারজীবী পিতৃপুরুষ’ আর ‘ক্ষুধাতুর নরখাদক হিংসার জন্তু’— এই দু’টি প্রতিপক্ষের ছবিতে। অর্থাৎ, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় নিজেই মনে করতেন, মানুষের এই গল্পকথনের নেশা, অভ্যাস বা জৈবিক পরম্পরার মূলে কোথাও না কোথাও রয়ে গেছে আদিম হিংসা আর হননের ভয়াবহ জীবন। পাশবিক সাম্রাজ্যের সেই অরণ্য-অধিকার সঞ্চারিত হয়ে চলেছে কাহিনিকারের রক্তে, মগ্নচৈতন্যে। উপরন্তু, তিনি এমন সময়ের জাতক, যখন নিসর্গের বুকে হাড় বাজিয়ে-চলা মৃত্যুপরোয়ানা দিকে-দিকে অস্থির করে তুলেছে সুশীল, সুস্থির, সুচারু সামাজিকতাকে। মানুষের মুখের ওপর থেকে নিমেষে সরে যাচ্ছে ভদ্রতার শৌখিন চাদর আর মুহুর্মুহু বেরিয়ে পড়ছে ‘ছিনিয়ে খায়নি কেন’-র মতো দুর্নিবার সত্যের পিশাচকঙ্কাল।

১৯১৮ সালে যাঁর জন্ম, তিনি আগুনে-পোড়া রক্তেভেজা সময়ের দলিললিপি দেখবেন, এই ভবিতব্য নিয়েই এসেছেন। বড় হওয়ার সময়টুকু তাঁর জুড়ে রইল যে যৌবনের উদ্দীপ্ত দিনপঞ্জি, তাতে কোনও লগনচাঁদা উত্তরাধিকারের সোনারুপোর চামচের স্বপ্ন যে লেগে নেই, এ-কথা বলার জন্য না লাগে ট্যারট কার্ড, না লাগে তেইরেসিয়াস-এর মধ্যে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন অন্তর্চক্ষু। কিন্তু অন্ধযুগের কবন্ধ সময়ে দাঁড়িয়ে অন্ধ অয়দিপাউস-এর মতোই কাতর অভিশপ্ত বিষ তাঁর লেখার হাড়ে-পাঁজরে, মাসে-মজ্জায় যেভাবে লেগে রইবে ভবিষ্যতে, তাকে শুধুই কালো সময়ের অবশ্যম্ভাবী প্রসব বলেও উপসংহার টেনে দেওয়া যায় না! অতীত আদিমতার রেশ আর আক্রান্ত সময়ের মহামারী পেরিয়েও আরও ঘনীভূত অন্ধকারের দিনপঞ্জি রয়ে যায় তাঁর লেখায়। বিকৃত মন, বিকৃত শরীর, বিকৃত সময়ের কুটিল জটের মধ্যে বারবার বাঁকা চোখে তাকিয়েছেন লেখক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, থেকে থেকে অন্ধকারে জ্বলে উঠেছে তাঁর ভ্রূকুটি, ছারখার করা সময়ের মধ্যে বারবার এক-একটি রক্তমাখা কালো নিশান হয়ে থেকেছে তাঁর একের পর এক গল্প— মধুর রসে যাদের বিস্তার নয়, যারা ভয়ংকর, অসহ্য এবং ক্ষেত্রবিশেষে ঘৃণ্যও বটে।
‘মর্গ’ গল্পটি যেমন। একের পর এক চাবুকসম্ভার সাজানো গল্প জুড়ে। গল্প শুরু হয় এক ছোট মফস্সল শহরের এক বেমানান বাড়াবাড়ি দিয়ে। ওইটুকু একটা এলাকায় পরপর দু’খানা চালকল বসে যাওয়াটা শহরের গৌরব, না কি শীর্ণ চেহারায় নাটকের পালোয়ান সাজতে যাওয়ার মতো বিড়ম্বনা, সেকথা পাঠক ভাল করে ঠাহর করে ওঠার আগেই তাদের সামনে এসে পড়ে আর এক না-মানানসই গলার কাঁটা— মন্মথ ডাক্তারের বউ। চার আনা, ছ-আনা করে যৎসামান্য যার রোজগার, শহরের একমাত্র ম্যাট্রিক পাস মেয়ে, সার্কল অফিসারের স্ত্রী-র চেয়েও সুন্দরী মেয়ে কেন তার বউ হবে? এই নিয়ে ঈর্ষা আর চাপা মুখভারের আপাত-রসিকতা বেশিক্ষণ টিকে থাকে না, কারণ খানিক পরেই দেখা যায়, ভয়াবহ এক ট্রেন দুর্ঘটনায় মন্মথ গেছে পঙ্গু হয়ে, তার বাঁ-দিকটা প্রায় অসাড়। কিন্তু এই খবরটা নিতান্ত সাধারণ আকস্মিকতায় কিন্তু কথক পেশ করেন না, সঙ্গে লিখে দেন— ‘কে বলে ইচ্ছাশক্তির দাম নেই একালে? অন্তত সমবেত ইচ্ছাশক্তির যে প্রকাণ্ড একটা জোর আছে, তার প্রমাণ পাওয়া গেল… একটা ভয়ংকর দুর্ঘটনায় মড়ার স্তূপের মধ্য থেকে বেরিয়ে এল প্রায় পিণ্ডাকার মন্মথ।’ যেন এই সমবেত ইচ্ছাশক্তির বলেই মন্মথর এই ভয়াবহ পরিণতি!
তার স্ত্রী মমতার যাবতীয় সৌন্দর্য, সাবলীলতা আর মেধার অনধিকার অধিকারী হওয়াটাই যেন তার জীবনের একমাত্র কাল! কিন্তু গল্পের শ্বাসরোধী ভয়াবহতা এখানেও শেষ হয় না! মমতা চাকরি নেয় শহরের সেই চালকলেই, আর তার রূপসৌন্দর্যের প্রত্যাশী হয়ে বসে চালকলেরই মালিকের ছেলে অনিরুদ্ধ। যদিও সেই প্রত্যাশায় প্রেম নেই, আকুলতা নেই, ভালবাসা নেই, আছে শুধু অনন্ত আকাঙ্ক্ষা আর তাকে ছলেবলেকৌশলে হাসিল করার পরাক্রম। ক্ষমতা দিয়ে নারীকে অধিকার করার এই তীব্রতার কথা মমতাও বোঝে— ‘মমতা জানে, যেদিন সুযোগ আসবে, সেদিন মুহূর্তের জন্যেও দ্বিধা করবে না অনিরুদ্ধ। ভয় করবে না একবিন্দু প্রতিবাদের, কণামাত্র প্রতিরোধের। হাত বাড়িয়ে ধরবে, মুঠো করে আঁকড়ে ধরবে, শক্ত আঙুলের ফাঁসে ফাঁসে একটা পায়রার নরম গলাকে নিষ্পেষিত করে ফেলবার মতো পিষ্ট করে দেবে তাকে।’ মমতার তাই কোনও প্রতিরোধই যেন নেই। অনিরুদ্ধ তার কাছে যা চায়, যেভাবে চায়, কোনও দ্বিরুক্তি পর্যন্ত না করে মূক, শ্রান্ত পুতুলের মতো তা করে চলে মমতা। তার আচরণে না আছে কোনও গ্রহণ করার উষ্ণতা, না আছে মেনে নেওয়ার কোনও বিরক্তি, না আছে প্রত্যাখ্যানের কোনও জ্বালা। নির্বিচারে ভবিতব্যকে যেন মেনে নিয়েছে সে। তার চরিত্রের উত্তুঙ্গ নির্বিকারতা ভয়াবহরকম অসহ্য হয়ে উঠেছে লাশকাটা ঘরের প্রতিবেশে— তাকে নিয়ে মাঠেঘাটে ঘুরে নিভৃত সময় ব্যয় করতে গিয়ে ঝড়ের মুখে পড়ে অনিরুদ্ধ যখন আশপাশে কিছু আর না পেয়ে মমতাকে সুদ্ধু ওই লাশকাটা ঘরেই আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়, কাহিনি জটিল মোড় নিতে থাকে এইখান থেকেই।
স্পষ্ট বোঝা যায়, এ ঘরের পরিচয় মমতার কাছে অজানা ছিল না, অনিরুদ্ধর মতো সে কিন্তু অজানা আচম্বিতে এখানে ঢুকে পড়েনি! শুধু তাই নয়, ঘরের পচা গন্ধ আর বিদ্যুৎচমক যখন ঘরের পরিচয়টি স্পষ্ট করে দেয় অনিরুদ্ধর কাছে, তখন বেরিয়ে যেতে চাইলেও, মমতা বাধা দেয়। বস্তুত এই প্রথম কাহিনিতে তাকে বাধা দিতে, বা অন্তত সক্রিয়ভাবে কিছু একটা করতে দেখা যায়। মৃত পচনশীল লাশের সঙ্গে যেন তার অভ্যস্ত নিত্য সম্পর্ক— এমন স্বাভাবিকতা গলায় ছুঁইয়ে সে বলে, ‘গন্ধ? ও কিছু না। মানুষ পচলে ওরকম গন্ধই বেরোয়।’ বিদ্যুতের আলোর দমকে অনিরুদ্ধ যখন দেখে ফেলে, ‘পচ ধরে-আসা একটা বীভৎস দেহ— পেটটা দু-ফাঁক করে চেরা’, তখনও মমতা তীব্র মিষ্টি গলা নিয়ে বলে চলে, ‘মড়া কাটলে ওর চেয়ে ভালো দেখায় না। কী করা যাবে বলুন।’ মমতার অনিচ্ছা, ঘৃণা বা প্রতিরোধের বালাই না রেখে একরকম জোর করে যে পরিণতির দিকে যাকে টেনে নিয়ে যেতে বসেছিল অনিরুদ্ধ, মমতাকে বাধ্য করছিল নিঘিন্নে নিষ্প্রশ্ন হতে, মমতার সেই চরিত্রই যেন আজ তার কাছে প্রেতবৎ হয়ে ওঠে। সে আর সহ্য করতে পারে না মমতাকে। অবশেষে ফেরার পথে, মমতার বাড়িতে এসে তার স্বামীকে দেখে পাণ্ডুর, বিবর্ণ হয়ে যায় সে। বুঝতে পারে মমতার আসল ঘৃণাহীন, নিরুত্তাপ হয়ে থাকার রহস্য। মন্মথকে দেখে তার মনে হয় যেন ‘সেই লাশকাটা ঘরের লাশটা আরো বিকৃত, আরো ভয়ংকর হয়ে উঠে বসেছে। মুখের একদিক বলে কিছু নেই। চোখের মতো কী একটা জিনিস ঠিকরে বেরিয়ে আছে, একরাশ থোরানো মাংস জমে আছে পিণ্ডাকারে। অস্বাভাবিক, অবিশ্বাস্য। একটা অমানুষিক বিভীষিকা।’ এইবার সত্যিকারের ঘৃণা জেগে ওঠে অনিরুদ্ধর। মনে হয়, মমতাও যেন এক জীবন্ত প্রেতিনী। আর যে হাতে মমতাকে স্পর্শ করতে চেয়েছিল সে, সেখানে লেগে আছে একতাল পচা মাংস। মনে করিয়ে দিই, গল্পের নাম ‘মর্গ’।

প্রায় একইরকম বীভৎসতা আর মনোবিকারের খণ্ডচিত্র লেগে থাকে ‘দুর্ঘটনা’ গল্পেও। সদ্যবিবাহিত যুগল বিভাস আর ইলা-কে দেখে যৌন ঈর্ষায় ছারখার হয়ে যায় ইন্দিরা চৌধুরী। ‘স্কুল-মিস্ট্রেস কুরূপা ইন্দিরা চৌধুরী’, মুখ পুড়ে যাওয়ায় যার চেহারা বীভৎস, রীতিমতো বিবমিষা উদ্রেককারী। আর বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না যে স্বাভাবিক যৌনজীবন তার নেই ঠিক এই কারণেই। ফলে বিভাস-ইলার সুখী আর তৃপ্ত যৌনতার আভাস লেগে ছিল তাদের যে বাহ্যিক দাম্পত্য প্রেমে, তা ঠিকই আগুন জ্বালিয়ে দেয় ইন্দিরার মনে। এক তুমুল প্রতিশোধের স্পৃহায় দু’জনকে এক কাল্পনিক দুর্ঘটনা আর প্রবঞ্চনার গল্প শোনাতে বসে সে। কাল্পনিক নামও বেছে নেয় ইচ্ছা করেই, ‘বিভাস’, পেশায় ডাক্তার। তার ইচ্ছাকৃত নির্বাচনের কথা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারে না ইলা আর বিভাস।
স্বামীর নামচরিত্রের সঙ্গে এই কাকতাল ইলাকে বিড়ম্বিত করে, অন্য নাম দিয়ে গল্প শুনতে চায় সে। অন্যদিকে আসল বিভাস ঘটনার গতিপ্রকৃতি কিছুই না বুঝে স্বাভাবিক গ্রহিষ্ণু মন নিয়েই জানায়, এই নামে তার তো কোনও আপত্তি নেই! অযথা গল্প শোনার মুখে বাধা তৈরি করতে চায় না সে। কিন্তু ক্রমশ গল্পের বিভাস আর আসল বিভাসের ভেদরেখা যেন মুছে যেতে থাকে গল্পের বয়ানে। অন্যের স্ত্রীর প্রতি আকাঙ্ক্ষা মেটাতে গিয়ে সেখানে প্রতিরোধের মুখোমুখি হয় গল্পের খলনায়ক। প্রতিহিংসাবশত মুখে মাখার ওষুধের নামে অ্যাসিড দিয়ে পুড়িয়ে দেয় তার মুখ। তারপর চিরতরে ফেরার হয়ে যাওয়া বিভাস ডাক্তারের এই কদর্য কাহিনির মধ্যে নিজের পোড়া মুখ আর পোড়া মন নিয়ে জ্বলজ্বল করতে থাকে প্রতিশোধলিপ্সু ইন্দিরা চৌধুরী আর ছটফট করতে থাকে খলনায়ক বনে যাওয়া বিভাস ডাক্তার।
একটা সময় আর সহ্য করতে পারে না বিভাস, তার মুখ কালো হয়ে ওঠে ক্রমশ, তীব্রভাবে বলে ফেলে, ‘থাক। আপনার গল্প আর ভালো লাগছে না, মিস চৌধুরী— মাপ করবেন।’ কিন্তু ততক্ষণে পৈশাচিক মিথ্যেকে সত্যি বলে হজম করার বিষপাচ্য নেশা ঢুকে পড়েছে ইলার মগজে। সে বলে, ‘না, না, ক্ষতি নেই। আপনি বলে যান।’ তার এই আত্মপীড়ন আসলে গভীর ফাটল ধরিয়ে দেবে তাদের এতদিনের নিষ্কলুষ সম্পর্কের মধ্যে, ঠিক যেটা চেয়েছিল ইন্দিরা চৌধুরী। গল্পের শেষে প্রায় হিস্টেরিক হয়ে ওঠা সন্দেহপ্রবণ ইলাকে পাগলের মতো বোঝানোর আর আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করতে থাকে বিভাস, আর আড়ালে ক্রূর হাসি হেসে যায় ইন্দিরা। তার যৌন বুভুক্ষা আর ইতরতা বেরিয়ে আসে এই বিকৃতির পথ ধরেই। গল্পের ডাক্তার বিভাসের অ্যাসিড-আক্রান্ত স্ত্রীর ভূমিকায় নিজেকে দেখার এবং দেখানোর এই বাসনার মধ্যে পরোক্ষ কাম চরিতার্থ করার যে কদাকার পন্থা আছে, তার আড়ালে মিথ্যে হয়ে যায় তার স্টোভ বার্স্ট করে পুড়ে যাওয়া ঝলসানো মাংসল মুখের প্রতি পাঠকের করুণা।
অসুন্দর নারী চেহারার প্রতি পুরুষের এই বিরক্তি আর বিবমিষা তাঁর বহু কাহিনির ভরকেন্দ্র হয়ে রয়ে গেছে প্রায় নির্ধারক দিকচিহ্ন হয়েই। ‘বন-জ্যোৎস্না’ গল্পেও যেমন পুলিশের তাড়া খেয়ে পালিয়ে-যাওয়া সঙ্গীহীন মহীতোষকে অজ্ঞান অবস্থায় যখন খুঁজে পায় পাহাড়ি মেয়ে শিউকুমারী, তখন বিপ্লবী আন্দোলনের শরিক এই তরুণ যুবাপুরুষের প্রতি উথলে ওঠে তার প্রেম, কিন্তু বিপরীতে মহীতোষ তাকে দেখে কীভাবে? ‘খর্বনাসিকা, ছোটো ছোটো চোখ। পরনের উড়ানিটার রং বিবর্ণ। ফর্সা মুখখানার ওপরে স্বাভাবিক অযত্নের একটা মলিন রেখা পড়েছে, গলার খাঁজে কালো হয়ে জমে আছে ময়লা। অপগতক্লান্তি, সুস্থ শিক্ষিত মহীতোষের যেন স্বপ্নভঙ্গ হয়ে গেল।’ এখানে ‘অপগতক্লান্তি’ শব্দটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই একটি শব্দের ব্যবহারই বুঝিয়ে দেয় অনেক কিছু।
দুর্ঘটনার কবলে পড়া ট্রেনের মধ্যে নিজে যে বেঁচে আছেন, তা ঠাহর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঠাহর হয়েছিল আরও একটি প্রাপ্তিযোগ। গলার কাছে এসে বিঁধছে যে হাতের অঙ্গুরীয়টি, তাঁর শরীরও এসে পড়েছে অস্বস্তিকর রকম কাছে। ভদ্রতার মুখোশ পরে সে বিষয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে যাওয়া মাত্রই কিন্তু ওই রক্তাক্ত, যন্ত্রণাকাতর মুহূর্তেও উলটো দিক থেকে ভেসে এসেছিল যৌন আশকারা দেওয়া আমন্ত্রণ— ‘কী হয়েছে? থাক না!’
বুঝিয়ে দেয় যে, নারীর সেবা, শ্রম, শুশ্রূষা পুরুষের শরীরের ক্লান্তি ঘোচানোর ক্ষমতা রাখতে পারে, কিন্তু শরীরের খিদে তাতে মেটে না। যতক্ষণ দেহে অপনোদনযোগ্য ক্লান্তির ছায়া আছে, ততক্ষণ আছে অপরিসীম নির্ভরতা। সেই নির্ভরতার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলেই শরীর বুঝে নিতে থাকে তার নিজস্ব সংকেত।
তবু, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় যেন পণ করেছেন, মানুষী অধঃপতনের শেষ অবধি ফেলে দেখবেন অনুসন্ধিৎসার অশ্লীল টর্চের আলো। আর সেজন্যই, এই প্রাথমিক ঘৃণা আর বিবমিষা ভরা দেহটির প্রতিও ক্রমশ এক জৈবিক আকর্ষণ সঞ্চারিত হয় মহীতোষের। তাকেই কি প্রেম বলে ভুল করে ফেলে শিউকুমারী? নইলে ফেরারি আসামি মহীতোষকে বাঁচানোর বিনিময়ে মাফিয়া বলদেও-এর কাছে নিজেকে সমর্পণ করবে কেন সে? শুধু মহীতোষের মুক্তিপরোয়ানা কেনার জন্য এই ধর্ষণপ্রস্তাব মহীতোষ নিজেও মেনে নিচ্ছে, আর রাতের আঁধারে শিউকুমারীকে ফেলে পালিয়ে যাচ্ছে নিজের ফেলে-আসা দলের পুরোনো সঙ্গীর কাছে, যাদের চোখে শিউকুমারী একটা পাহাড়ি মেয়ে ছাড়া তো আর কিছু নয়, তার প্রতি প্রেমটা মহীতোষের জীবনের একটা ঈষৎ নোনতা পর্ব ছাড়া তো আর কিছু নয়!
আবার এর বিপরীতে, সুন্দর নারীশরীরের প্রতি আকর্ষণের কাহিনিকে মুহূর্তে বীভৎস ট্রমায় রূপান্তর করার নজিরও নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্পে ভূরি ভূরি। ‘মর্গ’ গল্পের মমতার মতো এমন মেয়েদের মিছিল তাঁর লেখায় চলাচল করেছে বারবার। এর একেবারে শীর্ষনমুনা হয়ে থাকতে পারে ‘হাত’। ট্রেন দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে-ফেরা এক চরিত্রের মুখে গল্প বলার ভার। ট্রেনের আপার বার্থ থেকে সেই সফররাত্রে তাঁর আকাঙ্ক্ষাভরা লোলুপ নজর সেদিন বারবার গিয়ে পড়েছিল উলটোদিকের মিডল বার্থের সুন্দরীর দিকে, যাঁর ‘বাঁ হাতের অনামিকায় একটি আংটি, খুব বড়ো আংটি। মিনে করা লম্বা পাতটা রঙিন নখ পর্যন্ত এসে ছুঁয়েছে।’ ওই অস্বাভাবিক দীর্ঘ, প্রায় ছুরির মতো লম্বা আংটি পরিহিত একটি হাত বুকের মধ্যে জড়িয়ে নেওয়ার স্বপ্নও যে সে রাতে তাঁর সুষুপ্তি জুড়ে ছিল, সেকথাও ফলাও হয়ে এসেছিল গল্পে।
কিন্তু তার পরেই ঘুমের ঘোর কাটল তীব্র আওয়াজ, চিৎকার আর যন্ত্রণায়। দুর্ঘটনার কবলে পড়া ট্রেনের মধ্যে নিজে যে বেঁচে আছেন, তা ঠাহর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঠাহর হয়েছিল আরও একটি প্রাপ্তিযোগ। গলার কাছে এসে বিঁধছে যে হাতের অঙ্গুরীয়টি, তাঁর শরীরও এসে পড়েছে অস্বস্তিকর রকম কাছে। ভদ্রতার মুখোশ পরে সে বিষয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে যাওয়া মাত্রই কিন্তু ওই রক্তাক্ত, যন্ত্রণাকাতর মুহূর্তেও উলটো দিক থেকে ভেসে এসেছিল যৌন আশকারা দেওয়া আমন্ত্রণ— ‘কী হয়েছে? থাক না!’ মুহূর্তে রক্ত চলকে উঠেছিল উন্মাদনাময় পৌরুষের, আর আকাঙ্ক্ষা চিরন্তন করে রাখার আসায় প্রশ্ন করে ফেলেছিলেন, ‘আপনার মনে থাকবে এই রাতের কথা? আপনি এই রাতকে কোনোদিন ভুলবেন না?’ উত্তরে যে বীভৎস তীক্ষ্ণ হাসি ভেসে এল, তাতে সাড় ফিরে পেয়ে চমকে উঠে গলার কাছ থেকে সরিয়ে দিতে গেলেন ওই স্বপ্নের হাত।
‘আর সঙ্গে সঙ্গে আমার মুঠোর মধ্যে আংটিপরা হাতখানা উঠে এল। বুঝলাম— সঙ্গে সঙ্গেই বুঝলাম— মণিবন্ধের পরে সে হাতে আর কিছুই নেই, শুধু একতাল ছিন্ন মাংস!’

গল্পের মানুষটি সেই থেকে আর কিছুতেই সহ্য করতে পারেন না কোনও মানুষের হাত। ঘুমের ঘোরে গায়ে এসে-পড়া স্ত্রীর হাতকে ভয় পান, সভয়ে সরিয়ে দেন গলা জড়িয়ে ধরা বন্ধুর হাত, গা হিম হয়ে যায় কাঁধে কেউ হাত রাখলে। সমগ্র চৈতন্যের মধ্যে যেন তাঁর সত্যি হয়ে আছে শুধু ওই একখানি কাটা হাত, একদিন যা হয়ে উঠেছিল তাঁর স্বপ্নের আকুলতা, শেষে তা-ই হয়ে উঠেছে জীবনের শেষতক তাড়া করে ফেরা এক অনাম্নী আতঙ্ক।
এই আতঙ্ক আর বিবমিষাই তাঁর শ্বাসরোধী গল্পগুলোর মূল ড্রাইভ হয়ে উঠেছে বারবার। আর পুরুষকে তিনি তারই মধ্যে চিহ্নিত করেছেন আগ্রাসী এবং দখলপ্রিয় সংকীর্ণতার মধ্যে। খুনে প্রেমিকরা হামেশাই প্রবল যৌন অধিকারবোধ আর বিকৃতি নিয়ে তাঁর গল্পে সর্বনাশের শেষ চৌকাঠ অবধি ঠেলে নিয়ে গেছে নিজেদের, তার কথক হিসেবে লেখকের ভঙ্গি খানিক শ্লেষাত্মক রকম নিস্পৃহ। ‘জান্তব’ গল্পে যেমন পাহাড়ি ডেরায় বাসা বেঁধে থাকতে-থাকতে একটি কুকুরের সঙ্গে এক অদ্ভুত মিথোজীবিতার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে গুম্ফা লামা। কিন্তু এই পোষ্য আর প্রভুর উদ্বেগহীন নির্ভরতার সম্পর্ক দেখতে-দেখতে পাঠক যেই ক্রমশ নিশ্চিন্ত হবেন, অমনি ঘনিয়ে আসবে পরের পর দুর্যোগভরা দিনের শমন। ক্ষুদ্রপরিসর গুহার মধ্যে টিকে থাকার লড়াইয়ে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দী হয়ে ওঠে তারা। ‘প্রভু-ভৃত্যের সম্পর্ক আর নেই, এবার দুজনে দুজনার প্রতিদ্বন্দ্বী। কুকুরটার মধ্যে জেগে উঠেছে আদিম পাশবিকতা। যেমন করে পাহাড়ি অজগরের ওপরে সে ঝাঁপ দিয়ে পড়তে চায়, ঠিক তেমনই করে যেন তারও ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে। মারো কিংবা মরো।’ শেষ অবধি অবশ্য মরে না গুম্ফা লামা, মারে। প্রিয় পোষ্যটিকে। আর সেই সূত্রে ফিরে আসে তার পুরনো খুনী অতীত। নিজের দ্বিচারিণী স্ত্রী মইলি-কে খুন করে পাহাড়ি গুহায় ডেরা বেঁধে বসা গুম্ফা লামার হাতের রক্ত পুরনো হিসেব মেলায়। একইরকম প্লট মিলে যাবে ‘ঘাসবন’ গল্পেও, দ্বিচারিণী প্রেমিকা রুক্নিকে যখন খুন করে ফেলবে শ্যামলাল। নিজের বিয়ের খবর প্রেমিকের কাছ থেকে লুকিয়েছিল সে। যদিও ধরা পড়ার পর, ‘রুক্নি অস্বীকার করেনি কিছুই। তেমনই ঘাসবনের শান্ত কোমল ছায়ায় নিজেকে লীলাভরে এলিয়ে দিয়েছে শ্যামলালের বুকের ভেতরে, বলেছে, তোমাকে বলিনি, বললে তোমার কষ্ট হত। তা ছাড়া তোমার মতো জোয়ান মানুষটাকে পাওয়ার জন্যে ভারী লোভও হয়েছিল।’ কিছুই বলেনি শ্যামলাল উত্তরে। রুক্নিকে সরিয়েও দেয়নি। শুধু পরের দিন একবার শেষবারের মতো দেখা করতে চেয়েছে, আর আবদার করেছে রুক্নি যেন পরে আসে লাল শাড়িখানি। কথা রেখেওছে রুক্নি। আর তার সেই মাদকতাময় লাল শাড়ির টানে শ্যামলালের লেলিয়ে দেওয়া বুনো মোষের শিং ভিজে ওঠে সত্যিকারের লাল রক্তে।
মানুষের মধ্যে নিহিত জান্তবতার সন্ধান বারেবারে করবেন বলেই লিখেছেন ‘জান্তব’, ‘টোপ’, ‘হাড়’, ‘বন-তুলসী’, ‘পুষ্করা’, ‘নক্রচরিত’ কিংবা ‘দুঃশাসন’-এর মতো গল্প, বহু-আলোচিতও বটে সেসব। খুনে মানুষ-মানুষীর যৌনতা আর যৌন আগ্রাসনে ভরে আছে তাঁর লেখা। এত অন্ধকারের মধ্যে থেকে মাঝে মাঝে মনে হয়, এত ক্রূরতা, বক্রতা, জটিলতা আর এত অধঃপতনের কাহিনি লিখে উঠতে পারার জন্য যে বিপুল স্নায়বিক উত্তেজনার জোর এবং সহনক্ষমতা প্রয়োজন, তার রসদ পেলেন কীভাবে? যদিও যে-কোনও সাহিত্যিকের মতোই তাঁর ক্ষেত্রেও লেখকের নিজস্ব জগতের সঙ্গে গল্পের সম্বন্ধ চিহ্নিত করতে চাওয়াটা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাতুলতা, কিয়দংশে কষ্টকল্পনা আর স্বল্পাংশে সম্ভাবনাময়। গল্প ধরে ধরে সে অন্ধকারের খোঁজ যতই করি, কথকের কথনবিশ্বের সীমা ছাড়িয়ে সত্যিকারের ধূসর জগতে সেসব সম্ভাবনার বীজ খুঁজতে যাওয়ার সাহস সত্যিই কি আছে? অন্তত থাকতে পারে আর?




