ড্রাকুলা থেকে ক্লোন

‘You are not your body. It is just something you wear for a while,

because living in the earthplane is infinitely more meaningful and more

involved if you are encased in its trappings and subject to its rules.’

—P.M.H. Atwater

শরীর কি শুধুই রক্ত-মাংস-হাড়-মজ্জা-স্নায়ু-শিরা-ত্বকের সমষ্টি? মানুষ যে শরীর বয়ে নিয়ে বেড়ায়, তাই কি মানুষের অস্তিত্বের শেষ কথা? অবশ্যই নয়। মানব-অস্তিত্বের কেন্দ্রে রয়েছে তার চেতনা। চেতনার বিভিন্ন স্তর। কিন্তু সেই চেতনাকে শরীর বাদ দিয়ে অনুভব করা অসম্ভব। শরীর— যার মধ্যে প্রতিটি প্রাণীর আমিত্বের বসবাস, যে-কোনও প্রাণ যাকে নিজের বলে দাবি করে, সেই শরীর গঠনের ক্ষেত্রে তার কিন্তু কোনও ভূমিকাই থাকে না।

শুধুমাত্র মানবশরীর নিয়েই যদি কথা হয়, তাহলে বলা যায়, যে অলৌকিক এবং অত্যাশ্চর্য উপায়ে নতুন শরীর আবির্ভূত হয় পৃথিবীতে, সেই গোটা প্রক্রিয়ায় যার শরীর তার নিজস্ব কোনও অবদান থাকে না। কিন্তু মানুষ যে শরীর নিয়ে জন্মায় তার বাইরে তো প্রতিটি মানুষের থাকতে পারে একটি আকাঙ্ক্ষার শরীর। স্বাভাবিক প্রজননপ্রক্রিয়ায় প্রাপ্ত শরীর এবং যে শরীর একজন মানুষ আকাঙ্ক্ষা করে, তা তো পৃথক হতে পারে। চিরকালই মানুষ আকাঙ্ক্ষা করে এমন শরীর যা মরণশীল নয়, এমন শরীর, যা যৌবন ধরে রাখবে দীর্ঘকাল৷ কোনও পুরুষ চাইতে পারেন নারীশরীর, আবার কোনও নারী আকাঙ্ক্ষা করতে পারেন পুরুষ শরীর। কোনও স্বল্প উচ্চতার মানুষ হতে চাইতে পারেন দীর্ঘাঙ্গ। একজন কৃষ্ণবর্ণ ব্যক্তি চাইতে পারেন ফর্সা ত্বক। সুতরাং, একজন মানুষ যে শরীরের মধ্যে বেঁচে থাকেন এমন হতেই পারে সেই বিশেষ ত্রিমাত্রিক অবয়বের সঙ্গে তৈরি হচ্ছে তার মানসিক দূরত্ব। যেহেতু যা তিনি হতে চান তা হয়ে উঠতে পারছেন না তাই চেতনা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে থাকে শরীর থেকে। শুরু হয় মানুষের এলিয়েনেশন। মানুষ হতে চায় অমর কিন্তু তা সম্ভব নয়। মানুষ শরীরে ধরতে চায় অনন্ত যৌবন। তাই বা কী করে সম্ভব? তবে বাস্তবে যা সম্ভব নয়, তা সবসময়ই সম্ভব হয়েছে মানুষের কল্পনায়। সেই কল্পনাই আবার বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে পরবর্তীকালে বাস্তব যে হয়ে ওঠেনি বা উঠবে না কোনওদিন, তাও বলা যায় না। কিন্তু একথা ঠিক যে, মানুষ যা হতে চেয়েছে এবং পারেনি, যা ঘটাতে চেয়েছে এবং বাস্তবে ঘটাতে অপারগ থেকেছে সেই সবই সে সম্ভব করেছে কল্পবিজ্ঞানের স্বাধীন উন্মুক্ত পরিসরে।

আরও পড়ুন: ব্রাম স্টোকার ও ড্রাকুলা রহস্য! লিখছেন দীপ ঘোষ…

শরীর বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে একটি বিশেষ দিক নিয়ে ভাবার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে— তা হল মানবশরীরকে কেন্দ্রে রেখে, তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া ক্ষমতা এবং মালিকানার রাজনীতি। একটি শরীরের মৃত্যুকে বা স্বাভাবিকভাবে আসা বার্ধক্যকে অস্বীকার করতে গিয়ে মানুষ কি অন্য শরীরকে ব্যবহার বা ব্যবচ্ছেদ করতে পারে নিজের ইচ্ছেমতো? যে শরীর অপরের, তা থেকে শুষে নেওয়া যায়, নিজের শরীরকে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখার রসদ? অন্য জীবিত শরীর থেকে অঙ্গ কেটে জুড়ে নেওয়া যায় নিজের শরীরে? তাহলে অনিবার্যভাবে প্রশ্ন ওঠে একটি শরীরের মালিকানা কার? যার শরীর তার নয়? অধিক ক্ষমতাশালী যে কোনও মানুষ কম ক্ষমতাধারী যে কোনও মানুষের শরীর-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে? মিশেল ফুকো যে বায়োপলিটিক্সের তত্ত্ব আলোচনা করেছেন তাঁর ‘The History of Sexuality, Volume I: An Introduction’ (১৯৭৬) এবং ‘Society Must Be Defended’ বইতে, সেখানে তিনি মানবশরীরের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রাচীন এবং আধুনিক ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তুলে ধরেছেন। প্রাচীনকালে ক্ষমতার মূল উদ্দেশ্য ছিল কিছু মানুষকে হত্যা করা এবং কিছু মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা। ‘To take life and let live’— ক্ষমতার এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক সময়ে পাল্টে গিয়ে হয়েছে, ‘To make life and to let die.’— অর্থাৎ কিছু বিত্তবান এবং ক্ষমতাশালী মানুষের জীবনকে দীর্ঘায়িত এবং সুরক্ষিত করা এবং অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে অরক্ষিত অবস্থায় মৃত্যুর ঝুঁকি মাথায় নিয়ে বাঁচতে দেওয়া। যার হাতে ক্ষমতা, সে ক্ষমতাহীনের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তার ওপর মালিকানা স্থাপন করতে পারে অনায়াসেই। আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে সে হয়তো তৈরি করতে পারে এমন শরীর, যা তার নিজের শরীরের আয়ুকে দীর্ঘায়িত করবে। অমরত্বকে নিশ্চিত করতে এবং মৃত্যুকে দূরবর্তী গন্তব্যে পরিণত করতে চাওয়া মানবশরীরের এই গল্প দু’টি ভিন্ন আঙ্গিকে দেখিয়েছেন দুই শতকের দুই সাহিত্যিক ব্রাম স্টোকার এবং কাজুও ইশিগুরো।

ব্রাম স্টোকার লিখিত গথিক উপন্যাস ‘ড্রাকুলা’ প্রকাশিত হয় ১৮৯৭ সালে। তার ১০৮ বছর পর ২০০৫ সালে নোবেলজয়ী সাহিত্যিক কাজুও ইশিগুরোর উপন্যাস ‘নেভার লেট মি গো’ প্রকাশ পায়। এই দু’টি উপন্যাসেই মৃত্যুকে অস্বীকার করা এবং মানবশরীরের অস্তিত্বকে দীর্ঘায়িত করার ক্ষেত্রে অন্য মানুষের শরীর কীভাবে ব্যবহৃত হতে পারে, এই প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে এবং এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়টিকে কেন্দ্র করে উঠে এসেছে একেবারে পৃথক দু’রকম দৃষ্টিভঙ্গি।

ড্রাকুলার ক্ষেত্রে পাঠক দেখেছেন এক ভীতি-উদ্রেককারী ভ্যাম্পায়ার-চরিত্রকে। এই বাদুড়-মানবের শরীর আসলে মৃত কিন্তু সে নিজের অস্তিত্ব দীর্ঘায়িত করে থাকে অন্য শরীর থেকে রক্ত শোষণ করে। উপন্যাসে কাউন্ট ড্রাকুলার পরিচয় হিসেবে আমরা জানতে পারি, তিনি ছিলেন ট্রান্সিলভানিয়ার এক অত্যন্ত বিত্তশালী এবং ক্ষমতাবান পরিবারের উত্তরাধিকারী। জানা যায়, কাউন্টের পূর্বপুরুষরা ছিলেন যুদ্ধবিজেতা এবং তৎকালীন রাজবংশের সদস্য। যদিও ড্রাকুলার সম্পূর্ণ অতীত পাঠককে কখনওই পুরোপুরি জানতে দেননি স্টোকার, এবং এই অস্পষ্ট ইতিহাসই চরিত্রটিকে করে তুলেছে আরও ভয়াবহ এবং রহস্যময়। তবে এই কথা স্পষ্ট যে, কাউন্ট ড্রাকুলা ছিলেন সম্পদশালী এবং অতি-প্রাকৃতিক ক্ষমতায় ক্ষমতাবান। এই ক্ষমতা প্রয়োগ করে তিনি অধিকার করতেন বিভিন্ন মানবশরীর। সেইসব শরীর থেকে রক্ত শোষণ করে তাঁকে বেঁচে থাকতে হত, অর্থাৎ তাঁর শরীর মৃত্যুকে অতিক্রম করলেও, অমরত্ব তাঁকে স্বাধীনতা দিতে পারেনি। লুসি ওয়েস্টেনরা, যে তরুণীর শরীরকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতেন ড্রাকুলা, সেই নারীশরীর হয়ে ওঠে তাঁর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ। লুসির রক্ত পান করার মাধ্যমে কাউন্ট ড্রাকুলা ওই নারীর কাছ থেকে তার নিজের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করবার সমস্ত স্বাধীনতা কেড়ে নেন। এই গোটা বিষয়টিকে কার্ল মার্কসের ক্যাপিটাল বা পুঁজিবাদের ধারণার সঙ্গে এক সূত্রে মেলানো যেতে পারে সহজেই। মার্কস পুঁজি বৃদ্ধির প্রবণতা বিষয়ে লিখেছিলেন: ‘Capital is dead labour, that, vampire-like, only lives by sucking living labour.’ অর্থাৎ, সবটাই ক্ষমতার খেলা। পুঁজিবাদ যেমন ভ্যাম্পায়ারস্বরূপ এক শক্তি, যা জীবিত শ্রমকে শোষণ করে আত্মবৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলে, তেমনই কাউন্ট ড্রাকুলার ক্ষেত্রেও অপরের রক্ত-শোষণের ক্রিয়া আসলে নিজের জীবনকে দীর্ঘায়িত করার অনিবার্য এবং প্রয়োজনীয় একটি প্রক্রিয়া।

ড্রাকুলা চরিত্রটির সূত্রে পাশ্চাত্য পুঁজিবাদের ভয়ংকর আগ্রাসী রূপকে তুলে ধরতে চেয়েছেন স্টোকার। তিনি এই উপন্যাসে রক্তকে দেখিয়েছেন একরকম যৌন প্রতীক হিসেবে। একদিকে যেমন বলা হচ্ছে ‘The blood is the life’, আবার অন্যদিকে এই রক্তই হয়ে উঠেছে যৌন আকাঙ্ক্ষা এবং আকর্ষণের মূল অনুঘটক। ড্রাকুলার রক্ত পান করার ক্রিয়াটি সম্মতি ছাড়াই অন্য একটি শরীরে জোর করে প্রবেশ করবার রূপক হিসেবে দেখিয়েছেন লেখক। লুসির শরীরের ব্যক্তিগত সীমা লঙ্ঘন করে ড্রাকুলা তার রক্ত শোষণ করেন এবং নিজের ইচ্ছেমতো লুসির শরীরকে রূপান্তরিত করেন— ‘Lucy Westenra, but yet how changed. The sweetness was changed to adamantine, heartless cruelty, and the purity to voluptuous wantonness.’

সুতরাং, দেখা যায় নিজের শরীরকে সক্রিয় এবং সচল রাখতে ড্রাকুলা অন্য একটি শরীরের ওপর নিজের মালিকানা কায়েম করেন। একদিকে যেমন ড্রাকুলা লুসির স্বাধীনতা হরণ করেন অন্যদিকে এটাও দেখতে হবে যে, তাঁর নিজের স্বাধীনতাও প্রকৃতপক্ষে বাঁধা পড়ে থাকে লুসির কাছেই। লুসির রক্তই বাঁচিয়ে রাখে কাউন্ট ড্রাকুলাকে। অর্থাৎ, যে শরীর মৃত্যুকে অস্বীকার করে, সেই শরীরের টিকে থাকার একমাত্র উপায় হয় অন্য শরীরের মৃত্যু।

এই সূত্র ধরেই এবার আসা যাক একেবারে ভিন্ন স্বাদের একটি উপন্যাসের কাহিনিতে। এই উপন্যাসের কেন্দ্রেও রয়েছে মানুষের অমরত্ব লাভের আকাঙ্ক্ষা। যদিও এই উপন্যাসে মানুষ অমরত্ব অর্জন করতে পারে না তবু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে তারা তৈরি করে এমন একদল মানুষকে যারা প্রকৃত মানুষের ক্লোন। কিন্তু এই ক্লোন তৈরি করার উদ্দেশ্য কী? এদের তৈরি করা হয় আসল মানুষদের আয়ুবৃদ্ধি নিশ্চিত করার উদ্দেশে। এই ক্লোন-মানবদের জন্ম দেওয়া হয় প্রকৃত মানুষদের অঙ্গদান করবার জন্য। একাধিকবার নিজেদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান করার পর এরা অনিবার্য মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। সুতরাং এক্ষেত্রেও কিছু শরীরকে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট কিছু শরীরের বলিদান দেওয়া হয়। ইতালীয় দার্শনিক জর্জিও আগামবেন তাঁর ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত ‘Homo Sacer: Sovereign Power and Bare Life’-এ এমন অস্তিত্বের কথা বলেন সমাজে যাদের জৈবিক উপস্থিতি থাকলেও, তাদের কোনও সামাজিক এবং রাজনৈতিক গুরুত্ব নেই।

ইশিগুরোর ক্লোনমানবদের ক্ষেত্রেও এই তত্ত্ব যথাযথভাবে প্রযোজ্য। এই ক্লোনমানবেরা প্রেম, ঘৃণা, ঈর্ষা, বন্ধুত্ব ইত্যাদি সমস্ত মানবিক অনুভূতি অনুভব করলেও সমাজ তাদের স্বাভাবিক মানুষ হিসেব স্বীকৃতি দেয় না। হ্যানা আরেন্ট তাঁর ‘The Origins of Totalitarianism’-এ ‘right to have rights’-এর ধারণা নিয়ে আলোচনা করেছেন। এই আলোচনায় তিনি বলেন কোনও মানুষ জৈবিক অস্তিত্বের অধিকারী হওয়া মানেই তার মানবাধিকার নিশ্চিত হবে, এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। সমাজে নিজের অধিকার পেতে গেলে যে-কোনও ব্যক্তিকেই একটি সামাজিক-রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পরিসরের অন্তর্গত হতে হয়। ক্লোনদের ক্ষেত্রে এটাই হয়ে ওঠে এক বিরাট সংকটের জায়গা। তাদের জৈবিক অস্তিত্ব থাকলেও, নিজেদের জীবন বা ভবিষ্যৎ বিষয়ে কোনওরকম সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা তাদের নেই। দু’জন ক্লোনমানব যখন প্রেমের সম্পর্কে আবদ্ধ হয় সেই ভালবাসার পরিণতি কী হতে পারে? তাদের নিজেদের অস্তিত্বের মতোই প্রকৃত মানুষের কাছে গুরুত্বহীন ক্লোনমানবদের প্রেম বা বন্ধুত্বের সম্পর্কও।

ইশিগুরোর এই উপন্যাসে ক্যাথি, রূথ এবং টমি, হেইলশ্যাম আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তিন ছাত্রছাত্রী ধীরে-ধীরে বুঝতে পারে যে তাদের জীবন সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনের মতো নয়। তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে অন্য মানুষদের প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের অঙ্গদান করার জন্য। একের পর এক অঙ্গদান করতে-করতে একসময় তারা ‘কম্পলিশন’ অর্থাৎ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাবে। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, হেইলশ্যামের ছাত্র-ছাত্রীরা এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কোনও প্রতিবাদ করে না। তারা প্রথম থেকেই মেনে নেয় যে, অন্য মানুষের জীবনকে দীর্ঘায়িত করাই তাদের বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য। নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণা থাকলেও এই ক্লোনমানুষেরা যেহেতু সমস্ত রকম মানবিক অনুভূতি অনুভব করতে সক্ষম সেক্ষেত্রে এই প্রশ্ন ওঠে যে তাদের শরীরকে কেন স্বাভাবিক মানবশরীর হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না? মানুষ নিজেদের স্বার্থে এমন একটি ব্যবস্থা কেন তৈরি করবে, যেখানে সমস্তরকম মানবিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ক্লোনমানবেরা নিজেদের অস্তিত্ব এবং জীবন-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিজেরা নিতে পারবে না? মানুষের আয়ু বৃদ্ধি করার জন্য অঙ্গদানের যদি সত্যিই প্রয়োজন হয় তবে পরীক্ষাগারে প্রতিস্থাপনযোগ্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যাতে তৈরি করা যায় এবং সংরক্ষণ করা যায় সেই চেষ্টা করা উচিত। কিছু মানুষের জীবন দীর্ঘায়িত করে তুলতে একটি বিশেষ প্রকৃতির মানবশরীর সৃষ্টি করে, তাদের সমস্তরকম স্বাধীনতা হরণ করে, কেবলমাত্র বলিদানের উদ্দেশে তাদের বাঁচিয়ে রাখার মধ্যে যে চূড়ান্ত নৈতিক অপরাধ নিহিত রয়েছে স্বার্থপর মনুষ্যজাতি, সেই চিন্তা থেকে শত হস্ত দূরে অবস্থান করে। পাঠক দেখতে পান, এই ক্লোনমানবদের অত্যন্ত নির্লিপ্ত ও ভাবলেশহীনভাবে জানানো হয় তাদের ভবিষ্যৎ কীরকম হতে চলেছে— ‘You were brought into this world for a purpose, and your futures, all of them, have been decided.’

এবার কথা হল মানুষ কি নিজেকে ঈশ্বরতুল্য মনে করে? মনে করে, অন্য মানুষের শরীর কীভাবে চালিত হবে সে-ব্যাপারে তারা অনায়াসেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে? এই মর্মে প্রাসঙ্গিক ইতালীয়-অস্ট্রেলীয় দার্শনিক রোজি ব্রেডটির ‘Posthumanism’ তত্ত্ব। এই তত্ত্বের মূলে রয়েছে একটি প্রশ্ন। মানুষ একাই কি পৃথিবীর সমস্ত অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিরাজ করে? পাশ্চাত্য মানবতাবাদ বহুদিন বাবদ মানুষকেই পৃথিবীর সমস্ত অস্তিত্বের তুলনায় শ্রেষ্ঠ হিসেবে তকমা দিয়ে এসেছে যেহেতু মানুষ স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে এবং যুক্তি প্রয়োগ করতে সক্ষম। ব্রেডটি এই প্রচলিত ধারণাকে খণ্ডন করেন এবং মানুষকে পৃথিবীর সমস্ত অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেন। তাঁর মতে, মানুষ তার চারপাশের অন্যান্য সকল অস্তিত্ব এবং পরিবেশের সঙ্গে সংযুক্ত একটি সত্তা মাত্র। সেক্ষেত্রে অবশ্যই পৃথিবীর সবথেকে বুদ্ধিমান প্রাণী হিসেবে মানুষ অন্য কোনো অস্তিত্বের ওপর নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না। ব্রাম স্ট্রোকারের ড্রাকুলা মৃত্যুর সীমানা লঙ্ঘন করে এমন এক শরীর ধারণ করে যে, শরীর নিজেই স্বাভাবিক মানব-অস্তিত্বের সামনে এক প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়ায়। এই শরীরকেই আবার বেঁচে থাকতে রসদ গ্রহণ করতে হয় অন্য মানব দেহ থেকে রক্ত শোষণ করে। এই শোষণক্রিয়া যেহেতু অপর মানবদেহের সম্মতি নিয়ে করা হয় না, সুতরাং একে একরকম ধর্ষণই বলা চলে। অন্যদিকে ইশিগুরোর উপন্যাসে ক্লোনমানবরা উপস্থিত হয় মানুষের জৈবিক প্রতিরূপ হিসেবে। ক্লোনদের অনুভূতির জগৎকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে তাদের ব্যবহার করা হয় রাষ্ট্রের সম্পদ হিসেবে। দু’টি ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত এবং রাষ্ট্রীয় পরিসরে যা দেখা যায়, তা হল ক্ষমতার চূড়ান্ত অপপ্রয়োগ এবং অন্য অস্তিত্বের স্বাধীনতায় পূর্ণ হস্তক্ষেপ। দু’টি ক্ষেত্রেই এক বিশেষ ধরনের অস্তিত্বের টিকে থাকা বা তাদের টিকিয়ে রাখাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং তা করতে গিয়ে অন্যদের অস্তিত্বমূল্য হ্রাস পেয়েছে।

মনুষ্যজাতি চিরকালই নানা উপায়ে তার নশ্বর শরীরের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে অতি দীর্ঘ জীবন বা অমরত্ব লাভ করতে চেয়েছে। মৃত্যু অনিবার্য এবং অবশ্যম্ভাবী জেনেও, জীবনের এই চূড়ান্ত পরিণতির বিরুদ্ধে মানুষের বিদ্রোহ কখনওই থামেনি। ব্রাম স্ট্রোকারের ‘ড্রাকুলা’ থেকে কাজিও ইশিগুরোর ‘নেভার লেট মি গো’ পর্যন্ত যাত্রাপথে অমরত্বের এই লড়াই যে নৈতিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে যে-কোনও অস্তিত্বের শরীরের ওপর তার নিজের অধিকার কতখানি? নিজের শরীরকে স্বাধীনভাবে চালনা করার স্বীকৃতি কারা পাবে এবং কারা পাবে না? একদিকে ড্রাকুলা যেমন প্রকাশ্যে আনে অন্য মানবদেহ সম্পূর্ণ গ্রাস করে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ভয়াবহতা, তেমনি অন্যদিকে ‘নেভার লেট মি গো’ উপন্যাসে দেখা যায় মানবসমাজ কী অবলীলায় ক্লোনমানবদের মৃত্যুকে দিতে পারে একটি গ্রহণযোগ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ!

মানুষের এই জটিল মনস্তত্ত্ব-সংক্রান্ত আলোচনাটির শেষ পর্যায়ে এসে অমরত্ব লাভের এই সংক্রামক ব্যাধির উপশম হিসেবে মনে পড়ে যায় উইলিয়াম বাটলার ইয়েটসের ‘

‘Sailing to Byzantium’ কবিতার কয়েকটি স্মরণীয় পংক্তি, যেখানে মানুষের মরণশীল শরীরের সীমাবদ্ধতা পার করে আত্মার স্থায়িত্বের কথা প্রকাশ করা হয়েছে—

An aged man is but a paltry thing,

A tattered coat upon a stick, unless

Soul clap its hands and sing, and louder sing

For every tatter in its mortal dress.