তামসিক : ১

ডাক্তার, তান্ত্রিক ও বীর্য

[অক্ষ-এক]

২০১৭ সালে দ্য এমআইটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় ‘Cryopolitics: Frozen Life in a Melting World’ নামক গ্রন্থ। সম্পাদনার দায়িত্বে জোয়ানা র‍্যাডিন ও এমা কোওয়াল। সম্পাদকীয় হিসাবে র‍্যাডিন এবং কোওয়াল লেখেন, কীভাবে ১৯৫০-এর কালপর্বে একদল বিজ্ঞানীর সুমেরু বা আর্কটিক এবং কুমেরু বা অ্যান্টারটিক অঞ্চলের হিমবাহ গবেষণা বদলে দিল আর্কাইভের চেন সংজ্ঞা। শীতল যুদ্ধের সময় তখন। হিমবাহের ঘন জমাট বাঁধা জল বদলে গেল বায়ুমণ্ডলের আর্কাইভে। হিমবাহ থেকে ছেঁটে নেওয়া বরফের নমুনা জানান দিচ্ছিল জলবায়ু পরিবর্তনের সুদীর্ঘ ইতিহাস। এই ধরনের বরফের প্রায় সতেরো কিলোমিটার দীর্ঘ নমুনা রাখা আছে মার্কিন দেশের কলোরাডো অঙ্গরাজ্যের ডেনভারে অবস্থিত ‘এউ এস ন্যাশনাল আইস কোর ল্যাবরেটরি’-তে। র‍্যাডিন এবং কোওয়াল-এর বয়ানে বারেবারে উঠে আসে— নিয়ন্ত্রিত ঠান্ডা দুনিয়া কীভাবে সুপ্ত জীবনের আশ্রয় হয়ে ওঠে।

[অক্ষ-দুই]

আমার বর্তমান প্রবন্ধ এক নিয়ন্ত্রিত ঠান্ডা দুনিয়ার গল্প শোনাতে চায়, যেখানে আলোচনার মুখ্য বিষয়: বীর্য (semen)। কথাটা চুম্বক করে বললে, বীর্য-কে কৃত্রিম ঠান্ডা পরিবেশে রক্ষা করা কীভাবে ১৯৫০-এর কালপর্বে ডাক্তার অরুণকুমার রায়চৌধুরী-র বৌদ্ধিক চিন্তার একটি বিশেষ ক্ষেত্র হয়ে উঠছিল, তাই এই নিবন্ধের মুখ্য আলোচ্য। অরুণকুমার ছিলেন MBBS এবং এমএসসি ডিগ্রিধারী। এক সময় হাওড়া জেনারেল হসপিটাল এবং লুম্বিনী পার্ক মেন্টাল হসপিটাল-এ ‘ভিজিটিং ফিজিশিয়ান’-হিসাবে কর্মরত ছিলেন। মে-জুন ১৯৫২-র ‘তোমার জীবন’ পত্রিকায় ‘কৃত্রিম বীর্য্যসংস্থাপণ ও গর্ভাধান’ শিরোনামে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখবেন অরুণবাবু। ‘তোমার জীবন’ বাংলা ভাষার একেবারে আদি পর্বের একটি যৌনবিজ্ঞান পত্রিকা। তবে শুধুমাত্র ‘তোমার জীবন’ নয়, ‘নর-নারী’ এবং ‘নতুন জীবন’ নামক তৎকালের আরও দু’টি যৌনবিজ্ঞান পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ডাক্তার অরুণকুমার রায়চৌধুরী। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন-এর পর বাংলা যৌনবিজ্ঞান পত্রিকার হাত ধরে যৌনতাকে বিজ্ঞানের প্রেক্ষিত থেকে নতুন করে বোঝার জোয়ার আসে। এই বোঝাপড়ার কিছু সূত্রে ঔপনিবেশিক জ্ঞানদুনিয়ার বিশেষ প্রভাব ছিল। কিন্তু কিছু অক্ষ ছিল একেবারেই সতেজ, নতু্‌ন, তাজা। আর এই নানা অক্ষের বোঝাপড়ায় বীর্য হয়ে উঠছিল একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় আলোচনার ক্ষেত্র। সুদীর্ঘ ঔপনিবেশিক কালপর্বে বাংলা লেখালিখির দুনিয়ায় বীর্যর প্রশ্নটির সঙ্গে জুড়ে ছিল হস্তমৈথুন বা স্বপ্নদোষের মতো বিষয়। আলোচনার আরও নানা খোপ ছিল নিশ্চিতভাবে, কিন্তু বীর্য-বিষয়ক জ্ঞানের উৎপাদনে তৎকালের চিকিৎসা পত্রিকা বা অন্যান্য নানা মুদ্রণ-পরিসরে হস্তমৈথুন এবং স্বপ্নদোষ আলোচনার বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল।

১৯৪৭-এর পরবর্তীকালে যে হস্তমৈথুন বা স্বপ্নদোষ নিয়ে আলোচনা বন্ধ হয়ে গেল, এমন নয়, কিন্তু বীর্য-বিষয়ক উদ্বেগ এবং আলোচনার কিছু নতুন অক্ষের উদয় হল। এই প্রবন্ধে তেমন দু’টি পরত নিয়ে সামান্য কিছু কথালাপ চলবে। একটি হল কৃত্রিম ঠান্ডা পরিসরে বীর্য সংরক্ষণ এবং সন্তান জন্মের আকাঙ্ক্ষা। আর অন্যটি হল তন্ত্রচর্চায় বীর্যর ব্যবহার। তন্ত্রচর্চায় বীর্য ব্যবহার বিষয়টি নিয়ে ভুল বোঝার সম্ভাবনা আছে। তাই কথাটা খোলসা করা দরকার।

অবধূত

তন্ত্র বললেই তার সঙ্গে জুড়ে থাকে হাজার ফ্যাকড়া। আমি কোন সময়ের কথা বলছি? পনেরো শতকের তন্ত্র নাকি আঠারো শতকের তন্ত্র? আমি কি বৌদ্ধ তন্ত্রের কথা বলছি না অন্য কিছু? আর নানা তন্ত্রগ্রন্থে তো বীর্যর কথা আছেই। তাহলে তন্ত্রচর্চায় বীর্যর ব্যবহার বলতে ঠিক কী বলা হচ্ছে। আবারও চুম্বক করে বললে, মধ্য-বিশ শতকের আশপাশ থেকে বাংলা যৌনবিজ্ঞান পত্রিকা বীর্য-সংক্রান্ত যে নতুন জ্ঞানের দুনিয়া গড়তে চাইছিল সেখানে তন্ত্রে বীর্যর ব্যবহার হয়ে উঠছিল একটি নতুন আলোচনাক্ষেত্র। তন্ত্রে বীর্যর অবস্থান বোঝার এই যাত্রাপথে আমি বেছে নিয়েছি, ১৯৭১ সালে ‘শারদীয়া নব যৌবনা’-তে প্রকাশিত অবধূত লিখিত ‘লতা সাধনা’ নামক প্রবন্ধটি। অবধূত (১৯১০-১৯৭৮) ছিলেন ঔপন্যাসিক ও তন্ত্রসাধক, তাঁর আসল নাম ছিল দুলালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। মনে হতে পারে, অরুণকুমার রায়চৌধুরী-র ‘কৃত্রিম বীর্য্যসংস্থাপণ ও গর্ভাধান’ এবং অবধূত-এর ‘লতা সাধনা’ একেবারে দুই ভিন্ন জ্ঞানলোকের অক্ষ। কিন্তু একটু মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করলে বোঝা যাবে— কৃত্রিম নিয়ন্ত্রিত ঠান্ডা পরিবেশে বীর্যর সঙ্গে বোঝাপড়া আর তান্ত্রিক ঔপন্যাসিকের তন্ত্র এবং বীর্যর সম্পর্ক বিষয়ক প্রবন্ধ বিশেষ এক তন্তুজালের অংশ। বীর্য কেবলমাত্র পুরুষ শরীরের একটি জৈবিক তরলের নিঃসরণ নয় বরং বীর্য হয়ে উঠছিল একটি নতুন সংরক্ষণমূলক ধারণা। একদিকে যেমন অরুণকুমারের মতো ডাক্তার-নিয়ন্ত্রিত ঠান্ডা শীতল পরিসরে বীর্য সংরক্ষণের কথা বলছিলেন, অন্যদিকে অবধূত সাহিত্যিক হিসাবে যৌনবিজ্ঞান পত্রিকার পাঠকদের কাছে বিভিন্ন তন্ত্রগ্রন্থের জ্ঞান ছেনে— যৌনবিজ্ঞান, তন্ত্র, সাহিত্য এবং বীর্যর একটি নতুন সংরক্ষণমূলক সম্পর্কজাল গড়ছিলেন। তবে এখানে আমি ‘সংরক্ষণ’-কে ‘সংরক্ষণমূলক বিধিব্যবস্থা’ বা ‘Regimes of Preservation’ হিসেবে ভাবতে চাইছি না বরং আমার কাছে বিষয়টি ‘সংরক্ষণমূলক কল্পনা’ বা ‘Preservative Imagination’-এর সম্ভাবনা হিসাবে হাজির হয়।

[অক্ষ-তিন]

১৯৫২ সালে প্রকাশিত প্রবন্ধের গোড়াতেই অরুণকুমার রায়চৌধুরী সাফ জানিয়ে দেন, বীর্য সংস্থাপনের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত আছে ইউরোপ, আমেরিকা। ‘মহাভারত’ বা বিভিন্ন ‘পুরাণ’ গ্রন্থে সন্তানজন্মকে ঘিরে বীর্য বিষয়ে যে বিচিত্র ব্যবস্থা রয়েছে, তাকে ‘বিশ্বাসযোগ্য’ বলে মানতে নারাজ তিনি। কৃত্রিম বীর্য সংস্থাপন চেষ্টার আদি নিদর্শন হিসেবে আঠারো শতকের স্কটিশ শল্যচিকিৎসক জন হান্টার-এর কথা বলবেন অরুণকুমার। অবশ্য একথা বলেই সাবধানবাণী হিসেবে লেখেন: ‘তবে কৃত্রিম বীর্য্য সংস্থাপণের বৈজ্ঞানিক কৌশল ও ইহার ক্রম উন্নতির ইতিহাস খুবই আধুনিক।’ অরুণকুমার জানাবেন, রাশিয়া, ইংল্যান্ড, আমেরিকা বা ইউরোপের অন্যান্য দেশ তো আছেই, ভারতের পশু-সম্বন্ধীয় গবেষণাকেন্দ্রে কৃত্রিম উপায়ে বীর্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। অরুণকুমার বারে-বারে স্মরণ করিয়ে দিতে চান যে বীর্য সংরক্ষণ এবং সন্তানজন্মের বিষয়টি নতুন। তাঁর নিজের ভাষায়: ‘মানুষের মধ্যে ইহার বহুল প্রচলন আধুনিক।’

বীর্য সংরক্ষণের প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারে বর্ণনা দিয়েছেন অরুণকুমার। প্রথমেই ডাক্তারবাবু জানিয়ে দেবেন, স্বামী যদি শারীরিকভাবে সক্ষম হন তাহলে স্বামীর শরীর থেকেই বীর্য নিয়ে স্ত্রীর যোনিতে প্রয়োগ করবেন ডাক্তার। তবে স্বামী অক্ষম হলে অন্য পুরুষের বীর্য ব্যবহার ছাড়া উপায় নেই। এই অংশে সামাজিক এবং ব্যক্তিগত নৈতিকতার নানান পরতে প্রবেশ করেছেন অরুণকুমার। কিন্তু সে-প্রসঙ্গে আসার আগে কেমন করে বীর্য সংরক্ষিত হবে বা স্ত্রীর শরীরে প্রবেশ করবে— সে কথা বুঝে নেওয়া দরকার। অরুণকুমার বলবেন, স্বামীর যদি সম্পূর্ণ ধ্বজভঙ্গ না হয়ে থাকে এবং ‘স্বমেহন’ বা হস্তমৈথুন সম্ভব হয় তাহলে ‘পূর্বাহ্নে’ অর্থাৎ দিনের প্রথমভাগে স্বামীর নিজের লিঙ্গে একটি কন্ডোম লাগিয়ে নেবেন। অতঃপর স্বামী হস্তমৈথুন করলে ডাক্তার ‘পিচকারী’-তে বীর্য টেনে নেবেন। আর এক ‘বিশেষ পিচকারী’ দিয়ে স্ত্রীর যোনিতে বীর্যের প্রবেশ ঘটাবেন চিকিৎসক। কিন্তু স্বামী যদি সম্পূর্ণ ধ্বজভঙ্গ হন? সেক্ষেত্রে ‘পিচকারীর সুচ্‌ (needle)’ দিয়ে ‘বীর্য্যনালী’ থেকে বীর্য সংগ্রহ করতে হবে। কিন্তু বীর্য সংগ্রহই যথেষ্ট নয়। তাকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা দরকার। আর এখানেই আসে কৃত্রিম ঠান্ডা পরিবেশ এবং নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রার কথা। অরুণকুমারের নিজের ভাষায় ব্যপারটা এই: ‘সাধারণভাবে বাহিরে নিক্ষিপ্ত বীর্য্যস্থিত শুক্রকীট অল্প পরেই মরিয়া যায়। ওই মৃত্যুর বিশিষ্ট কারণ বাহিরের তাপ। বিভিন্ন জীবের শুক্রের পক্ষে বিভিন্ন রকমের তাপের মাত্রা (optimum temperature) তাহাদের সর্ব্বাঙ্গীন কল্যাণের ও দীর্যজীবনের সহায়ক। ইহা গবেষণা করিয়া জীব বিজ্ঞানীগণ বাহির করিয়াছেন এবং প্রধান জীবগুলির এই বিশিষ্ট তাপের মাত্রাও তাহারা নির্দ্ধারণ করিয়াছেন। এই তাপে রাখিলে সাধারণ ভাবে শুক্রকীট বহুদিন পর্যন্ত বাঁচিয়া থাকিতে ও কর্ম্মক্ষম থাকিতে সক্ষম হয়।’

১৯৭১ সালে ‘শারদীয়া নব যৌবনা’-তে প্রকাশিত অবধূত লিখিত ‘লতা সাধনা’ নামক প্রবন্ধের পরতে-পরতে ছড়িয়ে রয়েছে সাহিত্য, প্রাচীন তন্ত্রগ্রন্থাদির জ্ঞান এবং আধুনিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমান্তরাল সংলাপ। তন্ত্র বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে অবধূত বলবেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায় লিখিত ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসের কথা।

অতঃপর, বীর্য-সংরক্ষণকারী ব্যাঙ্কের বহুল-প্রচারের প্রয়োজনীয়তার কথা লিখবেন অরুণকুমার। কিন্তু অরুণকুমারের ভাবনায় মনোযোগ দিলে বোঝা যায়, বীর্য সংরক্ষণকারী ব্যাংক-নিয়ন্ত্রিত নজরদারিমূলক সমাজের কল্পনা সামনে আনছিল। অরুণকুমার বলবেন, বীর্য সংরক্ষণকারী ব্যাঙ্কের বহুল প্রচার হলে, ‘বংশধারা’ সম্বন্ধে গবেষণা এবং ‘পার্থিব জীবনের’ আদর্শগত মানের উন্নতির সম্ভাবনা বাড়বে। ‘শ্রেষ্ঠ মনীষীদের’ বীর্য পৃথিবীর বিভিন্ন অংশ থেকে সংগ্রহ করে দূরদূরান্তরে ব্যাঙ্কে জমা রাখলে এবং উপযুক্ত নারীতে সেইসব বীর্য নিক্ষেপ করলে ‘পৃথিবীর সমষ্টিগত মনীষীর অপূর্ব্ব বিকাশের শুভ-সম্ভাবনা’-র দরজা খুলে যাবে। বীর্য বিষয়ে ‘Preservative Imagination’-এর ভাল উদাহরণ আর কী বা হতে পারে। অরুণকুমারের বীর্য বাছাই প্রস্তাবনা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে অবলম্বন করে বিজ্ঞানের একটি নতুন শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। অরুণকুমারের চোখে ঠিক বীর্যটি বেছে নিতে পারলে বীর্য মূল্যবান সম্পদ। এই বাছাই প্রক্রিয়ার সঙ্গে ইউজেনিক্স চিন্তার সাদৃশ্য বিশেষভাবে খেয়াল করা যায়। অবশ্য আলাদা করে অরুণকুমারের ইউজেনিক্স চিন্তা না জানলে এই সম্পর্কজাল নির্মাণ ত্রুটিপূর্ণ।

তবে অরুণকুমারের চিন্তায় শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় প্রকল্প নেই। সাধারণ স্বামী-স্ত্রীর এই নতুন বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে বোঝাপড়ার মনস্তাত্ত্বিক সংকট নিয়েই তিনি বিস্তারে আলোচনা করেছেন। বিশেষত, স্বামী-ব্যতীত অন্য পুরুষের বীর্য ব্যবহার করলে তার নাম পরিচয় অজানা থাকবে এ-তো প্রাথমিক কথা। কিন্তু এই ভিন্ন বীর্যের বেড়ে ওঠা এবং সন্তানের ভূমিষ্ঠ হওয়া স্বামী এবং স্ত্রীর মনে ঠিক কেমন প্রভাব ফেলবে! অরুণকুমার লিখছেন: ‘সন্তান যতই বড় হইতে থাকে ততই সে [স্বামী] নিজের অক্ষমতার সম্বন্ধে সচেতন হইতে পারে— এ সন্তান যেন তাহারই অক্ষমতার মূর্ত্ত প্রতীক।’ তবু কথাটা শুধু ব্যক্তিপরিসর নিয়ে ছিল না। অরুণকুমারের মতে, এই নতুন বীর্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও চিকিৎসা সমাজজীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। এই সামাজিক বিশৃঙ্খলার বয়ানটি ভীষণরকম নৈতিক এবং পিতৃতান্ত্রিক। পুরুষ তার কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলবে, সামাজিক কাঠামোয় এমন উদ্বগ তৈরি হচ্ছিল অরুণকুমারের বয়ানে। পাশাপাশি আইনি জটিলতার কথাও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে তাঁর প্রবন্ধে। এই নতুন সন্তানের সঙ্গে সম্পত্তি, উত্তরাধিকার প্রভৃতি আইনি প্রশ্নের বিচার কেমনভাবে হবে, তা নিয়ে নানা সংশয় ছিল অরুণকুমারের প্রবন্ধে। আসলে সাঁটে বললে, অরুণকুমারের কৃত্রিম বীর্য বিষয়ক ভাবনা একটা নতুন তন্তুজাল তৈরি করছিল বাংলার সামাজিক কাঠামোয়। একটা নতুন বিজ্ঞান ,‘নতুন কল্পনা’ হয়ে তার সমস্ত সীমা ও সম্ভাবনা নিয়ে ঝরে পড়ছিল বকুল ফুলের মতো—গোপনতা, ঘেন্না, পবিত্রতা, সতীত্ব, পৌরুষ— ইত্যাদি প্রশ্নগুলোর পুনর্বিচার করতে।

[অক্ষ-চার]

১৯৭১ সালে ‘শারদীয়া নব যৌবনা’-তে প্রকাশিত অবধূত লিখিত ‘লতা সাধনা’ নামক প্রবন্ধের পরতে-পরতে ছড়িয়ে রয়েছে সাহিত্য, প্রাচীন তন্ত্রগ্রন্থাদির জ্ঞান এবং আধুনিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমান্তরাল সংলাপ। তন্ত্র বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে অবধূত বলবেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায় লিখিত ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসের কথা। ওই যে কাপালিক কপালকুণ্ডলা-কে আপন ‘যোগ-সিদ্ধিমানসে’ প্রতিপালন করেছিলেন। অবধূত লিখলেন: ‘কাপালিকের ঐ যোগ সিদ্ধি-মানসটি কি! কপালকুণ্ডলার মত একখানি সর্ব্বগুণ সম্পন্না পাত্রীকে, তান্ত্রিকদের ভাষায় শক্তিকে কি জাতের যোগ সাধনা করার মতলবে প্রতিপালন করছিলেন কাপালিক। যোগ সাধন পদ্ধতিটি বেশ খোলাখুলি বলে দেওয়া হোলে ওর ভেতরের বার আনান মজাই উধাও হয়ে যেত। সাহিত্য সম্রাট কাঁচা লিখিয়ে ছিলেন না, এমন জাতের একটি রহস্য সৃষ্টি করে রেখে গেছেন যে যুগযুগান্ত মানুষ ভাববে, শুধুই ভাববে, কি কাণ্ড করতেন কাপালিক মেয়েটিকে নিয়ে! এবং কার বাপের সাধ্য বলবে যে যোগসিদ্ধি-মানসে প্রতিপালন করা ব্যাপারটার ভেতর ছিঁটে ফোঁটা অশ্লীলতা আছে।’

বঙ্কিমের ‘কপালকুণ্ডলা’ নিয়ে আলোচনার অন্ত নেই। কিন্তু একটি যৌনবিজ্ঞান পত্রিকায় তার আলোচনার বস্তু হয়ে ওঠা বিশেষ তাৎপর্যময়। একটি উপন্যাসের কীভাবে পাঠ হয়, তা হঠাৎ করে একটি গোপন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে কি না, যৌন অভ্যাসের কথা নতুন করে ভাবা যায় কি না—ইত্যাদি নানান প্রশ্ন সুপ্তভাবে আছাড় খাচ্ছিল অবধূতের প্রবন্ধে। তন্ত্রের আলোচনায় পশ্বাচার, বীরাচার ভাগ নিয়ে বিস্তারে আলোচনা করেছেন অবধূত। কিন্তু যা নজর করার, তা হল, বীরাচারের আলোচনা করতে গিয়ে বারে-বারে চিকিৎসাজ্ঞানের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, মেডিক্যাল কলেজের কথা। যৌনবিজ্ঞান পাঠকের কাছে একটি বিশেষ জ্ঞানব্যবস্থার অংশ হিসেবে তন্ত্রকে পৌঁছে দিতে চাইছেন অবধূত। লিখছেন তিনি: “বীরাচারীদের মেডিকেল কলেজে কেমন ভাবে কি পড়ানো হয় তা’ আমি বলছি না। কেনই বা বলতে যাব! দুনিয়া সুদ্ধ সবাই বীরাচারীদের মেডিকেল কলেজে ঢুকতে যাচ্ছে না। যার সে রকম গরজ হবে সে স্বয়ং ঢুকবে দেখবে বুঝবে এবং নিজেকে নিয়ে পরীক্ষা চালাবে। ঐ যে আগেই বলেছি এই কর্ম্ম করতে হোলে এক ফোঁটা ভক্তি বা এক রতি বিশ্বাসের দরকার নেই ঐটেই আসল কথা। একটার পর একটা এক্সপেরিমেন্ট্‌, শেষ হবে সঙ্গে সঙ্গে ফল পাবে, ফল পেলেই বিশ্বাস হবে। শুরু করার আগেই বিশ্বাস হতে যাবে কোন দুঃখে! সবাই কি রামছাগল নাকি!”

যৌনবিজ্ঞানের পাঠকের সঙ্গে একটা নতুন ভাষায় কথা বলছেন অবধূত। ‘এক্সপেরিমেন্ট্‌’ , ‘মেডিকেল কলেজ’—ইত্যাদি শব্দের ব্যবহারে তন্ত্রকে বুঝতে আধুনিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নানা কথালাপ করছেন অবধূত। আরও লিখবেন অবধূত: “একশ’টা রুগী মরলে বৈদ্য হয়, হাজারটা রুগী মরলে হয় চিকিৎসক। মেডিকেল কলেজ থেকে বেরোলেই কেউ বৈদ্য বা চিকিৎসক হয় না। আমৃত্যু স্রেফ পরীক্ষা-নিরীক্ষা, প্রতিটি রুগী এক একখানি ডাক্তারি শাস্ত্র।” এই যে তন্ত্রকে বুঝতে চিকিৎসা আবহের দরজা খুলছেন অবধূত, এই ক্ষেত্রের সঙ্গেই জুড়ে আছে তন্ত্র ও বীর্যের সম্পর্ক। বীর্য শুধুমাত্র ধর্মীয় জ্ঞান ও অভ্যাসের বিষয় নয় অবধূতের রচনায়। ‘কুণ্ডপুষ্প’-র কথা বলতে গিয়ে লিখবেন অবধূত: “স্বামী বর্তমানে পরপুরুষ জাতা কন্যার পুষ্পই কুণ্ডপুষ্প।… এমন একটি কন্যা চাই যার মা স্বামী বর্তমান থাকলেও পরপুরুষকে দিয়ে গর্ভবতী হোয়ে কন্যাটি প্রসব করেছে। সেই কন্যা প্রথম রজস্বলা হোলে ঐ কুণ্ডপুষ্প গ্রহণ করতে হবে। গজতুণ্ডাখ্যমুদ্রায় শিবশক্তি সমাযোগে এক হাজার আট বার ইষ্টমন্ত্র জপ করে শুক্র ত্যাগ করতে হবে। সেই শুক্র শোনিতের নাম কুণ্ডপুষ্প।”

এই শুক্র শোনিতের আখ্যান যৌনবিজ্ঞান পত্রিকার পাঠকের কাছে এক বৃহত্তর তন্তুজালের অংশ হয়ে উঠেছে। বীর্য শুধুমাত্র ধর্মাচরণের বিশেষ উপকরণ নয়, বরং আধুনিক পাঠকের কাছে, যৌনবিজ্ঞান পত্রিকার পাঠকের কাছে তা একটি নতুন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। একইভাবে লেখা হবে ‘গোলপুষ্প’ এবং ‘স্বয়ম্ভু-কুসুম’-এর কথা। ‘গোলপুষ্প’ অর্থাৎ ‘পরপুরুষ কর্তৃক বিধবার গর্ভজাতা কন্যার প্রথম পুষ্পকে গোলপুষ্প বলে’ আর ‘অবিবাহিতা কন্যার প্রথম পুষ্পের নাম স্বয়ম্ভু-কুসুম’। বীর্য, ঋতুস্রাব, নারী শরীর, বিবাহ-বহির্ভূত গর্ভধারণ এবং তান্ত্রিক জ্ঞানের মধ্যে সম্পর্ক উপস্থাপিত হচ্ছে যৌনবিজ্ঞানের পাঠক/পাঠিকাদের কাছে। তবে অনেকগুলো অনালোচিত জায়গা রয়ে গেল— যা অনুসন্ধানের বিশেষ প্রয়োজনীয়তা আছে। বিশেষত তন্ত্রের প্রশ্নে সংরক্ষণমূলক কল্পনায় নারীর অবস্থান কী হবে, সে-কথার তেমন কোনও উত্তর মেলে না অবধূতের রচনায়। অবধূত যে প্রথাগতভাবে তন্ত্রের কথা লিখছেন না, তা নিয়ে নিজেই স্পষ্ট করেছেন প্রবন্ধের ভেতর। স্পষ্ট করতে চেয়েছেন, আসলে কী বলতে চাইছেন। অবধূত লিখবেন: ‘এখানে একটি কথা অনুগ্রহ করে মনে রাখবেন— তন্ত্র সাধনা সম্বন্ধে একটি কথাও আমি এখানও পর্যন্ত বলিনি এবং শেষ পর্যন্ত কিছুতেই বলব না। বলছি— তন্ত্র সাধনা কেন করে মানুষে, কি ভাবে একটার পর একটা সত্যের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে সেই বারতা।’

[অক্ষ-পাঁচ]

অন্তিমে কিছু প্রশ্নের কাছে পৌঁছতে চাই। অবধূত যখন বীর্য ও শোণিতের কথা বলছেন, তখন তিনি কি পুরনো তান্ত্রিক জ্ঞানকে আধুনিকরূপে প্রস্তাবনা করছেন শুধু, না কি আধুনিক যৌনবিজ্ঞানকে ব্যবহার করে তন্ত্রের জ্ঞানকে নতুন কর্তৃত্ব দিচ্ছেন? আর এই নতুন কর্তৃত্ব গড়তে চিকিৎভাষা তার একটি বড় আশ্রয় হয়ে উঠছে। গোড়ায় আমরা দেখেছিলাম রুণকুমারের লেখায় চিকিৎসাবিজ্ঞান মহাভারত বা পুরাণের জ্ঞান থেকে নিজেকে পৃথক করছে। অন্যদিকে অবধূত চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষা ব্যবহার করে তন্ত্রের জ্ঞানকে নতুনভাবে উপস্থাপিত করছেন। খুব সংক্ষেপে এই প্রবন্ধটি মধ্য বিশ শতকের বাংলায় বীর্যকে ঘিরে ভবিষ্যৎ জীবন, নিয়ন্ত্রিত ঠান্ডা পরিবেশ, প্রজনন, বংশধারা এবং তান্ত্রিক জ্ঞানকে নতুনভাবে কল্পনা করার ইতিহাস।