শব্দই অসুর?

রাম-ফাঁকিবাজ তপু ছেলেবেলায় সুকুমার রায়ের ‘শব্দকল্পদ্রুম’ পড়েনি। পড়লে তখনকার মোটা টিউবলাইটের একদিক কায়দা করে খুলে গাদা চকলেট বোম তার ভেতর ভরে অন্য দিকটা চাকতি দিয়ে বন্ধ করে পলতে লাগাত না। ভেবেছিল, ‘ঠাস ঠাস দ্রুম দ্রাম, মনে লাগে খটকা/ ফুল ফোটে তাই বলো আমি ভাবি পটকা।’

পলতেতে আগুন দিতেই বিস্ফোরণ। সারা শরীর জ্বলছে তপুর। কম্বল চাপা দিয়ে কোনওমতে সামলে সোজা পিজি হাসপাতাল। সেখানকার বার্ন্স ইউনিটে টানা দু’সপ্তাহ যমে-মানুষে টানাটানি। শেষ পর্যন্ত বেঁচে গেলেও তপুর হাত আর মুখ দু-দু’বার প্লাস্টিক সার্জারি করিয়েও আর আগের অবস্থায় ফেরেনি।

কালীপুজো এলেই তপুর কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে, মহিম রায়ের কথা। শব্দের তাণ্ডবে কালীপুজোর রাতে করোনারি হৃদরোগী মহিমবাবু মারা গেলেন প্রায় বিনা চিকিৎসায়। লীলাঠাকুমা কানে একটু কম শুনতেন, শক্তিদেবীর আরাধনার রাতে ঘরের জানালা দিয়ে চকলেট বোম এসে পড়ল ঠাকু’মার কানের ঠিক পাশে। চিরকালের মতো বধির হয়ে গেলেন লীলা সেন। শক্তিদেবীর সশব্দ আরাধনার ঠ্যালায় প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ নানাভাবে আহত হওয়ার ঘটনা আগের চেয়ে অনেকগুণ বেড়েছে। হাউই-চকলেট বোম-উড়ন তুবড়ি-বাক্স বোম-বান্ডিল বান্ডিল কালীপটকা। সঙ্গে মদের অনুপান, সাইলেন্সার পাইপের কারিগরিতে শব্দের তাণ্ডব তুলে ঝড়ের বেগে সশব্দে হেলমেটবিহীন বাইক ছোটানো। চাকা স্কিড করে কখনও তখনই মৃত্যু, কপাল ভাল থাকলে হাড়গোড় ভেঙে হাসপাতালে দিনের পর দিন শুয়ে থাকা। কেউ বধির, কেউ অন্ধ। শক্তির আরাধনা বলে কথা! কোল্যাটেরল ড্যামেজ নিয়ে মাথা ঘামালে চলে!

আরও পড়ুন: শব্দবাজির বিড়ম্বনায় সমব্যথী নয় বাঙালি? ‘চোখ-কান খোলা’ পর্ব ১৫…

কুকুরের লেজে তারাবাতি বেঁধে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে উৎকট উল্লাস। ভয়ে ঘরের সব দরজা-জানালা বন্ধ করে কানে তুলো গুঁজে বসে থাকা। শুধু ভবানীপুর নয়, কলকাতা জুড়ে কালীপুজোর রাতে শব্দের তাণ্ডব বড়সড় যুদ্ধকেও হার মানায়। বড় আবাসন থেকে ‘বাঁচান আমাদের’ বলে কাঁপা গলায় এক বৃদ্ধ ফোন করছেন দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদে। ওখান থেকে লালবাজার হয়ে স্থানীয় থানা। আবাসনের মেন গেট আটকে পুলিশের নো এন্ট্রি!

কালীপুজোর রাতে কলকাতা শহর শুধু নয়, শহরতলির নানা জায়গা চলে যাচ্ছে শব্দদানবের শক্তিমান হাতের মুঠোয়। গত বছর এক জেলার পুলিশ সুপার লাঠি হাতে বাধা দিতে এলে তাঁকে বদলি হতে হল কয়েকদিন বাদে!

এখানে-ওখানে অনেক আগে থাকতে প্রতিরোধের জন্য মিটিং-মিছিল হচ্ছে ইদানীং। পশুপ্রেমীরা বার্তা ছড়াচ্ছেন  সমাজমাধ্যমে। সংগঠিত হচ্ছেন নানা শ্রেণির মানুষ। খুব একটা লাভ যে হচ্ছে, তা নয়। তবু এখানে-ওখানে দেখা যাচ্ছে বিন্দু-বিন্দু আলো।কলকাতা শহরে বাঙালি এখন সংখ্যালঘু। সংখ্যালঘু পরিবেশবিদের দল। বহুকাল আগে একবার ইডেনে টেস্ট ম্যাচের শেষে সন্ধ্যায় ভারত জেতায় কাগজ জ্বালিয়ে আনন্দের উল্লাস মেরে ফেলেছিল লক্ষ-লক্ষ মথ-প্রজাপতি আর পোকামাকড়। হইচই হয়েছিল সংবাদমাধ্যমে। সেসব দিন এখন অলীক। এখন শব্দই ব্রহ্ম!

কুকুর-বিড়াল, পশুপাখি কষ্ট পেল তো আপনার-আমার কী! ঝলসে গেল হাজার-হাজার প্রজাপতি, কী আসে যায় তাতে! নিষিদ্ধ বাজি তৈরি চলছে-চলবে। এখানে-ওখানে আগমার্কা ‘বাজি বাজার’ তৈরি হলেও আমরা ছুটব চম্পাহাটির নিষিদ্ধ শব্দবাজি কিনতে। ভয় করে, কালীপুজোর সকাল থেকেই শুরু হয় ভয়। আজ রাত বাড়লেই কতজনকে নিয়ে ছুটতে হবে হাসপাতালে, কার চিরবিদায় হবে শ্মশানে। প্রতিবাদ করতে গিয়ে ক’জন হবেন ছুরির আঘাতে বিক্ষত, এবারও কি আবার কেউ শব্দশহিদ হয়ে পরের দিন ছবি-সহ জায়গা পাবেন খবরের কাগজে? এবার কি শব্দের তাণ্ডব আগেকার সব রেকর্ড ভেঙে দেবে? গত রবিবার স্কুলের সহপাঠী শৈবাল এসেছিল আড্ডা মারতে। কথায়-কথায় হঠাৎ উঠে এল ছেলেবেলার সেই ঘটনাটা। কালীমন্দিরের পাশে পুকুরপাড়ে একটা বাড়িতে থাকতেন কর্নেল বাসু। স্ত্রী মোনালিসা সুন্দরী বলে কর্নেলের পা পড়ে না মাটিতে! পাড়ার কালীপুজোর চাঁদা চাইতে গিয়েছি আমি আর শৈবাল। চমকানি-ধমকানি দিয়ে প্রায় ঘাড় ধরে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন। বিলবই হাতে মন খারাপ নিয়ে ফিরছি। হঠাৎ দেখা লাল্টুর সঙ্গে। সব শুনে মাঠে বসে একটু ভাবল লাল্টু। পরেরদিন বেশি রাতে কর্নেল বাসুর বাড়িতে নৈশ-অভিযান। বিশাল লম্বা একটা ছুঁচোবাজি বানিয়ে নিয়ে এসেছে রামবিচ্ছু লাল্টুু। দরজার ফাঁক দিয়ে ছুঁচো গলিয়ে দিয়ে পলতেতে আগুন দিতেই ‘ফায়ার ফায়ার’ বলতে-বলতে দরজা খুলে বাইরে এসে স্বামী-স্ত্রীর যুগলনৃত্য! বাজি তার আগেই নিভে গেছে। পরদিন ক্লাবে গিয়ে কড়কড়ে পঞ্চাশ টাকা চাঁদা দিয়ে এসেছিলেন কর্নেল বাসু।

কালীপুজোয় এরকম ছোটখাটো বিচ্ছুমি আমাদের স্কুলজীবনেও ছিল। ছিল না শব্দের ভয়ংকর তাণ্ডব। বাজি বলতে ছোটখাট ধানিপটকা আর বাড়িতে অনেক খেটে বানানো তুবড়ি। পাড়া ছিল, ছিল বড়দের শাসন, বাজি-পটকা নিয়ে বাড়াবাড়ি করলেই হিটলার বাবা-জ্যাঠাদের হাতে কানমলা! সাপবাজি-তারাবাতি-রং দেশলাই, সুতোর ওপর ছোটা গাড়িবাজি-চরকি, ওতেই ছিল অপার আনন্দ। তপুর মতো ডাকাবুকো ব্যতিক্রমীরা সত্যিই ব্যতিক্রম ছিল। রাজ্যের নানা জায়গায় ‘ডাকাতে কালী’-র পূজা হয়। কলেজে ঢুকতে না-ঢুকতেই শুরু হয়ে গেল ডাকাতি।

জিতেন দত্তর বিশাল জামগাছে উঠে বসে আছে পটা ডাকাত। বিশাল লম্বা টর্চ ডাকাতের মুখে ফেলতেই, পলতেতে আগুন লাগিয়ে কয়েক প্যাকেট কালীপটকা নিচের দিকে ছুড়ে মারছে পটা। ভয়ে রাজেনবাবু জাম গাছের তলায় অজ্ঞান!

সেই ডাকাতি আমরা ডাক্তার হওয়ার পর থেকে বাড়তে-বাড়তে এখন কালীপুজোর রাতে পুরোদস্তুর যুদ্ধ। ‘অপারেশন শক্তি’! রাত বাড়লেই গোলাগুলি। হাসপাতালে পোড়া রোগী নিয়ে আসা রোগীকে পরীক্ষা করতে-করতে কাঁপছেন এমার্জেন্সির ডাক্তারবাবু। রোগীর সঙ্গীরা মদ আর চাটের ককটেলে বেশিরভাগই টলটলায়মান! সাধে কি আর সুকুমার রায় লিখে গেছেন ‘হৈ হৈ, মার মার, বাপ বাপ চিৎকার, মালকোঁচা মারে বুঝি, সরে পড় এইবার।’

সরে পড়ে, পালিয়ে যাবেনটা কোথায়? চলুন প্রচার জোরদার করি। শুধু মিটিং-মিছিল সমাবেশ নয়, শব্দের অসুরকে বধ করতে গেলে চাই কড়া প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ।

শব্দবাজি-তারস্বরে মাইক-ডিজে বাজানোর জন্য তাৎক্ষণিক মোটা টাকার জরিমানা। চলমান কান ফাটানো বাইক থামিয়ে বাইক বাজেয়াপ্ত করা। আরোহীর লাইসেন্স চিরকালের মতো বাতিল। শুধু কালীপুজোর রাতে নয়, সারাবছর জুড়ে। এসবই হয়তো খোয়াবনামা! তবু স্বপ্ন দেখে যাই। স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেলে উৎসব উৎ-শব হতে কতক্ষণ!