সাধক-শিল্পী

আমার বাবা অরুণ দত্তর সংগীতজীবনের শুরুতেই তিনি গুরু হিসেবে পেয়েছেন কিংবদন্তি সুরকার অনুপম ঘটককে, যিনি আমার দাদুও বটে। জলপাইগুড়ি থেকে কলকাতায় এসে তিনি সংস্পর্শ পেয়েছেন কমল দাশগুপ্তর মতো মানুষের। কমল দাশগুপ্ত, ফিরোজা বেগম খুবই ভালবেসেছেন বাবাকে। বাবা আর আরতি মুখোপাধ্যায় যুগ্মভাবে মেট্রো মার্ফি কনটেস্টেও প্রথম হন। মুম্বই বা তৎকালীন বম্বের রেডিওতে গান গেয়েছেন বাবা, সেখান থেকে তখন কলকাতায় আসতেন, আকাশবাণীতে গান গাওয়ার জন্য। তাঁকে অনেকেই তরুণ সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ও বলতেন!

আমার দাদু অনুপম ঘটকের পরে দু’জনকে বাবা অন্তর থেকে শ্রদ্ধা করতেন। একজন ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, আরেকজন, যাঁকে বাবা ঈশ্বরের মতো দেখেছেন, তিনি সতীনাথ মুখোপাধ্যায়। আসলে সংগীতকে যাঁরা পেশা হিসেবে বেছে নেন, তাঁদের জীবনে রাতের আলোর ঝলকানি যতই থাকুক, সকালের ভাতের হাঁড়িটাও তো ওই পেশার ওপর নির্ভর করেই ভরে ওঠে। তার পরেও, সেই যুগে, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য বা সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের মতো মানুষ কিন্তু এই পেশাটাকে কেবল এবং কেবলমাত্র বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে চাননি। এঁদের সঙ্গে সংশ্রবের কারণে, মূল্যবোধের কারণে, বাবার মধ্যে আমি একজন সাধক-শিল্পীর পরিচয় পেয়েছি বারংবার। হ্যাঁ, বাণিজ্যিক সাফল্য সেই অর্থে বাবা হয়তো কখনও পাননি, কিন্তু বাবার অজান্তেই কত মানুষ বাবাকে মনে রেখেছেন। আমি কলকাতার বাইরে গিয়েও শ্রোতাদের মধ্যে অরুণ দত্তকে নিয়ে আগ্রহ দেখে অবাক হয়ে যাই।

আমি যখন কথাও ঠিক করে বলতে শিখিনি, সুর তখন থেকেই জিনগতভাবে হোক, পরিবেশের কারণে হোক, আমার ভেতরে প্রোথিত হয়ে গিয়েছিল। আমার বাবা অরুণ দত্ত, দাদু অনুপম ঘটকের কারণে তো বটেই, তাছাড়াও, বাড়িতে এত গুণী মানুষের সমাহার দেখেছি ছোটবেলা থেকেই, তাও আমার সংগীতজীবনকে ঋদ্ধ করেছে। আমার বাবা আমাকে বলেছিলেন তখনই, পেশাগতভাবে যেন সংগীতকে যেন বেছে না নিই। এর নেপথ্যে একটা অন্য ঘটনা আছে। তিনি বলেছিলেন বাবাকে, সস্তায় হাততালির মুখাপেক্ষী করবেন না, নিজেকে বা নিজের সন্তানকে।

অরুণ দত্ত

আরও পড়ুন: সত্যজিৎ থেকে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, মেলামেশার বিস্তৃত পরিসর সত্ত্বেও বিনয়ী থাকতেন প্রবীর সেন!
লিখছেন শুভেন্দু সরকার…

আমার মনে হয়, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, অখিলবন্ধু ঘোষ থেকে আমার বাবার মতো শিল্পীরা সংগীতকে সাধনা হিসেবেই দেখতে চেয়েছেন। ভাগ্যলক্ষ্মী ও প্রতিভা তো সবসময় হাত ধরাধরি করে চলে না, কিন্তু তাও মানুষের স্মৃতিতে ঠিকই থেকে যান প্রকৃত শিল্পীরা। শিল্পী সৈকত মিত্র সেদিন যেমন বলছিলেন, অরুণদাকে ভুলতে পারি না, কারণ ধুতি-পাঞ্জাবি পরা অরুণদার চেহারাটা চোখের সামনে ভাসে। বাঙালি সজ্জন মানুষের প্রতিরূপ যেন! এই ধরনের কথা আজও শুনলে সত্যিই মনটা এক অজানিত পূর্ণতায় ভরে ওঠে।

এই প্রজন্ম এখন বহু শিল্পীর নাম জানেই না, সেই দোষ শুধু প্রজন্মের তো নয়! একটা বিস্মৃতিপ্রবণতা আমাদের ঘিরে থাকে। এখনও বাবা আছেন, আমি বিশ্বাস করি, কিন্তু স্থূলদেহে থাকলে আজ তাঁর বয়স হত ৯০-৯১। কিন্তু বাবার মতো ততটা প্রাতিষ্ঠানিক অর্থে বাণিজ্যিক সাফল্য না পাওয়া শিল্পী এতটা স্মৃতিধার্য আজও, সেটা আর এই প্রজন্মে হবে কি না, আমি জানি না।

আমার বাবাকে কোনওদিন মিথ্যে বলতে দেখিনি। বাবা বলতেন, কোনওভাবেই মিথ্যে বলাটা আমার আসে না। বাবাকে কখনও অন্য শিল্পীর প্রতি বিষোদগার করতে দেখিনি। খাদ্যরসিক ছিলেন, খেতে ভালবাসতেন। আর সংগীতকে ধ্যানের মতো দেখতেন। সংগীতসাধনার সময় বাবাকে এমন আত্মস্থ হয়ে থাকতে দেখেছি, সময়ের জ্ঞান থাকত না। বাবা কোনওদিন সংগীতের ক্ষেত্রে আপস করেননি, আমাকেও আপস করতে শেখাননি। আমার মা-ও গুণী শিল্পী, পাশাপাশি, অনুপম ঘটকের কন্যা হিসেবে যেহেতু তিনি শিল্পীজীবনের অবসাদ জানতেন, বাবাকে কিন্তু তিনি সারাজীবন মানসিক সমর্থন জুগিয়ে গেছেন। এখনও মনে পড়ে, বাবা আর মায়ের কথোপকথনে কত মানুষের নাম সহজেই চলে আসত। বাবা হয়তো বলছেন মা-কে, ‘জানো তো, গৌরীদা এই গানটা লিখেছেন’, মা হয়তো তাতে বিস্ময় প্রকাশ করে বলছেন, ‘কার জন্য লিখলেন গানটা গৌরীকাকা?’ গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের মতো কিংবদন্তি গীতিকারকে নিয়ে হচ্ছে এমন একটা আন্তরিক কথোপকথন। সেই কথোপকথনে কখনও উঠে আসছেন রবীন চট্টোপাধ্যায়, তো কখনও নচিকেতা ঘোষ। শ্যামল গুপ্ত, মানে সন্ধ্যাজেঠিমা, শ্রদ্ধেয়া সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের স্বামী, আর বাবা ছিলেন যেন একই আয়নার এপিঠ-ওপিঠ, সাধনার নিরিখে। শ্যামলজেঠু আরেকটু শক্ত ছিলেন, তুলনায় বাবা অনেকটা নমনীয়। যেজন্য বাবাকে অসম্ভব স্নেহই করতেন শ্যামলজেঠু। কী সব গান লিখেছেন শ্যামলজেঠু! ‘আমি এত যে তোমায় ভালবেসেছি’ গানটাও ওঁরই লেখা। ক’জন মনে রাখেন!

অভিজিৎজেঠু, অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়-সুরে ‘সূর্যে-রৌদ্রে পুড়িয়ে নিজেকে’ গানটি বাবার কণ্ঠে অপূর্ব লাগে আমার! এই গানের কথার কোনও তুলনা হয় না। অনুপম ঘটকের সুরে ওঁর গানগুলি স্মর্তব্য। আমার খুব প্রিয়, শ্রেষ্ঠ মনে হয়, ‘কুহুর কবিতা পৃথিবী যে ওই শোনে’, বসন্তবন্দনার গান, ‘ও আমার কৃষ্ণকলি’-ও অপূর্ব। সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের সুরে ‘যদি যাবে চলে যাও’, হৈমন্তী শুক্লার সঙ্গে যুগ্মভাবে গাওয়া ‘পাখি বলে কারে দেব’-ও বেশ জনপ্রিয়। বেসিক ডিস্কের বাইরে বাংলা ছবির প্লেব্যাকেও গেয়েছেন বাবা। এর মধ্যে ‘চিরদিনের’ ছবিতে ইলা বসুর সঙ্গে গাওয়া ‘এক থেকে দুই হয়’ তো বেশ জনপ্রিয়। ‘আমি যে প্রদীপ জ্বলিতে শুধু পারি’ বা ‘ঝরনা ঝরো ঝরো’— কতরকমের গান যে গেয়েছেন বাবা!

আমি বাবার দেখানো পথেই হেঁটেছি। পেশাগতভাবে আমি কর্পোরেট আইনজীবী, কিন্তু সংগীতকে আমি সাধনার পথ হিসেবেই বেছেছি। তাই সংগীত আমার জীবনকে ভরিয়ে রাখে। আরেকটা কথা আমি আমার কন্যাকেও বলি, আধুনিক শব্দটা তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার অর্থ বদলায়। তাই বাংলা স্বর্ণযুগের গান বললেই হয়তো সবচেয়ে বেশি ভাল বোঝা যায় ওই সময়ের গানকে। তবে, বাঙালি তার ঐতিহ্যকে স্মরণ করে না বলেই বোধহয়, আমরা অনেককেই মনে রাখি না, কিন্তু তাও যখন বাবার মতো শিল্পীর কথা এই প্রজন্মের কাছে শুনি, তখন মনটা স্নিগ্ধ হয়ে যায়।