গত দু-দিন ধরে অদ্ভুতরকম মনখারাপ। স্বজনবিয়োগের যন্ত্রণা। বিশিষ্ট শিল্পী ও লেখক প্রবীর সেন হঠাৎ চলে গেলেন। কী আশ্চর্য একটা শূন্যতা অনুভব করছি! অথচ গত আট-নয় বছর মানুষটার সঙ্গে কোনও দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। কেবল প্রশান্তদা-র মাধ্যমে আমরা পরস্পরের খোঁজখবর রাখতাম, এইটুকুই। কিন্তু তার চলে যাওয়ার খবর পাওয়ামাত্রই মনে হল, কাঁধ থেকে কেউ হাতটা সরিয়ে নিল।
জীবনের এক টালমাটাল পর্বে প্রবীরদার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন শিল্পী কৃষ্ণেন্দু চাকী। একটা যৌথ প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে সেই আলাপ। অল্পদিনের মধ্যে নিজের দাদার মতো কাছে টেনে নিলেন। জড়িয়ে নিলেন প্রতিদিনকার জীবনে। সেই সময়ে প্রবীরদা সল্টলেকে একটা ছবি আঁকার স্টুডিও করেছিলেন। বক্স ক্যানভাস আর হ্যান্ডমেড কাগজের ওপর অ্যাক্রেলিক আর ইঙ্ক ব্যবহার করে মূলত ছবি আঁকতেন। ওঁর ছবিতে লাইনের মজা ছিল লক্ষ করার মতো। মানুষের মুখ আর প্রকৃতি নানা আঙ্গিকে ধরা দিত। নকশা এবং ছবি মিলেমিশে একাকার হয়ে উঠত। ছবিগুলো ছিল তাঁর মতোই প্রাণবন্ত। সপ্তাহে দু-তিন দিন সেই স্টুডিওতে যেতাম। ছবি আঁকার পাশাপাশি বইশিল্পের নানা বিষয় নিয়ে কথাবার্তা বলতেন। দেখতাম, নানারকম স্টাইলে ক্যলিগ্রাফি, আবার কখনও পেপার কাটিং করে প্রচ্ছদ তৈরি।
সেই প্রথম চোখের সামনে বই তৈরির যাবতীয় কর্মকাণ্ড দেখার অভিজ্ঞতা শুরু। কীভাবে ক্যালিগ্রাফি, পেজ লে-আউট করতে হয়, তার ধরনধারণ শেখা, নান্দনিকভাবে তার উপস্থাপন করা হাতে-কলমে শুরু করলাম। জীবনের আরও একটা জানলা খুলে গেল। দেখে আশ্চর্য হতাম, শুধু বই সাজানো নয়, তার বিষয় নির্বাচন, লেখার খুঁটিনাটি যাবতীয় কিছু নিজের হাতে কী অনায়াসে নীরবে করে চলেছেন! দেশ-বিদেশের দুর্লভ বইপত্রের সমস্ত তথ্য-তালাশ ছিল ওর নখদর্পণে। পড়াশোনার বিশাল পরিধি। সেই ঘোর আমার আজও কাটেনি। পরে যখন বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল, ওঁর বিশাল বইয়ের ভাণ্ডার দেখে চমকে উঠেছিলাম। যে-কোনও বড় লাইব্রেরিকে হার মানায়।
এর দু-তিন বছর আগে বাংলা হরফ, মুদ্রণ ও লেটারপ্রেসের প্রতি গভীর ভালবাসা থেকে তিনি এবং কৃষ্ণেন্দু চাকী ‘প্রকৃতি’ নামে একটা প্রকাশনা করেছিলেন। লেটারপ্রেসে ছাপা ও উডকাট ইলাস্ট্রেশনে ওঁদের নিজেদের লেখা কয়েকটা বই ছাপিয়েছিলেন। অন্যরকম আকারের সেই বইগুলো ছিল বাংলা মুদ্রণজগতের অমূল্য প্রাপ্তি।


আরও পড়ুন: যোগেন চৌধুরী কেবল শিল্পীই ছিলেন না, ছিলেন সংগঠকও!
লিখছেন সঞ্জয় ঘোষ…
এরপর আমাকে নিয়ে গেলেন ‘একদিন’ খবরের কাগজে। ওঁর এবং কৃষ্ণেন্দু চাকীর আশকারায় খবরের কাগজের কাজে জড়িয়ে পড়লাম। আমার কার্টুন আঁকা শুরু হল। তার আগে কার্টুন আঁকার কোনও অভিজ্ঞতা ছিল না। প্রবীরদার হাত ধরেই জাপানি মাঙ্গা থেকে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন কার্টুনের সঙ্গে পরিচয় হল। এর মধ্যে প্রবীর সেন ও কৃষ্ণেন্দু চাকীর তত্ত্বাবধানে ‘একদিন’ কাগজের রবিবারের রবিবাসরীয় ক্রোড়পত্র ‘নবপত্রিকা’ প্রকাশিত হল। ট্যাবলয়েড সাইজের এই ক্রোড়পত্রটি সেই সময়ে বাংলার সংবাদপত্রের জগতে আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। কভার স্টোরি ছাড়াও অন্যান্য বিভিন্ন বিভাগ নির্বাচন, লেখক নির্বাচন, সঙ্গে পাতা সাজানো— সব মিলিয়ে এক অন্য অভিজ্ঞতা। ছোটদের নানা বিষয়ে তিনি কলম ধরেছিলেন। যেমন পঞ্চতন্ত্রের গল্প, জাতকের গল্প, গ্রিমভাইদের রূপকথা, লুইস ক্যারল বা এডওয়ার্ড লিয়ারের ছড়া, কবিতা, গল্প অনুবাদ করতে শুরু করেন। এছাড়া আতোঁয়ান দ্য স্যাতেঁকজুপোরি-র চিরকালীন সাহিত্য ‘ছোট্ট রাজপুত্র’ অনুবাদ করেছিলেন।




২০১৩ সালে ‘পাতাবাহার’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল। বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য, লোককথা, বই— এইসব বিষয়ে তাঁর আগ্রহ গভীরভাবে ছাপ ফেলল এই পত্রিকাতে। পত্রিকাটির মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলার দুষ্প্রাপ্য প্রাচীন বই বা নিবন্ধের সটীক ও ভূমিকা-সহ পুনঃপ্রকাশ। পত্রিকাটি প্রকাশের সঙ্গে-সঙ্গে পাঠকের মনে স্থায়ী আসন করে নিয়েছিল।
ব্যক্তি প্রবীর সেনের সান্নিধ্য এক অন্য প্রাপ্তি। আপাত-লাজুক, সদাহাস্যময়, অজাতশত্রু এই মানুষটির সঙ্গসান্নিধ্য ভোলার নয়। প্রকৃতি, তার অণু-পরমাণু, কীটপতঙ্গের সঙ্গে জড়িয়েজাপটে বেঁচে থাকতে প্রবীরদা ছাড়া আমি এখনও অবধি কাউকে চাক্ষুষ করিনি। দেখেছি একটা সামান্য পিঁপড়েকেও পরম যত্নে তার জায়গা করে দিতেন। তার প্রিয় দুই পোষ্য অ্যালেক্স আর কোকোনাদ ছিল সর্বক্ষণের সঙ্গী। প্রবীরদা ওদের চোখে হারাতেন। এমনকী, বেলেঘাটার গেঞ্জিকলের ‘একদিন’ পত্রিকার অফিসের সারমেয়গুলো তাঁর ভক্ত হয়ে উঠেছিল। বাড়ির পোষ্যদের মতোই নিয়মিত ওদের যত্ন করতেন। সেই অপার্থিব স্নেহের ছবি আজও সজীব হয়ে আছে। কাজের ঘোরে সারাদিন বুঁদ হয়ে থাকতেন। সারাক্ষণ কিছু না-কিছু করে চলেছেন। অযথা সময় নষ্ট করতে দেখিনি।

একসময়ের বাংলা সংস্কৃতির উজ্জ্বল নক্ষত্রদের সংস্পর্শে থেকেও প্রচারের আলো থেকে সবসময় নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। শুনেছি সত্যজিৎ রায় ওঁকে ভীষণ স্নেহ করতেন। ফিল্মের কাজে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ার পর সত্যজিৎ রায়ের বইয়ের অলংকরণের যাবতীয় কাজ ফিনিশ করতেন প্রবীরদা। ‘এক্ষণ’-এর সম্পাদক নির্মাল্য আচার্যর প্রিয়পাত্র ছিলেন। ‘সুবর্ণরেখা’ প্রকাশনার কর্ণধার ইন্দ্রনাথ মজুমদারের সঙ্গে পরম আত্মীয়ের সম্পর্ক ছিল। ওঁর কত যে গল্প শুনেছি, তার ইয়ত্তা নেই। যেমন ‘সুবর্ণরেখা’-র দপ্তরে বসে কমলকুমার মজুমদার উডকাট করছেন বা শান্তিনিকেতনে ইন্দ্রনাথবাবুর বাড়িতে সারারাত সমরেশ বসুর নানা অভিজ্ঞতার গল্প শোনা— এমন নানা ঘটনার সাক্ষী ছিলেন। কবি শক্তি চট্টোপাধায়ের প্রাতঃভ্রমণের সঙ্গী ছিলেন।
সব মিলিয়ে প্রবীর সেন ছিলেন ভরপুর জীবনীশক্তির একজন রঙিন মানুষ। গত একদশকের বেশি সময় তিনি নিজের ভেতরে ডুব দিয়েছিলেন। আশ্রয় নিয়েছিলেন তার নিজস্ব কেল্লায়। কাজের ধ্যান করতে-করতেই তিনি স্বপ্নলোকে পাড়ি দিলেন। আনন্দে থেকো প্রবীরদা।




