বাঙালি কিচ্ছু ফেলে না। আমাদের ছেলেবেলায় পাড়ার হাঁড়ি-ফাটা দাদুটি মর্নিংওয়াক সেরে মাদার ডেয়ারির লাইনে দাঁড়াত প্লাস্টিকের ব্যাগ হাতে। পুরনো দুধের প্যাকেট জমিয়ে, মাপমতো কেটেছে নিজেই। বম্বে টেলার্সের খোট্টা দরজির সঙ্গে বেশ কয়েক প্রস্থ নিজস্ব হিন্দিতে ঝামেলা-ঝঞ্ঝাটের পর বেচারি মনে হয় পরিত্রাণ পেতেই দিব্যি একখানা হাতলওয়ালা ব্যাগ বানিয়ে দিয়েছিল। ইদানীং তার নাম ‘ডিজাইনার’ হয়েছে বটে, তবে সে-যুগে প্লাস্টিক এতটা সর্বগ্রাসী না হওয়া সত্ত্বেও ব্যাপারটা হিসেবিপনার, অর্থাৎ কিনা কিপটেমির চরম নিদর্শন মনে হয়েছিল— কাকিমাদের বিরক্তিমাখা বদনে মন্তব্য করতে শুনেছি, ‘কী করবে বুড়ো অত টাকা নিয়ে?’
‘কেন, ওই ব্যাগে ভরে ওপরে যাবে।’
ছবিটা হালকা ঠাট্টার চাইতে বীভৎস রসের কাছাকাছি হওয়া সত্ত্বেও, একই রকম মন্তব্য কাকিমা-জেঠিমাদের রোজকার অভ্যাস নিয়েও চলে অনায়াসে। কিছুদিনের মধ্যেই প্রায় সবার বাড়ি থেকেই ওরকম ব্যাগ বেরতে লাগল— কখনও রোজকার বাজারের মাছের থলে, কখনও ভেজা ছাতা বহন করার পারফেক্ট মোড়ক হিসেবে। বেশ আঁতে ঘা দেওয়া মন্তব্য ছাড়াও, সরাসরি গালাগাল করত লোকে গুপ্ত যুগের গিঁট পরা মশারির দড়ি জাজিমের তলায় জমানো নিয়ে। মেয়ের বিয়েতে প্রচুর আত্মীয়স্বজন এলে সকলের মশারি টাঙানোর যথেষ্ট দড়ি না পাওয়ার ফলে কিছু পেয়ারেজান ম্যালেরিয়ায় ফৌত হবেন, এই আশঙ্কায় সেগুলো ফেলা হত না— জাজিমের তলায় গুলটি পাকিয়ে গোঁজা থাকত। ফলে মাথার কাছে খাটের কোণের একটা অংশ সামান্য ফুলে উঠত, এবং মশারির দড়ি কখনও ছিঁড়ে গেলে ইনভেরিয়েবলি পাজামা অথবা সায়ার দড়ি ঝেড়ে পরপর কয়েকদিনের ঝগড়া, মারামারি, ‘তোর বর তো ঘুষের পয়সায় গাড়ি কিনেছে’ ইত্যাদি বলার অজুহাত এবং অন্যান্য পারিবারিক মনোমালিন্যের গ্রাউন্ড ওয়ার্ক সারা হত। তবে, দরকারের সময় কেউ জাজিমের তলা থেকে দড়ি নিয়ে মশারি টাঙিয়েছে, এমনটা কখনওই শোনা যায়নি।
আরও পড়ুন: সামাজিক মাধ্যম কি বঙ্গজনকে বাতেলাবাজ করে তুলছে?
লিখছেন সৈয়দ তৌসিফ আহমেদ…
তার প্রধান কারণ, মশারির দড়িতে যে পরিমাণ গিঁট পরে, তা লজিক্যালি বোঝা বা রাতে খাওয়ার পর সবক’টি খুলে-খুলে মশারি টাঙানো হিউম্যানলি সম্ভব ছিল না। অত গিঁট যে মারে বা যারা একটানা মেরেছে, তাদের খোঁজ কখনও কেউ না পেলেও, বাড়ির সকলেই তাদের রোজ উচ্চৈঃস্বরে গালাগালি দিত— বয়োজ্যেষ্ঠদের সামনে এদের, মোহনবাগান আর কংগ্রেসের সমর্থকদের এবং গরমকালে রোজ রাতে আদা-জিরেবাটা দিয়ে আলু-পটলের কালচেপানা ঝোলকে গালাগালের পারমিশন বাঙাল বাড়িতে ছোট-বড় নির্বিশেষে দেওয়াই ছিল। গিঁট মারনেওয়ালাদের গালাগালি দেওয়া হত, ঠিক যেভাবে অফিস যাওয়ার সময় লোকে ইন জেনারেল ইস্টিদেবতাদের উদ্দেশে একটা পেন্নাম ঠুকে রাখে, যে বোঝার বুঝে নিক— তবে তার ফলে ট্রামে পকেটমারি অথবা মশারির দড়িতে গিট্টুর সংখ্যা কমেনি।
মশা-ম্যালেরিয়ার দেশে মশারির দড়ি জমানোর আদপেই কোনও যুক্তি যে নেই, তা হয়তো নয়। ব্যাপারটা প্যারানইয়া হলেও, আছে। বাড়িতে গরিব কাজের লোকদের জন্য কানা-চটা, হাতলভাঙা চায়ের কাপও কি কোনও এক অবোধ্য আতঙ্কের ফলেই জমানো হত? আজকাল যাবতীয় খিদমতগারদের সংকুচিত ফ্ল্যাটের দুয়ার থেকেই হাঁকিয়ে দেওয়া হয় বটে, তবে কিছুকাল আগেও বাড়িতে প্রতিটা লোকের আলাদা-আলাদা জুতো-ছাতা-সাইকেল-ব্যাগ সারাইওয়ালা, ওস্তাগর, কাঁসারি, স্যাকরা, ফুলিয়ার (অর্থাৎ কিনা রামলাল বাজার নিবাসী) শাড়ি ব্যবসায়ী, ডাবওলা এবং কম্পাউন্ডার থাকত বাড়ির প্রত্যেকেই একে-অপরের সারাইওয়ালাদের ‘চুর’ হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত ছিল এবং তাঁরা এলেই কিছু লোক কেন সামনে দিয়ে বারবার ‘টেলিভিশনটা পাইতাসি না’, বা ‘আমাগো বাড়ির তালাখান রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ম্যানেজার গিফ্ট করসে’ বলে পায়চারি করত, তাও সকলের একরকম জানাই ছিল। এঁরা দল বেঁধে সর্বক্ষণ ঘরে, বারান্দায়, ছাদে, বাগানে, উঠোনে ঘুরে বেড়ানোর ফলে বাঙালির জীবনে তুচ্ছাতিতুচ্ছে কোনও খবরও যে ফেলে দেওয়ার নয়, তাও একরকম প্রতিষ্ঠিত সত্য।
বাঙালি প্লাস্টিকের প্যাকেট ফেলে না। ছেলেবেলায় যেভাবে ছায়া স্টোর্সের ব্রাউন পেপারের প্যাকেট, বাটা কম্পানির জুতোর বাক্স, মুদিখানার ঠোঙা রাখা হত, এখন সেভাবে পাস্তা, নুডলস, আটা, এমনকী, তেলের প্যাকেটেরও ওপরটা সমান করে কেটে জমিয়ে রাখা হয়— যেদিন আবর্জনা কম জমে, সেদিন বড় ডাস্টবিন খালি করার বদলে এরকম ছোট প্যাকেটই হাতে করে পৌরসভার গাড়িতে দিয়ে আসে কাজের মাসি।
বীরেনদা দাড়ি কামানোর সময় মরা শোল মাছের মতো চোখে কোনও দিকে না তাকিয়ে, ঠোঁট না নাড়িয়ে যেভাবে হাঁড়ির খবর দিতেন, অজিতদা গাছ থেকে ডাব পেড়ে পিছনের বাগানে বেশ করে ছড়িয়ে গেলাসে ঢেলে দেওয়ার কালেও ‘গুফন তইথ্য’ মোটামুটি একইভাবে পরিবেশন করেছেন বরাবর। খুড়তুতো, পিসতুতো দাদারা এদিকওদিক দ্রুত পর্যবেক্ষণ সেরে তাঁদের দাঁতে ধরা বিড়ি নিয়েই চট করে দু’চার টান মেরছে। তবে, সবার সঙ্গে ওঁদেরও চা দেওয়ার সময় সেই ফাটা কাপ। যে-ব্যক্তি বিভিন্ন ঘরে ঘুরে-ঘুরে মেয়েদের শাড়ি দেখাতেন, তাঁর সামনে বুকের কাপড় খসলেও কেউ মাইন্ড করত না— ফরাসি আমির-ওমরাহরা ক্রীতদাসদের সামনে ল্যাংটো হয়ে ঘুরে বেড়াত, কারণ তাঁদের মানুষের বদলে কুকুর, বিড়াল বা দেওয়ালের টিকটিকি হিসেবেই দেখাই রেওয়াজ ছিল— তবে এক্ষেত্রেও কাপ সেই ফাটা-ই। একবারের জায়গায় পাঁচবার দেওয়া হবে বড় পরিবারের সকলের মন জুগিয়ে একই শাড়ি বারবার খুলে ভাঁজ করে দেখানোর ধকল চোখেমুখে ফুটে উঠত বলে, তবে পাশে বসে ‘বাড়ির লোকেরা’ অন্যরকম পেয়ালা-পিরিচে চা খেলেও, ওঁর ফাটা-কাপের বন্দোবস্ত বদলায়নি। প্লেট দেওয়া হত না, বিস্কুট ধরাত হাতে, কেউ একটা হেঁকে যেত ‘দেখো যেন শাড়িতে না পড়ে’, বা ‘সাবধান, খুব গরম, জিভ পুড়িও না।’ সে-উদ্বেগে মেকিপনার মিশেল ছিল না খুব একটা, বা ‘তুমি তো বাড়িরই লোক’ বলার পিছনে যথেষ্ট আন্তরিক যোগ খুঁজে পাওয়া সত্তেও, কাপটিকে পাল্টানোর প্রয়োজন কেউ বোধ করেনি।
‘ওঁদের’ ছোঁয়া বাসন নিয়ে গা ঘিনঘিনেপনাকে স্বাভাবিক, ভদ্রোলোকি, শুচিবোধসম্পন্ন (শুচিবাই নয়) গেরস্তর শরীরক্রীয়া হিসেবে দেখা, এবং তাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে সবসময়। একই বিড়িতে টান দিলে ক্ষতি নেই, বউয়ের অনুপস্থিতিতে ‘কাজের মেয়েকে’ জাপটে ঠোঁট-জিভ দিয়ে চুমু-টুমু খেতেও অসুবিধে হয়নি, ক্লিটোরিসে-স্তনবৃন্তেও বিলকুল মুখ দেওয়া যায় ঠ্যাঙানির ভয় না থাকলে—শুধু বাসনকোসন ব্যবহারে আপত্তি। ঠিক যেমন ‘ঠাকুরের বাসনে’ নিজেরা খেয়ে ফেললে তা ‘শুদ্ধ’ থাকে না. নিজেদের অস্পৃশ্য ভাবার অভ্যাসটি মগজে বহু প্রজন্ম যাবৎ পাকাপোক্ত গেঁথে বসার ফলে, তেমনই আর-এক দল মানুষের ব্যবহৃত ‘অচ্ছুত’ থালা-বাটিও দরকার হয় সাংসারিক কাঠামোয় লৌকিক-অলৌকিক, হিন্দু-মুসলমান, শুচি-অশুচির মিশেলের ভারসাম্য রক্ষার কাজে। ফেলে দেওয়াই যেত, তবে দিলাম না, কাজে লেগে গেল, এই আর কী।
ঠিক এই যুক্তিতেই দলিতদের বাবরি মসজিদ ভাঙার কাজে লাগানো হয়েছিল। বাজপেয়ী, আদবানি, মুরলি মনোহর ইত্যাদিরা নিচে বসে ক্যামেরায় পোজ মেরে হাসছিলো। ওঁরা নিজেদের পুণ্যার্জনের ঈপ্সাটিকে প্রসমিত করেছিল বেচারা গরিবদের কথা ভেবেই— ‘যা, তোরা ভাঙ, তারপর রামরাজ্য প্রতিষ্ঠা হলেই একশো দিনের দাঙ্গার কাজ পাবি।’ এখনও দাঙ্গার ক্যানন ফডার জোগাড় হয় ভঙ্গি, চামার, মুসহরদের মহল্লায় দু’চারটে শুয়োর আর কান্ট্রি লিকারের অঢেল সাপ্লাই বাবদ। যে এক লক্ষ লোক ব্রিগেডে, রেড রোডে গীতা পাঠ করেছে, বা উত্তরপ্রদেশে সাত দিনের ছুটিতে ধর্মীয় মিছিলে হাঁটবে বা গায়ে সাত-আট কিলো সোনা জড়িয়ে মন্দির কমিটির হয়ে বিগ্রহর সামনে থেকে ধাক্কা মেরে দর্শনার্থীদের এগিয়ে যেতে বলে, তারা দাঙ্গা করতে যায় না। সিয়াটেল বা মিশিগানে হিন্দু জাগরণের সমারোহ থেকে, বা মোদিসাহেবের বক্তৃতায় উত্তাল, উদ্বেল, অশ্রু বিগলিত এনআরআই-মেহফিল থেকেও কেউ দাঙ্গায় যোগ দিতে ভারতে আসে না— ঠিক যেমন তাঁদের সন্তানরা কখনওই ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেবে না। ওই কাজগুলোর জন্য দলিত, নিম্নবর্গ, আর গ্রামীণ মানুষদের সন্তানরা কামড়াকামড়ি করবে। ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না বলেই একপাশে গুঁজে রাখা হয়েছে— মাঝেমধ্যে দু’একটাকে ধর্ষণ করে গ্রামের প্রধান সড়কের পাশে গাছ থেকে ঝুলিয়ে ঘোষণা করা হয় ‘‘সবক’টাকেই টাঙিয়ে দিতে পারতাম, তবে কয়েকটাকে মশারির দড়ির সঙ্গে গুটলি পাকিয়ে রেখে দিয়েছি, মেয়ের বিয়ে, হোলি, কঁবার-যাত্রায় নাচতে আসবে।” ফাটা কাপে চা পেয়েই খুশি চল্লিশ কোটি নিরন্ন, রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে ছিটকে যাওয়া জনসমাজ— প্লেট দেওয়া হয় না, অর্থাৎ শিক্ষা-স্বাস্থ্য-খাদ্য সুরক্ষা ইত্যাদি কুটুম্বিতার দিকদারি নেই। ভোটের আগে হাতে পাঁচশো টাকা, অর্থাৎ একটি মেরি বিস্কুট ধরিয়ে দিলেই আহ্লাদে আটখানা।
কিছুকাল আগে মাছের বাজারে নাহক হেনস্তা হলাম। মেছুনি খিঁচিয়ে উঠে বললে ‘বাড়ি থেকে প্লাস্টিক আনোনি কেন? যাও, লাইনের ধারে দোকান থেকে কিনে আনো।’ সে-যাত্রায় দোকান খুঁজে, খুচরো না থাকায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্যাকেট কিনে অবস্থা সামালে বাসায় ফিরে দেখি রান্নাঘরে অন্তত পনেরোটি আলাদা জায়গায় বিভিন্ন মাপের প্লাস্টিকের প্যাকেট জমানো। কোনওটি কুঁচকেমুচকে গুঁজে রাখা, কিছু পাট করে অন্য বড় প্যাকেটে ঢোকানো, কিছু কয়েক বছর আগে দিঘায় কাজে লাগবে বলে নিয়ে গিয়ে সে-অবস্থাতেই ফিরিয়ে এনে সামুদ্রিক বালু এবং ছেনাপোড়ার ক্যাশমেমো-সহ মশলার প্যাকেটের পিছনে সযত্নে রাখা হয়েছে— অথচ, স্পষ্ট মনে আছে, ফেরার সময় হাওয়াই চটি ঢোকানোর ‘প্লাস্টিক’ না-পাওয়ায় বড় গোলমালের আশঙ্কা ঘনিয়ে উঠেছিল।
বাঙালি প্লাস্টিকের প্যাকেট ফেলে না। ছেলেবেলায় যেভাবে ছায়া স্টোর্সের ব্রাউন পেপারের প্যাকেট, বাটা কম্পানির জুতোর বাক্স, মুদিখানার ঠোঙা রাখা হত, এখন সেভাবে পাস্তা, নুডলস, আটা, এমনকী, তেলের প্যাকেটেরও ওপরটা সমান করে কেটে জমিয়ে রাখা হয়— যেদিন আবর্জনা কম জমে, সেদিন বড় ডাস্টবিন খালি করার বদলে এরকম ছোট প্যাকেটই হাতে করে পৌরসভার গাড়িতে দিয়ে আসে কাজের মাসি। সাশ্রয়ী বাঙালির হিসেবিপনার অন্ত নেই! শুরুটা হয়েছিল আটের দশকের গোড়ায় বিদেশ থেকে আত্মীয়দের ডিউটি-ফ্রি দোকানের শপিং ব্যাগ হাতে ফেরা দিয়ে। পশ্চিমবাংলায় কমিউনিস্ট শাসন কায়েম হওয়ার পর ফিদেল কাস্ত্রো, চে গেভারা, লুমুম্বা, সাঙ্কারাদের আন্তর্জাতিকতাবাদ বা প্যান-অ্যাফ্রিকানিজম ছেঁটে বাঙালি তখন মার্কিন মুলুকে স্থায়ী বসবাস এবং নিজেই আন্তর্জাতিক পিটার প্যান হয়ে ওঠার স্বপ্নে বিভোর— ফলে গায়ে একখান জাতীয়তাবাদী পিরানের জোরদার প্রয়োজন অনুভূত হয়। এখনও, যারা দেশ ছেড়ে পালায়, তারাই দেখবেন সনাতন ভারত, মুনিঋষিদের সায়েন্টিফিক দিব্যজ্ঞান, জ্যোতিষীদের হাত দেখে পাথর বোল্ডার প্রেসক্রাইব করার দূরদৃষ্টি, মহিষ-বাঁদর-ইঁদুর-ছারপোকা-প্যাঁচা-বলির পাঁঠা ইত্যাদি জানোয়ার এবং পোকামাকড়দের ঐশ্বরিক ক্ষমতা আর বেদ নামক কেতাবে ‘সব আছে’ টাইপের উজবুকপনার সবচেয়ে জোরালো প্রবক্তা।

প্রশ্ন হল, কেউ যদি প্লাস্টিক না-ই ফেলে, তাহলে এত প্লাস্টিক চারপাশে উড়ে বেড়ায় কেন? শহরের রাস্তায় তো বটেই, জাতীয় সড়ক ধরে একটু বর্ধমান, মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদের দিকে গেলে নয়ানজুলির পানে তাকানো যায় না— সাপ যেভাবে খোলস ছাড়ে, আধুনিক মানুষ সেভাবে প্লাস্টিক ‘ছাড়ে’। তার মানে কি শুধুই ‘ভাল’ প্লাস্টিকগুলোকে তুলে নেওয়া হয়েছে আর ‘খারাপ’-গুলো পরে আছে, উড়ে বেড়াচ্ছে ছাঁট মালের মতো আস্তাকুঁড়েও জায়গা না পেয়ে? না কি গোটা রাজ্যটাই আস্তাকুঁড়ে পরিণত হয়েছে? ভালগুলো নবান্ন, বিকাশ ভবন, পুরসভা, পুকুর ভরাট, প্রোমোটিং, তোলাবাজী চালিয়ে যাবে পুনর্ব্যবহারযোগ্যদের যেমন দস্তুর, আর ‘খারাপ’-রা ডিম, না, মানে ডিম নয়, মানে, বাঙালি সত্যিই কিছু ফেলে না— মানে পচা ডিমও কেমন কাজে লাগিয়ে দিল।
সে ডিমের ক্রেট পোড়ানো ধোঁয়া দিয়ে মশা তাড়ায়, ছেঁড়া মশারি দিয়ে বর্ষাকালে মাছ ধরে, ট্রাক থেকে নির্মীয়মাণ বহুতল এবং অভিজাত আবাসনের ছাদে ছেঁড়া চটি— নট নেসেসারিলি নীল-সাদা হাওয়াই হতেই হবে— ঝুলিয়ে ভূত-পিরেত-বালাই তাড়ায়, এবং খালি বোতলে মানিপ্লান্ট গোঁজে। সে অবশ্য উত্তরবঙ্গের পাহাড়-সমতল জুড়ে সমস্ত নেপালিদের বাড়িতেই দেখতাম, সবরকমের খালি কৌটোতেই কোনও না কোনও ফুলের চারা বসিয়েছে— সংবৎসর ফুল ফুটত তাতে।
বাঙালি চাইলেই অশিক্ষিতদের রাজনীতি থেকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করতে পারত, করেনি। অতঃপর শুধুই অর্ধ-স্বল্প-সম্পূর্ণ অশিক্ষিত জনপ্রতিনিধিদের তাণ্ডব শুরু হল বিধানসভায়। স্কুলকলেজের গভর্নিং বডিতে গিঁট পাকানো মাস্তানরা জাজিমের তলা থেকে আড়মোড়া ভেঙে বেরিয়ে শিক্ষকদের জলের জগ ছুঁড়ে মারতে লাগল। জনগণ ভেবেছিল, এর ফলে জনজীবন অপেক্ষাকৃত শান্ত হবে, কারণ তারা রাস্তায় পেটো ছোড়ার সময় পাবে না। কোথায় কী! যারা তখনও গভর্নিং বডির সদস্যপদ পায়নি, তারা বে-এক্তিয়ার বোমা মারতে লাগল। কোথাও এতটুকু শান্তি নেই মাইরি! তবে সেটা তেমন সমস্যা নয় আর, কারণ স্কুলছুটরা আদৌ কীভাবে গভর্নিং বডির সদস্য হল সে প্রশ্নটাই মানুষ করতে ভুলে গেছে— একটা বডি থাকলেই হবে, ঠিক যেমন হুতোম বর্ণনা করেছিলেন স্নানযাত্রায় গোছালো গস্তানি মাগি না পেয়ে একটা বুড়ি পিসিকেই নৌকায় তুলে নেওয়া হয়েছিল। পিসি-ভাইপোদের নৌকায় তুলে কাজ চালানোর ট্র্যাডিশনই সমানে চলিতেছে, লোকে কেবল ভাবে আধুনিক হয়েছি! যাগ্গে! লোকসভায় গেরুয়া জড়ানো জটাজূটধারী সন্ন্যাসীরা মালা, তাবিজ, কবচ লটকিয়ে এলাকা সরগরম করছে বেশ কিছুকাল। তাতেও সমস্যা হত না, যদি তাঁরা আইনসভায় জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব পালন করতেন। সাধারণ মানুষের করের টাকায় আইনসভা চলে, এবং আইনপ্রণেতাদের লালন পালন করা হয় গরিব দেশের জনগণের টাকাতেই— কোনও বিশেষ দলের প্রাইভেট মৌজার আয়ের টাকা থেকে নয়। সেই মডেলটিই অতঃপর রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বাড়ির জঞ্জাল ড্রেনে ফেলতেই পারতো বাঙালি মধ্যবিত্ত— মুশকিল হল, যে জঞ্জাল হাসিমুখে ড্রেন থেকে উঠে ঘরে ঠাঁই নিল, তাকে সে ফেলে কোথায়?
তার মানে কি বাঙালি কোনওকালেই আবর্জনা চেনায় মাহির ছিল না? ‘গল্প হলেও সত্যি’ সিনেমায় রবি ঘোষ উঠোন পরিষ্কার করার জন্য নারকেলের মালা চেয়েছিল মনে আছে? পাওয়া গিয়েছিল দুটো। বাড়িতেই ছিল এবং রবি ঘোষ না এলেও কয়লার গাদার পাশেই পড়ে থাকত কেয়ামতের দিন অবধি, সব বাঙালি বাড়িতে যেমন থাকে। বাঙালি এই জঞ্জাল জমায় কেন? বাসন মাজার সাবান, ছাই, বিধবা আশ্রিতার গুড়াকু, মাঞ্জা, শীতের দুপুরে কুল-মাখা কোঁচরে লুকিয়ে ছাদে নিয়ে যাওয়ার সহজ উপায় এবং রান্নাঘরে সরষের তেলের খুচি হিসেবেও ব্যবহৃত হত এটি। যেগুলো পড়ে থাকে কয়লার গাদায়, কলতলার পাশে, সেগুলোকে বাঙালি ফেলে না কেন সেটাই প্রশ্ন। কোনও একদিন রবি ঘোষ এলে কাজে লাগলেও লাগতে পারে বলে? না-ফেলার তার মানে দুটো পরিষ্কার, স্বতন্ত্র ধরন আছে। প্রথমটি নিজের আখের গোছানো— ‘এবার আমার হয়ে কাজ কর দিকি বাপু, সবটাই তো জানিস!’ দ্বিতীয়টা কি মায়া পড়ে গেছে বলে? না-হলে বাঙালি তারেক জিয়াকে ফিরিয়ে আনল কী বলে? ধর্ষণ, খুন, রাহাজানি, মিলিটারি তাণ্ডবের শখ এখনও মেটেনি? অথবা দেশের হাল ইউনুস নামক ঋণ-খেলাপি, করের টাকা ফাঁকি দেওয়া, মামলা এড়িয়ে পালিয়ে বেড়ানো চোরের হাতেই বা দেয় কী করে? এরা বাড়ির আনাচকানাচে কাত হয়ে থাকা দইয়ের ভাঁড়ের মতো— খানিকটা জল জমে থাকে, মশা ডিম পাড়ে, বদগন্ধ ছড়ায়। অথবা প্লাস্টিকের বোতল হিসেবেও ভাবা যায় অনায়াসে। জেলেরা আজকাল গলায় দড়ি বেঁধে জালের সঙ্গে কুখতিলের বদলে কাজে লাগাচ্ছে— ডোবে না কিছুতেই, ঢেউয়ের তালে দুলতে-দুলতে ভেসে বেড়ায়, হারিয়ে গেলেও ফিরে আসে যাকে বলে লাইক আ ব্যাড পেনি। তাদের হাতে বাংলাদেশিরা জাতির দায়িত্ব ছেড়েছে। কিছু জাত অবশ্য আছে যাদের একটানা চাবুক না মারলে সকালে দাঁতও মাজতে পারে না নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে। তবে মায়াও হতে পারে— ‘আহা রে! কুকের বুতল, অহনও গইন্ধ ছারতেআসে!’ এছাড়া লেজে-গোবরে বাঙালির মাথামুন্ডুহীন কাচরা জমানোর অর্থোদ্ধার অসম্ভব।
সবকিছুকেই জোর করে, ঘাড়ে ধরে পুরনো, প্রাক্তন, তামাদি ঘোষণাবাবদ বাতিলের খাতায় তুলে বাজার থেকে নতুন মাল কেনানোর ক্যাপিটালিস্ট, কনজিউমারিস্ট প্রকল্পের জয়গান গাওয়া আমার উদ্দেশ্য নয়। জিনিসের যত্ন করার সঙ্গে তার বিরোধ নিয়ে তর্ক নেই, এবং আমি নিজে অযথা জিনিসপত্র ফেলে দেওয়ার বা কথায় কথায় নতুন মাল কেনার ঘোরতর বিরোধী— আমার এবং বন্ধুবান্ধবদের ছেলেমেয়েরা একে-অপরের ‘ছোট হয়ে যাওয়া’ জামাকাপড়, জুতো পড়েছে, বই দেওয়ানেওয়া চলে এখনও। ঠাট বজায় রাখতে বাতিলের তালিকাটিকে দীর্ঘ করার অবিমৃশ্যকারিতা সম্পর্কে আমরা প্রায় সবাই সচেতন। রবিবাবু যে জীর্ণ, পুরাতনকে ভাসিয়ে দিতে বলেছেন, তাও অন্য কিসিমের মাল, বাজারে দাম চুকিয়ে খরিদারির তৈজস তাহা নহে— বাহিরের এই ভিক্ষাভরা থালিটিকে নিঃশেষে খালি করতে না পারলে ওই জীর্ণ এবং পুরাতনের খোঁজ মেলে না। বাজার তো মানুষকেও রদ্দি বানিয়ে ছাড়ে— পর্নস্টার থেকে অমুক মিস আর তমুক ম্যাডামদের তালিকাটিতে প্রতি বছর নতুন মুখের অন্তর্ভুক্তি মানেই তো কয়েকজন খসে গেল তামঝাম ছাড়াই। তারপর অন্য বাজারে, নতুন পসরার সারিতে, নতুন প্রাইস ট্যাগ সেঁটে বিক্রয়যোগ্য হয়ে ওঠার মরণপণ লড়াই। বাতিল ঘোষণার মাধ্যমে অনেকগুলো স্তরে পণ্যায়ণের সমান্তরাল কারবার চালানো এই সমাজে জায়েজ। তাই বলে সেই ফাঁদে পা না দিয়ে আবর্জনা চেনার চোখ আর বর্জনের মানসিকতা তৈরি হবে না? অমুক বাবাজির মৃত্যুর পর তার চুল, দাড়ি, নখ উপড়ে গলায় সেসবের পুঁটলি বানিয়ে, মাদুলি ঝুলিয়ে ঘুরতে হবে? এ কেমন নিঘিন্নেপনা বাপু? শকুনের মতো হাড়গোড় নিয়ে টানাহেঁচড়া, ‘পরে রয়েসয়ে খাবো’ বলার সময় কি কাণ্ডজ্ঞান একেবারে লোপ পায়? এটুকুই জানতে চেয়েছি। ব্যাস!




