উল্টো দূরবিন: পর্ব ৩৭

সিঁথি-স্মৃতি ও অন্যান্য

আমার দাদুর সঙ্গে ঠাকুমাকে কোনওদিন গল্প করতে দেখিনি। রাস্তায় হাঁটার সময়ে দুজনের মধ্যে কমপক্ষে দূরত্ব থাকত দশ হাত। এটা আমার বাবা-মায়ের মধ্যেও দেখেছি। বাবা যখন বিরাটি চলে গেলেন, দাদু বাবার সঙ্গে গেল, ঠাকুমা কিন্তু বাগবাজারেই রইলেন কাকার সঙ্গে। ঠাকুমা মাঝে মাঝে বিরাটি গেলে একটা ব্যাপার দেখে খুব মজা লাগত। দাদু খাটে পা ঝুলিয়ে বসে, ঠাকুমা একটা তামার বাটিতে জল নিয়ে দাদুর পায়ের বুড়ো আঙুলটা জলে টুক করে স্পর্শ করিয়ে ঢক করে সেই জলটা গিলে ফেলতেন। স্বামীর পা-ধোয়া জল। দাদু ওইদিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলতেন, ‘ঢং!’ অথচ সারাদিন কোনও কথা নেই। ঠিক মনে নেই, তবে মনে হয় বৃহস্পতিবার দিনগুলোই ঠাকুমা ওই পা-ধোয়া জলটি খেতেন। কারণ, এইদিন আচার অনুসারে অনেক ‘সতী’ নারীই আলতা পরত। ঠাকুমাকেও আলতা পরতে দেখেছি। স্বামীর ‘চরণবারি’ আরেকজনকে খেতে দেখেছি। আমার অন্য এক দিদিমা, আমার বলতাম ‘সিঁথির দিদিমা’। চিৎপুরের দাদুর কথা, পাকিস্তানি দাদুর কথা অনেক বলেছি। সিঁথির দাদুর কথা তেমন বলা হয়নি।

এই দাদুর নাম সারদাচরণ কাব্যতীর্থ। সিঁথি অঞ্চলে থাকতেন। বেশ ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে দু-একবার সিঁথির দাদুর বাড়ি গিয়েছিলাম। পাকিস্তান থেকে আসার পর ওই অঞ্চলে সম্ভবত একটা বাড়ি ভাড়া নিয়েই থাকতেন। তখনকার সিঁথি-স্মৃতি এল মনে। বাড়িগুলোর সামনে কলাগাছ, বাঁশঝাড়, ছোটখাট পুকুর, ছাগল লাফাচ্ছে। বড় ধরনের দু-চারটে পাকা বাড়ি, প্রাচীরঘেরা; আর অন্য বাড়িগুলো বেশির ভাগই টালির কিংবা টিনের চালার। চালার ওপর লাউগাছ। ওই বড়-বড় পাকা বাড়িগুলো ছিল কলকাতার ধনী মানুষদের বাগানবাড়ি। ওইসব বাড়িগুলোর অনেক ক-টাই বাস্তুহারা বাঙালরা এক অর্থে দখল করে ফেলেছিল।

তালি-বান দাদুর গল্প!
পড়ুন আগের পর্ব…

তবে সিঁথির দাদু অবশ্য দখল-করা বাড়িতে নয়, ভাড়া নিয়েই থাকতেন, পরে বিরাটিতে চলে যান। ওই দাদু দেশভাগের আগে থেকেই ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র প্রুফরিডারের চাকরি করতেন। আনন্দবাজার তখন সম্পূর্ণ সাধু ভাষায় লেখা হত। সংস্কৃত-ঘেঁষা তৎসম শব্দের প্রচুর ব্যবহার হত। দাদু একাই কোম্পানি বাগানের উলটোদিকে (এখন যেটা রবীন্দ্রকানন) নতুনবাজারের কাছাকাছি একটা মেসবাড়িতে থাকতেন। পূর্ব বাংলায় দেশের বাড়িতে তাঁর পরিবার থাকত। দেশভাগের পর সবাই চলে এল সিঁথিতে। ওই দিদিমাকে দেখতাম, ঠাকুমার মতোই ‘চরণবারি’ পান করতে।

দাদুর জীবিতকালে এই বইটা নিয়ে কেন যে কিছু জিজ্ঞাসা করিনি! এখন ভাবলে আফশোস হয়। কার সঙ্গে সম্পাদনা করেছেন? এত তথ্য কীভাবে সংগ্রহ করলেন? কোনও বড় লাইব্রেরিতে এই বই ছিল না। বেশ মোটা বই, সাড়ে চারশো পৃষ্ঠায় সাত-আটশো চরিত্র নিয়ে লেখা।

আমার নিজের দাদুর স্মৃতিশক্তি ছিল দুর্দান্ত। কবীরের দোহা, চার্বাকের শ্লোক, খনার বচন গড়গড় করে বলে যেতেন। পরে বুঝেছি, এইসব চরিত্ররা দাদুর ‘চরিতাভিধান’ বইতে ছিল, যেটার সঙ্গে দাদু জড়িত ছিলেন। দাদুর জীবিতকালে এই বইটা নিয়ে কেন যে কিছু জিজ্ঞাসা করিনি! এখন ভাবলে আফশোস হয়। কার সঙ্গে সম্পাদনা করেছেন? এত তথ্য কীভাবে সংগ্রহ করলেন? কোনও বড় লাইব্রেরিতে এই বই ছিল না। বেশ মোটা বই, সাড়ে চারশো পৃষ্ঠায় সাত-আটশো চরিত্র নিয়ে লেখা। বইটার প্রথম দুটি পৃষ্ঠা প্রত্থম থেকেই পাইনি। ফলে কত সালে প্রথম প্রকাশ, কে বা কে-কে সংগ্রহ বা সম্পাদনা করেছেন জানার কোনও উপায় ছিল না। দাদুর মৃত্যুর পর বাবাকে, পিসিদের জিজ্ঞাসা করেছি, কেউ কিছু বলতে পারেনি। ব্যাপারটা অজানাই থেকে গেল। এই বইটা পরে বাঁধিয়ে নিয়েছিলাম, কিন্তু পোকায় নষ্ট করে দিয়েছে, এবং পাতাগুলিও ভেঙে যাচ্ছে।

বিরাটিতেও দাদু কখনও চুপচাপ শুয়ে থাকত না। কিছু না-হোক, নিড়ানি দিয়ে উঠোনের ঘাস পরিষ্কার করতেন, গাছে জল দিতেন, কোথাও যেতে পারতেন না। গাড়ি করে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতেও পারা যেত না। তবে, মেজ পিসেমশাইয়ের গাড়ি ছিল, মেজ পিসিমজা এসে গাড়ি করে ওর বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল দু-একবার। দাদু গাড়িতে উঠেছে বটে, কিন্তু কী লজ্জায়! যেন কী একটা অপরাধ করছে। আসলে জামাইয়ের গাড়ি কিনা!

একটা কথা তো বলাই হয়নি। দাদুর ওষুধ বানানোর গল্প। সেটা বরং পরের পর্বের জন্য তোলা থাক।