নীলা-নীলাব্জ: পর্ব ৩১

রিভিউ

শনিবার সন্ধে। লেক মার্কেটের কাছাকাছি একটা সরু রাস্তার উপর ছোট্ট রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে নীলা। জায়গাটা দেখে খুব একটা রেস্টুরেন্ট বলে মনে হয় না। পুরনো একটা বাড়ির নীচতলায় কাচের দরজা লাগিয়ে কোনওরকমে বানানো। ভেতরে কয়েকটা টেবিল দেখা যাচ্ছে। লোকজন বিশেষ নেই। নীলা মোবাইল ফোনের দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে কীসব পড়ছিল। একবার রেস্টুরেন্টের দিকে তাকায়, আবার ফোনের দিকে। ঠিক তখন পেছন থেকে পরিচিত গলা, ‘ঢুকবে না খালি পেটে দাঁড়িয়ে থাকবে?’

নীলা চমকে ঘুরে তাকায়।

নীলা: তুমি আবার এখানে কী করছ?

নীলাব্জ: যাচ্ছিলাম এদিক দিয়ে। দেখলাম একটা রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে তুমি এমন মুখ করে আছ যেন ভেতরে মানুষ মরে পড়ে আছে।

নীলা: বাজে বোকো না তো!

নীলাব্জ: তাহলে খিদে পেটে ঢুকছ না কেন?

নীলা আবার ফোনের দিকে তাকায়। ‘না, এখানে খাব না। অন্য কোথাও চলো।’

আরও পড়ুন: প্রেমে মিথ্যে কথা বলা আর ধর্মের নামে জনসাধারণকে মিথ্যে বলা কি এক?
নীলা-নীলাব্জ: পর্ব ৩০…

নীলাব্জ: কেন?

নীলা: রিভিউ খারাপ।

নীলা ফোনটা ওর চোখের সামনে ধরে, ‘থ্রি পয়েন্ট সিক্স।’

নীলাব্জ: ও।

নীলা: ও মানে?

নীলাব্জ: না, ভাবলাম ভয়ংকর কিছু হয়েছে। থ্রি পয়েন্ট সিক্স তো ভালই।

নীলা: পাঁচের মধ্যে থ্রি পয়েন্ট সিক্স ভাল?

নীলাব্জ: পাশ তো করেছে।

নীলা: আমি পয়সা দিয়ে পাশমার্কের খাবার খাব কেন?

নীলাব্জ হেসে ফেলে।

নীলা: কী এমন হাসির কথা বললাম? তানিয়া বলেছিল এখানকার খাবার ভাল। তাই এতটা এলাম। তারপর এখন চেহারা দেখে সন্দেহ হচ্ছে।

নীলাব্জ: আরে দোকানের চেহারা যত খারাপ হয়, খাবার তত ভাল!

নীলা: বাজে কথা। রেটিং দেখো থ্রি পয়েন্ট সিক্স। প্রায় সাতশো রিভিউ আছে।

নীলাব্জ: তানিয়া কত দিয়েছে?

নীলা: তানিয়া আবার স্টার দেবে কেন?

নীলাব্জ: মানে তানিয়া তোমার পরিচিত, ওর সঙ্গে বহুবার খেয়েছ, ওর পছন্দ-অপছন্দ মোটামুটি জানো। সে বলছে ভাল। আর সাতশো অচেনা লোক কী বলছে দেখে তুমি তানিয়ার কথা বাতিল করে দিলে?

নীলা: আরে! সাতশো লোককে তো আর পুরোপুরি অগ্রাহ্য করা যায় না!

নীলাব্জ নীলার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে স্ক্রিনে আঙুল চালাতে শুরু করে।

‘দেখি কী লিখেছে তোমার সাতশো খাদ্যবিশেষজ্ঞ!’

নীলা: ফোনটা ফেলো না আবার।

নীলাব্জ: এই যে, একজন ওয়ান স্টার দিয়েছে। লিখেছে, ‘Very bad behaviour.’

নীলা: দেখলে?

নীলাব্জ: দাঁড়াও। কী বিহেভিয়ার করেছে সেটা তো লেখেনি। নিজের বিহেভিয়ার কেমন, তাও তো আমরা জানি না। গ্রাহকের রেটিং হয়?

নীলা: আহ্‌!

নীলাব্জ আবার স্ক্রোল করে।

‘আর একজন ওয়ান স্টার। ‘Too expensive.’

নীলা: সেটাও তো গুরুত্বপূর্ণ।

নীলাব্জ: কত দাম হলে ওর কাছে এক্সপেনসিভ তুমি জানো? এই জায়গাটা কোন অ্যাঙ্গেল থেকে তোমার দামি লাগছে? একবার ভেতরে গিয়ে…

নীলা: না।

নীলাব্জ: রিভিউ যে দিয়েছে, সে কিপটে কি না জানো?

‘কী করে জানব?’

‘তাহলে?’

নীলা বিরক্ত হয়ে ফোনটা কেড়ে নেয়।

‘সব কিছু নিয়ে তোমাকে তর্ক করতেই হবে? লোকজন খেয়েছে, তাদের অভিজ্ঞতা লিখেছে। আমি খাওয়ার আগে একটু দেখে নিচ্ছি। এতে সমস্যাটা কোথায়?’

নীলাব্জ: কোনও সমস্যা নেই। আমি শুধু বুঝতে চাইছি, তুমি যাদের মতামতের উপর নিজের সিদ্ধান্ত ছেড়ে দিলে, তারা কারা?

নীলা: সাতশো লোকের সবাই তো আর গাধা নয়!

নীলাব্জ: সবাই মানুষ কি না, সেটাই-বা জানছ কী করে?

নীলা থমকে যায়।

‘মানে?’

‘মানে রিভিউগুলো আসল কি না জানো?’

‘গুগল রিভিউ।’

‘গুগল তোমার শ্বশুর? সত্যবাদিতার দায়িত্ব নিয়েছে?’

নীলা: তুমি বলতে চাইছ, এগুলো সব ফেক?

‘একদমই না। বলছি কোনটা ফেক তুমি জানো না। পাঁচটা আসল, পাঁচটা দোকানদারের আত্মীয়, দশটা পয়সা দিয়ে কেনা, দুটো কম্পিটিটর রাগ করে ওয়ান স্টার দিয়েছে— কী করে বুঝবে?’

নীলা: তাহলে কোনও রিভিউই বিশ্বাস করব না?

নীলাব্জ: আমি সেটা কখন বললাম?

নীলা: তাহলে কী বলছ?

নীলাব্জ একটু চুপ করে থাকে, তারপর বলে, ‘জানি না। ভাবছি।’

নীলা: না জেনেই এতক্ষণ বকবক করছ?

নীলাব্জ হাসে: মানুষ সাধারণত তাই করে। আগে মতামত দেয়, তারপর কেন দিয়েছে সেটা ভেবে বের করে।

নীলাও হাসে, ‘যাক! অন্তত নিজের ব্যাপারে তোমার ধারণাটা পরিষ্কার।’

রেস্টুরেন্টের দরজা খুলে একজন ডেলিভারির লোক বেরিয়ে আসে। হাতে খাবারের প্যাকেট। বেরনোর সময়ে ভেতর থেকে মাংস রান্নার একটা সুন্দর গন্ধ ভেসে আসে। নীলা একবার দরজার দিকে তাকিয়ে আবার ফোনে চোখ নামায়।

নীলাব্জ: খিদে পেয়েছে?

নীলা: হ্যাঁ।

‘তাহলে ঢোকো।’

‘দাঁড়াও না। কাছাকাছি আর কী আছে দেখি।’

নীলা ফোনে সার্চ করে।

‘এই দেখো! এখান থেকে চারশো মিটার। ফোর পয়েন্ট সেভেন। প্রায় তিন হাজার রিভিউ।’

নীলাব্জ: ব্যাস। খিদে চেপে ওখানেই চলো। গণতন্ত্রের জয় হোক।

নীলা: ঠাট্টা করছ কেন? তিন হাজার লোক যদি একটা জায়গাকে ফোর পয়েন্ট সেভেন দেয়, নিশ্চয় কিছু তো আছে!

নীলাব্জ: নিশ্চয়। তিন হাজার লোকের ভাল লেগেছে।

নীলা: সেটাই তো!

নীলাব্জ: না, সেটাই তো না।

নীলা ফোন থেকে চোখ তুলে তাকায়।

‘আবার কী?’

‘তিন হাজার লোকের ভাল লেগেছে— শুধুমাত্র এই তথ্যটা থেকে খাবারটা ভাল— এই সিদ্ধান্তে কী করে পৌঁছলে?’

নীলা: তিন হাজার লোকের ভাল লাগাটা কোনও তথ্য নয়?

নীলাব্জ: অবশ্যই তথ্য। তিন হাজার লোকের ভাল লেগেছে আর খাবারটা ভাল— দুটো এক কথা নয়।

নীলা কয়েক সেকেন্ড ওর দিকে তাকিয়ে থাকে।

‘এবার তুমি আঁতলামি শুরু করছ।’

‘কেন?’

‘কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কিছু পছন্দ করলেই তোমাদের সমস্যা। সবাই যে-সিনেমা দেখে সেটা খারাপ, সবাই যে-গান শোনে সেটা সস্তা, যে-রেস্টুরেন্টে ভিড় হয় সেটা বাজে। আর যে-সিনেমা কেউ বোঝে না, যে-গান শুনে ঘুম পায় আর যে-রেস্টুরেন্টে মাছি ওড়ে— সেটাই মাস্টারপিস। কারণ তোমরা পাঁচজন সেটা বুঝেছ।

নীলাব্জ হেসে ফেলে।

‘ভাল বলেছ। কিন্তু আমি সেটা বলছি না।’

‘তাহলে?’

নীলাব্জ একটু থেমে বলে, ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ ভুল হতে পারে, এটুকুই বলছি। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতাদের দেখলেই তো বোঝা যায় যে…।’

নীলা: আরে বাবা, সংখ্যালঘুও তো ভুল হতে পারে!

‘তাও পারে।’

‘তাহলে সংখ্যার অন্তত একটা মূল্য আছে।’

‘আছে। কিন্তু সত্যি নির্ধারণের ক্ষমতা নেই।’

নীলা: খাবারের আবার সত্যি-মিথ্যে কী?

নীলাব্জ: সেইজন্যই তো আরও বেশি করে নেই।

নীলা আবার ফোনের দিকে তাকায়। ফোর পয়েন্ট সেভেন রেস্টুরেন্টটার ছবিগুলো খুলে নীলাব্জকে দেখায়।

‘এই দেখো। জায়গাটাও সুন্দর।’

ছবিতে বিরাট একটা ঘর। ঝকঝকে আলো। একটা খাবারের উপর গলানো চিজ ঢালা হচ্ছে। আর একটা ছবিতে সবুজ কাচের গ্লাস থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে।

নীলাব্জ: এটা কী?

নীলা: মকটেল বোধহয়।

‘ধোঁয়া বেরোচ্ছে কেন?’

‘ড্রাই আইস হবে।’

‘খেতে হয়?’

‘না।’

‘তাহলে?’

নীলা: দেখতে ভাল লাগে।

নীলাব্জ: ও। ওই চিজটা?

‘কী?’

‘পুরো খাবারটার উপর বালতি করে চিজ ঢালছে কেন?’

নীলা: খেতে ভাল লাগে বলে!

নীলাব্জ: না কি ছবি তুলতে ভাল লাগে বলে?

নীলা চোখ পাকায়।

‘আবার শুরু হল।’

নীলাব্জ ফোনটার দিকে তাকিয়ে থাকে।

‘আসলে একটা সমস্যা আছে জানো?’

‘তোমার অনেক সমস্যা আছে।’

‘যে-জিনিসটা চিৎকার করে বলে ‘আমাকে দেখো’, তাকে সবাই দেখবে। আরে এই যে মুখচোরা রেস্টুরেন্টটা, একটু লো ভলিউমে কথা বলে, তাকে সবাই শুনতে পায় না। তার কাছে গিয়ে একটু বসতে হয়।’

নীলা: তুমি এই ফালতু রেস্টুরেন্টটার দালালি কেন শুরু করলে বলো তো, গায়ে পড়ে? লো ভলিউমে কথা বললেই কথাটা গভীর হয়ে যায় না নীলাব্জ।

‘একদম না।’

‘জনপ্রিয় হলেই অগভীরও হয় না।’

‘সেটাও ঠিক।’

নীলা: তাহলে?

নীলাব্জ একটু হাসে।

‘তাহলে হয়তো পাঁচটা স্টারের মধ্যে এই গোটা পৃথিবীটাকে ঢোকানোই মুশকিল।

নীলা: উফ্‌! খাব কোথায় সেটা বলো। আমার খিদে পেয়েছে।

নীলাব্জ কাচের দরজাটা ঠেলে খুলে ধরে।

‘থ্রি পয়েন্ট সিক্স।’

নীলা দাঁড়িয়ে থাকে।

ভেতর থেকে আবার সেই মাংস রান্নার গন্ধটা ভেসে আসে।

নীলাব্জ: তানিয়ার রিভিউটা একবার বিশ্বাস করেই দেখো না।

নীলা কয়েক সেকেন্ড ফোনের স্ক্রিনে থ্রি পয়েন্ট সিক্স সংখ্যাটার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ফোনটা ব্যাগে ঢুকিয়ে দেয়।

‘খাবার খারাপ হলে কিন্তু বিল তুমি দেবে!’

নীলাব্জ: বেশ! খাবার পছন্দ হলে আমার একটা ভাল রিভিউ দিও কিন্তু!

নীলা: তোমার রিভিউ আমি অনেকদিন আগেই দিয়ে রেখেছি।

‘কত স্টার?’

নীলা দরজা দিয়ে ঢুকতে-ঢুকতে বলল, ‘মাইনাস থ্রি পয়েন্ট সিক্স।’