সংবাদ মূলত কাব্য : পর্ব ৪৮

কাগুজে কথা

‘যুগান্তর’-এ স্থায়ীভাবে সাব এডিটর পদে আমার চাকরি হওয়ায় আমার বাবা, দু-ভাই ও এক বোন খুশি হল। আমিও বেশ আমোদ পেলাম, স্বস্তিও বলা যেতে পারে। ভাবলাম সারা জীবন আমি ‘যুগান্ত‍র’ সংবাদপত্রটিতে কাজ করব, আর রাতগভীরে চিলেকোঠায় বসে কবিতা লিখে যাব। (সারাজীবন আমি তা-ই করেছি, তবে কর্মস্থল বদলেছে, ‘যুগান্তর’ বন্ধ হওয়ার পর আমি কাজ করেছি ‘আজকাল’ সংবাদপত্রটিতে অনেকগুলি বছর, অবসরও নিয়েছি ‘আজকাল’ থেকেই।)

‘যুগান্তর’-এ আমি যোগ দিয়েছিলাম ১৯৮২ সালের শেষে, স্থায়ী হই ১৯৮৪-র শেষদিকটায়। পরের বছর, আমার মা-র মৃত‍্যুর একবছর পর মাধবীর সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। একা ঘুমতে তার ভূতের ভয়, চিলেকোঠায় উঠে কবিতা লেখায় বাধাপ্রাপ্ত হয়ে আমি একটি টেবল ল‍্যাম্প কিনি। ঘুমন্ত নববধূর পাশ থেকে উঠে ঘরের কোণে টেবল ল‍্যাম্প জ্বেলে আমি কবিতা লেখার চেষ্টা চালাতাম। তখনকার দিনে বাঙালির সবকিছুতেই একটা বাইনারি খেলা করত, ওই ১৯৮২-’৮৩-তে। ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান, কংগ্রেস-সিপিএম, হেমন্ত-মান্না, উত্তম-সৌমিত্র— যদিও তখন নবজাত ‘আজকাল’ সংবাদপত্রটির উদয় হয়েছে, ‘বর্তমান’ তখনও বেরয়নি, ‘বসুমতী’ বাঁচানোর চেষ্টায় নেমেছে রাজ‍্য সরকার, ‘সত‍্যযুগ’ নামে আরেকটি সংবাদপত্র প্রায়-অস্তমিত, তখন বাইনারি ছিল ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ ও ‘যুগান্তর’-এর।

সেসময় ‘যুগান্তর’-এ অমিতদা, অমিতাভ চৌধুরী, দেবুদা, দেবব্রত মুখোপাধ‍্যায় ছাড়াও নিরঞ্জন সেনগুপ্ত, যোগনাথ মুখোপাধ‍্যায়রা ছিলেন ওপরের সারির পদগুলিতে, চিফ রিপোর্টার ছিলেন তরুণ অঞ্জন বসু, পদস্থ রিপোর্টারদের ভেতরে ছিলেন অনিল ভট্টাচার্য, মিহির গঙ্গোপাধ‍্যায়, মহেন্দ্র চক্রবর্তী, মণি চক্রবর্তী, কল‍্যাণ বসু, উপেন চক্রবর্তী, কমল ভট্টাচার্য, সঞ্জয় শিকদার… সকলের কথা আমার মনে নেই। রবিবারের সাময়িকীর দায়িত্বে ছিলেন প্রফুল্ল রায়। সহকারী সম্পাদক ছিলেন কৃষ্ণ ধর, ‘ছোটদের পাততাড়ি’ দেখভাল করতেন গৌরাঙ্গ ভৌমিক। শ‍্যামল গঙ্গোপাধ‍্যায় ছিলেন ‘অমৃত’ সাপ্তাহিকটির সম্পাদনায়। ১৯৬১ সালে ‘অমৃত’ যখন প্রথম বের হয়, সম্পাদক ছিলেন মণীন্দ্র রায়। ‘অমৃত’ বন্ধর পর শ‍্যামল গঙ্গোপাধ‍্যায় আসেন সংবাদ বিভাগে, বরেন গঙ্গোপাধ‍্যায়, অতীন বন্দ‍্যোপাধ‍্যায় ছিলেন সংবাদ বিভাগেই। সকালে ডাকের কাগজ করার টিমে চিফ সাব এডিটর বরেনদার সঙ্গে থাকতাম আমি। বরেনদা বইপত্র সমালোচনার সাপ্তাহিক পাতা ‘গ্রন্থজগৎ’ সম্পাদনা করতেন। ‘গ্রন্থজগৎ’-এ এক কলম লিটল ম‍্যাগাজিনের খবর চালু হয়েছিল, লিখতাম আমি। (পরে বরেনদার অবসর গ্রহণের পর তিনি বইমেলার আয়োজক গিল্ডের পত্রিকা ‘কলেজ স্ট্রিট’-এর সম্পাদনার দায়িত্ব নেন, সেই পত্রিকাতেও আমাকে দিয়ে নিয়মিত তিনি লিটল ম‍্যাগাজিনের খবরাখবর লিখিয়েছেন। কলেজ স্ট্রিটে সম্ভবত দে’জ-এর অফিসবাড়ির দোতলার একটি কোণে ছিল ‘কলেজ স্ট্রিট’ পত্রিকাটির অফিস।)

শিখ দাঙ্গা, বিয়ে ও অন্যান্য! পড়ুন আগের পর্ব…

অমিতাভ চৌধুরী

‘যুগান্তর’-এর চলচ্চিত্র-নাটক সাংস্কৃতিক পাতার সম্পাদনা করতেন আশিসতরু মুখোপাধ‍্যায়। এই আশিসতরুদা এবং আকাশবাণীর অমিয় চট্টোপাধ‍্যায় ১৯৭০ সালে হইহই ফেলে দিয়েছিলেন মিনি পত্রিকা ‘পত্রাণু’ বের করে। সত‍্যজিৎ রায় এঁকেছিলেন পত্রাণুর প্রচ্ছদ। ‘যুগান্তর’-এ আমরা যে নতুনরা যোগ দিয়েছিল, তাদের ভেতর সতীনাথদা, সতীনাথ চট্টোপাধ্যায় ছিল একেবারে চলচ্চিত্রপ্লাবিত, তাকে আশিসদা খুব কাজে লাগিয়েছিলেন। সতীনাথদার স্ত্রী সুনেত্রাও ছিলেন চলচ্চিত্র-নাটকের অনুরাগিনী, তিনিও নিয়মিত লিখতেন আশিসদার সম্পাদিত ওই পাতাটিতে। ওদের ছেলে বাবান তখন শিশুটি, এখনকার অভিনেতা পরমব্রত। পরিবর্তন-এ কাজ করার সময় থেকে নির্মল ধরকে চিনতাম, নাটক চলচ্চিত্র নিয়ে লিখতেন, হাওড়ায় থাকতেন। ‘যুগান্তর’-এর ওই পাতাটিতে নির্মলদা অনেক লিখেছেন। মনে পড়ে, নির্মলদা, সতীনাথদার সঙ্গে আড্ডার কথা।

‘অমৃতবাজার পত্রিকা’-র নিউজ ডেস্কে দিলীপ মৌলিক ছিলেন নাটকের সু-অভিনেতা। সম্ভবত ইংরেজি নাটকের দল। ওই নাট‍্যদলটির সঙ্গে তিনি বিদেশও গিয়েছিলেন। সমীর দাশগুপ্ত, প্রদীপ্তশংকর সেন, বিশ্বজিৎ রায়, সোমেন মুখোপাধ‍্যায়, কল‍্যাণ চৌধুরী, মঞ্জুল গুপ্ত— নামী-নামী সাংবাদিকরা ছিলেন অমৃতবাজারে। অমৃতবাজার পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন শংকর ঘোষ। যে-কোনও তথ‍্য, যে-কোনও বিষয়ে সংশয় জাগলে আমাদের মতো ছোট ও সাধারণরা তাঁর সহযোগিতা পেতাম। বিদেশি সংবাদ সংস্থাগুলি কখনও-কখনও তাদের পাঠানো খবরে দু’টি-একটি ফরাসি শব্দ জুড়ে দিত, তখন শংকর ঘোষকে গিয়ে ধরতাম।

আমি যখন ‘যুগান্তর’-এ যোগ দিই, আলোকিত ছিল যুগান্তর-অমৃতবাজার পত্রিকার বার্তা বিভাগ। তার আগে, যাঁদের কাউকেই আমি যুগান্তর-এ, অমৃতবাজার পত্রিকায় কর্মরত অবস্থায় দেখিনি, সেই দক্ষিণারঞ্জন বসু, বিবেকানন্দ মুখোপাধ‍্যায়, আশুতোষ মুখোপাধ‍্যায় ছিলেন যুগান্তরের বার্তা বিভাগে। ছোটদের পাততাড়ি সম্পাদনা করেছেন অখিল নিয়োগী (স্বপনবুড়ো), এরপর প্রেমেন মিত্র, নকশালবাড়ি আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আগে অমৃতবাজার পত্রিকার সহকারী সম্পাদক ছিলেন সরোজ দত্ত, যিনি সিপিআই (এম-এল) দলটির মুখপত্র ‘দেশব্রতী’-র সম্পাদক হয়েছিলেন। অমৃতবাজার পত্রিকার সংযুক্ত সম্পাদক শংকর ঘোষ ছিলেন সরোজ দত্তর মামা। সিপিআই (এম- এল) দলের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা সত‍্যানন্দ ভট্টাচার্য নকশালপন্থী দলে যোগ দিয়ে আত্মগোপনে যাওয়ার আগে ছিলেন যুগান্তর-এ। সম্পর্কে আমার এক মামা সুখরঞ্জন সেনগুপ্ত ছিলেন যুগান্তরের সাংবাদিক, আমি যুগান্তরে যোগ দেওয়ার আগেই সুখরঞ্জন মামা আনন্দবাজার পত্রিকায় চলে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ, আরও পূর্বকাল ছিল অধিক আলোকিত, ঝলমলঝল।

বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ চলার সময় ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’-র রিপোর্টার দীপক বন্দ‍্যোপাধ‍্যায় ফোটোগ্রাফার সুরজিৎ ঘোষালকে নিয়ে যুদ্ধের ভেতর ঢুকে পড়েছিলেন তৎকালীন পূর্ব বাংলায়। তাঁদের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। মনে করা হয়, পাক বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছিলেন তাঁরা। তাঁদের সহকর্মীদের কাছে এই দুই অকুতোভয় সাংবাদিকদের কথা শুনেছিলাম আমরা অল্পবয়সিরা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সেখান থেকে বহু আওয়ামী লিগের নেতা-কর্মীরা কলকাতায় চলে এসেছিলেন, ঢাকার বেশ কয়েকজন সাংবাদিকও এসেছিলেন, তাঁরা নিয়মিতভাবে যুগান্তর-এ সেখানকার পরিস্থিতি ও যুদ্ধের খবর লিখতেন। ঢাকা থেকে তখন আওয়ামী লিগের মুজিব-ঘনিষ্ঠ এক তরুণ নেতা পরেশ সাহা কলকাতায় এসে থেকে গিয়েছিলেন। তিনি যুগান্তর-এ চাকরি পান। আমি যখন যুগান্তর-এ যোগ দিই, পরেশ সাহা ছিলেন চিফ সাব এডিটর। আমি বাংলাদেশের খবরাখবর সম্পর্কে পরেশদার কাছেই প্রথম তালিম পেয়েছি। তাঁর ছেলে অভী পরে প্রতিদিন পত্রিকার ক্রীড়া বিভাগের সাংবাদিক হয়েছিল।

অজয় বসু

দেবুদা, দেবব্রত মুখোপাধ‍্যায়, তাঁর ‘সেই সব দিনরাত্রি: যুগান্তর এবং আরও কিছু’ বইটিতে যুগান্তর-এর কর্তৃপক্ষীয় স্তর থেকে,রাজনৈতিক চাপের কথা উল্লেখ করেছেন। বিশেষত তুষারকান্তি ঘোষের পুত্র তরুণকান্তি ঘোষ কংগ্রেসে যোগ দেওয়া ও মন্ত্রী হওয়ার পর। তবে তা উচ্চ মহলের। আমরা যখন কাজ করেছি, সেই আটের দশকেও সংবাদপত্র ছিল অনেক মুক্ত। সাংবাদিকতাও এযুগের মতো ঝুঁকে পড়েনি। কর্তৃপক্ষীয় চাপ আমরা, হতে পারে নিচের স্তরে বলে, টের পেতাম না। তুষারকান্তি ঘোষরা ছিলেন বৈষ্ণব। বাগবাজারে ‘যুগান্তর-অমৃতবাজার’ অফিসের ছাদের ওপর একটি মন্দির ছিল। ছিল কীর্তনীয়া দল। তুষারকান্তি ঘোষের, তথা ঘোষ পরিবারের একটিই নির্দেশ ‘যুগান্তর’-এ পালিত হত, যুগান্তর পত্রিকায় সাপ্তাহিক একটি পৃষ্ঠা— ধর্মকর্ম।

‘যুগান্তর’-এর খেলার দপ্তরটিতে আমি রোজই উঁকিঝুঁকি দিতাম। এই বিভাগের সম্পাদক অজয় বসু ছিলেন, সে-বয়সে আমার আকর্ষণীয় মানুষ। সেই বাল‍্যকাল থেকে আমি বেতারে অজয় বসু আর কমল সরকারের ধারাবিবরণী শুনেছি ফুটবল-ক্রিকেটের। অতীব সুর্দশন মানুষ ছিলেন অজয়দা। ইস্ত্রি করা দুধসাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরতেন তিনি, তাঁর ধারাবিবরণীতে থাকত না ইংরেজি শব্দ। কথা বলার সময়ও না। বাগবাজারে ‘যুগান্তর’ অফিসের কাছেই থাকতেন তিনি। ‘যুগান্তর’-এর খেলার বিভাগে ছিলেন শান্তিপ্রিয় বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়, বিপুল বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়, জয়ন্ত চক্রবর্তী।

একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম, আমাদের কার্যকালের ভেতরেই, ওই ’৮০-’৯০ সময়কালে, কলকাতার সংবাদপত্রগুলি থেকে ক্রমশ ব‍্যাঙ্গচিত্র বা কার্টুন উবে যায়। আমার বালকবেলায় যুগান্তর ও অমৃতবাজার পত্রিকায় কার্টুন আঁকতেন প্রফুল্লচন্দ্র লাহিড়ী। যুগান্তর-এ তিনি কাফী খাঁ ছদ্মনামটি ব‍্যবহার করতেন, অমৃতবাজার পত্রিকায় নামের ইংরেজি আদ‍্যাক্ষর নিয়ে ব‍্যবহার করতেন পিসিএল। তবে আমি যখন যুগান্তর-এ কাজ করেছি, তখন তিনি ছিলেন না। তখন প্রথম পৃষ্ঠায় প্রথম কলমের নিচে রোজনামচায় ছোট্ট একটু কার্টুন আঁকতেন অমল চক্রবর্তী। আনন্দবাজার পত্রিকায় কার্টুন আঁকতেন দক্ষিণী কার্টুন শিল্পী পুথুক্কোডি কোট্টুথোডি শঙ্করন কুট্টি নায়ার, যাঁর পরিচিতি ছিল কুট্টি নামেই। আনন্দবাজার পত্রিকার পর কুট্টি আজকাল-এ কার্টুন আঁকতেন। একসময় সংবাদপত্রে কার্টুনকে খুবই গুরুত্ব দেওয়া হত। তিন কলম, চার কলমও কার্টুন ছাপা হত ১০/১২ সেমি উচ্চতার,একেবারে ওপরে, প্রথম পাতায়। নেহরু থেকে ইন্দিরা গান্ধীর কাল, তারপরেও কিছুকাল কার্টুন খোঁচা দিয়েছে রাজনৈতিক সামাজিক বিষয়াদিতে, এ-রাজ‍্যেও বিধানচন্দ্র রায় থেকে জ‍্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য পর্যন্ত, লোকে আমোদ পেয়েছে। পরবর্তী রাজনীতিকরা বোধ করি খুবই স্পর্শকাতর। উবে গেছে কার্টুন তা-ই।