থোড় ‘বড়ি’ খাড়া
কবিরাজি ওষুধ বানানোর বিদ্যাটা দাদু কীভাবে শিখেছিলেন, আমার জানা নেই। দাদুর বাবা সম্ভবত কবিরাজিবিদ্যা জানতেন। বৈদ্যরা তো এক সময়ে ব্রাহ্মণ-ই ছিলেন। বিদ্যা যেমন বিক্রি করা দণ্ডনীয় ছিল, চিকিৎসার বিনিময়ে টাকাপয়সা নেওয়াও নিন্দনীয় ছিল। যে-ব্রাহ্মণরা চিকিৎসা-সেবার বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করতেন, তাঁরা পতিত ব্রাহ্মণ ছিলেন, আবার তাঁরাই নাকি বৈদ্য। দাদুর বাবা, মানে আমার প্রপিতামহের কবিরাজিবিদ্যা পেশা ছিল না কি শখ, তা আমি জানি না। আমার প্রপিতামহ কী করে সংসার চালাতেন, তাও জানি না। যজমানি করতেন না, এটুকু জানি। জমিজায়গা খুব বেশি ছিল না যে ফসল বিক্রি করে সংসার চলত। সে যাই হোক, দাদু তিন-চাররকম ওষুধ তৈরি করতেন। কালমেঘের পাতা বেটে গুলি তৈরি করে রোদ্দুরে শুকিয়ে বয়ামে ভরে রাখতেন।
তখন কৃমির প্রবণতা ছিল খুব। কালমেঘ পাতার বড়ি জল দিয়ে গিলে ফেলতে হত। জবাফুল, আরও কীসব নারকোল তেলে ফুটিয়ে দাদু একটা তেল তৈরি করেছিলেন। বাড়ির বউ-মেয়েরা মাথায় দিত। হরতুকী, বয়রা, আরও কী কী যেন ভিজিয়ে সৈন্ধব নুন, জোয়ান, এইসব দিয়ে বাটিয়ে নিয়ে বড়ি বানিয়ে পাথরের থালায় রোদ্দুরে শুকোতেন। একটা নাম বলেছিলেন এই বড়িটার, ‘অগ্নিবিলাস’ কিংবা ‘অগ্নিপ্রাস’। নিজে মধ্যাহ্নভোজনের পরে একটা করে খেতেন।
আরও পড়ুন: দাদু ও চরিতাভিধান! লিখছেন স্বপ্নময় চক্রবর্তী…
এই প্রসঙ্গে একটা বচন মনে পড়ল। ‘দাদু খেতে এসো’ বলে ডাকলে দাদু বলতেন— ‘খাওয়া তো নয়, গেলা! যখন ফরিদপুরে ছিলাম, দাঁতগুলি অটুট ছিল, টাটকা মাছ-তরিতরকারি-দুধ— তখন করতাম ভোজন। এইপারে আইস্যা খাওন, এখন গেলন। খাওয়া তো নয়, কোনওরকমে গলাধঃকরণ।’ দাদুর বড়ি খেতে মন্দ লাগত না। আমিও মাঝেমধ্যে চুরি করে খেতাম। তবে ওই বড়ি তো বেশি বানানো যেত না। তাই বড়ি শেষ হয়ে গেলে জোয়ান খেতেন। পরেরদিকে আর বড়ি বানাতেন না।

দাদুর ‘খেউড়ি হওয়া’টা একটা ব্যাপার ছিল বটে। এর মানে হচ্ছে দাড়ি কামানো। এখন জেনেছি, ক্ষৌরকর্ম থেকে ‘খেউড়ি’ শব্দটা এসেছে। দাদু সকালবেলায় বলে দিতেন, ‘খেউড়ি হব।’ শীতকাল হলে গরমজল করে দিতে হত। একটা ছোট্ট টিনের বাক্সে দাদুর খেউড়ি হওয়ার সরঞ্জাম থাকত। একটা ছোট বাটি, একটা কৌটোর মধ্যে ফিট করে যায় এমন সাবান, একটা ব্রাশ, একটা সেফটি রেজারের পার্টস, একটা কাগজে মোড়া ব্লেড, একটা ফিটকিরির চাক ও একটা ছোট্ট আয়না।
বেশ আলো আসে, এমন জায়গায় দাদু একটা আসনে বসতেন। সামনে একটা জলচৌকি। চৌকির ওপর আয়নাটাকে রাখা হল। এইবার ব্লেডটা বের করে দুটো প্লেটের মাঝখানে বসিয়ে হাতলটা পেঁচিয়ে লাগিয়ে দিয়ে মুখে সাবান মেখে, এক হাতে রেজার অন্য হাতে আয়না নিয়ে নানা কোণে রেখে নানা মুখভঙ্গিমা সহযোগে ‘খেউড়ি’ হতেন দাদু। তারপর সারা মুখ-গলায় জলে-ভেজানো ফিটকিরি ঘষতেন। এখন শেভ করা কোনও ব্যাপার নয়। বিল্ট-ইন রেজার পাওয়া যায়, শেভিং ক্রিম, আফটার শেভ, আবার কেউ-কেউ ইলেকট্রিক রেজারও ব্যবহার করেন। ওতে সাবান-টাবানও লাগে না। বাবাও দাদুর পদ্ধতিতেই দাড়ি কামাতেন। তবে তার এত তোড়জোড় লাগত না। আমি প্রথম দাড়ি কামিয়েছিলাম সেলুনে। সেটা পরে বলব।




