দায়িত্ববোধ ও সম্পর্ক
ডানলপের মোড়ের ওই আলো-অন্ধকারে যানবাহন-ভাঙা কাচের টুকরো ছড়ানো পথে অনেকক্ষণ, তা প্রায় আধঘণ্টাটাক ঘুরে মাধবীর দেখা না পেয়ে আমার উদ্বেগ বাড়ছিল, ভাস্করদাও চিন্তায় পড়েছিলেন। আমাদের ঘুরতে দেখে এক পুলিশ কনস্টেবল ধমক দিলেন, ‘বাড়ি ঢুকে যান। রাস্তায় বেরিয়েছেন কেন!’ আমাদের স্থানীয় মানুষ ভেবেছিলেন তিনি। এইরকম কৌতূহলী দু’চারজন উঁকিঝুঁকি দিয়ে পুলিশ-মিলিটারির টহলদারি দেখছিলেন ডানলপে। ভাস্করদা ছিলেন একটু ভীতু প্রকৃতির, কী ভেবে ভাস্করদা বলে ফেললেন, ‘আমাদের একজন হারিয়ে গিয়েছে!’ কনস্টেবল বললেন, ‘দেখুন গিয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছে।’
আমি মাধবীদের বাড়িতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম। বাড়িটি চিনতাম। একবার দূর থেকে মাধবী চিনিয়ে দিয়েছিল, ‘মাঠের ধারে ওই আমাদের বাড়ি।’ ভাস্করদাকে বললাম, ‘আপনি বাড়ি ফিরে যান।’ ডানলপ থেকে আমি পিডব্লুডি রোড ধরে দক্ষিণেশ্বরের দিকে হাঁটতে থাকলাম। থমথমে অন্ধকার রাস্তা। রাস্তাভরা ট্রাক-লরির ভাঙা কাচ। ওখানে রাস্তার ধারে খোলা জমিতে সার-সার ট্রাক-লরি থাকে। সব ভাঙচুর হয়েছে। আড়িয়াদহে প্রগতি সংঘের ধারে মাধবীদের বাড়ির গেটের কাছে পথক্লান্ত আমি পৌঁছে ‘শিবনাথ, শিবনাথ’ বলে চেঁচাতে লাগলাম।
আরও পড়ুন: সাঁজোয়াগাড়ি, সেনাটহল! শুনশান কলকাতায় হেঁটেছিলাম প্রেমের জন্য!
‘সংবাদ মূলত কাব্য’ পর্ব ৪৭…
শিবনাথ আমার শ্যালক। তার সঙ্গে আমার আলাপ-পরিচয় আগেই ঘটেছিল। বাগবাজারে ‘যুগান্তর’ অফিস শিবনাথকে ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলাম। ‘যুগান্তর’-এর ক্যান্টিনে ১০ পয়সায় তরকারি-সহ চারখানা লুচি ও একটি রসগোল্লা, সে চমৎকৃত হয়েছিল। আমার ডাকাডাকিতে মাধবীদের বারান্দায় আলো জ্বলে উঠল, শিবনাথ বাগানের ভেতর দিয়ে গেটের কাছে চলে এল, এবং ওইরকম দিন বলেই হয়তো মাধবীর বাবা ও মা বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। আমি অবশ্য জানালাগুলির দিকে তাকিয়ে মাধবীর উঁক ঝুঁকি ঠাহর করে আশ্বস্ত হয়েছি। গেটের কাছে এসে শিবনাথ আমাকে দেখে চমকে উঠল, যেন ভূত দেখছে! কারণ তখন, সেই তখন, আমার সম্পর্কে মাধবীর বাবা-মা’র একটু কিন্তু-কিন্তু ভাব ছিল। হাব্জিগাব্জি তরুণ কবি, খবরকাগজে খবর লেখে, সেটা কি চাকরি! শিবনাথকে প্রগতি সংঘের মাঠের কোনায় নিয়ে এসে আমার আসার কারণটি জানালাম। শিবনাথ বলল, আজকের দিনে কেউ বের হয়! তার বোন বাড়িতে রয়েছে।

আমার ঝুলিতে পিটিআই, ইউএনআইয়ের ইন্দিরা গান্ধী শুট আউট-এর ক্রিডের গোছা ছিল, ‘যুগান্তর’-এর টেলিগ্রামটি ছিল। সেসব আমি শিবনাথকে দিয়ে দিলাম। শিবনাথ ও আমি তখন, এখনও পরস্পরকে আপনি-আপনি করি। শিবনাথ আমাকে বলল, ‘ভেতরে আসবেন না?’ ‘পাগল, না মাথা খারাপ!’ বলে আমি ওই আড়িয়াদহের মাঠ থেকে ফেরার পথ ধরলাম। দক্ষিণেশ্বর স্টেশনের সামনে এসে দেখলাম, যানবাহন একেবারেই নেই, কেবল মাঝে মাঝে দক্ষিণেশ্বর ব্রিজ দিয়ে পুলিশ আর সেনাদের গাড়ি যাতায়াত করছে। আমরা পা-দু’খানি আর চলছিল না। পথশ্রমে বিধ্বস্ত আমি উপায়ান্তর না দেখে একটি পুলিশের জিপকে হাত দেখিয়ে থামালাম। সেটা ব্রিজ পেরিয়ে ওপারে বালি-উত্তরপাড়ার দিকে যাচ্ছিল। জিপ থামিয়ে এক পুলিশ অফিসার বললেন, ‘কী হয়েছে?’ আমি ‘যুগান্তর’-এর সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বললাম, ‘আমাকে একটু ওপারে বালিতে পৌঁছে দেবেন?’ ওরা জিপে তুলে নিলেন। বালি স্টেশনে পৌঁছনোর পথেই শুনলাম, বিকেলের পর কিছু ট্রেন চলাচল শুরু হয়ে গিয়েছে। বালি স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে উঠে দেখলাম, দু-চারজন যাত্রী ছাড়া এমাথা-ওমাথা এলোমেলো টহল দিয়ে চলছে সেনারা আর রেলপুলিশ। তখন রাত সাড়ে আটটা-ন’টা। কিছুক্ষণের মধ্যে ট্রেন এসে গেল, তাতেও কামরায়-কামরায় সেনা-পুলিশের পাহারা। শ্রীরামপুরে নামলাম। বাড়ি ফিরলাম।
পরদিন রাজ্যের শাসক বামফ্রন্ট ইন্দিরা-হত্যার প্রতিবাদে বাংলা বন্ধ ডেকেছিল। কিন্তু শ্রীরামপুর স্টেশন থেকে বাগবাজার পর্যন্ত চলাচলকারী ৩ নং বাসটি অধুনা অবলুপ্ত হলেও তৎকালে ছিল দায়িত্বশীল ও অকুতোভয়। কাকভোর থেকে মধ্যরাত সময় ছুঁইছুঁইকাল পর্যন্ত প্রতি পাঁচ মিনিট অন্তর-অন্তর ছুটত এক-একটি ৩ নং। বন্ধের দিন আমি সক্কালবেলা চালু হওয়া ৩ নং বাসে বাগবাজার অফিসে পৌঁছে যাই। দোতলায় উঠে আমাদের নিউজ ডিপার্টমেন্টের দিকে যেতেই দেখি কোণের দিকের চেয়ারে ভাস্কর চক্রবর্তী বসে আছেন। আমি গতকাল রাতে দক্ষিণেশ্বর পৌঁছে মাধবীকে দেখতে পেয়েছিলাম কি না, তারপর শ্রীরামপুরে ঠিকঠাক বাড়িতে ফিরেছিলাম কি না, জানতে ভাস্করদা বরানগর থেকে সাইকেলে বাগবাজারে ‘যুগান্তর’ অফিসে এসেছেন! ভাস্করদাকে সারা ‘যুগান্তর’ অফিস ঘুরিয়ে দেখালাম। দুপুরবেলা ক্যান্টিনে ভাত খেলেন মাছের ঝোল দিয়ে। দুপুরে গৌরাঙ্গ ভৌমিক আসতে তাঁর সঙ্গে গল্পগুজব করে ভাস্করদা বরানগর ফিরে গেলেন।

ওই যে মাধবীদের বাড়ির গেটে গিয়েছিলাম, তাতে মনে হয় মাধবীর বাবা-মা আমার দায়িত্ববোধ সম্পর্কে আশ্বস্ত হয়েছিলেন। দিন দশকের ভেতর তাঁরা দুজন, শিবনাথ ও মাধবীর মামা-মামিমা আমাদের বাড়িতে এলেন। আমার বাবার সঙ্গে তাঁদের কথা হল। এরপর তাঁদের ফেরার সময়ে ঘটেছিল একটি চমকপ্রদ ঘটনা। সে-কথা বলতে গেলে ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার দিনটির সন্ধ্যায় আমাদের শ্রীরামপুরের বাড়ির অদূরের একটি ঘটনার কথা বলতে হয়। শ্রীরামপুরে আমাদের পাড়ার মোড়ে তেমাথায় তিনদিকের রিকশা-র একটি জমায়েত তখনকার দিনে ছিল। মাঝে মাঝে আমি যখন অনেক রাতে, বিশেষত শীতকালে, ফিরতাম, রিকশাচালকেরা কাঠকুটো জ্বেলে আমার অপেক্ষা করত। আমাকে ঘিরে বসে গল্প শুনত ওরা। চম্বলের গল্প, নানারকম গল্প। যাই হোক, আমাদের পাশের গলি, সেখানে তখন ঝোপঝাড়ের ভেতর কয়েকটা বাড়ি ছিল। ওইরকম একটি বাড়িতে আমার চেয়ে একটু কমবয়সি শিখ তরুণ মোহন সিং থাকত। আমার সঙ্গে পরিচয় ছিল মোহনের, সে ৩ নং বাসের কন্ডাক্টর ছিল, মাঝে মাঝে বাস চালাতও। ইন্দিরা-হত্যার দিন সন্ধ্যায় ওই রিকশাচালকরা দল বেঁধে মোহনের বাড়িতে লুঠপাট চালায়। অনেক রাতে শ্রীরামপুরে ফিরে এসব শুনে আমি মোহনের বাড়ি যাই। ছটফট করছিলাম।
পরদিন আমার মাথায় একটি পরিকল্পনা ছেয়ে যায়। সকালবেলাই আমি একটি টাইপস্কুলে গিয়ে একখানা কাগজে টাইপরাইটারে ওই রিকশাচালকদের নামের একটি তালিকা টাইপ করে নিই। এবার রিকশাচালকদের বলি, ‘থানা থেকে তোদের নামের এই লিস্ট পেয়েছি। এখনই যদি মোহনকে ফেরত না দিস, পুলিশ তোদের ধরবে।’ ওরা ভয় পেয়ে যায়। তারা ট্রানজিস্টার, ঘড়ি, থালাবাসন মোহনকে ফেরত দেয়। কাকুতিমিনতি করতে থাকে তারা, ‘আমরা সব ফেরত দিয়ে দিয়েছি, তুমি পুলিশকে বলে দিয়ো।’ আমি তাদের ধমকাতে থাকি, ‘ছিঃ, তোরা এমন কাজ করলি! এই আমি তোদের গল্প বলি!’
এরপর হয়েছিল কী, ওই যে মাধবীর বাবা-মা-মামারা এলেন আমাদের বাড়িতে আমার বাবার সঙ্গে কথা বলতে, ওঁরা যখন ফিরলেন, আমি তাঁদের ৩ নং বাসে বসিয়ে দিলাম শ্রীরামপুর স্টেশনের বাসগুমটি থেকে। মোহন তা দেখেছিল। মোহন ছিল ওই বাসের কন্ডাক্টর। এরপর বাস ছাড়ার পর তাঁরা যখন বাসের টিকিট কাটতে চাইলেন, মোহন তাদের ভাড়া নিতে চায়নি। কিছুতেই নেয়নি, ‘আপনারা মৃদুলদার লোক’, সে বলে দেয়। এতে মাধবীর বাবা-মা-মামা হকচকিয়ে যান। এ আমি পরে শুনেছি। এতে আমার বিয়ে বরবাদও হয়ে যেতে পারত। ওই মোহন পরবর্তীকালে বাসচালকও হয়েছিল। কলকাতায় সরকারি পরিবহনেও সে বাসচালকের চাকরি করেছে। এখনও পথে মাঝে মাঝে মোহনের সঙ্গে দেখা হয়।

ওই সময়েই, ইন্দিরা গান্ধী নিহত হওয়ার কয়েকদিন পর তুষারকান্তিবাবুর গোলঘরটিতে আমার ডাক পড়ে। তাঁর সচিব বুলুবাবু আমাকে একটি খাম দেন। খাম খুলে চিঠিটি দেখি, স্থায়ী পদে নিয়োগ হয়েছে আমার। তুষারবাবুকে প্রণাম করে দপ্তরে ফিরে ওই চিঠি আমি অমিতাভ চৌধুরী, দেবব্রত মুখোপাধ্যায়কে দেখাই। বড়ই আমোদ পেয়েছিলাম ওই নিয়োগপত্রটিতে; সম্পাদক তুষারকান্তি ঘোষ সই করেছিলেন সবুজ কালিতে, ঝরনা কলমে।
আমাদের কৈশোরে সবেমাত্র বলপেন বা ডটপেনের আবির্ভাব ঘটলেও, গোড়ার যুগে ডটপেনের কালি অনেক সময়ে থেবড়ে যেত, কাগজের উলটোদিকে ফুটে উঠত। আমরা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছি ফাউন্টেন পেনে। ব্যাঙ্কের চেক ভাউচার ডটপেন বা বলপেনে লেখা নিষেধ ছিল। সে-সময়ে সুলেখা সংস্থাটি নীল, কালচে নীল, কালো, লাল ছাড়া নানা রঙে, সবুজ, খয়েরি, বেগুনি, কমলা, গোলাপি কালি বের করেছিল। ওই বয়সে নানা রঙের ঝরনা কলমে লিখতে ভাল লাগত। নিয়োগপত্রে তুষারকান্তিবাবুর সবুজ কালির সইয়ে তাই আমোদ পেলাম। সে-কথা অমিতদাকে শুধোতেই তিনি বললেন, ‘তুমি জানো না হেড অফ দ্য ইনস্টিটিউশন সবুজ কালিতে সই করেন! রাষ্ট্রপতি সবুজ কালিতে সই করেন, ইংল্যান্ডের রানি সবুজ কালিতে সই করেন!’
পরদিন বাবাকে সুলেখার এক শিশি সবুজ কালি কিনে দিলাম। বললাম, ‘যেখানেই সই করবে, সবুজ কালিতে করবে, ইউ আর দি হেড অফ আওয়ার ফ্যামেলি।’



