ননীচোরা গোপাল
মেজপিসেমশাইয়ের কথা শেষ হওয়ার নয়। পাশের বস্তির যক্ষ্মা রোগগ্রস্তদের মাসে দুটো করে মাখন কেনার টাকা দিতেন। হাসপাতালের কাগজ দেখালে, যক্ষ্মা রোগীদের খাতায় নাম উঠত। এরপর ফাঁকা প্যাকেটটা দেখালে, দশটা টাকা পাওয়া যেত। তখনও আমূল মাখনের এতটা ব্যাপ্তি হয়নি; পলসন, ক্যাভেন্টার এইসব কোম্পানি ছিল। কারখানাটার একপাশে একটা ঘর ছিল, ওই ঘরটাকে আস্তাবল বলা হত। আস্তাবল কেন বলা হত আমার জানা নেই। হয়তো কোনও এক সময়ে ওখানে ঘোড়া রাখা হত। ওই আস্তাবলেই প্রতিদিন সকালবেলায় দুধ বিলি করা হত। এই দুধ বিলি করা নিয়ে অনেককিছু বলতে হয়।
স্বাধীনতার পরপরই ‘পশ্চিমবঙ্গ সমাজসেবা সমিতি’ নামে একটা সংগঠন গড়ে উঠেছিল। এই সমিতি কাদের উদ্যোগে তৈরি হয়েছিল আমরা জানি না। গুগ্লে খোঁজ করে এর হদিশ পেলাম না কোনও। তবে যুগান্তর পত্রিকা পরিবারের লোকজন জড়িত ছিলেন, উত্তর কলকাতার সেন এবং বসু পরিবারও হয়তো। এঁরা নানা রকম সমাজসেবা মূলক কাজও করতেন। এর মধ্যে দুঃস্থদের বস্ত্রদান, চিকিৎসা এবং পুষ্টির দিকটাও ছিল। ‘দুগ্ধ বিতরণ’ ছিল এইসব কাজকর্মের একটা অংশ। আমার মনে পড়ে, আমাদের ওই বাড়ির একটা মাঝের ঘরে, যেটা ভাড়া দেওয়া হয়নি, নিজেরাই ব্যবহার করতাম, আত্মীয়স্বজন এলে থাকত, ওই ঘরে এক জায়গায় টিনবদ্ধ মিল্ক-পাউডার থাকত। এই মিল্ক-পাউডার বিদেশের দান ছিল। খুব সম্ভব আমেরিকা থেকেই আসত। সরকারের পক্ষ থেকে কোনও-কোনও প্রতিষ্ঠানকে এই গুঁড়ো দুধ, জলে গুলে বিলি করার দায়িত্ব দেওয়া হত। ‘পশ্চিমবঙ্গ সমাজসেবা সমিতি’-ও এই দান পেত। আবার ওই সমিতি নির্ভরযোগ্য কোনও ব্যক্তি বা সংগঠনের মাধ্যমে ওই দুধ বিলির ব্যবস্থা করত। ‘বাগবাজার তরুণ ব্যায়াম সমিতি’ ছিল এরকম একটা সংস্থা। যেটা এক সময়ে বিপ্লবীদের জন্ম দিয়েছিল। জাহ্নবীজীবন চক্রবর্তী ছিলেন একজন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি। যার মাধ্যমে এই দুধ বিলি করানো যায়। ওঁরা নিশ্চিত জানতেন যে, এই দুধ কখনও চায়ের দোকানে যাবে না, ব্যক্তিগত কাজেও ব্যবহৃত হবে না।
বাঙালদের লুচি-পরোটায় পটুত্ব ছিল না, ডাল ছিল অতি আদরের! পড়ুন: উল্টো দূরবিন পর্ব ১১…
আমি দেখতাম সকালবেলায় সন্তোষ নামে কারখানার একজন কর্মচারী উপরে এসে পিসিমার কাছ থেকে একটা টিন নিয়ে যেত, তারপর একটা ছোট ড্রামে গুলত, বস্তির মানুষরা একটা কার্ড এবং একটা পাত্র নিয়ে আসত এবং ওদের মগে মেপে দুধ দেওয়া হত। এ-জন্য সন্তোষকে নিশ্চয়ই আলাদা করে কিছু টাকা-পয়সা দেওয়া হত। দুঃস্থ হিসেবে আমাদের পরিবারেরও একটা কার্ড হয়েছিল, যতটুকু পাওয়র কথা, সবাই যা পায়, তাই পেতাম। কিন্তু পিসেমশাইয়ের নিষেধ সত্ত্বেও কী করে যেন আমরা গুঁড়ো দুধ পেয়ে যেতাম। একটা কৌটো থেকে গুঁড়ো দুধ চুরি করে খেতাম। হাতের চেটোতে একটু দুধের গুঁড়ো রেখে, চেটে-চেটে খেতাম। চেটে খাওয়ার জন্যই হাতের ওই অংশটার নাম চেটো কি না কে জানে। টিনগুলো খালি হয়ে গেলে ওই টিন ব্যবহার করার জন্য আত্মীয়-স্বজন নিয়ে যেত। পায়খানার মগের পক্ষে অনেকটাই বড়। স্নান করার জন্য চৌবাচ্চার মগ হিসেবে ব্যবহার করা চলত, কিন্তু হাতল ছিল না বলে অসুবিধা হত। কিন্তু সে-সময়ে আমাদের শরণার্থী আত্মীয়-স্বজনের অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে, বাতিল বা অব্যবহার্য শব্দটাই গুরুত্ব পেত না। সব কিছুই কোনও-না-কোনও ভাবে ব্যবহার্য ছিল। অনেকেই বিনে পয়সায় পাওয়া ওই টিনে তুলসী গাছের চারা লাগিয়ে দিত।
পিসেমশাইয়ের সঙ্গে কংগ্রেসিদের সখ্য-সম্পর্ক ছিল, কিন্তু নিজে কোনও রাজনীতির মধ্যে যাননি। কোনও রাজনৈতিক মঞ্চেও উঠতে দেখিনি।

পিসেমশাইদের দুর্গাচরণ মুখার্জি স্ট্রিট-এর বাড়িটার কথা বলেছি। যেখানে চলে গিয়েছিলেন তিনি, ও বাড়িতে রান্না হত একতলায়। বাড়িটা ছোট। ও বাড়িতে খুবই যেতাম সেটা বলেছি। কিন্তু আর-একটা কথা বলি, ও-বাড়ির ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে খুচরো পয়সা থাকত, আমি ওখান থেকে পয়সা চুরি করেছি। একবার নয়, বহুবার। একটা যুক্তি তৈরি করেছিলাম— ওরা তো বড়লোক, অনেক পয়সা। সামান্য কিছু খুচরো পয়সা সরালে ওদের কিচ্ছু যাবে আসবে না। আমার তো পয়সা নেই, আমার তো ফুচকা-আলুকাবলি খেতে ইচ্ছে করে। ফুলে ওঠা কচুরির গায়ে টোকা মেরে গরম ধোঁয়ার গন্ধ পেতে ইচ্ছে করে। এরপর কয়েকদিন দুপুরবেলায় পিসেমশাই ঘুমোচ্ছে আনলায় ঝুলছে শার্ট, শার্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দু’একটা খুচরো পয়সা বের করে নিয়েছি। হয়তো দুটো দশ নয়াপয়সা, কিম্বা একটা সিকি, একটা পাঁচ নয়াপয়সা। আধুলি উঠে এলে ভয়ে রেখে দিয়েছি। অনেক পরে এই ব্যাপারটা নিয়ে অপরাধবোধে ভুগেছি। এখন এই বয়সে ওগুলো মনে পড়ে, আরও যখন ছোট ছিলাম, তখনও চুরি করেছি মনে পড়ে। মেজপিসিমাদের রান্নাঘরের দেওয়ালে একটা খোপ ছিল, আমার হাত ওই খোপ পর্যন্ত পৌঁছত না। একটা গামলা উপুড় করে, তার উপরে উঠে খোপের ভিতরে রাখা মাখন চুরি করেছি। একদিন আমার ছোটকাকু দেখে ফেলেছিল। আমাকে বকাবকি করেছিল খুব। ঠাকুর্মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল— ‘আমার কিষ্ট ঠাকুর! আমার ননীচোরা গোপাল…’
আমাদের ঘরে মাখন আসত না কখনও। কাকামণি ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার পর চাকরি পেল, তখন রবিবার করে মাংস হত। ঠাকুর্মা কাকামণিকে দিয়ে মাখন আনিয়েছিল। আমাদের ঘরে মাখনের টিন এল। গরম ভাতে আলুসেদ্ধ আর মাখন। নিজেদের মাখন। কিন্তু কাকামণি তো পৃথিবীতেই রইল না। এরপর সারাজীবনে কতবার কত জায়গায় মাখনের চাকার সামনে পড়েছি, বড় হোটেলের ব্রেকফাস্টে, বিমানে, বুফেতে। সেই মাখন চুরির গল্পটা মনে পড়ে যায় প্রতিবার।
পিসিমাদের রান্নাঘরের খোপটা ক্রমশ নীচু হয়ে গেল। মানে আমি লম্বা হতে লাগলাম। আমার হাতের নাগালে এসে গেল ওই খোপ সেই কবে… কিন্তু ওই খোপে আটকে রইল আমার একটা কষ্ট।

হঠাৎ-হঠাৎ লাফ দিয়ে নামে স্মৃতির টুকরো। একটা কালো গাড়িতে ভর্তি আমরা। ড্রাইভার হর্ন বাজাচ্ছে রবারের বাল্বের মতো। ওটা টিপতে হত। সেই হর্নের শব্দটা মনে পড়ছে— প্যাঁক প্যাঁকাপ্যাঁকা প্যাঁক প্যাঁকর প্যাঁকর প্যাঁক। পিসেমশাই তখনও গাড়ি কেনেননি। গাড়িটা পিসেমশাইয়ের এক বন্ধুর। মনে পড়ল, সেই বন্ধুর নাম মধুবাবু। মধুসূদন বণিক। সেই গাড়িটা ঠাসিয়ে আমরা। পিসেমশাই-পিসিমা, আছেন রাঙাদা আর আমরা কাচ্চাবাচ্চারা।
আমরা যাচ্ছি কল্যাণী। সবাই মিলে আমরা বাচ্চারা সব। কিচির-মিচির। পথে চকলেট, বিস্কুট। কতসব চাঁদোয়া। কী যেন সব হচ্ছে, অনেক পরে জেনেছিলাম কল্যাণী তখন নতুন শহর, বিধান রায়ের স্বপ্ন। ওখানে তখন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফেয়ার। পিসেমশাই গিয়েছিলেন রাঙাদাকে নিয়ে অটোমেটিক ট্যাবলেটিং মেশিন দেখবার জন্য। বিদেশ থেকে কোম্পানি এসেছে মেশিন নিয়ে। তখন কালির ট্যাবলেট তৈরি হত মেশিনেই। দুটো মেশিন ছিল, ওগুলো পুরনো হয়ে গিয়েছিল, প্রায়ই খারাপ হত, তাই একটা আধুনিক মেশিন দরকার হয়েছিল। পিসেমশাই ওঁর ছেলে রাঙাদাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। পিসিমাও। লং-ড্রাইভ। সঙ্গে আমাদের নেওয়ার কোনও দরকারই ছিল না। কেন আমরা সব গুঁড়োগুঁড়িগুলো? কে-কে ছিল মনে নেই। ছ’সাতজন তো ছিলামই, এর কোলে ও, ওর কোলে এ। কেন নিয়েছিলেন সঙ্গে করে? আমাদের আনন্দ দেবেন বলে। আর আমাদের সঙ্গে উনিও গ্রহণ করবেন তাই।




