ডিসটোপিয়া: ৪
পুজো-পুজো ভাব, মানে কাশফুল, আকাশে মেঘের ভেলা ইত্যাদি (স্রেফ দশম শ্রেণির রচনাবইয়ের ‘শারদোৎসব’ অধুনা-নিষিদ্ধ শব্দ) চলে গিয়ে, মাথার মধ্যের ‘অরওয়েলিয় চুরাশি’ ভাবটা বেশ তাগড়া হয়ে গেঁড়ে বসেছে। কল্পচক্ষে দেখছি, প্যান্ডেলে-প্যান্ডেলে ছ’ফুট আকারে মা। অসংখ্য নতুন ধরনের অস্ত্রশোভিতা। এবং সবাই ছয়-ছয় বারো হাতের দুর্গামা। তাঁর সর্বাঙ্গে চুমকির সঙ্গে ব্লেন্ড করা গোপন ক্যামেরা… দর্শনার্থীর ফেস রেকগনিশন করে তার যোগ্যতা, সে চিকেন খেয়ে এসেছে কি না, তার ধর্মাভ্যাস, কপালে টিপ আছে কি না সব দেখে নিচ্ছে আর ট্যাঁ করে একটা লাল নাহয় সবুজ আলো জ্বলে উঠছে।
এইসব দুঃস্বপ্নাকারে তৈরি হতে-হতে, অনুভব করলাম, ইউটোপিয়া বনাম ডিসটোপিয়ার লড়াইতে ডিসটোপিয়া জিতে গেল? না কি কয়েক ধাপ এগিয়ে গেল? একটা কথা প্রায় প্রায়ই বলি আমরা। আমাদের কাছে ডিসটোপিয়া আর অদূর ভবিষ্যৎদর্শী গল্প নয়। আমরা এখনই ডিসটোপিয়াতে বাঁচছি। হ্যাঁ সেই যে, উপকথার ধরনেই এখন ভেবে বা লিখে ফেলতে পারছি গল্প, যেখানে রাজার আদেশে সমস্ত মানুষ জড়ো হয়েছে শহরের মধ্যের চৌকো জায়গাটায়। আর সেখানে একে-একে জ্বলে উঠছে খড়ের চিতা… খড়ের ভেতর থেকে উঠেছে কতগুলো শক্ত খুঁটি, খুঁটিতে বাঁধা মানুষ। একে-একে শঙ্কুর অ্যানাইহিলিন গান দিয়ে তাদের পেট ফুটো করে দিচ্ছে যন্ত্র, আর তারা নেই-মানুষ হয়ে চলেছে। চোখের সামনে মানুষকে নেই-মানুষ করে দেওয়ার উৎসবে, আজকের দিনে, ডিসটোপিয়ার সংজ্ঞা খুঁজতে এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার লাল চামড়ায় বাঁধানো খণ্ড নামাতে হয় না সিধুজ্যাঠাকে। কান টানলেই যেমন মাথা আসে, আমরাও আসি। কানের কাছটা বেগুনি চামড়ায় বাঁধানো, আমরা এক-একটি মূর্তিমান ডিসটোপিয়ার ডেফিনিশন হয়ে গেছি। টানতে-টানতে আমাদের কান যেমন বেগুনি হয়েছে, আবার অনেকের চামড়াও গণ্ডারের হয়েছে। কোনও ব্যথা সেখানে আর নেই। সব অসাড়।
আরও পড়ুন: যে-রাতজাগা পথ মিছিলে সোচ্চার হয়, সে-পথেই কাঁধে চেপে জগজ্জননী আসেন মণ্ডপে!
লিখছেন পার্থ দাশগুপ্ত…
এই তো সেদিন! কে যেন বললেন, পুজোর সময়ে দেখলেই চিনে যাবেন। সিঁদুর বা চন্দনের টিপ আছে না নেই? পরলেই রাষ্ট্রবাদী, টিপ না পরলেই গণশত্রু। পরদিনই আমি এআই-কে প্রম্পট দিয়ে একটা গল্প লেখালাম, এআই অবশ্য দেখলাম এখনও অবধি নিজেই বুঝে যাচ্ছে কার পক্ষ নিতে হবে, সে এটাও ভেবে ফেলেছে, প্রতিটি টিপ সরকার থেকেই দেওয়া হবে আর তাতে মাইক্রোচিপ থাকবে আর তা দিয়ে টিপ-পরিধানকারীর মনের কথাও বুঝে রাষ্ট্রযন্ত্র এক ডেটাবেসে জড়ো করবে।
এইভাবে আমি একটা সিরিজ এআই-কে দিয়েই লেখাব, ভেবে রেখেছি। পুজোর প্রসাদের কাটা শসার মিষ্টি গন্ধ হয়ে যাচ্ছে প্রতিটি এগ রোলের আমিষগন্ধ একটা প্রযুক্তিবশে, মাংস এখন থেকে রাজমার মতো টেস্টের হয়ে গেছে। অথবা পুজোর দিনগুলোতে হেলিকপ্টার থেকে গুগাবাবা স্টাইলে পনির পকোড়া বৃষ্টি করে বাঙালিকে পনিরমত্ত, পনিরাকৃষ্ট ও পনিরাসক্ত করা হচ্ছে। এইসব প্রম্পট দিয়ে লেখাব। নিজে কষ্ট করার দরকার নেই, আমরা এআই-নির্মিত, এআই-পরিচালিত লজিকাল ডিসক্রিপেন্সির মধ্যে ঢুকে গেছি যেখানে, সেখানে আমাদের আধারের সঙ্গে বাকি সত্তাও লিংক হয়ে যাওয়ার পর যেটুকু পড়ে থাকে, তা অবান্তর প্রলাপ শুধু। ওটুকুই ‘আমার’ স্বাধীনতা।
তবে, এআই যবে হইতে হইল উদয়, তার পূর্বে মানুষ ক’টি মাত্র লেখালেখি করে গেছেন, তার মধ্যে আবার মেয়েমানুষরাও। তা, সেইরকম কয়েকটি মনুষ্যনির্মিত ডিসটোপিয়ার কথা কই। মেয়েদের লেখা। মেয়েদের ডিসটোপিয়া, সে কেমন? মেয়েদের সায়েন্স ফিকশন, সে কি আদৌ হবে?
২
সায়েন্স ফিকশন সম্পর্কে অজস্র সংজ্ঞার মধ্যে আমার বেদম পছন্দের এই সংজ্ঞাটি: সায়েন্স ফিকশন আসলে সেই-সেই প্রশ্নগুলোরই উত্তর দিতে চায়, ধর্ম যে-যে প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে চায়। মানে, মানবসমাজের আদি ও মৌলিক প্রশ্ন। যেমন ‘এলেম আমি কোথা হতে?’, ‘বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ?’ (দশম শ্রেণির রচনাবই) আর হ্যাঁ, মানবসভ্যতার অন্তে কী আছে? প্রগতি একরৈখিক না হাজারমুখো। সব শেষ ভালতে, না কি মন্দে? ধর্মের বিক্রি করা আইডিয়া ছিল স্বর্গ আর নরক। সাই-ফাই জানতে চায় মানবসভ্যতার গন্তব্য কি ইউটোপিয়ায় না ডিসটোপিয়ায়? উত্তরও তো জানা। ডিসটোপিয়ায়।
দুনিয়ার প্রথম সাই-ফাই নাকি লিখেছিলেন মেরি শেলি। ‘স্পেকুফিক’। যেখানে বিজ্ঞানকে মানুষের উপকারার্থে ব্যবহার করতে গিয়েও শেষাবধি ভয়াল এক ডিসটোপিয়ায় গিয়ে শেষ হয় সবটা। মেরি শেলির কাহিনির শুরুই হয়, কবরের মধ্যে মাটি ফেলার, শিউরে ওঠার মতো খপাৎছপাৎ শব্দে। কবরে মৃতদেহ শুইয়ে দেওয়ার পর কফিনসুদ্ধু আবার খুঁড়ে তুলছে কারা? তারা বৈজ্ঞানিক, না কি ধর্মের বিপরীতে পিশাচ-উপাসক, শয়তানের দাস? ডক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের সেই শব চুরির গল্প দিয়ে একটা কাঁটা-হয়ে-ওঠা উপাখ্যান আকার পায়। ব্যাকড্রপ বা চালচিত্রে তো আছেই, মধ্য ইউরোপের পাহাড়ি শহরের উঁচু-উঁচু দেওয়ালের দুর্গপ্রতিম বাড়িঘর। আর সবার অলক্ষে, মানবকল্যাণে গোপন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা ডক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন। জম্পেশ গথিক নভেলের সবরকমের উপকরণ, ভয়, অতিপ্রাকৃত, ভূতুড়ে আবহ, অন্ধকার… ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন— দ্য মডার্ন প্রমিথিউস’ কীভাবে লেখা হল? রোদ্দুরে ভরা গ্রীষ্মের সুন্দর দিনেই নাকি বাজি রাখা হয়েছিল কোনও এক আড্ডায়। ছুটিতে তিনি, স্বামী শেলি এবং কবি বায়রন জেনেভাতে মহানন্দে আছেন, এমন সময়ে ফরাসি ভাষায় অনূদিত কতগুলো জার্মান ভূতুড়ে গল্প তাঁদের হাতে পড়ে। ওই দুঃসহ কাল্পনিক গল্পগুলো পড়ার পর বায়রন মহা উত্তেজিত হয়ে উঠলেন, বললেন, ‘আমরাও প্রত্যেকেই এক-একটি ভূতের গল্প লিখব।’ এ যেন চ্যালেঞ্জ! তিনজনেই সম্মত হয়ে লিখতে শুরু করেন, কিন্তু একমাত্র মিসেস শেলির ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’ ছাড়া আর দু’জনের লেখা লোকচক্ষুর অন্তরালেই রয়ে গেল।
বস্তুত, মানবসভ্যতার কিছু আদি ও মৌলিক প্রশ্নই উঠে গেল মেরি শেলির কলমের কালির আঁচড়ে। আর রচিত হল বিশ্বসাহিত্যের প্রথম কল্পবিজ্ঞানের লক্ষণাক্রান্ত, কল্পগল্পের বা ফ্যান্টাসির ছাঁচের মধ্যে বিজ্ঞানকে ঢেলে ফেলে তৈরি করা এক রসালো ভিয়েন। চোখ বড়-বড় করে বিস্ময় আর ভয় নিয়ে গিলবে পাঠক সেই গল্প, তারপরের দুশো বছর। আশ্চর্যভাবে এই ‘হলেও হতে পারত ভূতের গল্প’ রচিত হয়ে গেল নারীকলমে। টেক এ বাও, মেরি শেলি। আদি মাতা মেরি শেলিই ১৮১৮-র সেই কল্পগল্পকে এনে দিলেন আমাদের হাতে, আমাদের মেয়ে বাংলার বেগম রোকেয়া ইউটোপিয়া ‘সুলতানা’জ ড্রিম’ লিখলেন ১৯০৫ সালে।

সাই-ফাই-এর জমানায় পৌরুষের আস্ফালন চূড়া স্পর্শ করেছিল ক্যাম্বেল সায়েবদের কালে। তাঁর মতে, কল্পবিজ্ঞান হল হার্ড ফ্যাক্টস ও নিখাদ বিজ্ঞান আধারিত পৌরুষময় এক আখ্যান। কিন্তু উরসুলা লেগুইন কি বলবেন তা? না, বহুবার মার্কিন কল্পবিজ্ঞান জগতের বাছার বাছা পুরস্কার তাঁর ঝুলিতে। কিন্তু তাঁর কাহিনি কেবল শুষ্ক বিজ্ঞানতত্ত্বের চর্বিতচর্বণ নয়। তাঁর লেখা প্রতিরোধের, দর্শনের। তাঁর লেখা পরিপূর্ণভাবে স্পর্শ করে আমাদের এই সময়কে। যখন শুষ্ক বিজ্ঞান-প্রযুক্তি পরিবেশ ধ্বংস করছে। যখন প্রতিরোধ জারি থাকছে মানববিরোধী, পশুপাখি-মনুষ্যেতর জগতের পক্ষে ক্ষতিকর প্রযুক্তির তীব্র ঔদাসীন্যের প্রতি।
কী ছিল জন ডব্লিউ ক্যাম্বেল জুনিয়রের থিওরি? ওই ঔদাসীন্যটাই ছিল, যা নারীসত্তাকে ক্রমশ সম্পূর্ণ না করে দেয়। যতটুকু বিজ্ঞান জানা গিয়েছে, তাকে ভিত্তি করে দূরদর্শিতাপূর্ণ মসিহার মতো এগিয়ে ভাবতে হবে, বিজ্ঞান কোথায় যেতে পারে। এখানে ফ্যান্টাসির স্থান নেই। ‘যন্ত্রজগৎকে বুঝবেন সাই-ফাই লেখক, এবং সেই যান্ত্রিক নীতিকেই অ্যাপ্লাই করবেন মানবসভ্যতার ওপরও।’ পৃথিবীর যে-কোনও সমস্যার সমাধান হতে পারে প্রযুক্তি দিয়ে। ক্যাম্পবেলের বিশ্বে নারীর স্থান প্রান্তিক৷ তাকে মূল ভূমি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। নারীকে যুক্তিবিবর্জিত আবেগসর্বস্ব ভাবার পিতৃতান্ত্রিক দর্শনে ক্যাম্পবেল পুরোপুরি প্রোথিত থাকেন। ‘The machine does not care’— এই কথাটিই একমাত্র প্রাধান্যের জায়গায় ছিল (টম গডউইনের ‘দ্য কোল্ড ইকুয়েশন্স’-এর বিখ্যাত বাক্য) পাঁচের দশকের গোড়ায়, পুরুষপ্রাধান্যের শীর্ষসময়ে বসে লেখা। ‘অ্যামেজিং স্টোরি’-র পাঠিকা উরসুলা নিশ্চিত সে-গল্প পড়েছিলেন৷ শুষ্ক, কঠোর বিজ্ঞানের বাস্তব ভূমিতে যেন বিচরণ করে মানুষ, আবেগের স্থান নগণ্য। তাই জ্বালানি নেওয়ার জন্য একটি মেয়ে মহাকাশচারীকে স্বেচ্ছায় আত্মবলিদান দিতে হয় ‘কোল্ড হার্ড ফ্যাক্টস’-এর ক্যাম্পবেলীয় দুনিয়ায়। ‘দ্য আর্থসি ট্রিলজি’, ‘দ্য উইজার্ড অফ আর্থসি’ (১৯৬৮), দ্য ফারদেস্ট শোর (১৯৭২), ‘দ্য টুম্বস অফ অ্যাটুয়ান’ (১৯৭০)। এই তিন মিলে উরসুলার ফ্যান্টাসি জয়যাত্রা। আবার ‘লেফট হ্যান্ড অফ ডার্কনেস’-এর মতো হার্ড সাই-ফাইও লিখেছেন। ‘All fiction is metaphor. Science fiction is metaphor.’ এই ছিল উরসুলার কথা। সমস্ত কাহিনিই আসলে রূপক। আর সাই-ফাইও রূপকই। শুধু পুরনো কাহিনির সঙ্গে তুলনা করলে এই রূপক কেবলমাত্র বর্তমানের উপাদানে গঠিত হয় না, তা ভবিষ্যতের উপাদানকেও ব্যবহার করে। আজকের বিজ্ঞানপ্রযুক্তির ওপরে দাঁড়িয়ে, এই রূপক ঐতিহাসিকতার নিয়মকে সূক্ষ্মভাবে লক্ষ করে, পর্যবেক্ষণ করে। রূপক কোনগুলো? মহাকাশযাত্রা একটি রূপক, ভিন্ন প্রজাতির ইটি একটি রূপক, ভিন্ন জীবজন্তু, আশ্চর্য জন্তুর দল রূপক। সবচেয়ে বড় রূপক সাই-ফাইয়ের ক্ষেত্রে হল, ভবিষ্যৎ। ভবিষ্যৎ কালটি কীসের রূপক? বর্তমানের।

মার্গারেট অ্যাটউডের লেখা আমেরিকান উপন্যাস, ১৯৮৪-তে লেখা ‘দ্য হ্যান্ডমেইড’স টেল’। যাকে তুলনা করা হয় জর্জ অরওয়েল লিখিত ‘১৯৮৪’ উপন্যাসের সঙ্গেই। বীভৎস এক ডিসটোপিয়া, দুঃস্বপ্নের দেশ হয়ে গিয়েছে সে-গল্পে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আমেরিকা নামক দেশটি, হঠাৎ উলটে গেছে সমাজ-রাষ্ট্রের বিধিবিধান। আচমকা, ওয়েস্টার্নাইজড, তথাকথিতভাবে লিবারেটেড (পড়ুন বেহায়া, বে-আব্রু) মেয়েশরীরের ওপর নেমে এসেছে ফতোয়া, ধর্মীয় কানুন, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। গল্পে, সে-দেশ পরিণত হয়েছে খ্রিস্টান ধর্মীয় মৌলবাদের এক আখড়ায়। রাষ্ট্র মেয়েদের ‘সুরক্ষা দিতে’ সম্পূর্ণ একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে আবার মেয়েদের লেখাপড়া, কাজ করা, ভোট দেওয়া, সব ধরনের কর্তৃত্ব নিষিদ্ধ করেছে, পর্দানশিন করেছে। আর পরিণত করেছে এক শরীরে যার কাজ শুধু সন্তানের জন্ম দেওয়া। যেন ইতিমধ্যে, নারীমুক্তির পূর্বেকার ধারণা সব মিথ্যে প্রমাণিত, আসলে তো, মেয়েরা স্বাধীনতাকে নিয়ে কী করবে বুঝতেই পারে না, নিজেদের শরীরকে সঠিক ব্যবহার না করে নষ্ট করে ফেলে, তাই তাদের সুরক্ষা দিতে আনতেই হয় ঘোমটা-পর্দা। নিষিদ্ধ হয় তাদের নিজের শরীরের ওপর নিজেদের অধিকারের স্পর্ধাপ্রদর্শন। তাদের শরীর তাদের সম্পত্তি থাকে না আর, থাকে না আর তা নিয়ে যা খুশি করার অধিকার।
‘নারী ধর্ষণ, আসলে মেয়েদেরই দায়, তাদেরই দোষ, নিজের শরীরকে ক্রমাগত দেখিয়ে-দেখিয়ে, নিজেদের শরীরের প্রদর্শনে পুরুষের লোভ জাগিয়ে-জাগিয়েই মেয়েরা নিজেদের এই ক্ষতি ডেকে আনেনি কি?’ সংলাপ রাষ্ট্রযন্ত্রের মুখে, অ্যাটউডের গপ্পে। কাল্পনিক? এই কাহিনিতে মেয়েদের পরিণত করা হয়েছে যন্ত্রে। জরায়ুযন্ত্রে। কারণ জনসংখ্যা কমে গিয়েছে তাই জন্ম দিয়ে যেতে হবে তাদের। কেবলমাত্র সন্তানজন্মের ধারকে পরিণত হতে হয়েছে তাদের।
অ্যাটউড শেষে লিখেছেন, এ-বইটিতে যেসব অত্যাচার বা মনোভাবের কথা আছে নারীদের বিষয়ে, সেগুলো তাঁর নিজ সমাজ, কানাডা বা আমেরিকার সমাজে অভাবনীয় বা প্রচণ্ড পশ্চাৎপদ বলে মনে হলেও, (এইটা লিখেছিলেন ১৯৮৪-তে, যদিও ২০২৬-এ আমেরিকাও এর চেয়ে কিছু দশক পিছিয়ে গেছে মহিলাবিষয়ক ভাবনায়) বস্তুত সেগুলো সারাক্ষণই পৃথিবীর অন্য নানা প্রান্তে ঘটে চলেছে, আফগানিস্তান বা মায়ানমার বা ভারতে। তিনি বলেছেন, এ-বইতে তিনি একটা কথাও এমন লেখেননি যা বাস্তবে কোথাও-না-কোথাও ঘটে যায়নি। কবি বলেছেন, সেই সত্য যা রচিবে তুমি। আর অ্যাটউড রুকুর মতন বলবেন, কোনওটাই মিথ্যে নয়। সব সত্যি! সব সত্যি! সতীদাহ থেকে হিজাব-আড়াল, বাধ্যতামূলক বিবাহচিহ্নধারণ থেকে আকাশপথে পুষ্পবৃষ্টি। সব সত্যি।

সুকন্যা দত্ত, আমাদের ঘরের মেয়ে। বাঙালিনি। ‘আজকের নীলকন্ঠ’ নামের কাহিনি (‘Modern Neelkanths’) একটি পরিবেশবাদী ডিসটোপিয়া। সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক তথ্যের ব্যবহার করে, কোথাও কোনও তথ্যবিচ্যুতি না ঘটিয়ে সুকন্যা হার্ড সাই-ফাই লিখেছেন। কাহিনির বিষয়টির কাল্পনিক উপদান কিন্তু গাছের ধর্মঘট, মানুষের বিরুদ্ধে। এ-গল্পকে ইকোক্রিটিসিজমের তকমা দেওয়া হয়। সংস্কৃতির নানা ক্ষেত্রকে যা জুড়ে দেয় প্রকৃতির সচেতনতার সাথে, ইকোলজি ও পরিবেশের সাথে। যে-যুক্তিবাদ মানুষকে পৃথিবীর কেন্দ্রে রেখে, সব কিছুকে মানুষের ছাঁচে ফেলে দেখায়, সেই ভ্রান্ত রাজনীতি (অ্যানথ্রোপোমরফিজম)-কে চুরমার করে দেয়।
আরেক বাঙালিনি রিমি বি চ্যাটার্জি ইতিমধ্যেই একটি সমান্তরাল জগৎ সৃষ্টি করে ফেলেছেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপকের ‘সিগন্যাল রেড’ নামের ইংরেজি উপন্যাস বের হয় ২০০৫-এ। রিমি বি চ্যাটার্জির এই উপন্যাসটি অনতিভবিষ্যতের গল্প। এবং হার্ড সাই-ফাই। বিষয়, সেই সময়েই, হিন্দু মৌলবাদীদের অধীনস্থ ভারতবর্ষ। সে-সময়টা কল সেন্টারের প্লাস্টিক মুখমণ্ডলের সুখী যুবক-যুবতীদের গল্প লেখার কাল। এই ধরনের গল্প মেনে নিতে পারেনি পাঠককুল। পরে রিমি আসেন অ্যান্টিভার্স বা বিপরীতবিশ্বের কাহিনিবয়নে। পরের বই ‘দ্য সিটি অফ লাভ’-এ, মশলা ব্যবসায়ী বিদেশি এবং ভারতীয় গূহ্য তন্ত্র নিয়ে কাজ করেছিলেন রিমি। সর্বদা তাঁর কাজ থেকেছে সবার থেকে আলাদা। তাঁর অন্যান্য উপন্যাস, ‘বিচ ওয়ার ও ব্ল্যাক লাইট’। যথাক্রমে ২০০৯ ও ২০১০-এ প্রকাশিত। ভবিষ্যতের যে-ডিসটোপিয়া আঁকেন তিনি, তাঁর মতে, আমরা ইতিমধ্যেই তার ভেতরেই বসবাস করছি। রিমির লেখার যন্ত্রমানবী মেরিলিন কাঁদতে পারে, রাঁধতে পারে, ভালবাসতেও পারে।
অ্যাটউড বলেছিলেন, দ্য ডেভিল ইজ ইন দ্য ডিটেল, তাই কল্পগল্পের ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং-এর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছোট-ছোট বিষয়গুলোকে বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে উপস্থাপিত করা। গোটা ব্যাপারটাই যেখানে দাঁড়িয়ে আছে কল্পনার ওপরে, গালগল্পের ওপরে। সেখানে হরিণের শিং, বা গিরগিটিয়ার ল্যাজ ও ডানার গঠনেই আছে রচনাকর্তার কারিগরি সূক্ষ্মতার প্রমাণ, তাঁদের ধুরন্ধর ও বেমিসাল কল্পনাশক্তির শেষ চাবিকাঠি।




