পুলিশের পাহারায় ডাকাতি করার সুযোগ, এমন কথা কোথাও শুনেছেন? স্বাধীন ভারতের বুকে প্রতি বছর নিয়ম করে সেরকমই এক ‘পবিত্র বিশৃঙ্খলা’র আয়োজন করা হয়। প্রশাসনের নজরদারিতে হাজার-হাজার মানুষ প্রকাশ্য দিবালোকে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই ডাকাতি বা লুঠপাট চালান। এটা কোনও সাধারণ উৎসব নয়, এ এক ধরনের সামাজিক প্রথা, যা প্রতি বছর হয়ে আসছে। এবং শুধু তাই নয়, এর সামাজিক স্বীকৃতিও যথেষ্ট। যদিও ‘লুট’ শব্দটার মধ্যে একটা অপরাধবোধ লুকিয়ে আছে, কিন্তু হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ায় আষাঢ়ী শুক্লা নবমী তিথিতে বৃন্দাবনচন্দ্র জিউর রথের পরদিন যখন মানুষ ‘ভাণ্ডার’ লুট করতে ছোটেন, তখন সেই শব্দটাই আচমকা রূপান্তরিত হয় পুণ্যে। আমরা যাকে সচরাচর ‘ঐতিহ্য’ বা ‘লোক-আচার’ বলে হালকা করে দিই, গবেষকদের মতে তার নীচে লুকিয়ে থাকতে পারে এক পুরনো গণ-মনস্তত্ত্ব ও সামাজিক স্তরবিন্যাসের ইতিহাস।
আশ্চর্যের বিষয়, স্বয়ং জগন্নাথদেবের প্রধান ধাম পুরীতে এই ভাণ্ডার লুটের চল নেই বলেই জানা যায়। পশ্চিমবঙ্গে তো বটেই, সারা ভারতেও এই ধরনের প্রথা খুব বেশি চোখে পড়ে না। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, এই উৎসব মূলত গোপ বা গোয়ালা সম্প্রদায়ের নিজস্ব লোকাচার হিসেবে শুরু হয়েছিল, কোনও পুরোহিততন্ত্র বা উচ্চবর্ণের নির্দেশে নয়। এই আচারের মধ্যে জগন্নাথের বৃন্দাবনলীলার স্মারকও দেখা যায়— গুণ্ডিচাবাড়ির ব্রজবিহার, হোড়া পঞ্চমী কিংবা এই ভাণ্ডার লুটের মতো লোকাচারে বিরাট ঐশ্বরিক রূপ ছেড়ে জগন্নাথ যেন হয়ে ওঠেন ঘরের ছেলে গোপাল। জনশ্রুতি বলে, এই ঘরের ছেলের ওপর অধিকার দাবি করার চল প্রথম শুরু হয়েছিল অন্ত্যজ সমাজের হাতে, যা পরে মঠের দণ্ডী স্বামীরা ধীরে-ধীরে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হন।
আরও পড়ুন: পুজো বাঙালির নস্টালজিয়া, এই হুজুগে মাততে বাঙালি ভালবাসে!
লিখছেন পারঙ্গমা সেন সাহা…
গুপ্তিপাড়ার ভাণ্ডার লুট আসলে ঠিক কী? এর উত্তরে বলা যায়, উৎসবের দিন অপরাহ্নে বন্ধ দরজার ওপারে চলে এলাহি আয়োজন— দই, ক্ষীর, বিভিন্ন মিষ্টি সহকারে জগন্নাথদেবের ভোগ। এবং ঠিক তখনই মন্দিরের গর্ভগৃহের বাইরে জড়ো হতে থাকেন গুপ্তিপাড়া-সংলগ্ন বেহুলা, আয়দা বা সূর্যপুরের মতো আশপাশের গ্রামের ঘোষেরা। দেখতে-দেখতে চারপাশের চাতাল ছেয়ে যায় হাজার-হাজার মানুষের ভিড়ে। ভোগ শেষ হতেই পুরোহিত গর্ভগৃহের দরজা খুলে দেন আর সেই কাঠের দরজা খুলে যাওয়ামাত্র চাতাল থেকে হুড়মুড় করে ভেতরে আছড়ে পড়ে মানুষের ঢল। কোনও লাইন নেই, শিষ্টাচারের বালাই নেই— কনুইয়ের গুঁতো, ঘামের গন্ধ, চিৎকার।

মুহূর্তে শত-শত কেজি মিষ্টি হাওয়া হয়ে যায়। কেউ গামছায় বাঁধছেন, কেউ জামার খুঁটে পুরছেন, কেউ আবার মাটিতে পড়া ভাঙা মালসা থেকে ক্ষীর চেঁছে নিচ্ছেন। যে-ভদ্রলোক গতকালও ট্রেনে পাশের যাত্রীর গায়ে হাত লাগলে ‘সরি’ বলতেন, দেখা যাবে তিনি হয়তো আজ এক হাতে অন্যের কলার ধরে অন্য হাতে বোঁদের মালসা টানছেন। মিনিট দশেকের মধ্যে গোটা চাতাল ফাঁকা হয়ে যায়, মেঝেতে পড়ে থাকে শুধু কিছু ভাঙা মাটির টুকরো আর ছড়িয়ে থাকা রসের দাগ। শোনা যায়, অতীতে এই লুটের অধিকার মূলত ঘোষ সম্প্রদায়ের হাতেই সীমাবদ্ধ ছিল; বর্তমানে প্রান্তিক ও নিম্নবর্গের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ সমানভাবে এতে অংশগ্রহণ করেন। মিনিট দশেকের মধ্যে মুছে যায় সামাজিক বিভেদ। এবং এই দৃশ্যকে শুধু ‘ধর্মীয় আবেগ’ দিয়ে ব্যাখ্যা করাও মুশকিল, তাহলে তার ভেতরের সামাজিক ও ঐতিহাসিক স্তরটা অধরা থেকে যায়।
ইতিহাসের পাতা ওলটালে দেখা যায়, গুপ্তিপাড়া বরাবরই কিছুটা প্রথা-ভাঙা, স্বতন্ত্র মেজাজের জনপদ। বাংলার প্রথম ‘বারোয়ারি’ বা সর্বজনীন পুজোর সূচনাও এখান থেকেই হয়েছিল বলে অনুমান। ১৭৯০ সালে বারোজন বন্ধু মিলে জমিদারবাড়ির অন্দর থেকে পুজোকে টেনে এনে রাস্তায় নামিয়েছিলেন। গুপ্তিপাড়ার ভাণ্ডার লুটকেও অনেকে তাই একই সমান্তরাল, প্রতিষ্ঠানবিরোধী মেজাজের ধারাবাহিকতা বলে চিহ্নিত করতে চান।
মধ্যযুগে বা প্রাক্-আধুনিক বাংলায় মঠ ও তার গর্ভগৃহ মূলত উচ্চবর্ণ ও সামন্তপ্রভুদের নিয়ন্ত্রণে ছিল; সাধারণ অন্ত্যজ মানুষের সেখানে অবাধ প্রবেশাধিকার ছিল না। তাই ভাণ্ডার লুটের ঘটনাকে সাব-অলটার্ন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে— রণজিৎ গুহ বা গৌতম ভদ্রের মতো ইতিহাসবিদরা যে-অর্থে ‘জনগণের নিজস্ব প্রতিরোধ’ বলে থাকেন। ভাণ্ডার লুটের ক্ষেত্রে নিম্নবর্গীয় অন্ত্যজ শ্রেণির উপস্থিতি এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই দৃশ্য আমাদের মিখাইল বাখতিনের ‘কার্নিভালেস্ক’-এর ধারণাকে মনে করিয়ে দেয়। বাখতিন দেখিয়েছিলেন, মধ্যযুগীয় ইউরোপের কার্নিভালের দিনগুলোয় সমাজের প্রচলিত নিয়ম সাময়িকভাবে উলটে যেত— রাজা হতেন ভিখারি, ভিখারি হতেন রাজা। গুপ্তিপাড়ার ভাণ্ডার লুটকে অনেকটা বাংলার নিজস্ব সংস্করণের কার্নিভালও বলা চলে, যেখানে মঠের সারা বছরের কঠোর অনুশাসন একটি দিনের জন্য শিথিল হয়ে যায়। ফরাসি দার্শনিক জর্জ বাতাইয়ের ‘অপচয়ের দর্শন’ও এখানে প্রাসঙ্গিক— তাঁর মতে, সমাজ মাঝেমধ্যে সঞ্চিত শক্তি বা সম্পদকে যুক্তিহীন-বাঁধভাঙা অপচয়ের মধ্য দিয়ে খরচ করে এক ধরনের আত্মশুদ্ধি লাভ করে। সারা বছরের অনুশাসন আর বৈষম্য থেকে তৈরি হওয়া চাপের পরে, ভাণ্ডার লুটের এই ঘটনাকে সেই অর্থে সামাজিক এক ‘সেফটি ভাল্ভ’ হিসেবেও দেখা যায়— যা দশ মিনিটের ‘পবিত্র বিশৃঙ্খলা’য় বেরিয়ে যায়।
আধুনিক গণ-মনস্তত্ত্বকে সামনে রেখে বিচার করলে আবার দেখা যায়— এই লুটের উন্মাদনার মধ্যে দিয়ে মানুষ যখন ভিড়ের অংশ হয়ে যায়, তখন তার ব্যক্তিগত যুক্তিবোধ অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়ে, সঙ্গে জন্ম নেয় এক ধরনের যৌথ, আবেগনির্ভর মন। সিগমুন্ড ফ্রয়েড আবার মনে করেন, ভিড়ের মধ্যে মানুষ তার সামাজিক বিবেকের চাপ থেকে সাময়িক মুক্তি পায় এবং ভেতরের অবদমিত তাগিদ জেগে ওঠে। ভাণ্ডার লুটের ওই কয়েক মিনিটে মন্দিরের ভেতর যেন কোনও পৃথক ‘ব্যক্তি’ থাকে না—ভেদাভেদ মুছে যায় ধনী-দরিদ্রের। তখন একজন কর্পোরেট কর্মী আর একজন দিনমজুরের দুটো হাতই একই খাবারের দিকে ছুটছে।

মনে পড়ছে গত বছরের কথা। দেখলাম, ভাণ্ডার লুটের ধুলো আর ক্ষীরমাখা শরীর নিয়ে এক মাঝবয়সি ভদ্রলোক মন্দির থেকে বেরিয়ে আসছিলেন। পাঞ্জাবির হাতা ছেঁড়া, কপালে কনুইয়ের আঘাতের দাগ। চাদরে বাঁধা তিনটে মাটির মালসা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘এত কষ্ট করে এই ক-টা মিষ্টি লুটের কী দরকার ছিল, দোকানে তো ভালো ক্ষীর পাওয়াই যায়!’ তিনি হাঁপাতে-হাঁপাতে হাসলেন, চাদরের গিঁটটা শক্ত করে বেঁধে বললেন, ‘দোকানের ক্ষীর কিনে খাই, তাতে পেট ভরে মশাই, কিন্তু অহংকার মেটে না। এই মিষ্টিটা কিনে আনিনি, ছিনিয়ে এনেছি। এর স্বাদ আলাদা।’ ভক্তের কাছে গুপ্তিপাড়ার ভাণ্ডার লুট আসলে সুরহীন, ছন্দহীন এক আদিম রাজপথের কবিতা। যেখানে গদ্যের কঠোর যুক্তিতে নয়, বরং পেশিশক্তির প্রখর দাবিতে সর্বহারা তার অধিকার বুঝে নেয়।
ঈশ্বর যদি কেবল দূর আকাশের দুর্ভেদ্য শাসক হতেন, মানুষ হয়তো তার সঙ্গে কখনও এমন সরাসরি শরীরী সম্পর্কে জড়াতে পারত না। কিন্তু আষাঢ়ের এই একটা দিনে, এক অলিখিত সামাজিক রীতিতে, ঈশ্বর আর মানুষ যেন প্রায় এক সমতলে এসে দাঁড়ান। আইনের কড়াকড়ি সরে যায়, প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকা নেয়, পুরোহিততন্ত্র কিছুক্ষণের জন্য পিছু হটে। গুপ্তিপাড়ার এই ভাণ্ডার লুট তাই কেবল এক লোকাচার নয়— তা প্রতি বছর মনে করিয়ে দেয়, সাম্যের আকাঙ্ক্ষা আর একটুখানি নিয়ম ভাঙার তাগিদ মানুষের মধ্যে থেকেই যায়, যত সভ্যই সে হোক-না কেন!




