কলঙ্কিত বিশ্বকাপ
‘গো-ও-ও-ল’। রিভার প্লেটের ‘এস্তাদিও মনুমেন্টাল’-এর আকাশে তখন ভাসছে সমবেত গর্জনের শব্দ-তরঙ্গ। ঠিক তখনই, অদূরের আকাশে উড়ে যেতে দেখা গেল একটি বিমানকে। বিমানটি সমুদ্রের ওপর দুটো চক্কর কাটল। তারপর একটি জানলা খুলে গেল বিমানের। কিছু ষণ্ডামার্কা সেনা ধরেবেঁধে এক-এক করে সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলে দিল কয়েকজন ‘বন্দি’ ব্যক্তিকে। অন্যনদিকে, বিশ্বকাপ এগিয়ে চলছে, স্টেডিয়ামে দর্শকদের চিৎকার আরও জোরালো হচ্ছে। ‘এতদিনে আর্জেন্টিনার সত্যিেকারের মুখ দেখতে পেতে চলেছে বহির্বিশ্ব’, টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে ঘোষণা করলেন ‘ফিফা’ সভাপতি জোয়াও হ্যাভেলেঞ্জ।
‘আর্জেন্টিনার ভবিষ্যত সর্বদিকে উজ্জ্বল’, দাবি করলেন মার্কিন বিদেশসচিব হেনরি কিসিঞ্জার, যিনি বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে পাঁচদিনের সফরে আর্জেন্টিনায় এসেছিলেন। রোম থেকে এক বিশেষ বার্তায় আয়োজকদের আশীর্বাদ জানিয়েছিলেন পোপ।
বলিভিয়াতে তখন দোমিতিলা ব্যারিওসের নেতৃত্বে পাঁচজন টিন-খনির মহিলা শ্রমিক অনশন করছেন সে-দেশের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে। কিছুদিনের মধ্যেই সমগ্র বলিভিয়ায় এই অনশন-হরতাল ছড়িয়ে পড়ে। যার জেরে ভেঙে পড়ে সামরিক শাসন। কিন্তু আর্জেন্টিনার ‘সামগ্রিক সুস্বাস্থ্য ও উন্নয়নযজ্ঞ’ প্রদর্শনের মধ্যে দিয়ে একাদশ ‘ফিফা’ বিশ্বকাপের উদ্বোধন করল। আশেপাশে তখন বাজছে প্রতিযোগিতার বিজ্ঞাপনের সুর, ‘আর্জেন্টিনা মাই লাভ’ (আর্জেন্টিনা, আমার ভালবাসা)! কিকঅফ করে উদ্বোধনী ম্যাচ শুরু করেছিলেন পশ্চিম জার্মান অধিনায়ক বার্তি ভোগতস। কয়েকদিন পর তিনি জানিয়েছিলেন, আর্জেন্টিনা এমন এক দেশ, যেখানে আইনের শাসন রক্ষিত হয়। একজনও ‘রাজনৈতিক বন্দি’ তাঁর চোখে পড়েনি!
প্ররোচনার গুঁতো! জিদানকে শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছিল মাঠ থেকে! পড়ুন: বিতর্কিত একাদশ পর্ব ৯…
এর কিছুদিন আগে, ২৩ মে বোর্দো থেকে প্যারিস যাওয়ার ট্রেন ধরার জন্যন বোর্দোর উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন ফ্রান্সের কোচ, মিশেল হিদালগো। কিন্তু পথেই তাঁর গাড়ি আটকালেন তিনজন অজ্ঞাত পরিচয় বন্দুকধারী। ফরাসী কোচকে তাঁরা গাড়ি থেকে বের করে নিয়ে গেলেন জঙ্গলের মধ্যেহ। কোনওক্রমে এই জঙ্গিদের হাত থেকে পালিয়ে, বোর্দো পৌছলেন ও শেষপর্যন্ত ট্রেন ধরতে পারলেন।

‘বাম-প্রলেতারিয়েত’ নামক একটি সংঘটন এই অপহরণের দায় স্বীকার করে। ‘ফ্রান্স সরকার এই দ্বিচারিতা অবিলম্বে বন্ধ করুন। একদিকে তারা আর্জেন্টিনার সামরিক শাসকের এক বড় অস্ত্র সরবরাহকারী। ও অন্যলদিকে তারা মানবাধিকার রক্ষার জন্যর গলা ফাটাচ্ছে।’ ওই বার্তায় আরও যোগ করা হয় যে, ‘এই বিশ্বকাপে খেললে সেটা হবে আর্জেন্টিনার সামরিক-জুন্টা একনায়কতন্ত্রের প্রতি ফরাসী সরকারের সমর্থন স্বরুপ।’
আর্জেন্টিনার সামরিক শাসনের হাতে নিহত ফরাসী নাগরিকের সংখ্যা ছিল কুড়ি! মানবিকতা লঙ্ঘনের সমস্ত সীমা অতিক্রম করে যখন দুই ফরাসী নান, রেনি লিওনি দুকেত ও অ্যালিস দোমোন, যাঁরা অভ্যুনত্থানের আগে সেবিকার মতো জেনেরাল ভিদেলার প্রতিবন্ধী ছেলের দেখাশোনা করতেন, তাঁদের কড়া ঘুমের ওষুধ খাইয়ে নিস্তেজ করে, বিমানে তুলে নিয়ে গিয়ে রিও-দে-লা-প্লাতা মোহনায় ফেলে দিয়েছিলেন সামরিক কর্তারা!
সামরিক একনায়কতন্ত্রের শাসনযন্ত্রে নির্যাতন, নির্বিচারে হত্যা, অপহরণ ও অন্তর্ধানের খবর যখন বিশ্ব মিডিয়ায় দেশ-ছাড়াদের কলামের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে, তখন এই বিশ্বকাপ আয়োজন সব অপকর্ম ধুয়েমুছে সাফ করে ভাবমূর্তি কিছুটা উজ্জ্বল করার একটা মঞ্চ দিয়েছিল— জেনেরাল ভিদেলা-সহ সামরিক জুন্টা কর্তাদের। ‘সামরিক বা সাধারণ পোশাকে, অভ্যু্ত্থানের নেতারা এই মঞ্চে নিজেদের নতুন করে চেনানোর সুযোগ পেয়েছিলেন।’ তাঁর ‘স্ট্যান্ডস উইদাউট পিপল’ বইতে লিখেছেন গুস্তাভ কাম্পানা।

১৯৭৬-এ একটি সামরিক অভ্যুাত্থানের মধ্যে দিয়ে ক্ষমতায় দখল করেছিল জেনেরাল জর্জে রাফায়েল ভিদেলার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনার সামরিক জুন্টা। বিংশ শতাব্দীতে ষষ্ঠবারের জন্য আর্জেন্টিনায় সামরিক একনায়কতন্ত্র কায়েম হয়, এবং এই সাত বছরের সময়কালে গুপ্তহত্যা, নির্যাতন, রক্তক্ষরণে আগের সব একনায়কতন্ত্রের শাসনকে ছাপিয়ে যায়। এর আগে ১৯৭৩-এ কিন্তু জুয়ান দোমিঙ্গো পেরনের নেতৃত্বে, সাময়িকভাবে গণতান্ত্রিক সরকারের প্রত্যাবর্তন হয়েছিল লাতিন আমেরিকার দেশে। তবে বর্ষিয়ান পেরন ক্ষমতায় আসার কিছুদিনের মধ্যেই, অসুস্থ হয়ে পড়লেন ও ১৯৭৪-এ তার মৃত্যু হল। উপরাষ্ট্রপতি ও তাঁর তৃতীয় স্ত্রী ইসাবেলের হাতে তিনি ক্ষমতা দিয়ে গিয়েছিলেন। এই পর্বে দু’বছর ধরে নানা সংঘাত ও সমস্যায় বিদীর্ণ হয় দেশ। সে-সুযোগেই ’৭৬-এ অভ্যুৃত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করলেন জেনেরাল ভিদেলা ও তার সামরিক গোষ্ঠীর কর্তারা।
ক্ষমতায় আসার দু’বছরের মধ্যেৃ, কয়েক মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে একাদশ ‘ফিফা’ বিশ্বকাপ আয়োজন করল আর্জেন্টিনা। ১৯৬৬ থেকেই বিশ্বকাপ আয়োজনের দাবি জানাচ্ছিল এই দেশ। ঠিক কত কোটি ডলার ব্যয় বা নয়ছয় হয়েছিল এই আয়োজন যজ্ঞে, তা রাষ্ট্রীয় ভাবে গোপন রাখা হয়। তার নির্দিষ্ট হিসেব আজও পাওয়া যায়নি।
সামরিক শাসনের অধীনে আর্জেন্টিনার ঝলমলে মুখশ্রী বিশ্বের প্রতিটি কোণে সম্প্রচার করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। ঝাঁ চকচকে বিমান বন্দর, সুসজ্জিত স্টেডিয়াম, বিলাসবহুল মিডিয়া সেন্টার— সারা বিশ্ব থেকে আসা পাঁচ হাজার সাংবাদিকের জন্য অপেক্ষা করে ছিল। এই দৃশ্যে নির্মাণের জন্য জেনেরাল ভিদেলা-সহ মিলিটারি জুন্টার শীর্ষ নেতারা বুলডোজার নিয়ে গিয়ে মনুমেন্টালের আশপাশের অঞ্চলের সমস্ত বস্তি গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন। কয়েক হাজার বস্তিবাসীকে উচ্ছেদ করে ট্রেনে চাপিয়ে শহরের বাইরে বের করে দেওয়া হয়! লেখক ও সুরকার জর্জে স্কুশিমকে দিয়ে বিশ্বকাপের কয়েকটি বিজ্ঞাপন করিয়ে নিয়েছিলেন সামরিক সংগঠকরা, তার মধ্যে অন্যেতম ছিল আধা-ফ্যাসিবাদী আবেদনের বিজ্ঞাপন ‘আর্জেন্টিনা, মাই লাভ’।
নিজের আত্মজীবনীতে স্কুশিম লিখেছেন যে, একদিন একটি ক্যাবারে শো-এর পর তাঁর দেখা হয়ে গিয়েছিল নৌ-সেনাপ্রধান ও এসমার শীর্ষকর্তা এমিলিও মাসেরার সঙ্গে। মাসেরা তাকে অভিনন্দন জানিয়ে, ‘আর্জেন্টিনা, মাই লাভ’-এর ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। কয়েকজন বর্ষিয়ান জার্মান সাংবাদিক এই আয়োজনের জাঁকজমকের মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন হিটলার যুগের ১৯৩৬ বার্লিন অলিম্পিকের ছায়া। দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি জোরালো করার জন্য, আধ মিলিয়ন ডলার পারিশ্রমিক দিয়ে একটি মার্কিন জনসংযোগ সংস্থাকে নিয়োগ করেন সামরিক কর্তারা। বার্সন-মার্স্টেলর যে-চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দিয়েছিল, তার শিরোনাম ছিল, ‘পণ্যের জন্য যা সত্য, তা দেশের জন্যেও সত্য ।’
এই নৌ-সেনাপ্রধান মাসেরার-ই ডানহাত ছিলেন অ্যাডমিরাল কার্লোস আলবার্তো লাকস্ট। অ্যাডমিরাল লাকস্টই কালক্রমে হয়ে গেলেন, বিশ্বকাপ সংগঠক কমিটির সর্বেসর্বা। কাপ আয়োজন নিয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইউরোপ বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গেলে প্রথমেই কী-কী আমাদের নজর কাড়ে? উঁচু বহুতল, বিশাল এয়ারপোর্ট, দুর্দান্ত সব গাড়ি…’ এহেন লাকস্ট কোটি-কোটি ডলার উধাও করে হঠাৎ চমক দেওয়ায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। বিশ্বকাপ সংগঠনের শীর্ষ পদের দায়িত্ব তিনি পেয়েছিলেন জনৈক পূর্বতন শীর্ষ কর্তার রহস্যজনক মৃত্যুর পর। লাকস্টের নেতৃত্বে আয়োজক কমিটি কোনও নজরদারি ছাড়াই, জনগণের কোটি-কোটি ডলার নয়ছয় করে যাচ্ছিল। খরচের বাহুল্য হু-হু করে বাড়ছিল, লাকস্ট তা নিয়ে কোনও ভ্রুক্ষেপই করছিলেন না। যা দেখে স্বয়ং সামরিক জুন্টার অর্থভাণ্ডারের সচিব হুয়ান আলেমান, কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলেছিলেন। লাকস্ট ঠান্ডা মাথায় একটি হুমকি প্রায়শই দিতেন, ‘যদি কেউ একটা বোমা রেখে আসে তোমার বাড়িতে তখন কিন্তু অভিযোগ কোর না!’ এবং মারিও কেম্পেসরা যখন পেরু ম্যাচের চতুর্থ গোল উদ্যাপন করছেন, তখন সত্যিই আলেমানের বাড়িতে এক শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণ হল! যদিও বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর, সংগঠক হিসেবে তাঁর ‘অবদান ও পরিশ্রমের’ কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ‘ফিফা’ লাকস্টকে পুরস্কৃত করেছিল। ‘ফিফা’-র নতুন সহ-সভাপতি বনে গেলেন বহু অপরাধে অভিযুক্ত এই অ্যাডমিরাল!
মার্কিন মদতে তখন আর্জেন্টিনার মতোই পেরু, চিলি, বলিভিয়া-সহ লাতিন আমেরিকার বহু দেশে সামরিক একনায়কতন্ত্র কায়েম হয়েছিল। ‘অপারেশন কন্ডোর’ নামে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল রাজনৈতিক বিরোধীদের নির্মূল করার উদ্দেশ্যে। বুয়েনাস আইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্টালের অদূরেই অবস্থিত, ‘এসকুয়েলা দে মেকানিকা দে লা আর্মাদা’ (‘এসমা’), অর্থাৎ নৌবাহিনীর উচ্চ-কারিগরি বিদ্যাীর এক স্কুলকে, নিজেদের গুপ্ত কারাগার ও নির্যাতন কেন্দ্রে পরিণত করেছিল জেনেরাল ভিদেলার শাসনযন্ত্র। এই কারাগারে বহু ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী থেকে সাংবাদিক ও সমালোচক, ছাত্র থেকে জঙ্গি সংগঠনের নেতা, সমাজকর্মী থেকে মহিলা নেত্রী, শিল্পী থেকে সাংস্কৃতিক কর্মী— সব প্রকার বিরোধীদের বিনা বিচারে আটক করে নিপীড়ন করা হত। অনেক রাজনৈতিক বন্দির আর কোনও চিহ্নই মেলেনি! এসমাকে বহু রাজনীতি বিশেষজ্ঞ তুলনা করে থাকেন, হিটলার আমলের নাৎসি বাহিনীর কুখ্যাত অউশউইৎজ রাজনৈতিক বন্দি-শিবিরের (কনসেন্ট্রেশন ক্যারম্প) সঙ্গে।
সামরিক জুন্টার যে সর্বোচ্চ স্তরের কর্তারা বিশ্বকাপ সংগঠনের দায়িত্বে ছিলেন, তাঁরাই সমান্তরালভাবে ‘চূড়ান্ত নিষ্পত্তি’ (‘দ্য ফাইনাল সলিউশন’) বা ‘চূড়ান্ত ব্যবস্থা’ (ফাইনাল ডিসপজিশন), এই সাংকেতিক নামে রাজনৈতিক বন্দিদের এই গুমখুন ও নির্যাতনের প্রকল্প চালাচ্ছিলেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই সাত বছরের সামরিক শাসনকালে, প্রায় তিরিশ হাজার রাজনৈতিক বিরোধীকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দেওয়া হয়েছিল। যাদের অধিকাংশই ছিলেন বাম বা পেরনপন্থী। ঠিক কত হাজার, সংখ্যাটা আজও জানা যায় না। যাঁরা তা জানার চেষ্টা করেছিলেন, তাঁরাও রহস্যজনক ভাবে উধাও হয়ে যান। বিক্ষোভ জানানোর মতোই, অযাচিত কৌতূহল ও যতই ন্যায্য হোক-না-কেন, অপ্রিয় প্রশ্ন তোলা একনায়কতন্ত্রের চোখে ছিল নাশকতার নিশ্চিত প্রমাণ! বিশ্বকাপে দর্শকদের চিৎকার ভেসে আসত এসমার অন্ধকার কারাগারে, মিশে যেত নির্যাতিত বন্দিদের আর্তনাদের সঙ্গে।

সেই সময়ে এসমা কারাগারে বন্দিনী ছিলেন গ্রেসিয়েলা দালিও। বহু বছর পরে, পপেলিতোস নামে আর্জেন্টিনার সাংবাদিকদের যৌথ এক প্রকল্প ১৯৭৮ বিশ্বকাপের ৭৮-টি কুখ্যাত গল্প খুঁজে বের করে, তা ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশ করে। সেখানে বামপন্থী নেত্রী গ্রেসিয়েলা লিখেছেন, ‘জেলের পেছন দিকের একটা অফিস ঘরে আমরা বন্দিরা, সাদা-কালো টিভিতে খেলা দেখার সুযোগ পেতাম। ফুটবল নিয়ে বন্দিদের মধ্যে ও উৎসাহের কমতি ছিল না। কিন্তু এই বিশ্বকাপ আমাদের সমস্যা কে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। আমরা জানতাম, ওদের জয় মানেই আমাদের পরাজয়!’ শেষ দুটি বাক্যের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গ্রেসিয়েলা লিখেছেন, ‘এতদিন গোপনে লুকিয়ে থেকে যে মানবাধিকার ও জঙ্গি কর্মীরা কাজ চালাচ্ছিলেন, তাঁরা বিশ্বকাপ কভার করতে আসা পাঁচ হাজার বিদেশি সাংবাদিকদের কাছে সামরিক শাসকদের কুকীর্তি ফাঁস করার সুযোগ হাতছাড়া করত না। দেশছাড়া পলাতকদের একাংশও এই কাজের জন্য্ দেশে ফিরবে। এতদিন এঁরা বিদেশি পত্রিকায় কিছু হাতে গোনা কলাম লিখে পরিস্থিতি জানানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু সামরিক জুন্টার আধিকারিকরাও এটা আগাম বুঝে ফেলেছিলেন। তাই তাঁরা বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই তাঁদের ধরপাকড়, অপহরণ বেড়ে গিয়েছিল; বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা যত এগোচ্ছিল তত বৃদ্ধি পাচ্ছিল ধরপাকড় অভিযান। আমাদের মতো বন্দিদের বাইরে জনবহুল জায়গায় নিয়ে যাওয়া হত কমরেডদের চিনিয়ে দেওয়ার জন্যে। তাই বাড়ছিল নিখোঁজের সংখ্যাকও!’

পপেলিতোস কথাটির মানে হল, ছেঁড়া কাগজের টুকরো। আর্জেন্টিনার ফুটবল সমর্থকরা বরাবরই ম্যাচ চলাকালীন কাগজের টুকরো মাঠে ছুঁড়তেন উদ্যাপনের জন্য। কিন্তু সামরিক শাসন বিশ্বকাপে এর ওপর বেতার মারফত নিষেধাজ্ঞা জারি করে দেয়, বিদেশিদের সামনে স্টেডিয়ামের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার অজুহাতে। তার প্রতিবাদে জনপ্রিয় কার্টুনিস্ট কায়লো, দর্শকদের মাঠে কাগজবৃষ্টি করার জন্যর আবেদন করেন। ফাইনালেও দেখা গিয়েছিল এই কাগজবৃষ্টির দৃশ্য। মাঠে পড়ে থাকা কাগজের টুকরোর ওপর দিয়ে গোল করছেন মারিও কেম্পেস।
সামরিক জুন্টার যে সর্বোচ্চ স্তরের কর্তারা বিশ্বকাপ সংগঠনের দায়িত্বে ছিলেন, তাঁরাই সমান্তরালভাবে ‘চূড়ান্ত নিষ্পত্তি’ (‘দ্য ফাইনাল সলিউশন’) বা ‘চূড়ান্ত ব্যবস্থা’ (ফাইনাল ডিসপজিশন), এই সাংকেতিক নামে রাজনৈতিক বন্দিদের এই গুমখুন ও নির্যাতনের প্রকল্প চালাচ্ছিলেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই সাত বছরের সামরিক শাসনকালে, প্রায় তিরিশ হাজার রাজনৈতিক বিরোধীকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দেওয়া হয়েছিল।
এই পরিস্থিতিতে বুয়েনাস আইরেসের নবনির্মিত ঝাঁ চকচকে বিমানবন্দরে বিশ্বকাপে যোগ দিতে নেমেছিল, আরও পনেরোটি দেশের জাতীয় দল— ইউরোপের দশটি, দুই আমেরিকা মিলিয়ে আরও তিনটি এবং তিউনিসিয়া ও ইরান। আয়োজক আর্জেন্টিনাকে নিয়ে শুরু হল ষোল দলীয় প্রতিযোগিতা। দুই প্রাক্তন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে ও ইংল্যান্ড যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। বাছাই পর্বের বাধা টপকাতে পারেনি বেলজিয়ামের মতো ভারী দলও।
সিজার লুই মেনোত্তির হাতে ছিল আর্জেন্টিনা দলের পূর্ণ দায়িত্ব। শিল্পীদের মতোই সামরিক শাসনের নজরদারি থেকে বাদ যাননি ফুটবলাররাও। আজকের যুগের লিও মেসি-লতারু মার্তিনেজদের মতো তখনকার জাতীয় দলের ফুটবলাররা ইচ্ছামতো ইউরোপের ক্লাবে খেলতে যেতে পারতেন না। মেনোত্তির বাছাই করা ৬৬জন জাতীয় ফুটবলারের ইউরোপের ক্লাবে খেলার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে দেয় সামরিক সরকার। মেনোত্তির আর্জেন্টিনা টিমের একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন— মারিও কেম্পেস, যিনি স্প্যােনিশ লিগে ভ্যালেন্সিয়ার জার্সি গায়ে খেলতেন, দলকে একটা আক্রমণাত্মক ছকে খেলানোয় রপ্ত করেছিলেন মেনোত্তি।
আর্জেন্টিনা কোচের দর্শন অনুযায়ী, ফুটবল ব্যক্তিগত দক্ষতার থেকে অনেক বেশি টিমগেম নির্ভর খেলা। মেনোত্তি কমিউনিস্ট-ঘনিষ্ঠ কি না, তা নিয়ে জল্পনা ছিল বহুদিন। সামরিক শাসনের পতনের পরে জানা গেল যে, তিনি আদতে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। আর্জেন্টিনাকে প্রথম বিশ্বকাপ দেওয়া কোচ মেনত্তি ২০২৪-এ প্রয়াত হন।
এই দলের অধিনায়ক ছিলেন ডিফেন্সের স্তম্ভ দানিয়েল পাসারেল্লা, মূল স্কিমার ছিলেন ফরোয়ার্ড মারিও কেম্পেস। সুদর্শন, ঝাঁকড়া চুলের কেম্পেসের খেলাও তার চেহেরার মতোই আকর্ষক ছিল। ‘উইথ দ্য বল’ তার গতি আর তেজ ছিল বুনো ঘোড়ার মতো, সঙ্গে ছিল অসাধারণ ফিনিশিং-ক্ষমতা। যোহান ক্রুয়েফের অনুপস্থিতিতে, ঘরের মাঠে কেম্পেস সবথেকে বেশি দর্শক টানতে পেরেছিলেন। আর্জেন্তিনোস জুনিয়রের হয়ে তখন ঘরোয়া লিগে আত্মপ্রকাশ করেছেন, সাড়ে সতেরোর এক বিস্ময় প্রতিভা— দিয়েগো মারাদোনা। কিন্তু মেনোত্তি-পাসারেল্লারা মারাদোনাকে বিশ্বকাপের জন্যি যথেষ্ট পরিণত বলে মনে করলেন না। তাঁরা অভিজ্ঞদের ওপর ভরসা রাখলেন এবং বাদ পড়লেন টিনএজার দিয়েগো। পরে বহু সাক্ষাৎকারে মারাদোনা বলেছিলেন যে, ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ দলে জায়গা না পাওয়া তার জীবনের এক বড় অক্ষেপ।
আর-একটি বিষয় নিয়ে একটি জনপ্রিয় মিথ রয়েছে ’৭৮ বিশ্বকাপ ঘিরে। রাইনাস মিশেলের কোচিংয়ে টোটাল ফুটবল খেলে ১৯৭৪-পশ্চিম জার্মানি বিশ্বকাপে ফুটবল দুনিয়াকে সম্মোহিত করেছিল নেদারল্যান্ডস। যদিও ফাইনালে তারা হেরে যায় ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার-গার্ড মুলারদের পশ্চিম জার্মানির কাছে। সেই ডাচ দলের সুপারস্টার যোহান ক্রুয়েফ, আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ থেকে হঠাৎ নিজেকে সরিয়ে নেন। অথচ যোগ্যতা অর্জনকারী পর্বে কমলা জার্সিতে নিয়মিত দেখা গিয়েছিল ডাচ প্লে-মেকারকে।
অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন যে, সামরিক একানায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে বিশ্বকাপে না খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ক্রুয়েফ। পরে একাধিক সাক্ষাৎকারে বিশ্বকাপে না যাওয়ার রহস্যা উন্মোচন করেন স্বয়ং ক্রুয়েফই। সে-সময়ে ‘বার্সেলোনা’-র হয়ে ক্লাব ফুটবলে ফুল ফোটাচ্ছিলেন ডাচ তারকা। কিন্তু ‘বার্সেলোনা’য় তাঁকে সস্ত্রীক মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে, অপহরণের চেষ্টা হয় বিশ্বকাপ শুরুর কয়েকমাস আগে। এই প্রচেষ্টায় বেঁধে ফেলা হয়েছিল ক্রুয়েফ ও তাঁর স্ত্রীকে। ক্রুয়েফের ছেলেমেয়েরা তখন ক্যাটালান শহরের একটি ফ্ল্যাটে অভিভাবকহীন অবস্থায়। এই পরিস্থিতিতে প্রবল দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপের মধ্যে পড়ে যান ক্রুয়েফ ও তার স্ত্রী। পুলিশ ঘটনার তদন্ত করতে নামে, ও তাঁদের বাড়িতে সর্বক্ষণের জন্য পুলিশ প্রহরা বসানো হয়। পুরো ঘটনায় সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে ক্রুয়েফের পরিবার। ‘বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতায় খেলার জন্য যে-শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি দরকার, তা আমার তখন ছিল না। তাই নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলাম।’
অর্থাৎ ডাচ দল আর্জেন্টিনা পাড়ি দিয়েছিল দলের সেরা বল-প্লেয়ারকে ছাড়াই। যদিও তাতে তাদের পারফরম্যান্সে বিশেষ প্রভাব পড়েনি। প্রথম পর্বের গ্রুপে স্কটল্যান্ডের কাছে একটি ম্যাচে হেরে গেলেও, কোয়ার্টার ফাইনালে কঠিন গ্রুপে দেখা যায় কমলা জার্সির দাপট। ইতালি ও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে স্বকীয় স্টাইলে ফুটবল খেলে পেছনে ফেলে দিয়ে, সদর্পে আবার ফাইনালে পৌঁছে যায় ডাচরা।
সে-বারের বিশ্বকাপ মূল পর্বে সেমিফাইনাল ছিল না। ফাইনাল ছাড়া আর নকআউট পর্ব বলতে কিছু রাখা হয়নি! প্রাথমিক গ্রুপ লিগ পর্ব থেকে আটটি দল ওঠে কোয়ার্টার ফাইনাল গ্রুপ পর্বে। তাদের দু’টি গ্রুপে ভাগ করে আবার লিগ পর্বে খেলা হয়, ও দু’টি গ্রুপ-সেরা দল, সরাসরি ফাইনালের ছাড়পত্র পায়। গ্রুপের দ্বিতীয় দু’টি দলের মধ্যে খেলা হয় তৃতীয় স্থানের জন্য।
এবং ব্রাজিল। তিনবারের ‘জুলেরিমে’ ট্রফি জয়ীদের দেশের ফুটবল তখন একটা বাঁকের মুখে দাঁড়িয়ে। কোচ ক্লদিও কুটিনহোর টিমে ছিলেন ১৬ জন নতুন মুখ; একটা নতুন প্রজন্ম উঠে আসছে সাতের দশকের তারাদের বিকল্প হিসেবে। জিকো, বাতিস্তা, জে সের্জিও, রবার্তো দিনামিতি, রেনাল্ডিনহোদের মতো তরুণদের বিশ্বকাপ অভিষেক হয়েছিল আর্জেন্টিনায়। পুরনোদের মধ্যেি ছিলেন রবার্তো রিভেলিনো, নেলিনহো ও নির্ভরযোগ্য গোলকিপার এমার্সন লিয়াও প্রমুখরা। মারাদোনার মতোই এই বিশ্বকাপ দলে জায়গা হয়নি সক্রেটিসের। পরবর্তীতে বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে নেতৃত্বে দিয়েছিলেন সক্রেটিস।
নির্লজ্জ গটআপের মাস্টারমাইন্ড ভিদেলাই!
অধিকাংশ ফুটবলার অনভিজ্ঞ হওয়ায়, প্রাথমিক গ্রুপ পর্বে সুইডেন ও স্পেনের সঙ্গে ড্র করলেও, অস্ট্রিয়া ম্যাচ থেকে ছন্দ পেয়ে যান জিকো-দিনামিতিরা। ডাচদের মতোই কোয়ার্টার ফাইনাল গ্রুপে যোগো বোনিটো পূর্ণতা পেল জিকো-নেলিনহোদের স্কিলের দ্যুতিতে। ডাচদের খেলায় যেমন ছিল টোটাল ফুটবলের আভা, ব্রাজিলের খেলায় তেমনই সাম্বার সুর, তাল ও ছন্দ। তাই অনেকে বিশেষজ্ঞই মনে করেছিলেন, ফাইনাল হবে, ‘নেদারল্যান্ডস ভার্সেস ব্রাজিল’। কিন্তু ইতিহাসের চিত্রনাট্যে অন্য, কিছু লেখা ছিল। কোয়ার্টার ফাইনাল গ্রুপ লিগে পেরু ও পোল্যা্ন্ডকে যথাক্রমে ৩-০ ও ৩-১ এ উড়িয়ে দিয়েছিলেন নেলিনহোরা।
১৮ জুন রোসারিওতে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হল ব্রাজিল। খেলার শুরুতে দিনামিতিরা প্রাধান্য বিস্তার করলেও, মাঠের পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠল। জিকো-দিরেসুদের ছন্দ নষ্ট করতে আগ্রাসী পা চালানো শুরু করল আর্জেন্টিনা। ক্রমেই মেজাজ হারাতে শুরু করলেন ব্রাজিল ফুটবলাররা ও যোগো বোনিটো হারিয়ে গিয়ে, ম্যাচ গা জোয়ারি ফুটবল ও ধাক্কাধাক্কিতে পর্যবসিত হল। ডিফেন্সে অতিমানব হয়ে উঠে আর্জেন্টিনাকে রক্ষা করেছিলেন অধিনায়ক পাসারেল্লা; তবে তিনিও পরে শারীরিক বলপ্রয়োগের ফুটবলে মেতে ওঠেন। যদিও আর্জেন্টিনা টিম মাঠে যাই করুক-না-কেন, ড্র বা হার যাই ফলাফল হোক-না-কেন, কোনও আর্জেন্টিনীয় ধারাভাষ্যকারের জাতীয় দলের সমালোচনা করার অধিকার ছিল না! ওই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ রাখতে হিমশিম খান রেফারি। তাই ফুটবল ইতিহাসে চড়া মেজাজের এই খেলাটি ‘ব্যাটল অফ রোসারিও’ নামে চিহ্নিত হয়ে আছে। এর মধ্যে ও মাঠের সেরা প্লেয়ার ছিলেন কেম্পেস, তবে এমার্সনদের দাপটে তিনিও গোলমুখ খুলতে পারেননি। ‘ব্যাটল অফ রোসারিও’ তাই শেষ হল গোলশূন্য ভাবে। পয়েন্টের হিসেবেও দু’দল রয়ে গেল সমবিন্দুতে।




২১ জুন, গ্রুপের শেষ ম্যাচ। ব্রাজিলের সামনে পোল্যান্ড, আর্জেন্টিনা মুখোমুখি পেরুর। দুটি ম্যাচ একই সময়ে সমান্তরালভাবে হওয়ার কথা ছিল, গ্রুপের শেষ ম্যাচ বলে। কিন্তু আয়োজকরা আর্জেন্টিনার ম্যাচের সময় প্রায় ঘণ্টা দুয়েক পিছিয়ে দিলেন। মেন্ডিওজের এস্তাদিও মালভিনাসে ব্রাজিলের খেলা শুরু হল স্থানীয় সময়ে, বিকেল পৌনে পাঁচটায়। আর রোসারিওতে, ব্রাজিল ম্যাচের ফলাফল জেনে যাতে নামতে পারেন পাসারেল্লারা, তাই আর্জেন্টিনা-পেরু ম্যাচ শুরু করা হয়েছিল স্থানীয় সময় সাতটা বেজে পনেরোতে। ততক্ষণে পোল্যান্ডকে ৩-১ গোলে বিধ্বস্ত করে গ্রুপের শীর্ষ স্থানে পৌঁছে গেছে ব্রাজিল। তাদের গোলপার্থক্যে প্লাস পাঁচ। আর আর্জেন্টিনার পেরুর বিরুদ্ধে নামার মুহূর্ত পর্যন্ত প্লাস দুই। অর্থাৎ গোল পার্থক্যে ব্রাজিলকে টপকে ফাইনাল খেলা নিশ্চিত করতে হলে, পেরু ম্যাচ অন্তত চার গোলে জিততে হত কেম্পেসদের। একটা কালো ছায়া গ্রাস করল রোসারিওর মাঠকে। বিশ্বকাপ আকাশে তখন জমতে শুরু করেছে আশঙ্কার কালো মেঘ। এমন কিছু ঘটবে না তো, যা কলঙ্কিত করবে সমগ্র বিশ্বকাপ ইতিহাসকে?
খেলা শুরুর মিনিট পঁচিশেক পর দেখা গেল, সেই চিত্রনাট্যই অভিনিত হচ্ছে মাঠে। পেরুকে গোলের মালা পরাচ্ছেন কেম্পেস-লুকেরা। জোড়া গোল করলেন কেম্পেস ও লিওপোল্ডো লুকে। একটি করে গোল পেলেন অ্যালবার্তো তারান্তিনি ও রেনে হাউসম্যানন। হাফ টাইমে দু’গোলে এগিয়ে ছিলেন পাসারেল্লারা, কিন্তু তখনই সন্দেহ দানা বেধে উঠেছে ম্যা চের ফলাফল ঘিরে। শেষপর্যন্ত আধডজন গোলে জিতে ফাইনালে গেল আর্জেন্টিনা। তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ল ব্রাজিল শিবির। ব্রাজিল ফেডারেশন ‘ফিফা’র কাছে গটআপের অভিযোগ দায়ের করল।
এ-প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য, এরপর থেকেই ‘ফিফা’ গ্রুপ লিগের শেষ ম্যা চগুলো একই সময় অনুষ্ঠিত করার নিয়ম বেঁধে দেয়। যদিও তাতে গটআপ পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। ৮২-র স্পেন বিশ্বকাপে গ্রুপের শেষ ম্যা্চে পশ্চিম জার্মানি অস্ট্রিয়াকে ১-০ গোলে হারায়, যার ফলে গোল পার্থক্যে ছিটকে যায় আলজেরিয়া। এই ফলাফল দুই দলেরই কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা নিশ্চিত করবে জানতেন ফুটবলাররা। তাই জার্মানরা গোল করার পর, দু’দলের মধ্যেন আর কোনও লড়াই’এর মানসিকতা চোখে পড়েনি। এই ম্যারচ ‘গিজনের কলঙ্ক’ হিসেবে চিহ্নিত করা রয়েছে ফুটবল ইতিহাসে।

সে-দিন কি পেরুর সাজঘরে গিয়েছিলেন জেনেরাল জর্জ রাফায়েল ভিদেলা? হ্যাঁ , কিকঅফের ঠিক কুড়ি মিনিট আগে তাঁর আচমকা আবির্ভাব ঘটে ড্রেসিংরুমে। পেরুর ফুটবলাররা তখন বুটের ফিতে বাঁধছেন আর্জেন্টিনা ম্যাাচ খেলার জন্য। কেউ-বা দেখে নিচ্ছেন অ্যাঙ্কলেটটা ঠিক জায়গায় পরেছেন কি না। এমন সময়ে পেরুর ড্রেসিংরুমে সামরিক পোশাকে হাজির হলেন জেনেরাল ভিদেলা। সঙ্গে কয়েকজন সশস্ত্র দেহরক্ষী ও মার্কিন বিদেশসচিব হেনরি কিসিঞ্জার।
সামরিক একনায়ককে দেখে ঘাবড়ে যান পেরুর কিছু জুনিয়র ফুটবলার। জেনেরাল প্রথমে পেরুর প্লেয়ারদের লাতিন আমেরিকার ভাতৃত্ব ও ঐক্যর নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। তারপর পেরুর সামরিক শাসক ফ্রান্সিসকো মরালেজ বারমুদেজের একটি সরকারি চিঠি পড়ে শোনান! পরে বারমুদেজ বলেছিলেন, ভিদেলা তাঁদের ফুটবলারদের ভয় দেখাতে গিয়েছিলেন। ওই পেরু দলের প্রাক্তনী হুয়ান কর্লোস ওবলিতাস বলেন, ‘সশস্ত্র রক্ষীদের নিয়ে নির্মম একনায়কের ড্রেসিংরুমে উপস্থিতি ত্রাসের সঞ্চার করেছিল আমাদের শিবিরে।’
এই ঘটনা ’৩৪-এর মুসোলিনির স্মৃতি মনে পড়িয়ে দিতে পারে। ফ্যাসিস্ট নেতা ফাইনালের বিরতিতে নিজের দলের সাজঘরে গিয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু, মুসোলিনির বিরুদ্ধেও বিপক্ষ দলের সাজঘরে গিয়ে ভয় দেখানো বা গোল ছাড়ার জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগ ওঠেনি! তবে ভয়ের সঙ্গে লোভও দেখিয়েছিলেন কি আর্জেন্টিনার সামরিক শাসক! এই সাক্ষাতে টাকার লেনদেনও জড়িয়ে ছিল, এ-অভিযোগ ওঠে বহু মহল থেকে। ‘অবৈধ লেনদেন কোনও রসিদ রাখে না’, লিখেছেন কাম্পানা। পেরুর ফুটবলাররা এরপর মাঠে স্রেফ আত্মসমর্পণ করেছিলেন, যাতে কেম্পেসরা ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। দেশে ফেরার পর রাজধানী লিমাতে এই ফুটবলারদের পাথর ছুঁড়ে ‘সংবর্ধিত’ করেছিলেন পেরুবাসী, বিশ্বকাপে গটআপ ম্যাচ খেলে দেশের নাম ডোবানোর জন্য! অথচ প্রাথমিক গ্রুপ পর্বে পেরু রীতিমতো আকর্ষক ফুটবল খেলে গ্রুপ সেরা হয়েছিল। নজর কেড়েছিলেন কুবিয়াস, তিয়াফিলোর মতো ফুটবলাররা। কেম্পেসের পরই কুবিয়াস প্রতিযোগিতার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হন পাঁচটি গোল করে, ডাচ স্ট্রাইকার রব রেনসেনব্রিঙ্কের সঙ্গে যৌথভাবে। তাই পেরুর ছ’গোল খাওয়া সারা বিশ্বের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য হয়নি।


প্রতিযোগিতার সাতটি ম্যাচেই অপরাজিত থেকে, মাত্র তিনটি গোল খেয়েও বিদায় নিতে হল ব্রাজিলকে। ইতালিকে পিছিয়ে পড়েও নেলিনহোর দুর্দান্ত গোলে ২-১ হারিয়ে তৃতীয় স্থান পেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হল জিকোদের। আর্জেন্টিনা কিন্তু প্রাথমিক গ্রুপে পর্বেই ইতালির কাছে হেরেছিল, বেত্তেগার একমাত্র গোলে। আন্তোনোনি-পাওলো রসি-বেত্তেগা ত্রিভুজ আক্রমণ থেকে বাঁ-পায়ে দর্শনীয় গোল করেছিলেন বেত্তেগা।
গটআপ করে ফাইনালে পৌঁছেও, ২৫ জুন নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে মারিও কেম্পেসের গোলে দীর্ঘক্ষণ এগিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু খেলার নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার সাত মিনিট আগে, দুরন্ত হেডে গোল শোধ করে দেন ডার্ক ন্যানিঙ্গা। এরপর ইঞ্জুরি সময়ে আর্জেন্টিনার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত পোস্টের কাছে। রব রেনসেনব্রিঙ্কের জোরালো শট আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক উবালদো ফিলোলকে পরাস্ত করে, পোস্টে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে। ম্যাচ গড়ালো অতিরিক্ত সময়ে। কেম্পেস ও দানিয়েল বার্তোনি পরপর দু’টি গোল করে পাসারেল্লার হাতে কাপ ওঠা নিশ্চিত করেন। ম্যাচের পর ডাচ দল সামরিক কর্তাদের হাত থেকে পুরস্কার নিতে অস্বীকার করেছিল। মারিও কেম্পেস সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়ে সোনার বল পান, আর ফাইনালের জোড়া গোল তাঁর সোনার বুট জয়েও নিশ্চিত করে দেয়।
এর ঠিক চল্লিশ বছর পর, মনুমেন্টালে যান সেই বিশ্বজয়ী দলের গোলকিপার ফিলোল। তাঁর সঙ্গী ছিলেন দুই মহিলা— গ্রেসিয়া পালাসিও দি লয়েস, অ্যাঞ্জেলা পাওলিন দি বইতানো। পপেলিতোস প্রকল্পের উদ্যোছগে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ঐতিহাসিক স্টেডিয়ামে ফিরে গিয়েছিলেন ফিলোলরা। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই গ্রেসিয়ার ২৪ বছর বয়সি স্বামী রিকার্দোকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল; অ্যাঞ্জেলা বইতানোর ২২ বছর বয়সি পুত্র মিগুয়েলের সঙ্গে সেই কাহিনি স্থান পেয়েছে ওই ৭৮ টি কাহিনীর সংকলনে। এর পরের বছর বইতানোর মেয়ে আদ্রিয়ানাও নিরুদ্দেশ হয়ে যান। ফিলোলকেও বিশ্বকাপের পরের বছর বন্দুক দেখিয়ে হুমকি দিয়েছিলেন লাকস্ট, বিশ্বজয়ী গোলকিপার যাতে বিদেশি ক্লাবের অফার ফিরিয়ে, রিভারপ্লেটে থেকে যান। তাই স্বজন-হারানো দুই মহিলার সঙ্গে প্রতিবাদ সভায় এসে ফিলোল বলেছিলেন, ‘আমি ক্ষমাপ্রার্থী’। ২০১৩-তে জেলে থাকাকালীন মৃত্যু হয় প্রাক্তন একনায়ক ভিদেলার। ’৭৮-এর বিশ্বকাপ ফিলোলের মতোই আর্জেন্টিনার সমগ্র ফুটবল মহলকে ক্ষমাপ্রার্থী করে দিয়ে যায়নি তো?



