সব কোচ ইতিহাস লেখেন না। কেউ-কেউ ইতিহাসের গতিপথই বদলে দেন। দিদিয়ে দেশঁ সেই বিরল মানুষদের একজন। ফ্রান্সের ফুটবল ইতিহাসে যদি তিনজনের নাম চিরকাল পাশাপাশি লেখা থাকে, তাঁরা হলেন— মিশেল প্লাতিনি, জিনেদিন জিদান এবং দিদিয়ে দেশঁ। পার্থক্য শুধু একটাই। প্লাতিনি আর জিদান কিংবদন্তি হয়েছেন মূলত ফুটবলার হিসেবে। আর দেশঁ কিংবদন্তি হয়েছেন দু’বার। একবার অধিনায়ক হিসেবে, আরেকবার কোচ হিসেবে। এমন কীর্তি বিশ্ব ফুটবলেও হাতে গোনা কয়েকজনের ভাগ্যেই জোটে।
এবারের মতো হয়তো ফ্রান্সের বিশ্বকাপ যাত্রা সেমিফাইনালেই থেমে গেল। কিন্তু সব গল্প তো আর ট্রফি দিয়ে মাপা যায় না। স্পেন হয়তো ম্যাচ জিতেছে, কিন্তু দিদিয়ে দেশঁ আবারও প্রমাণ করে গেলেন যে একজন মহান কোচের পরিচয় শুধু তিনি কতবার জিতলেন, তা নয়; তিনি কত বছর ধরে একটি দলকে বিশ্বের সেরাদের মাঝে ধরে রাখতে পারলেন, সেটাই তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার। কিছু পরাজয়ও ইতিহাসে সম্মানের আসন পায়।
দিদিয়ে দেশঁ কখনও সবচেয়ে প্রতিভাবান ফুটবলার ছিলেন না। তাঁর ড্রিবলিং দেখে মানুষ বিস্মিত হত না। তিনি দশ গোলের মালিকও ছিলেন না। কিন্তু তিনি জানতেন যে, একটা দলকে কীভাবে জেতাতে হয়। মাঠে তিনি ছিলেন নীরব নেতা। মিডফিল্ডে দাঁড়িয়ে যেন অদৃশ্য সুতোয় পুরো দলটাকে বেঁধে রাখতেন। জিনেদিন জিদানের শিল্পকে নিরাপত্তা দিতেন, আক্রমণভাগকে স্বাধীনতা দিতেন, আর রক্ষণভাগকে সাহস দিতেন।


১৯৯৮ সালে ফ্রান্স প্রথম বিশ্বকাপ জিতল। অধিনায়ক? দিদিয়ে দেশঁ। দু’বছর পরে ইউরোও জিতল ফ্রান্স। অধিনায়ক? আবারও দেশঁ। খেলোয়াড় হিসেবে তিনি বুঝেছিলেন, একটা ট্রফি শুধু প্রতিভা দিয়ে জেতা যায় না, চরিত্র দিয়েও জেতা যায়। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় কাজ শুরু হয়েছিল অনেক পরে।
আরও পড়ুন: যে-ফুটবল উদ্বাস্তুকে ঘরে ফেরায়! লিখছেন আদিত্য ঘোষ…
২০১০ বিশ্বকাপ। ফ্রান্সের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোর একটি। দলের ভেতরে বিদ্রোহ। খেলোয়াড়দের ধর্মঘট। কোচের সঙ্গে প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব। গোটা বিশ্ব অবাক হয়ে দেখেছিল, কীভাবে এক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল নিজেরাই নিজেদের ভেঙে ফেলতে পারে। ফ্রান্স তখন শুধু ম্যাচ হারছিল না। হারাচ্ছিল নিজের পরিচয়ও। ঠিক সেই সময়ে, ২০১২ সালে ফ্রান্সের জাতীয় দলের দায়িত্ব নিলেন দিদিয়ে দেশঁ। কোচ হিসেবে। তাঁর সামনে কাজটা ছিল নতুন দল গড়া নয়। একটা ভেঙে পড়া জাতীয় দলকে আবার বিশ্বাস করতে শেখানো।
তিনি প্রথম দিন থেকেই দলের মধ্যে একটা বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন। দলে নামের চেয়ে বড় হবে শৃঙ্খলা। যে যত বড় তারকাই হোক, দলের নিয়ম ভাঙলে তার জায়গা হবে না। এটাই ছিল দেশঁর দর্শন। তিনি জানতেন, বড় দল তৈরি হয় বড় ব্যক্তিত্ব দিয়ে নয়, বড় সংস্কৃতি দিয়ে।

তারপর শুরু হল এক দীর্ঘ নির্মাণ। পল পগবা, অঁতোয়ান গ্রিজম্যান, রাফায়েল ভারান, এন গোলো কান্তে, ব্লেইজ মাতুইদি, উগো লরিস, অলিভিয়ে জিরু, কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে, অরেলিয়ান চুয়ামেনি, এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গা, জুল কুন্দে, উইলিয়াম সালিবা— এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে তিনি এমনভাবে পরিবর্তন ঘটিয়েছেন, যেন ফ্রান্সের শক্তি কখনও কমেইনি। তিনি শুধু খেলোয়াড় বেছে নেননি। তিনি চরিত্র বেছে নিয়েছেন।
২০১৬ ইউরোর ফাইনাল। হেরে গেল ফ্রান্স। অনেকে ভাবলেন, হয়তো এখানেই শেষ। দেশঁ কিন্তু জানতেন, বড় সাফল্যের আগে বড় ব্যর্থতা অনেক সময়ে দরকার হয়। দু’বছর পর, ২০১৮ সালে রাশিয়ার মাটিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হল ফ্রান্স। বিশ বছর পর আবার। এবার কোচ হিসেবে। তিনি হয়ে গেলেন ফুটবল ইতিহাসের তৃতীয় ব্যক্তি, যিনি খেলোয়াড় এবং কোচ— দুই ভূমিকাতেই বিশ্বকাপ জিতেছেন।

২০২২ সালে আবার বিশ্বকাপ ফাইনাল। প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা। ফ্রান্সের অর্ধেক দল চোটে জর্জরিত। অনেকে বলেছিলেন, এই দল বেশিদূর যাবে না। দেশঁ আবার সবাইকে ভুল প্রমাণ করলেন। ফ্রান্স আবার ফাইনালে। বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। কিন্তু পরপর দুই বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা আজকের দিনের ফুটবলে কতটা কঠিন, সেটা ইতিহাসই বলে।
আর ২০২৬ সালেও ফ্রান্স আবার শিরোপার দাবিদার। এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। এটা পরিকল্পনার ফসল। এটা ধারাবাহিকতার ফল। এটা একজন কোচের দর্শনের ফল।
দেশঁর কোচিংয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি কী? তিনি ফুটবলকে শুধু কৌশলের খেলা মনে করেন না। তিনি মানুষকে বোঝেন। কে কখন ভেঙে পড়ছে, কে চাপ নিতে পারছে না, কার পাশে কখন দাঁড়াতে হবে— এসবই তাঁর বড় অস্ত্র। তিনি কখনও সংবাদমাধ্যমের জন্য নাটক করেন না। শিরোনাম হওয়ার চেষ্টা করেন না। তিনি শুধু কাজ করেন। আর ফলাফলই তাঁর হয়ে কথা বলে।
০২২ সালে আবার বিশ্বকাপ ফাইনাল। প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা। ফ্রান্সের অর্ধেক দল চোটে জর্জরিত। অনেকে বলেছিলেন, এই দল বেশিদূর যাবে না। দেশঁ আবার সবাইকে ভুল প্রমাণ করলেন। ফ্রান্স আবার ফাইনালে। বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। কিন্তু পরপর দুই বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা আজকের দিনের ফুটবলে কতটা কঠিন, সেটা ইতিহাসই বলে।
আজকের ফুটবলে অনেক কোচ নতুন-নতুন কৌশল নিয়ে আসেন। কেউ পজিশনাল প্লে শেখান। কেউ হাই প্রেসিং। কেউ তিকি-তাকা। দেশঁর সবচেয়ে বড় কৌশল অন্য জায়গায়। তিনি দল বানাতে জানেন। তিনি জানেন, এগারোজন ভাল ফুটবলার মানেই ভাল দল নয়। একটা ভাল দল তৈরি করতে লাগে বিশ্বাস, দায়িত্ব, শৃঙ্খলা আর আত্মত্যাগ।
আজ হয়তো আলোটা এমবাপ্পের ওপর পড়ে। কখনও গ্রিজম্যানের ওপর। কখনও জিরুর ওপর। কিন্তু পর্দার আড়ালে একজন মানুষ নীরবে সব সুতো ধরে রেখেছেন বহু বছর ধরে। সেই মানুষটির নাম— দিদিয়ে দেশঁ। তিনি শুধু ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ জেতাননি। তিনি শিখিয়েছেন, একটি মহান দল রাতারাতি তৈরি হয় না। ইটের পর ইট, বিশ্বাসের পর বিশ্বাস, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাকে গড়ে তুলতে হয়। আর তাই, ফ্রান্সের ফুটবলের ইতিহাস যখনই লেখা হবে, দেশঁর নাম শুধু একজন সফল কোচ হিসেবে নয়; একজন নির্মাতা, একজন স্থপতি, একজন নীরব শিল্পী হিসেবেও লেখা থাকবে।




