ছায়ার মতো, ভূতের মতো

‘আমি চ্যালেঞ্জ করছি অন্ধকারকে। যদি না পারি, অন্তত আমার চারপাশে আমি অন্ধকারকে জেঁকে বসতে দেব না কিছুতেই। আমার চারপাশে আমি আলো নিয়ে আসবই।’ জীবনের শেষ বক্তৃতায় বলেছিলেন যশবন্ত সিং খালরা। যাঁকে নিয়ে এই মুহূর্তে উত্তাল হয়ে উঠছে পাঞ্জাবের গুরুদ্বার থেকে জম্মু উপত্যকা। 

তিন দশক আগের পাঞ্জাবে যশবন্ত সিং খালরা দাঁড়িয়েছিলেন সত্যের পক্ষে, বিচারবহির্ভূত এনকাউন্টারের বিপক্ষে। খালিস্তান আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন কি যশবন্ত সিং খালরা? ‘খালিস্তান লিবারেশন’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন তিনি। রাষ্ট্রের চোখে যে আন্দোলন বিচ্ছিন্নতাবাদী, যে আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অপারেশন ব্লু স্টার থেকে ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার মতো ইতিহাসে কালির দাগ লেপে দেওয়া ঘটনাপ্রবাহ, সেই আন্দোলনের প্রতি কি সমব্যথী ছিলেন যশবন্ত? যে-যে পরিসংখ্যান তিনি তুলে ধরছিলেন, তা কি সর্বাংশে বাস্তবের সঙ্গে মেলে? পাঞ্জাবের আসন্ন নির্বাচনী আবহে এই ছবির গুরুত্ব কতটা? এই সব প্রশ্নের ঊর্ধ্বে উঠে হানি ত্রেহানের ছবি এক অন্য প্রশ্নমালা তুলে ধরছে। 

২০২৩-এ নির্মাণ হয়ে যাওয়া এই ছবির নাম প্রাথমিকভাবে ছিল ‘ঘাল্লুঘাড়া’। পরে ছবিটার নাম হয়ে দাঁড়াল ‘পাঞ্জাব ৯৫’। শেষত, ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পাওয়ার আগে নাম হল ‘সতলাজ’। যশবন্ত সিং খালরা সেই মাঝ-নব্বই-এ এক আশ্চর্য সন্ধান শুরু করেন। নিখোঁজ হওয়া আত্মজনদের খোঁজ করতে গিয়ে তাঁর হাতে আসে এক তালিকা, যে-তালিকায় জীবিত নামগুলির পাশে অনায়াসে পড়ে যায় কাটাচিহ্ন। যে মর্গে পুলিশি খাতা বজায় থাকে, সেই মর্গে নিখোঁজদের সন্ধান মেলে না। সেই সন্ধান পাওয়া যায় বেওয়ারিশদের শ্মশানে। সেই শ্মশানের খাতা এক-এক করে সাক্ষ্য দিতে থাকে, ঘরে ঘরে নিরুদ্দেশ হওয়াদের কবে সৎকার হয়েছে। 

আরও পড়ুন : আত্মঘাতী গোল হয়ে উঠল ফুটবলার হত্যার কারণ? লিখছেন সোমক রায়চৌধুরী…

ছবিতে যশবন্ত সিং খালরার নামে দিলজিৎ দোশাঞ্জ

এই ছবির শুরুতে একটি হাড়হিম দৃ্শ্য দেখিয়ে দেয়, হবু ইনস্পেক্টর এক শিক্ষানবিশ পুলিশ অফিসারের হাতে যদি পিস্তল না চলে, যদি তদন্ত, বিচারের পরোয়া না করে সরাসরি বুলেটের ভাষায় সে কথা বলতে না শেখে, তাহলে সে প্রথমেই পরীক্ষায় ফেল করে যায়। তাই গুলি খেয়েও বেঁচে থাকা বিবি গুরপেজ কউরকে সে মর্গ থেকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় এনকাউন্টার স্পটে, দ্বিতীয়বার গুলি চালায় তার ওপর, তার মৃত্যু নিশ্চিত করে সে ক্ষান্ত হয়। কী অপরাধ ছিল বিবি গুরপেজ কউরের? তার সন্তান কৃপাল যে নিহত, তা ভুলে যেত সে মাঝেমধ্যেই। একদিন পুলিশের গাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে সে নিহত ছেলের খোঁজ করে ফেলে। এইটুকু, শুধু এইটুকু কারণে সেও সন্ত্রাসবাদী হয়ে ওঠে নিমেষে। ছেলের সঙ্গে তাকে দেখা করানোর নাম করে পুলিশ তার নাম যোগ করে দেয় ওই খোঁজ না-পাওয়াদের তালিকায়। 

যশবন্ত (ছবিতে দিলজিৎ দোশাঞ্জ যে চরিত্রে অভিনয় করছেন) খোঁজ শুরু করে কৃপালের মা, বিবি গুরপেজ কউরের। সে শেষমেশ কেবল খুঁজে পায় শ্মশানের সেই মৃতের খাতায় গুরপেজ কউরের নামটুকু। সৎনাম, যশবন্তর বন্ধু, যে এই পুলিশবাহিনীর অংশ হিসেবে প্রত্যক্ষদর্শী হয় এই ঘটনার, তাকে যশবন্ত জিজ্ঞেস করে, তুমি কেন ছেড়ে দিচ্ছ না এই কাজ। সৎনাম নির্লিপ্তির সঙ্গে উত্তর দেয়, তাহলে তার নামও ওই তালিকা থেকে খুঁজে বের করতে হবে যশবন্তকে।

২৮ নভেম্বর, ২০১৯। তেলেঙ্গানায় ঘটে গিয়েছিল একটি বীভৎস গণধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা। চারজন অভিযুক্ত গ্রেপ্তার হয়, স্বীকারোক্তি দেয় তারা। চেরলাপল্লি সেন্ট্রাল জেলে তাদের জেল হেফাজত হয়। তেলেঙ্গানার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাও নির্দেশ দেন, ৬ ডিসেম্বর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় বেঙ্গালুরু-হায়দরাবাদ হাইওয়ের নিচে, ক্রাইম সিন পুনর্নির্মাণের জন্য। সেইদিনই তাদের এনকাউন্টার সম্পন্ন হয়। এই ঘটনার অব্যবহিত পরেই রণবীর শোরে একটি টুইট করেছিলেন। ছোট্ট টুইট, কিন্তু যা বলার, বলা হয়ে গিয়েছিল তাতে। যাতে লেখা ছিল— ‘পারভার্শন অফ জাস্টিস ক্যান নট বি দ্য অ্যানসার টু ডিলিং উইথ পারভার্টস ইন সোসাইটি। ফিক্সিং দ্য জাস্টিস সিস্টেম ইজ। ’

বিচারপ্রক্রিয়ায় কেউ দোষী সাব্যস্ত হবেন, কেউ শাস্তি পাবেন। কিন্তু বিচার-বহির্ভূত হত্যা বা শাস্তির অঙ্কটা আদতে নির্ভর করে অন্য একটা সমীকরণের ওপর। কখনও জনমত তাকে নিয়ন্ত্রণ করবে, কখনও বা আইনি জটিলতা এড়াতে খোদ প্রশাসনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলবে, বিচারকের রায়ের বাইরে গিয়ে বুলেট ঠিক করে দেবে অপরাধীর প্রাণের হিসেব। সৎনামের স্বীকারোক্তি বুঝিয়ে দেয়, অপরাধ এখানে বড় কথা নয়, প্রশ্ন তোলাটাই সবচেয়ে বড় অপরাধ আসলে। তাই একের পর এক পরিবার ঘুরে, অন্যায়ভাবে নিহত নাগরিকদের আত্মীয়দের একজোট করার চেষ্টা যখন করে চলে যশবন্ত, যখন সে বলে, ‘আমাদের নিজেদের লোকেদের খোঁজ করার অধিকার আমাদের আছে, সরকারের কাছে প্রশ্ন তুলে ধরলে, সরকার আমাদের এই অধিকারকে মান্যতা দিতে বাধ্য,’ তখন সে অবধারিতভাবে ভুলে যায় নায়কের হ্যামারশিয়া। সে ভুলে যায় সৎনামের কথাগুলো। সে নিজের নিয়তি নির্ধারণ করে ফেলে। যাদের কাছে এখন তাদের পরিজনদের ছবি আর স্মৃতিটুকুই সম্বল, জীবন-মৃত্যুর মাঝে যাদের অস্তিত্ব দাঁড়িয়ে আছে বেখাপ্পা, তাদের জন্য, মানবাধিকারের জন্য লড়াই করতে গিয়ে যশবন্ত ভুলে যায়, একদিন সেও একটা নিখোঁজ ছবি হয়ে উঠবে। তার সাথী, তার স্ত্রী পরমজিৎকে তার ভূমিকা পালন করতে নামতে হবে ময়দানে।

উপনিবেশে আইনের নির্মাণ ও শাস্তির বিধানের ভাঙাগড়ার সূত্রপাত ১৭৭২ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রেগুলেশনের মধ্য দিয়ে। ১৭৯০ সালের ১ ডিসেম্বর লর্ড কর্নওয়ালিসের মিনিট-এর মধ্য দিয়ে প্রাক-ঔপনিবেশিক মোগল যুগের মুসলিম আইন প্রথম তার প্রাসঙ্গিকতা হারাতে শুরু করল। এর অর্ধশতাব্দী পর ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে ঔপনিবেশিক ‘পেনাল কোড’-এর জন্ম হল লর্ড ম্যাকাউলের হাত ধরে। ১৮৬০ সালে বর্তমান ‘ইন্ডিয়ান পেনাল কোড’-এর জন্ম হল। মনে রাখা প্রয়োজন, মুসলিম এবং হিন্দু আইন ‘সিভিল ল’ এবং ‘ক্রিমিনাল ল’-এর পার্থক্য করেনি বিশেষ। ঔপনিবেশিক আইনের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তা শাসকবর্গের জাতিগত পরিচয় আইন এবং শাস্তির বিধানের ক্ষেত্রে নির্ণায়ক হয়ে উঠেছিল। ইংল্যান্ডে ১৮৬৯ সালে প্রবর্তিত আইন অনুসারে স্বভাবত অপরাধীদের চিহ্নিত করা শুরু হয়, উপনিবেশের আইনেও তার প্রভাব পড়ে, ১৮৭১ সালে ‘ক্রিমিনাল ট্রাইবস অ্যাক্ট’ লাগু হয়, যার দ্বারা ভারতীয়দের একাংশকে স্বভাবত অপরাধী বলে চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এহেন আগ্রাসী ঔপনিবেশিক আইনের নেপথ্যে এক বৈষম্যের বোধ অবশ্যই কাজ করছিল। কিন্তু স্বাধীন ভারতেও কি তার উত্তরাধিকার বাহিত হয়নি? 

কার্ল মার্ক্স-এর মত ছিল অপরাধ বাজার অর্থনীতির ইঁদুরদৌড়ের জেরেই জমি খুঁজে পায়। মূলত শিল্পবিপ্লব পরবর্তী ইউরোপকে লক্ষ করেই মার্কসের এই বিশেষ উপলব্ধি। নৈরাজ্যবাদী ম্যাক্স স্ট্রাইনার আবার অপরাধীদের ব্যক্তিসত্তায় জোর দেন এবং অপরাধকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে তুলে ধরতে চান, মার্কসীয় তাত্ত্বিক আলোচনায় এর বিরোধ পাওয়া যায়। অপরাধের নানান তত্ত্বায়নের আলোকে কোনওভাবেই উপনিবেশের অপরাধজগৎকে সম্পূর্ণভাবে ধরা যাবে না। তবে অপরাধ এব‌ং অপরাধীর প্রতি উপনিবেশের আইন কোনও সহানুভূতির দৃষ্টি দেখায়নি, আবার, ইংরেজদের প্রতি তাদের পক্ষপাত ছিল স্পষ্ট। এই ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও যখন এক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, খোদ প্রশাসনিক বৈঠকে বলেন, এনকাউন্টার করার আগে পুলিশ অবশ্যই যেন অপরাধীর জাত কী, জিজ্ঞেস করে নেয়, তখন সেই উপনিবেশের ভূত ঠিক এসে উঁকি দিয়ে যায়। 

ছবির নেপথ্যের বাস্তব ছেঁচে দেখলে, যশবন্ত ছিলেন অমৃতসরের এক ব্যাঙ্কের ডিরেক্টর। পাকেচক্রে তাঁর এই বৃত্তে জড়িয়ে পড়ার কোনও কারণ দিনের শেষে না-ই থাকতে পারত। কিন্তু বন্ধুর মায়ের খোঁজ তাঁকে শেষমেশ ঠেলে দিল মানবাধিকারের এক বড় লড়াইয়ে। এই লড়াই তাঁর একার ছিল না। কেবল বিবেকের কাছে দায়টুকু ছিল তাঁর, সে কখনও সেই দায় থেকে চ্যুত হতে চায়নি। আমৃত্যু। তাঁর যে মৃত্যুকে প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা বলে দাবি করেছিল পুলিশ, তা যে আদতে আরও একটি হত্যা, তা প্রমাণিত হয়েছে। আদালতের বিচারে অভিযুক্ত ও দোষী সাব্যস্ত পুলিশ অফিসাররা শাস্তিও ভোগ করছে। ৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৫ সালে, নিজের বাড়ির সামনে গাড়ি পরিষ্কার করতে গিয়ে, একটি লাল ওমনি গাড়িতে অপহৃত হয়েছিলেন যশবন্ত। তাঁকে প্রথমে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় ঝাবাল থানায়, সেখান থেকে তার্ন তরন থানায়। তাঁর মৃত্যুর একবছর পর, সিবিআই তদন্ত শুরু হলে এই সত্যিগুলো ক্রমে প্রকাশ্যে আসতে থাকে। এর মধ্যেই আবার নিহত হয়েছিলেন এই ঘটনার অন্যতম সন্দেহভাজন, অজিত সিং সান্ধু, ১৯৯৭ সালে। শেষপর্যন্ত যদিও বিচার আটকে থাকে না। 

‘সতলাজ’ বারবার দেখিয়ে দেয়, প্রশ্ন তোলা, ক্রমাগত, দুর্ভেদ্য দেওয়ালে হাতুড়ির নিরন্তর ঘায়ের মতো প্রশ্ন ছুড়ে যাওয়া, ক্লান্তিকর। সেই ক্লান্তি মৃত্যুর থেকেও অসহনীয়, কিন্তু থেমে যেতে যারা শেখেনি, তারা কখনও প্রশ্নের সেই আঘাত থামাতে চায় না। তারা অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষে আলো দেখতে না পেলেও আলো ফিরিয়ে আনায় বিশ্বাস করে। তাই বিচারবিভাগ, প্রশাসন, সরকারি দপ্তর, যেখান থেকে সঠিক উত্তরের আশাটুকু করা যায়, সেখান থেকে বারবার ফিরে আসতে হলেও তারা পিছপা হয় না। মৃতের নাম তারা মিলিয়ে নেয় পুরসভার রেকর্ড থেকে শ্মশানের তালিকায়। তারা নিজেরাও ভূত হয়ে যায়, একটা রাষ্ট্রব্যবস্থার থেকে যে নৈতিকতা মানুষ চায়, সেই নৈতিকতার ছায়া হয়ে তারাই ঘুরে বেড়ায় নিয়ত। 

গণতন্ত্রের প্রায় সব স্তম্ভর ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে মানুষ, আজকের ভারতে একথা শোনা যায় প্রায়শই। তাই অপরাধের বিচার, সত্যিটুকু মানুষের সামনে তুলে ধরার প্রয়াস কোথাও হারিয়ে যায়, নতুন আইন জানিয়ে দেয়, কাউকে গ্রেফতার করার জন্য কোনও কারণও দর্শাতে বাধ্য নয় সরকার। গোয়েন্দা গল্পে শার্লক হোমসের হাত ধরে যে ‘সায়েন্স অফ ডিডাকশন’-এর আমদানি হয়েছিল, সেই বিজ্ঞান তাই উল্টে যায় এক্ষেত্রে। অপরাধের মিথ্যে ঢেকে দেয় অপরাধের সত্যিকে। একটা বুলেট চললেই যদি বিচার সম্পন্ন হয়, ক্ষুব্ধ নাগরিকরা মন ফেরাতে পারে নিজ-নিজ কাজে, তাহলে আইনের নৈতিকতা আর কোন কাজে লাগবে! 

ছবিতে বেপাত্তা যশবন্তের স্ত্রী পরমজিৎ চিৎকার করে প্রশ্ন করে ওঠে, কোথায় যশবন্ত সিং খালরা? এমন কত প্রশ্ন নিয়ে বয়ে যাচ্ছে সতলাজ নদীর জল, উত্তর কি মেলে সবসময়?

তাই এই সময়েও যশবন্তের তোলা প্রশ্ন অস্বস্তির। তাই ‘সতলাজ’ নিষিদ্ধ হয়, ঘুরে বেড়ায় ইন্টারনেটের কানাগলিতে, নামে-বেনামে। সঙ্গে গুরুদ্বার থেকে উপত্যকায় আবারও এসে দাঁড়ায় যশবন্ত সিং খালরার ভূত। যে-প্রশ্ন সে তুলেছিল, তার উত্তর না পেলে তো নিস্তার নেই তারও।