৭ জুলাই, ২০২৬। আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়াম সাক্ষী রইল ফিফা বিশ্বকাপের অন্যতম বিতর্কিত স্কোরলাইনের। একদিকে, জার্সিতে তিনটি তারা নিয়ে খেলতে নামল লাতিন আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে, নীল নদের উপত্যকায় অবস্থিত, হায়ারোগ্লিফিক্সের দেশ মিশর। গতবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। দুনিয়াজুড়ে কোটি-কোটি সমর্থক তাকিয়ে আছে এক জাদুকরের দিকে। জাদুকরের নাম লিওনেল মেসি। জার্সি নম্বর ১০। আমাদের সরল শৈশবের তারকা। এর আগে রোনাল্ডো, মদ্রিচ, নেইমার, নয়্যার— নিজেদের শেষ খেলাটুকু খেলে বিদায় নিয়েছেন। মনে মনে ভেবেছি, স্কোরবোর্ড নয়, ফুটবলের শেষ বাঁশি সবচেয়ে নিষ্ঠুর।
মহম্মদ আল-ওয়াহিদি ছিলেন গাজা-র মিশরীয় ত্রাণ কমিটির জনসংযোগ পরিচালক। আর্জেন্টিনা বনাম মিশরের ম্যাচ শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ আগে ইজরায়েল সেনাবাহিনীর ড্রোন হামলায় আল-ওয়াহিদি নিহত হন। মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি গাজায় যুদ্ধবিধ্বস্ত জনগণকে তাদের সাধ্যমতো সহায়তা পৌঁছে দিতে এই ত্রাণ কমিটি গঠন করেন। সংস্থাটি মূলত প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ, বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার কাজ করে। এর পাশপাশি, লাগাতার যুদ্ধের আবহে, নিজেদের অস্ত্বিত্ব রক্ষার জন্য অবিরাম লড়ে যাওয়া প্যালেস্টিনীয়দের, খানিকক্ষণের জন্য স্বাভাবিক জীবনযাপনের স্বাদ ফিরিয়ে দিতে মহম্মদ আল-ওয়াহিদি গাজায় মিশরের বিশ্বকাপ ম্যাচগুলো বড় পর্দায় দেখানোর আয়োজন করেছিলেন। যেসব মানুষ ওই পর্দার সামনে জড়ো হতেন, তাদের প্রায় প্রত্যেকেই নিরন্তর গণহত্যায় নিজভূমে উদ্বাস্তু হয়েছেন। স্বজন হারানোর ব্যথা প্রতিদিন তাদের কুরে-কুরে খায়। নেই বিদ্যুৎ, নেই সচল ইন্টারনেট ব্যবস্থা। চারপাশের ভয়াবহ বাস্তবতা থেকে মুখ ফেরাতে ফুটবল তাদের কাছে জিয়নকাঠি স্বরূপ। প্যালেস্টাইন জাতীয় দলের খেলোয়াড় আবদুল্লাহ শাকফা, তাঁর একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বিশ্বকাপ নিয়ে এত মানুষের উল্লাস দেখে মনে হয়, পৃথিবীর ইয়াব্বড়ো মানচিত্র থেকে গাজা যেন চিরতরে মুছে গেছে! সকলে নিজের প্রিয় দলের জয় উদযাপন করে। প্রিয় খেলোয়াড়ের কতগুলো গোল হল, সেই সংখ্যা হাতে গুনে রাখে। আর ফিলিস্তিনিরা থাকে আতঙ্কে। নির্ঘুম রাত আদৌ নিরাপদে কাটবে কি না, সেই ভয়ে তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়!
আরও পড়ুন : প্যালেস্টাইনের পতাকা হাতে প্রতিবাদী, অন্যদিকে স্বৈরাচারের পক্ষেও?
লিখছেন স্বস্তিক চৌধুরী…
প্যালেস্টাইনের বহু খেলোয়াড় সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় দলে খেলার সুযোগ হারিয়েছেন। যুদ্ধ তাদের সব স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে। বিশ্বকাপের মরশুমে আমরা যখন দোকানে, বাজারে, স্টেশনে, মাঠে-ময়দানে, চায়ের ঠেকে; সর্বত্র খেলার নানবিধ আলোচনা আর বিশ্লেষণে মজে থাকি, তখন ফিলিস্তিনের বুকে একদল মানুষকে খেলার হার-জিত আর ভাবায় না। খেলা শেষে তারা ফিরে যায় অনিশ্চয়তাকে সঙ্গী করে গড়ে ওঠা অতি রূঢ় বাস্তবে। ১৯৮৭ সালের ৯ ডিসেম্বর থেকে বারুদের গন্ধ, বিস্ফোরণের শব্দ, মাথার ওপর বোমারু বিমান, গণহত্যা, ইজরায়েলের দখলদারিত্বর বিরুদ্ধে তাদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম জারি আছে। ইন্তিফাদা। আমাদের জগতের সঙ্গে তাদের জগতের মিল খুঁজে পাওয়া দায়।
‘ফিফা’ অর্থাৎ ‘ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ অ্যাসোসিয়েশন ফুটবল’ স্বঘোষিত অরাজনৈতিক সংস্থা। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইজরায়েলের হামলায় ১০১৫ জন ফিলিস্তিনি ক্রীড়াবিদ নিহত হয়েছেন। যাদের মধ্যে ৫৬৭ জন ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্যালেস্টাইন অলিম্পিক কমিটি ও প্যালেস্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য থেকে জানা যায়, গাজায় খেলাধুলোর পরিকাঠামোর ৯০ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। স্টেডিয়াম, ক্লাব, প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলি এখন অগণিত বাস্তুচ্যুত মানুষের শরণার্থী শিবিরে পরিণত হয়েছে।
‘ফিলিস্তিনি পেলে’ নামে পরিচিত সুলেইমান আল-ওবেইদ ত্রাণশিবিরে খাবারের প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়েছিলেন। ৪১ বছর বয়সি সুলেইমান প্যালেস্টাইনের জাতীয় দলের প্রাক্তন ফুটবলার ছিলেন। গত বছর আগস্ট মাসে ইজরায়েলের ঘাতকবাহিনী তাঁকে ত্রাণশিবিরের সামনে খুন করে। চলতি বিশ্বকাপের মাঝের ঘটনা। ৩২ বছর বয়সি সালিম আল-আশকার একটি গ্যাস সিলিন্ডারের খোঁজে সাইকেল চালিয়ে যাওয়ার সময় ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর গুলিতে আহত হন। অতিরিক্ত অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের কারণে তিনি মারা যান। তাঁর স্ত্রী বর্তমানে অন্তঃসত্ত্বা। চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন তাঁকে বাঁচানোর। কিন্তু চলমান হত্যাযজ্ঞের কারণে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। হাসপাতালের সীমিত ব্যবস্থাপনার কারণে তাঁর রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে, হাসপাতালে পৌঁছানোর দু’ঘণ্টার মধ্যেই আল-আশকার মারা যান।
২০২৪ সালে প্যালেস্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন গাজায় চলমান গণহত্যাকারীদের জাতীয় ফুটবল দল, ইজরায়েল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে ফিফা থেকে বহিষ্কার করার আবেদন জানায়। তা সত্ত্বেও, এই বছরের মার্চ মাসে ফিফা জানায়, তারা ইজরায়েলকে বহিষ্কার করবে না। স্মৃতি ঘেঁটে দেখুন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় রাশিয়ার জাতীয় দল এবং ক্লাবগুলির বিরুদ্ধে ফিফার পক্ষ থেকে অতি দ্রুত কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। প্রশ্ন থেকে যায়, ইজরায়েলের সঙ্গে কোনও বিশেষ সম্পর্কের খাতিরে এখনও তাদের বিরুদ্ধে কোনওরকম ব্যবস্থা নেওয়া গেল না?
মার্কিন স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগানকে বসনিয়ার বিরুদ্ধে খেলতে নেমে তাদের ডিফেন্ডারকে আঘাত করেন এবং লাল কার্ড দেখেন। খেলার নিয়ম অনুযায়ী, এই মার্কিন খেলোয়াড়ের পরের ম্যাচটা খেলার অনুমতি ছিল না। সকলকে তাক লাগিয়ে বালোগান খেললেন শেষ ষোলো-র ম্যাচে, বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে। অভিযোগ উঠেছে, হোয়াইট হাউস থেকে ট্রাম্পের একটামাত্র ফোনে ফিফা প্রেসিডেন্ট বালোগানের ওপর থেকে সাসপেনশন তুলে নেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ৩৫ জন সদস্য যৌথ বিবৃতি দিয়ে জানান, এই ঘটনা অত্যন্ত লজ্জাজনক। তারা ফিফা এথিক্স কমিটির কাছে ফিফা প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের আবেদন জানিয়েছেন।
বিশ্বকাপ প্রায় সায়াহ্নে এসে পৌঁছেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো এই বছর বিশ্বকাপের আয়োজকের ভূমিকা পালন করেছেন। বিশ্বকাপে এইবছর অংশ নিয়েছিল মোট ২১১টি দেশ। ৪৮টি দেশ বাছাইপর্ব থেকে উঠে আসে। অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী দেশের কর্মকর্তা, খেলোয়াড়, ফুটবলপ্রেমী সমর্থকদের ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হয়। অজস্র ভিসা আবেদনকারীর ভিসা বাতিল হয়। যাঁরা কোনওক্রমে ভিসা পান, তাঁদেরও অনেকের শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডায় প্রবেশের অনুমতি খারিজ হয়ে যায়। বিশেষত, আফ্রিকা এবং মুসলিম-অধ্যুষিত দেশগুলিকে বাড়তি আপত্তির নজরে দেখার একাধিক নজির গড়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর ভিসা-নীতি।
সোমালিয়ান রেফারি ওমর আব্দুলকাদির আরতানের বৈধ আমেরিকান ভিসা ছিল। সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ এনে মায়ামি বিমানবন্দর থেকে তাকে নিজের দেশে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়। ইরানের জাতীয় দলের কাছে যুক্তরাষ্ট্রে অনুমতি ছিল না। তাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল মেক্সিকোতে। যুক্তরাষ্ট্রের অনুষ্ঠিত ম্যাচগুলির দিন তারা ঠিক ২৪ ঘণ্টা আগে আমেরিকায় প্রবেশ করতে পারত। খেলা শেষ হওয়ার পর আধঘণ্টার মধ্যে তাদের আমেরিকা ছেড়ে চলে যেতে হত। শুধুমাত্র খেলার সময়টুকুর জন্যই তারা মার্কিন ভিসা পেয়েছিলেন। ইরানি খেলোয়াড়দের ম্যাচের পর বিশ্রাম নেওয়ার মতো অবসরও ছিল না। ফিফার মতো সংস্থা, ইরানের খেলোয়াড়দের প্রতি এমন অমানবিক আচরণ নিয়েও বিন্দুমাত্র বাক্যব্যয় করেনি। ইরানের সাংবাদিকদেরকে মার্কিন মুলুকে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। তাদের ফুটবল প্রতিনিধি দলের প্রায় ১৫ জন সদস্যকে যুক্তরাষ্ট্র ভিসা দেয়নি। ইরানের অধিনায়ক মেহেদি তারেমি মিশরের কাছে পরাজিত হওয়ার পর ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, তাদের সঙ্গে ফিফা এবং অন্যতম প্রধান আয়োজক দেশ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র অন্যায় করেছে। প্রথম পর্ব থেকে ফিফাকে বিভিন্ন সমস্যার কথা জানানো হলেও, ইরানের সমস্যার সমাধান করার সদিচ্ছা দেখায়নি তারা। তাদের কোনও অভিযোগকেই বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে মনে করেছেন তারেমি।
১৮০৪ সালে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি পায় হাইতি। বিশ্বের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রজাতন্ত্র। হাইতির ইতিহাসে আরও যে কারণে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, তা হল দাসপ্রথাবিরোধী আন্দোলন। হাইতিতে সর্বপ্রথম দাসপ্রথা স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। এই বিপ্লবের মাসিহা ছিলেন জঁ-জ্যাক দেসালিন আর টুসেন লুভাটুয়ার। বিশ্বকাপে হাইতি তাদের জার্সিতে টুসেন লুভাটুয়ারের প্রতিকৃতি রাখতে চায়। পূর্বসূরীদের সম্মান জানাতেই তারা জার্সিতে এই নকশা রেখেছিল। ফিফা উদ্বোধনী ম্যাচের আগে তাদের জার্সি বদলানোর নিদান দেয়। তাদের মতে, তারা কোনওরকম রাজনৈতিক, ধর্মীয়, ব্যক্তিগত বার্তা বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে দেওয়াকে তারা সমর্থন করবেন না। অথচ, ইউরোপের দেশগুলি নিজেদের জার্সিতে রাজতন্ত্রের চিহ্ন রেখে খেলতে নামলে সেই চিহ্ন ফিফার কর্মকর্তাদের চোখে পড়ে না। কৃষ্ণাঙ্গদের দাসত্ব থেকে মুক্তির ইতিহাসকে আজও এত ভয় পায় শ্বেতাঙ্গদের সাম্রাজ্যবাদ?

প্যাট্রিস লুমুম্বা ছিলেন আফ্রিকার মুক্তি সংগ্রামের নেতা। ১৯৬০ সালে কঙ্গো, বেলজিয়ামের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হয়। স্বাধীন কঙ্গোর প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন প্যাট্রিস লুমুম্বা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বেলজিয়ামের মতো পশ্চিমা শক্তিগুলি কঙ্গোর খনিজ সম্পদ লুঠ করতে চাইলে প্যাট্রিস লুমুম্বা তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। তাঁর সখ্যতা তৈরি হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার ছ’মাস পর, যুক্তরাষ্ট্র এবং বেলজিয়ামের কর্মকর্তারা লুমুম্বা ও তাঁর দুই সহযোগীকে জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করে। শুধু তাই নয়, তিনজনের মৃতদেহ করাত দিয়ে টুকরো-টুকরো করে কেটে সালফিউরিক অ্যাসিডে গলিয়ে ফেলে। লুমুম্বার কেবল দু’টিমাত্র দাঁত অবশিষ্ট ছিল। হত্যাকারী সেই দাঁতদু’টিকে বিজয়চিহ্ন হিসেবে নিজের কাছে রেখে দেয়। লুমুম্বা শুধু কঙ্গোর স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন না; তিনি সমগ্র আফ্রিকার মুক্তি ও ঐক্যের পক্ষেও সোচ্চার ছিলেন। তাঁর এই দৃঢ় অবস্থান, সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমা শক্তিগুলির ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। ডিআর কঙ্গোর ফুটবল সমর্থক মিশেল কুকা এমবোলাডিঙ্গা, ‘লুমুম্বা ভেয়া’ নামে পরিচিত। মিশেল কুকা, ফিফা বিশ্বকাপে আসতেন প্যাট্রিস লুমুম্বা সেজে। তাকে দেখে মনে হত প্যাট্রিস লুমুম্বার জীবন্ত মূর্তি। লাল, হলুদ ও নীল রঙের পোশাক পরে তিনি পুরো ম্যাচে একহাত উঁচু করে একেবারে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। চারপাশে হাজারও সমর্থক যখন উল্লাসে মেতে উঠতেন, তখন তাঁর এই নীরব উপস্থিতিই হয়ে উঠত কঙ্গোর অদম্য লড়াইয়ের প্রতীক। আজও কঙ্গোতে গণহত্যা চলছে। বহু সাধারণ মানুষের রক্ত ঝরছে। এমন এক সময় লুমুম্বার মূর্তির মতো অটল হয়ে দাঁড়িয়ে এমবোলাডিঙ্গা তাঁর দল ও দলের সমর্থকদের মানসিক শক্তি জোগানোর চেষ্টা করেছিলেন। এই নিশ্চুপ প্রতিরোধও আমেরিকা মানতে পারেনি। উজবেকিস্তানের সঙ্গে কঙ্গোর ম্যাচের আগেই এমবোলাডিঙ্গার ভিসা বাতিল হয়।
এছাড়াও, প্যালেস্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান জিবরিল রাজুবের ভিসার আবেদন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, দুই দেশই প্রত্যাখ্যান করে। ইরাকের স্ট্রাইকার আইমেন হোসেন শিকাগোর বিমানবন্দরে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে আটক করে আমেরিকার পুলিশ। সাত ঘণ্টা আটকে রেখে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সেই ছবি যাতে প্রকাশ্যে না আসে, তাই ইরাকের সাংবাদিক তালাল সালাহকেও দশ ঘণ্টা আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করে তারা। আইমেনকে আমেরিকায় প্রবেশ করার অনুমতি দিলেও, তালাল সালাহ আমেরিকার প্রবেশে বাধা পায়। দু’জনেরই ফোন খতিয়ে পরীক্ষা করা হয়।

সেনেগাল, মরক্কো, আইভরি কোস্টের সমর্থকদের আমেরিকায় প্রবেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। ব্রাজিলের এক ক্রীড়া সাংবাদিককে নিউ জার্সির বিমানবন্দরে বিবস্ত্র করে তল্লাশি করা হয়। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে প্রতি পদে ফিফার তীব্র বৈষম্যমূলক আচরণ বিশ্ববাসীর কাছে আমৃত্যু স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এদুয়ার্দো গালোয়ানো কবেই লিখে গেছেন, দৃশ্যমান স্বৈরশাসক যেমন আছে, তেমন অদৃশ্য স্বৈরশাসকও আছে। বর্তমানে বিশ্ব ফুটবলের ক্ষমতার কাঠামো সম্পূর্ণ রাজতান্ত্রিক— এ-কথা অনস্বীকার্য।
ফিফা বিশ্বকাপের প্রতিটা ম্যাচের টিকিটের মূল্য রেখেছে আকাশছোঁয়া। কাতারে বিশ্বকাপ চলাকালীন সমস্ত গণপরিবহণে দর্শকরা বিনামূল্যে যাতায়াত করার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু এইবছর আমরা দেখলাম, আমেরিকায় বিমান এবং ট্রেনের টিকিটের মূল্যও বাড়ানো হয়েছে। অর্থলোলুপদের মুনাফা লুটে নেওয়ার আয়োজন যেন এই বিশ্বকাপ!
এতক্ষণ যে ফুটবলের কথা বললাম, ক্ষমতার আস্ফালনের যে আখ্যান লিখলাম, তার বাইরেও ফুটবল বহুবিস্মৃত পদচিহ্নের পদাবলি, ভৈরবীর সুরে বাঁধা’। ফুটবল গরিব মানুষের খেলা। ছিন্নমূল মানুষের কাছে রূপকথার গল্প। যে-দেশ আজ অবধি বিশ্বকাপে পৌঁছতে পারেনি, সেই দেশের উন্মাদনা কি কম? জাত, ধর্ম, বর্ণের ওপরে ছিল ফুটবল। ভারতের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে, কতশত পলেস্তারা খসে পড়া চুন-সুরকির দেওয়াল মারাদোনা, পেলে, রোনাল্ডোর মতো কিংবদন্তিদের ছবিতে ভরে উঠেছে যুগ-যুগ ধরে। বস্তি-মহল্লা সেজে উঠেছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, পর্তুগাল, জার্মানির পতাকায়। তাই সালতামামিতে কিছু প্রতিরোধের কথা লিখে রেখে যাওয়া জরুরি।

ফুটবল বিশ্বকাপের মতো ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ গাজায় শহিদ হওয়া খেলোয়াড়, তাদের পরিবার, সন্তান-সন্ততির কথা মনে রাখে না। তারা মনে রাখে না; ফিলিস্তিনের যে শিশুরা ফ্যালফ্যাল চোখে, ফ্যাকাসে মুখে তাকিয়ে থাকে, একটুকরো পাউরুটি অথবা সামান্য পানীয় জলের অপেক্ষায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে, যে শিশুদের স্কুল নেই, পাঠ্যবই নেই, খেলার মাঠ নেই— তাদের কাউকে। মানবতার শত্রু আমেরিকার মদতপুষ্ট ইজরায়েলি হানাদারদের আক্রমণে মৃত শিশুদের রক্তে ভেজা নিষ্পাপ মুখ তারা বিশ্ববাসীকে মনে করাতে চায় না। যে শিশু বোমাকে আতসবাজি ভেবে ভুল করেছিল, যে মা সন্তান প্রসবের সময় সঠিক চিকিৎসার অভাবে প্রাণ হারিয়েছে, যে হাজার-হাজার মানুষ গাজায় প্রতিদিন অনাহারে-অপুষ্টিতে, সঠিক চিকিৎসা, বিশুদ্ধ পানীয় জল, কিংবা রক্তের অভাবে মারা যাচ্ছে— তাদের কারও কথাই ফিফা এই ‘গ্রেটেস্ট শো’-তে মঞ্চস্থ করতে চায়নি। কারণ সব সত্যি সব জায়গায় বলতে নেই। ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ তুলে দেয় যুদ্ধবাজ ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে।
ইরান যেদিন নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলতে নামে, সেদিন গ্যালারিতে সাদা কাপড়ের ব্যানারে কালো কালিতে লেখা ছিল ‘MINAB 168’। ইরানের সমর্থকরা সেদিন তামাম দুনিয়াকে মনে করায়, ইরানের মিনাব শহরের কথা। ২৮ ফেব্রুয়ারির কথা। আমেরিকা এবং ইজরায়েলের মিলিত হামলার কথা। ইরানের মিনাব শহরে শাজারেহ তাইয়িবা স্কুলে বিমান হামলায় নিহত হয়েছিল ১৬৮ শিশু-সহ ১৪ জন শিক্ষক। ফুটবলের গ্যালারি এভাবেই হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ক্যানভাস।
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দালাল, ফিফা কর্তৃপক্ষের বিধিনিষেধের তোয়াক্কা না করে বহু দেশের সমর্থকরা এইবছর মেক্সিকো, কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রের গ্যালারিতে ফিলিস্তিনের পতাকা উড়িয়েছে। মরক্কো, তিউনিসিয়া, ইরাক, মিশর, হার্জেগোভিনা, বসনিয়া, ব্রাজিল, ফ্রান্স, তুরস্ক-সহ একাধিক দেশের সমর্থকরা গ্যালারি থেকে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে। বিশ্ব জুড়ে বিভিন্ন দেশের ফুটবল সমর্থকরা ‘শো ইজরায়েল রেড কার্ড’— ইজরায়েলকে বিশ্বকাপের ময়দানে সরাসরি বয়কট করার দাবি তুলেছে।

মিশরের কোচ হোসাম হাসান বহুদিন ধরেই সাংবাদিক সম্মেলন এবং বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন ফিলিস্তিনের জনগণের অপ্রতিরোধ্য লড়াইয়ের কথা। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে জয়লাভ করে সেই জয় তিনি উৎসর্গ করেন ফিলিস্তিনিদের উদ্দেশ্যে। হাসান বলেন, গাজায় আর্জেন্টিনা, বার্সেলোনা ও রিয়েল মাদ্রিদ, মেসি, রোনাল্ডোদের জার্সি পরা শিশুরা ফুটবলকে ভালবেসে, ফুটবল জগতের তারকাদের ভালবেসে বড় হচ্ছে। তবুও, সেই তারকারা নির্বাক। আর্জেন্টিনা এবং মিশর যেদিন মুখোমুখি হয়, সেদিনের হার মেনে নিতে পারেননি হাসান। সব ধৈর্যের সীমা পেরিয়ে গেলে, সাইডলাইন থেকে ‘ক্রস সাইন’ দেখিয়ে হাসান বোঝাতে চেয়েছিলেন, রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেটেক্সিয়ার তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করছেন, পক্ষপাতিত্ব করছেন। এই প্রতিবাদের বদলে রেফারি তাকে হলুদ কার্ড দেখায়।
এমন ঘটনা বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম নয়। ফুটবলের সবুজ ময়দান বারংবার একইসাথে বিশ্বরাজনীতির মঞ্চ এবং প্রতিরোধের ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছে। ১৯৩৪ সালে ইতালির ফ্যাসিস্ট নায়ক বেনিতো মুসোলিনি বিশ্বকাপে ক্রমাগত রেফারিদের নিয়ন্ত্রণ করেন, মাথায় অদৃশ্য বন্দুক ঠেকিয়ে রেখে ইতালির খেলোয়াড়দের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করেন এবং বিশ্বকাপকে সর্বপ্রথম নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। সাধারণের ভাষায় এই ঘটনার বর্ণনা দিলে বলা যায়, সেই বছর কর্তৃপক্ষের রীতিনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে, মুসোলিনি হস্তক্ষেপ করায় ইতালি বিশ্বকাপের ট্রফি ছিনিয়ে নেয়। এরপর আসা যাক ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপের কথায়। ফিফা ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব দেয় আর্জেন্টিনার ওপর। আর্জেন্টিনায় তখন ভিদেলের জান্তা সরকার, বিরোধীদের ওপর ব্যাপক মাত্রায় অত্যাচার করছে। ভিন্ন মত রাখার অধিকার খর্ব করে সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালাচ্ছে। এমতাবস্থায়, আর্জেন্টিনায় জান্তার তৈরি করা অরাজকতার দৃশ্য আমজনতার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখার একমাত্র পন্থা ছিল ফুটবল বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপের জ্বরে মেতে রইলেন সাধারণ মানুষ। আর্জেন্টিনার সমর্থকরা দেশের হয়ে গ্যালারিতে গলা ফাটালেন। আর ঠিক সেইসময়, খানিক দূরের কোনও বন্দিশালায় শয়ে-শয়ে মাসুম মানুষকে জান্তা সরকার একে-একে থেঁতলে মেরে ফেলল। ২০০৬ সাল। আরেকটি অবিস্মরণীয় ঘটনা। ইতালির ডিফেন্ডার মার্কো মাতেরাজ্জি, বিখ্যাত ফরাসি খেলোয়াড় জিনেদিন জিদানের বোন সম্পর্কে খেলার মাঝে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন। জিদান মেজাজ হারিয়ে মাতেরাজ্জির বুকে মাথা দিয়ে সজোরে আঘাত করেন। মাতেরাজ্জি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে যায়। রেফারি হোরাসিও এলিজান্দো জিদানকে লাল কার্ড দেখান। জিদানের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন অধরা থেকে যায়। ইতালি পেনাল্টি শুটআউটে ম্যাচটি জিতে যায়।
দুর্নীতিপরায়ণ ফিফা বরাবরের মতো এ-বছরও অরাজনৈতিক সেজে প্রভাবশালী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সঙ্গে কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে ফুটবলের ময়দানকে স্রেফ বিনোদনের অঙ্গন বানাতে চেয়েছিল। ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর মতো চাটুকার যেমন ফুটবলের জগতে বিরাজমান, সেই সঙ্গে ফুটবলের বৃহৎ পরিসরে হোসাম হাসানদের মতো নির্ভীক মানুষের সংখ্যাও নেহাৎ কম না। ইনফান্তিনোরা চক্রান্ত করে ফুটবলকে ‘অরাজনৈতিক’ বলে দাগিয়ে দিয়ে যতবার স্বৈরাচারীদের হাতে তুলে দিতে চাইবে, ততবার হোসাম হাসানরা লিখে দিয়ে যাবে প্রতিরোধের মহাকাব্য। ইজরায়েল যেদিন প্যালেস্টাইনের মাটিতে ফিলিস্তিনি পতাকা ওড়ানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল, ফিলিস্তিনিরা সেদিন বিকল্প খুঁজে নিয়েছিল। একফালি তরমুজ তুলে ধরেছিল শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে। আজ সেই ফিলিস্তিনের পতাকা উড়ছে সাম্রাজ্যবাদের ঘাঁটিতে, বিশ্বকাপের গ্যালারিতে। গাজার অতিকায় ধ্বংসস্তুপের মাঝে বসে ফিলিস্তিনিদের বিশ্বকাপ দেখার ছবি সারা পৃথিবীকে চিৎকার করে বলে দিয়েছে, ফুটবল আজও শোষিত মানুষের কাছে উৎসব হয়ে আসে। ফিলিস্তিনের আঁধার-ঘেরা তাঁবুগুলিতে, উজ্জ্বল আলোর রোশনাই হয়ে চির-অম্লান হোক ফুটবল।



