নয়ের দশকের শেষভাগ। তখন আমার অল্প বয়স, ১৮-১৯ হবে। আমরা থাকতাম উত্তর কলকাতার একটি সরকারি আবাসনে। সেই আবাসনেই কেতকী দত্ত ও চপল ভাদুড়ীকে, রাজ্যের তৎকালীন উপ-মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য একটি ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। ওঁরা তখন ওঁদের বাগবাজারের আদি বাড়ি ছেড়ে, আমাদের পাড়ায় চলে আসেন। ওঁরা এসেছিলেন পুজোর সময়ে। আমাদের পাড়ার পুজো-কমিটি সিদ্ধান্ত নেয় যে, পাড়ার তরফে কেতকী দত্তকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে।
সত্যি কথা বলতে, তখনও অবধি আমি কেতকী দত্ত সম্পর্কে তেমন কিছু জানতাম না। অষ্টমীর দিন ওঁকে সংবর্ধিত করা হয়েছিল। সে-দিন আমাদের পাড়ার একটা নাটকও মঞ্চস্থ হয়েছিল। আমি সেখানে অভিনয় করেছিলাম। বলে রাখা ভাল, সে-সময়ে কিন্তু আমি পেশাদার-অভিনেতা ছিলাম না। যে-নাটকে অভিনয় করেছিলাম, সেখানে বেশ কিছু গান ছিল, আমিই গেয়েছিলাম। নাটক চলছে, এরই মধ্যে কোন ফাঁকে কেতকী দত্ত এসে মঞ্চের ডানদিকে বসেছেন। নাটক শেষ হলেই ওঁর সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শুরু হবে। উনি যে নাটকটা মন দিয়ে দেখেছেন, আমার গান শুনেছেন— আমি তা খেয়ালও করিনি। নাটক শেষে যখন গ্রিনরুমে যাব মেক-আপ তুলতে, তখন দেখি আমাকে ডাকছেন। বললেন, ‘বোসো আমার পাশে।’ বসলাম। বললেন, ‘‘আমাকে চেনো তুমি? আমার নাম কেতকী দত্ত।”
আমি তখন ওঁকে অপর্ণা সেনের ‘সতী’ সিনেমা-সহ বেশ কয়েকটা ছবিতেই অভিনয় দেখেছিলাম। উনি যে কত বড়মাপের শিল্পী, আমি খুব একটা জানতাম না। আমি যথারীতি বললাম, ‘হ্যাঁ, আপনাকে টিভিতে দেখেছি, সিনেমায় দেখেছি।’ বললেন, ‘তুমি তো খুব সুন্দর গান করলে স্টেজে, স্টেজে এরকম গান করতে-করতে অভিনয় করা খুব শক্ত কাজ!’ আমি বললাম, ‘আপনার ভাল লেগেছে?’ বললেন, ‘আমার খুব ভাল লেগেছে, তুমি আমার সঙ্গে থিয়েটার/নাটকের গান গাইবে?’ এদিকে ‘নাটকের গান’ কী বস্তু তখন আমি জানি না, আমি একটু ইতস্তত করাতে, একটা রবিবার ওঁর বাড়িতে আমাকে ডাকলেন এবং বলেন বুঝিয়ে দেবেন। ওঁর একটা ছেলেকে প্রয়োজন, যাকে নাটকের গান শেখাতে চান।
আমি বাড়ি ফিরে বাবার কাছে কেতকী দত্ত সম্পর্কে জানতে চাইলে বাবা, প্রভাদেবী, শিশিরকুমার ভাদুড়ী, শ্রীরঙ্গম থিয়েটার হয়ে ‘বারবধূ’ সিনেমা-সহ আমাকে ওঁর বিস্তৃত শিল্পী-জীবনের ইতিহাস বললেন। ওই বয়সে যেটুকু বোঝার, বুঝলাম। সঙ্গে এ-ও মাথায় এল যে, ওঁর সঙ্গে থিয়েটার করতে পারলে, ভারতের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়ানো যাবে। পাশাপাশি যে নাটকের গান শেখানোর কথা উনি বলছেন, সেটা শিখলে যদি দুটো পয়সা রোজগার হয়, মন্দ কী!
নির্দিষ্ট রবিবার আমি চলে গেলাম ওঁর বাড়ি। উনি বলেন, উনি থিয়েটারের গান গেয়ে থাকেন নানা জায়গায়। উনি নতুন কাউকে শেখাতে চান, কিন্তু যাকেই শেখাতে যান, কয়েকদিন শিখে সে চলে যায়। আমাকে দেখে ওঁর মনে হয়েছে, আমার দ্বারা থিয়েটারের গান হবে, তাই আমাকে উনি শেখাতে চান।
সেই থেকে ওঁর কাছে আমার শিক্ষানবিশি শুরু। কিন্তু আমি যেটাকে খুব সহজ ভেবেছিলাম, ওঁর কাছে শিখলেই, ওঁর সঙ্গে নানা জায়গায় ঘুরে-ঘুরে অনুষ্ঠান করতে পারব— ইত্যাদি, সেগুলো একেবারেই মিলল না। প্রায় একবছর তিনমাস আমাকে উনি শুধু তালিম দিয়েছিলেন। কোনও অনুষ্ঠানে নিয়ে যেতেন না, সপ্তাহে দু’দিন করে ওঁর বাড়িতে যেতাম, আমাকে থিয়েটারের গান শেখাতেন। পরবর্তীকালে বুঝেছি, এই সামগ্রিক শিক্ষানবিশি পর্বটা— আমার সারাজীবনের সম্পদ হয়ে রয়েছে। শিশিরকুমার ভাদুড়ী যেভাবে গলা ভাল রাখার জন্য রেওয়াজ করতেন, কেতকী দত্ত সে-ভাবে হারমোনিয়ামের স্কেল চেঞ্জ করে-করে শেখতেন আমাকে। আমি সুরে গাইতাম, কিন্তু সেই সুরে ‘থিয়েটারের অভিনয়’ থাকত না। উনি সেটা শেখানোর জন্য, প্রায় দেড় বছর সময় নিয়েছিলেন। এই শেখার পর্বে, আমাকে মারও খেতে হয়েছে। একবার ভুল করার জন্য— হ্যাঙার দিয়ে মেরেছিলেন। আমাকে বলতেন, এই যে আমি দিল্লি-বম্বে— কত জায়গায় যাই গান গাইতে, তুমি যদি মন দিয়ে শেখ, তুমিও যেতে পারবে।
একটা সময়ে কেতকীদি, থিয়েটারের গান শেখার এই প্রক্রিয়া— সবটাই ভাল লেগে যায়। কেতকীদির সঙ্গে বন্ধুর মতো সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। কতবার ওঁর বাড়িতেই রিহার্সাল শেষে খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি— ইয়ত্তা নেই।
সেই সময়ে উনি বহু বছর পর ‘রঙ্গকর্মী’-র জন্য মঞ্চে ফিরছেন। ‘মুক্তি’ নাটকের অভিনয় হবে। সেটার রিহার্সাল ওই বাড়িতেই হত। দেখতাম খুব মন দিয়ে। আমাকে বলতেন, ‘পার্ট ধর আমার!’ আমার সঙ্গে রিহার্সাল করতেন, আমি বাকি চরিত্রের সংলাপগুলো বলতাম। উনি ওঁর সংলাপগুলো বলে যেতেন।
এখানে লক্ষণীয়, এই সামগ্রিক রিহার্সাল প্রক্রিয়াটা খুবা অনায়াসেই হত। কুটনো কুটতে-কুটতে রিহার্সাল করা, রান্না করতে-করতে রিহার্সাল করা, ফ্রিজ পরিস্কার করতে-করতে আমাকে গান শিখিয়ে দেওয়া— এমন আরও কত কী! সংগীত আর অভিনয় কেতকী দত্তের মজ্জায় প্রোথিত ছিল।
এখন যেমন ‘ওয়ার্কশপ’ নামে একটা বিষয়ের খুব রমরমা। সকলে খুব গম্ভীর মুখে বসে, খুব গম্ভীর কোনও বিষয়— আরও গম্ভীরভাবে শিখছে। কেতকী দত্তদের ‘স্কুলিং’ এমনটা ছিল না। কেতকীদি, প্রভা দেবী, শিশিরকুমারের কাছে খেলতে-খেলতে তালিম নিয়েছিলেন, আমাকেও সেই স্কুলিংয়েই তালিম দিয়েছিলেন।
প্রভা দেবী সম্পর্কিত একটা ঘটনার কথা বলি। কেতকীদি-র মুখেই শোনা। ‘বিন্দুর ছেলে’ নাটকে একটা দৃশ্য ছিল, সেখানে প্রভা দেবী একটা বড় ‘সলিলোকি’ বলবেন, সলিলোকি শেষে ওঁর সংলাপ— ‘এই সংসারে যত অশান্তিই হোক, সংসারের চাবি কিন্তু আমার কাছেই থাকবে। সংসারের চাবি আমি কারও কাছে দেব না।’ এই দৃশ্য-প্রসঙ্গে শিশিরকুমার বলেছিলেন, ‘এখানে আমরা একটা ঝাঁঝের (ঝংকারের) শব্দ দেব।’ তখন প্রভা দেবী বলেছিলেন, ‘বড়বাবু, ঝাঁঝের শব্দ দেবেন না; আমি ডায়লগটা বলে, আমার আঁচলে যে-চাবির গোছাটা আছে, ওটা পিঠে ফেলব, তাতে করে যে-শব্দটা হবে, সেটাই এই ডায়লগের আবহ হবে।’
কেতকীদি বলতেন, প্রভা দেবী সম্ভবত দুশো রজনী ওই নাটকের অভিনয় করেছিলেন। দুশো রজনী ঠিক একইভাবে আঁচলটা ফেলতেন, যাতে করে ওঁর পিঠে গিয়ে ওই চাবির গোছাটা লাগে এবং ‘ছন্’ করে একটা শব্দ হয়। কেতকীদি বলতেন, “আমি জানি না, কোন টেকনিকে মা ওই চাবির গোছা একই সময়ে, একইভাবে ফেলতেন! এবং গোটা ‘শ্রীরঙ্গম’-এ যত দর্শক থাকত, ছ্যাঁৎ করে উঠত তাদের বুক। পরবর্তীকালে কুমার রায়ও প্রভা দেবী-র গল্প করতে গিয়ে এই একই দৃশ্যের কথা আমাকে বলেছিলেন। কুমার রায় ‘বিন্দুর ছেলে’-র অভিনয় প্রায় সাত-আটবার দেখেছিলেন এ-কারণে, যে কীভাবে প্রভা দেবী একইভাবে পিঠের ওপরে চাবির গোছা ফেলছেন, যাতে ওই আশ্চর্য সাংগীতিক আবহ তৈরি হয়!
ফিরে আসি কেতকীদির কথায়। দেড় বছর পর যখন আমার গানে উনি সন্তুষ্ট হন, তারপর থেকে শুরু হয় আমার এক অন্য জীবন। থিয়েটারের গানের অনুষ্ঠান-সূত্রে, আমি কেতকী দত্তর সঙ্গে গোটা ভারত ঘুরেছি। প্রায় ৩০০-৪০০ অনুষ্ঠান তো করেইছি। থিয়েটারের গান উনিই মূলত গাইতেন, আমি ডুয়েট গাইতাম। কয়েকদিন পর আমার উপর যখন আরেকটু ভরসা জাগল, আমাকে একক গাইতে দিতেন। আমার কাছে একটা নতুন পৃথিবীর জানলা খুলে গেল।
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন নাট্য উৎসবে উনি যখন ডাক পেতেন, আমি আর কেতকীদি গাড়ি করে যেতাম। তখন কলকাতা-সহ পশ্চিমবঙ্গের রাস্তা এত উন্নত ছিল না। কলকাতা থেকে দুর্গাপুর যেতে প্রায় সাড়ে পাঁচ-ছ’ঘণ্টা সময় লাগত। এই দীর্ঘ সময় জুড়ে আমরা দূর-দূরান্তে যেতাম, কেতকীদি আমাকে থিয়েটারের নানা গল্প শোনাতেন। ‘শ্রীরঙ্গম’-এ কীভাবে ওঁরা রিহার্সাল করতেন, ওঁদের বাড়ি ছিল ওখানে, তার গল্প, ‘বড়বাবু’ অর্থাৎ শিশিরকুমার ভাদুড়ী কীভাবে শেখাতেন— তার গল্প, প্রভা দেবীর কাছে কীভাবে উনি কণ্ঠ প্রক্ষেপণ, নাচ শিখেছেন, কৃষ্ণচন্দ্র দে-র কাছে গান শেখার গল্প— আরও কত কী সেই যাত্রাপথের সঙ্গী হত। এগুলো শুনতে-শুনতে আমার মনে অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ জন্মাতে শুরু করে। আজ যে আমি একজন পেশাদার অভিনেতা হয়েছি, তার পিছনে বিরাট অবদান কেতকী দত্তর। অবচেতনে আমার মনের মধ্যে ওই গল্পগুলো, ওই সময়টাকে উনি এনে দিতেন, সেটাই আমার মধ্যে অভিনেতা হওয়ার বীজ বপন করে দিয়েছিল।
পরবর্তীকালে কেতকীদি দেখে যেতে পারেননি যে, আমি পেশাগতভাবে অভিনেতা হয়েছি। চপলদা (ভাদুড়ী) আমাকে মাঝে-মাঝে বলেন, ‘ছোড়দি যদি দেখে যেতে পারত তুই অভিনেতা হয়েছিস, অভিনয় করে একটু নামটাম করেছিস, তাহলে খুব খুশি হত।’ আমি আজও সুযোগ পেলেই স্বীকার করি— কেতকীদি আমার ভিতটা তৈরি করে দিয়েছিলেন।
যে তিন-চার বছর আমি কেতকীদির সাহচর্যে ছিলাম, প্রায় প্রত্যেকদিনই ওঁর সঙ্গে কাটিয়েছি। কোথায়-না-কোথায় গিয়েছি ওঁর সঙ্গে! আজও মনে পড়ে, প্রথম যে-দিন ওঁর ক্যানসার ধরা পড়ল, সে-দিনের কথা। দিল্লিতে আমরা একটা অনুষ্ঠান করতে গিয়েছিলাম, দিল্লির হ্যাবিট্যাট সেন্টারে বিরাট বড় থিয়েটারের গানের অনুষ্ঠান চলছিল, সেখান থেকে ফেরার সময়ে রেলস্টেশনে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। আমাদের সঙ্গে সুরঞ্জনা দাশগুপ্ত, অঞ্জন দেব প্রমুখ ছিলেন। ট্রেন তখন ছাড়ার মুখে, আমরা সকলে মিলে কেতকীদিকে অন্য একটা কম্পার্টমেন্টে তুলে দিয়েছিলাম। এর পর-পরই ওঁর একটা শারীরিক অ্যাটাক আসে। কলকাতা ফিরে টেস্ট করার পর জানা যায়, ওঁর ক্যানসার থার্ড স্টেজে। আরও কোনও উপায় নেই…
এখানে অন্য একটা বলে রাখা ভাল, তাহলে পার্থক্যটা করা যাবে। আজকাল খুব ছুটকোছাটকা, সদ্য অভিনয় জগতে পা-রাখা অভিনেতা-অভিনেত্রীদের দেখি, তাঁরা ফ্লাইটের টিকিট না পেলে কাজ করতে চান না। কিন্তু কেতকীদি ট্রেনের সামান্য একটা সেকেন্ড ক্লাসের টিকিট পেলেই খুশি হয়ে যেতেন।
বহুদিন অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও গান গাওয়া, অভিনয়, থিয়েটার করা ছাড়েননি কেতকীদি। ওঁর শেষ অনুষ্ঠানেরও সাক্ষী ছিলাম আমি। ২০০৩ সালের জানুয়ারি মাস। রানাঘাটের পাল চৌধুরী স্কুলে একটা নাটকের গানের অনুষ্ঠান হয়েছিল। সে-দিন সকাল থেকেই ভীষণ অসুস্থ ছিলেন উনি। বমি হচ্ছিল, গলা দিয়ে স্বর বেরচ্ছিল না। আমি ওঁর বাড়িতে গিয়ে বললাম, আমি কি ফোন করে বলে দেব আপনার যাওয়া সম্ভব নয়? কেননা কেতকীদি দাঁড়াতেই পারছিলেন না। রানাঘাট তিন-চার ঘণ্টার পথ, যাওয়া প্রায় অসম্ভব। আমার হাতটা চেপে ধরে বললেন, ‘না বাবু, আমরা তো এই শিক্ষা পাইনি; আমাদের তো শেখানো হয়েছে, যতক্ষণ না শেষ নিঃশ্বাস বেরিয়ে যাচ্ছে, তোমাকে পারফর্ম করতেই হবে! স্টেজে পারফর্ম করতে-করতে গান গাইতে-গাইতে মরে গেলে মরে যাব, কিন্তু আমাকে যেতেই হবে!’ নিজের জেদ ধরে রাখলেন; বললেন, যাব, যতটা পারব অনুষ্ঠান করব। আমি যথারীতি ভাড়া করা গাড়ি নিয়ে এলাম। এই যে কেতকীদি শাড়ি-সিঁদুর পরে, চুল বেঁধে, টিপটা একবার পরলেন, সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যেন এক অন্য মানুষ হয়ে গেলেন ম্যাজিকের মতো! মঞ্চে যে উনি পারফর্ম করতে যাচ্ছেন, এটাই যেন ওঁর জীবনীশক্তি!
শত অসুস্থতা নিয়েও গাড়িতে চাপলেন, চার-পাঁচ ঘণ্টা পথ অতিক্রম করে আমরা রানাঘাট পৌঁছলাম। পাল চৌধুরী স্কুলে পৌঁছে শো-র আগে উনি বেশ অসুস্থ হয়ে পড়লেন, বাথরুম পর্যন্ত যেতে পারছিলেন না। তখনও জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেতকীদি, আপনি এই শরীর নিয়ে গান গাইতে পারবেন?’ বললেন, ‘আমি পারব! একঘণ্টাই আমি অনুষ্ঠান করব, ওঁদের বলো, দাঁড়িয়ে আমি অনুষ্ঠান করতে পারব না, চেয়ারে বসে করব।’ সে-দিন উনি টানা একঘণ্টাই অনুষ্ঠান করেছিলেন।
ফেরার পথে আমাকে গাড়ির সামনে বসতে বললেন। মাঝের সিটে, একটা থলে বিছিয়ে, তার ওপরে চাদর দিয়ে ওঁর জন্য একটা বালিশ মতো বানিয়ে দিয়েছিলাম। সারাটা পথ ক্লান্তিতে শুয়ে-শুয়ে এলেন। এরপর প্রায় দু’মাস শারীরিক যন্ত্রণা পেয়ে, চলে গিয়েছিলেন কেতকীদি। মৃত্যুর আগে ওটাই তাঁর শেষ অনুষ্ঠান। উনি অসুস্থ থাকাকালীন মাঝে-মাঝে যেতাম ওঁর বাড়ি। সে-ভাবে কথা বলতে পারতেন না। একদিন আমার হাত ধরে বলেছিলেন, ‘তুই কিন্তু বাবা আমার নাটকের গানগুলো বাঁচিয়ে রাখিস!’
আমি ওঁর বাড়িতে গিয়ে বললাম, আমি কি ফোন করে বলে দেব আপনার যাওয়া সম্ভব নয়? কেননা কেতকীদি দাঁড়াতেই পারছিলেন না। রানাঘাট তিন-চার ঘণ্টার পথ, যাওয়া প্রায় অসম্ভব। আমার হাতটা চেপে ধরে বললেন, ‘না বাবু, আমরা তো এই শিক্ষা পাইনি; আমাদের তো শেখানো হয়েছে, যতক্ষণ না শেষ নিঃশ্বাস বেরিয়ে যাচ্ছে, তোমাকে পারফর্ম করতেই হবে! স্টেজে পারফর্ম করতে-করতে গান গাইতে-গাইতে মরে গেলে মরে যাব, কিন্তু আমাকে যেতেই হবে!’
ওই যে বলছিলাম, ওঁর স্কুলিংয়ের মধ্যে একটা মেঠো ব্যাপার ছিল। একজন মানুষ, শিশিরকুমার ভাদুড়ী থেকে অপর্ণা সেন হয়ে ঊষা গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং তারপরেও ‘বারবধূ’ নাটক নিয়ে বিতর্কের পর, দীর্ঘ কয়েক বছরের বঞ্চনা সহ্য করছেন, প্রায় অঘোষিতভাবে ‘ব্যান’ হয়ে যাচ্ছেন রঙ্গমঞ্চ মঞ্চে থেকে এবং সর্বোপরি ‘মুক্তি’ নাটকের মাধ্যমে ফিরে আসছেন আবার! ‘মুক্তি’ নাটক করতে যখন উনি আমেরিকা যাবেন ঠিক হল, তার আগেই উনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আর আমেরিকা যাওয়া হল না। ওঁর মা প্রভা দেবী, শিশিরকুমার ভাদুড়ীর সঙ্গে ‘সীতা’ নাটকের অভিনয় করতে আমেরিকা গিয়েছিলেন জাহাজে করে। কেতকীদির খুব ইচ্ছে ছিল উনি আমেরিকা যাবেন। ওঁর মা যেমন শো করে এসেছিলেন, উনিও করবেন। বারবার এ-কথা বলতেন আমায়। সে-ইচ্ছে পূরণ হয়নি আর।
কেতকীদি চলে গেছেন এতগুলো বছর হয়ে গেল, আজও আমি যেখানেই পারি, ‘থিয়েটারে গান’-এর অনুষ্ঠান করার চেষ্টা করি। এই শ্রদ্ধাঞ্জলি ওঁর প্রতি আমার চিরকাল থাকবে। আমি যে অভিনয় করে নিজের জীবন কাটাতে পারি, সেই পথটা কেতকীদি-ই আমাকে দেখিয়ে গেছিলেন নিজের অজান্তে।
আমি যখন আজকাল আমেরিকা বা অন্য নানা দেশে শো করতে যাই, খুব মনে পড়ে ওঁর কথা। হয়তো কেতকীদির শেখানো গানই গাই, কিন্তু কেতকীদি এই গানগুলো নিজে এসে গাইতে পারলেন না… আমি সব সময়ে চেষ্টা করি কেতকীদিকে লোকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার। আজকের প্রজন্ম যদি কেতকীদিকে জানতে-চিনতে পারে, তাহলে সেটাই বাংলা রঙ্গমঞ্চ-ইতিহাসের একটা বিবর্ণ হতে চলা পাতাকে ধরে রাখবে।




