দেশ জোড়ার কারিগর

ভাঙছে! যা কিছু অবশেষ সবটুকু ভেঙে পড়ছে। ধ্বংসাবশেষ মিলছে ইতিউতি। একটা মানচিত্র, একটা ভাবনা, একটা দেশের শব। যে দেশ, রাষ্ট্রের চেয়ে অধিকতর বৃহৎ। সেই দেশের মঞ্চে ভাঙচুর চালিয়ে খানিক জিরচ্ছে রাষ্ট্রীয় দল। আপাতত খানিক নিশ্চিন্ত। শব্দ হচ্ছে বিস্তর। একঘেয়ে একটানা। খানিক ঝিমুনি আসে কখনও। আবার কখনও মনে হয় শ্রুতিভ্রম। কখনও চপেটাঘাত করে কানে। যন্ত্রণা দেয়। তখন মনে হয় কর্ণপটহ বিদারক। ভাঙনের মর্মর ধ্বনি। ভাঙছে একটা ভিত্তি আর অজুত-নিজুত মানুষের বিশ্বাস। সব গোলযোগ সয়ে ভগবান নিদ্রিত। বধির করেছে শব্দ, নিদ্রায় চোখ বন্ধ।

তবু জেগে থাকে মানুষ। যেমন জেগেছিল শাহিনবাগে। তখনও নীল গ্রহ পরিচিত নয় কোভিড নামক শব্দবন্ধের সঙ্গে। বায়োস্কোপে চোখ বোলালে দিব্যি সাদা-কালো ফ্রিজ শটে ভেসে ওঠে এক অন্য ভারত। আজ তাকালে বড় অচেনা লাগে। মনে হয়, গত জন্মের ভ্রম। বিগত বছরগুলোয় আরও বেড়েছে ধর্মীয় হিংসা, মানুষে-মানুষে অবিশ্বাস আর সন্দেহ। জাল বুনেছে সাম্প্রদায়িকতার বিষ। তবু এই অচেনা ভারতে উনি জেগেছিলেন। উনি নিতান্তই বোকা। পরখ করেননি আমূল বদল। তাই ৬৯ বছর বয়সেও আশা ছাড়েননি। রাষ্ট্রীয় লেঠেলবাহিনী বেপরোয়া ভাঙচুর চালিয়ে তাঁকে তুলে নিয়ে গেছে।

আমরা তো সেই কবেই পড়ে নিলাম দেওয়াললিখন, প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করলাম পুঁজি আর বিশ্বায়নের অতিকায় ছায়া। স্যাক্রিফাইস আর কম্প্রোমাইজের স্যান্ডউইচে কাটিয়ে দিলাম একটা জীবন। কিন্তু তিনি ৬৯-এও ধরে রাখলেন আঠারোর যৌবন। ‘আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ, স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি’! বিগত কুড়ি দিনে কত কুঁড়ি বিকশিত হয়? ব্যস্ত যন্তরমন্তর জানে। দীর্ঘ অবনতি শারীরিক অবস্থার। তবু ভরসা জোগায় এক অদম্য জেদ। আট কেজিরও বেশি ওজন কমেছে, কমেছে শরীরে শর্করার মাত্রা। ডাক্তাররাও খারাপ কিছুর আশঙ্কা করছিলেন, আর তিনি তখনও বিশ্বাস রেখেছেন ক্ষমতাসীনদের কানে আর্তি পৌঁছে দেওয়ার। ‘আমরা যদি এই আকালেও স্বপ্ন দেখি’। লাদাখের উন্নয়নে কয়েক দশক ধরে নিরলস অবদান। ভারতীয় সেনার জন্য উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে ব্যবহারযোগ্য বিশেষ তাঁবু তৈরি করেছেন। পরিবেশবান্ধব নানা প্রযুক্তির উদ্ভাবন বহুবার কাজে লেগেছে দেশের।

আরও পড়ুন : লাদাখের পরিবেশ বাঁচানোর লড়াইয়ে নেমেছিলেন সোনম!
লিখছেন রোদ্দুর মিত্র…

অনশন মঞ্চ থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথে সোনম ওয়াংচুক

তবু কার তাতে কী! তিনি ক্ষমতা চান না, পদ চান না। রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই। তবু রাষ্ট্রের চোখে শত্রু। জীবন বাজি রেখে লড়ছেন শিক্ষার জন্য। ‘পুরা এডুকেশন সিস্টেম কো বদলনে চলা থা’, কারণ বুঝেছেন শিক্ষার স্বাস্থ্য ভাল নেই পোড়া দেশে। লক্ষ পড়ুয়ার ভবিষ্যত অনিশ্চয়তার মুখে। গত মে মাসে সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস। সরকার প্রথমে খারিজই করে দেয় মিথ্যা অপবাদ বলে। তবু এই ভূখণ্ড এখনও গান্ধীর, অনেকে চাইলেও গডসের হয়নি পুরোপুরি। দানা বাঁধে প্রতিবাদ। মানুষ জোট বাঁধে, হাতে হাত রাখে। বিগত দিনে মানসিক চাপে কুড়ি জনেরও বেশি পড়ুয়া বেছে নিয়েছে আত্মহত্যার পথ। ভয় কমে বাড়তে থাকে ক্রোধ। হেরে যাওয়া মানুষ, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষ অবাক চোখে দেখে সিবিএসই-র দ্বাদশ শ্রেণির মূল্যায়নও ত্রুটিপূর্ণ। কারও নম্বর অন্যের নামে, তো কারও খাতাই সঠিকভাবে দেখা হয়নি। সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র জনরোষের আঁচ না বুঝেই চিফ জাস্টিস ছুড়ে দেন কটাক্ষ। অগত্যা কিলবিল করতে থাকে আরশোলার দল। একটি প্রতীকী মঞ্চ। বামপন্থী দলগুলো-সহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ এগিয়ে আসে সমর্থনে।

কিন্তু এসব খুচরো বিষয় কর্ণে যন্ত্রণা দেয়, বধিরতা আনে। চোখও ঝাপসা ঠেকে খানিক। মুখ ঘোরায় রাষ্ট্র। ২৮ জুন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অনশনে বসেন সোনম ওয়াঙচুক। ক্ষুদ্রই চাওয়া। এসবকিছুর জবাবদিহি করুক সরকার। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়িত্বশীল হোক সাথে। তবু ‘নয়া’ ভারত খানিক অচেনা। গান্ধী বহুদিন আগেই বোধহয় অপ্রাসঙ্গিক। সত্যাগ্রহ আর অনশন শক্তি হারিয়ে খানিক ভোঁতা। মনে পড়ে শর্মিলা চানুর কথা কিংবা বৃদ্ধ জি ডি আগরওয়াল, পরিবেশকর্মী। অনশন করে প্রাণটাই দিয়ে দিলেন একদিন। অন্না হাজারে, নতুন সময় স্বপ্ন দেখায়। আমরা ব্যর্থ হয়েছি বারবার। সমাজমাধ্যমে ধেয়ে আসে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ। কদর্য মিম শেয়ার হয়। অধিকাংশই সার্কুলেট করে নতুন প্রজন্ম।

সোনম নিতান্তই বোকা। তিনি জানেন না, তিনি কাদের জন্য লড়ছেন! ধর্মান্ধ এই দেশে তাঁর শিক্ষা-বিদ্যে প্রলাপের অনুরূপ। সংখ্যাগুরুর কাছে তিনি আদতে এক জোকার। প্রমাণের অবকাশ নেই, তবু দেশদ্রোহী। কেউ কেউ মনে করেন, চিনের দালাল। দালালির সংজ্ঞা বিষয়ে যে মানুষ অজ্ঞ, সে মানুষ আয়না দেখে না। তবু সোনম হাল ছাড়েন না। বরং কণ্ঠ ছাড়েন। ডোবার পাঁক হয়ে যাওয়া সমাজমাধ্যমই তার অস্ত্র। বার্তা পৌঁছে যায় দেশের অলিগলি-পাকস্থলীর বুকে। অসুস্থ শীর্ণকায় শরীরে ছুড়ে দেন মুষ্টিবদ্ধ হাত। কী অপরূপ বারুদ ওই কৃশ, জীর্ণ বুকের খাঁচায়।

আজ যখন রাষ্ট্রীয় ঘেরাটোপে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তখনও কী দীপ্ত চাহনি! তাঁর প্রতিবাদ শুধু একটি ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, একটা গোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। রাষ্ট্র জবাব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করে না। নীরব থাকাই সমীচীন। ঘুণ ধরেছিল সেই কংগ্রেস আমলেই। বিরোধী দলনেতাও তাই একটি বাক্যও ব্যয় করেননি এই অনশন নিয়ে। ২০১৪-র পর থেকে চারবার মুখবদল। প্রথমে স্মৃতি ইরানি, যাঁর নিজের ডিগ্রিতেই গরমিল। পরবর্তীতে প্রকাশ জাভড়েকর। গবেষণা ও উদ্ভাবনের কথা বলে স্বপ্ন দেখান আগামীকে। পরবর্তীতে শিক্ষাক্ষেত্রে বিনিয়োগ জিডিপির এক শতাংশও ছুঁতে পারেনি। অথচ একই সময়ে প্রতিবেশী চিন বিপুল বিনিয়োগ করেছে গবেষণাখাতে। তারপর তাঁকে সরিয়ে আসেন রমেশ পোখরিয়াল। প্রবর্তন করেন জাতীয় শিক্ষানীতি। বাস্তবায়নে প্রভাব অনুভূত নৈব নৈব চ! অবশেষে আসেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। সঙ্গে আসে প্রশ্ন ফাঁস, মূল্যায়নের ত্রুটি, জন-অসন্তোষ ইত্যাদি প্রভৃতি। দেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক পদে বিপুল ঘাটতি। শূন্যপদ পূরণের প্রচেষ্টাও হয় না তেমন। যেখানে প্রতিনিয়ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে, এখনও দেশের শিক্ষাব্যবস্থা আটকে রয়েছে সেই মুখস্থনির্ভর প্রাচীন শিক্ষার গন্ডিতেই। বাদ দেওয়া হচ্ছে মুঘল ইতিহাস।

ছাত্রসংখ্যার নিরিখে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উচ্চশিক্ষা পরিসর ভারতের। দেশে বিদ্যমান হাজারেরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও চল্লিশ হাজারেরও বেশি কলেজ। তবু এতকিছু সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের অবস্থান নিদারুণ হতাশাজনক। টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বের প্রথম ২০০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভারতের উপস্থিতি হাতেগোনা। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের পাশাপাশি চিনের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সারিতে অবস্থান করছে। জনসংখ্যা, মেধা ও তারুণ্য সত্ত্বেও ভারত বিগত কয়েকবছরে ক্রমাগত নিম্নগামী।

এই সবকিছুই জানেন সোনম। এসবকিছুর বিরুদ্ধেই তাঁর লড়াই। পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে বদলে দেওয়ার প্রয়াসে যেমন ধেয়ে এসেছিল চতুর রামলিঙ্গমের শ্লেষ, তেমনই তাঁর চড়াইপাখি সাইজের বুকে যে ভারত বাস করে তাকেও বাঁকাচোখেই দেখে রাষ্ট্র। বারবার প্রহসন ছুড়ে দেয়। তিনি নাকি বাথরুমে গিয়ে লুকিয়ে খাচ্ছেন। জলের বোতলে নিশ্চয়ই জুস্ রয়েছে। তবু তাঁর দাবিগুলোর পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস হয় না কারও। মুখ ফুটে বলতে পারে না, তিনি অন্যায্য কিছু চাইছেন!

তাই আক্রমণ হয় স্লোগান নিয়ে, গান নিয়ে, আন্দোলনের ধরণ নিয়ে। সবাই দেখছে যে রাজা উলঙ্গ, তবুও সবাই হাততালি দিচ্ছে। তবু সাইলেন্স ভেঙে এগিয়ে আসা সঠিক মনে করেন সাইলেন্সার। না আসুক ইডিয়টের দল। কাঠবেড়ালিও পাথর জুড়েছিল অসময়ে। তাই পর্দার প্রতিনায়ক অবতীর্ণ হন নায়কের ভূমিকায়। স্মরণ করান অনিবার্য কর্তব্য। শীর্ণজীর্ণ মানুষকে হিঁচড়ে নিয়ে গেল শকুনের দল।

কী মজার না! ফুংসুক ওয়াংড়ু সোনম ওয়াংচুক নন, এই তথ্য হঠাৎই ২০২৬-এ জরুরি হয়ে ওঠে। কে ভুলবে, আজ থেকে ১৭ বছর আগে রাজকুমার হিরানির ‘থ্রি ইডিয়টস’ কীভাবে জনপ্রিয় করে তুলেছিল সোনম ওয়াংচুককে? কে ভুলবে, আমির খানের মতো তারকাকে ছাপিয়েও বাস্তবের তারকাকে ঠিক চিনে নিয়েছিল দেশ! ২০১৪-র পর তো শাসকের প্রশংসাও করেছেন সোনম, কিন্তু সময়ের দাবি মানতেও নারাজ হননি। তাই আজ হঠাৎ ‘থ্রি ইডিয়টস’-এর অনুপ্রেরণা আসলে কে, সেই নাদান তর্ক জরুরি হয়ে ওঠে। আসলে বলিউড তাঁকে জনপ্রিয় করতেই পারে, কিন্তু মূল স্রোতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, দ্রোহ কোন আক্কেলে মেনে নেবে জনমুখী সংস্কৃতির ধারকবাহকরা? তাই খোঁচা মারা অপ্রিয় সত্যর মতো মিথ্যের বেসাতিতে বুঁদ জনমানসে লেগে থাকেন সোনম ওয়াংচুক।

আপাতত ফোর্স-ফিডিং চলবে। যদি এ মৃত্যু প্রত্যক্ষ করতো ভারত, তার ছিটেফোঁটা রক্ত থাকত রাষ্ট্রব্যবস্থার হাতেও। তাই ক্ষুরধার রাষ্ট্র দাবি পূরণের বিষয়ে নূন্যতম আলোচনায় না গিয়ে, গায়ের জোরে আস্থা রেখেছে। ট্রোল চলছে। অসুস্থ ন্যুব্জ শরীরটাকে নিয়ে বিকৃত মিম ছড়ানো হচ্ছে। আমরা এই ভেঙে পড়া ধ্বংসাবশেষ দেখেও চুপ থেকেছি। কানে হাত রেখে বিশ্বকাপ, চোখে হাত দিয়ে স্ক্রল করেছি। বিদেশ-বিভুঁইয়ের নিশ্চিত জীবন ছেড়ে দেশরক্ষার দুরূহ গাণ্ডীব হাতে তুলে নেওয়া সোনমকে পরিহাস করেছি। আর আমাদের অনাগত কাল অলক্ষ্যে হেসেছে আমাদের অদৃষ্ট অভিমুখে। প্রারব্ধ হিসেব রাখে এক রিক্ত, নিকৃষ্ট, হীন জনজাতির। দড়ির একপ্রান্তে ঘৃণার অস্ত্র হাতে এক সুবিশাল বাহিনী, অন্যদিকে এক নাগরিক, ভাঙা দেশ জুড়তে নিজের জীবন বন্ধক রেখে ইতিহাসের গায়ে ইনকিলাবি পাণ্ডুলিপি খোদাই করছেন।