রাজনীতির বিশ্বকাপ
‘লা মালভিনাস সান আর্জেন্তিনা’ ব্যানার নিয়ে উচ্ছ্বাসে মেতেছেন মেসি-ম্যাক অ্যালিস্টাররা। দ্বিতীয় সেমিফাইনালে দুরন্তভাবে ফিরে এসে, শেষ দশ মিনিটে দু’গোল করে ইংল্যান্ডকে হারানোর পর। স্প্যানিশ এই ব্যানারটির অর্থ হল— ‘মালভিনাস (ফকল্যান্ড) আর্জেন্টিনার অন্তর্গত!’ প্রায় চার দশকেরও বেশি আগে, মালভিনাস-যুদ্ধে ইংরেজরা সংশ্লিষ্ট দ্বীপটি ছিনিয়ে নিয়েছিল আর্জেন্টিনার কাছ থেকে। শহিদ হয়েছিলেন তিন হাজার আর্জেন্টিনীয় সেনা। তাই বিশ্বকাপে এই দুই দেশ মুখোমুখি হলেই, সে-যুদ্ধের প্রভাব এখনও মাঠে পড়তে থাকে।
বর্তমান যুগে যখন উদ্ধত অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি বিশ্বব্যাপী এক সংকীর্ণতাবাদী আধিপত্য কায়েম করেছে, তখন বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রতিটা আসর সেই প্রচলিত ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতার বিন্যাসকে উলটে দিয়ে একটি প্রাণবন্ত ও শিক্ষণীয় সমান্তরাল জগত সৃষ্টি করে যায়। এই জগতে তৃতীয় বিশ্ব, আর্থ-সামাজিক ভাবে পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর আম-নাগরিকদের প্রাধান্য বেশি দেখা ও শোনা যায়। চেনা যায় বিশ্ব মানচিত্রের কিছু অখ্যাত ক্ষুদ্র দেশ, দ্বীপরাষ্ট্র বা জাতির রূপ। তাই মাঠের যুদ্ধে জিতে মালভিনাস পুনরুদ্ধার করার সম আনন্দে মেতে ওঠেন মেসি-ফারনান্দেজরা।


ঠিক চার দশক আগে, মেক্সিকোর অ্যাজটেকায় ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনালে নামার আগে এই মালভিনাস যুদ্ধ-শহিদদের কথা বলেই দলকে তাতিয়েছিলেন দিয়েগো মারাদোনা। ওই আর্জেন্টিনা দলের অনেকেই বলেছিলেন, বিশ্বকাপের থেকেও এই ম্যাচটা জেতা আমাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল! চল্লিশ বছর পরেও একই আত্মা নিয়ে মাঠে নামল আর্জেন্টিনা। বিশেষজ্ঞরা, যাঁরা ইংল্যান্ডকে ফেভারিট আখ্যা দিয়েছিলেন, তাঁরা ভুলে গিয়েছিলেন এই ম্যাচটায় হৃদয় দিয়ে ফুটবল খেলবেন ক্রিশ্চান রোমেরো-লউতারো মার্তিনেজরা। মাঠে ভূ-রাজনীতি টেনে এনে মেসিদের এই ব্যানার প্রদর্শনে প্রবল বিরূপ হয়েছে সংযুক্ত রাষ্ট্র। দশ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের তরফ থেকে ইতোমধ্যেই ‘ফিফা’কে নালিশ জানিয়ে ঘটনার তদন্ত দাবি করা হয়েছে। এই ব্যানার যাতে বিশ্বকাপের মঞ্চে আর প্রদর্শিত না হয়, সেই ব্যবস্থা করার দাবিও করা হয়েছে।
আঁধারের বিশ্বকাপ! কেলেঙ্কারির মাস্টারমাইন্ড আর্জেন্টিনার একনায়ক?
পড়ুন: বিতর্কিত একাদশ পর্ব ১০…
গাজায় নির্বিচারে চলছে ইজরায়েলি হানাদরি আর গণহত্যা। শিশু, ছাত্র, সাংবাদিক, মহিলা কবি-শিল্পীর সঙ্গে নিহত হয়েছেন বহু অ্যাথলিট ও ফুটবলারও। যোগ্যতা অর্জনকারী পর্বে দুরন্ত লড়ে ইরাকের মতো দলকে হারিয়েও রেফারির বিতর্কিত সিদ্ধান্তে ছিটকে যেতে হয়েছিল প্যালেস্টাইনকে। ইরান ও পার্শ্ববর্তী লেবাননে মার্কিন ও ইজরায়েলি হানাদারি অব্যাহত। মার্কিন-ইরান যুদ্ধ চলছে সাড়ে চার মাস ধরে, যার জেরে দীর্ঘদিন বন্ধ ও অনিশ্চিত হরমুজ প্রণালী, হু-হু করে বাড়ছে অপরিশোধিত তেলের দাম। রাশিয়া-ইউক্রেন শান্তি প্রক্রিয়াও কিছুতেই বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে মেক্সিকো সিটিতে ১১ জুন বাজল ২৩-তম ‘ফিফা’ বিশ্বকাপের বাঁশি। সে-দিনই শহরে পথে নামলেন ৫০ হাজার মানুষ; শিক্ষকরা বেসরকারি পেনশন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, কয়েক হাজার নিখোঁজ মানুষের সন্ধানে যৌথ অভিযানে; আদিবাসী, কৃষক ও যুবরা প্রতিবাদ কর্মসূচিতে, যাদের কাছে এই কাপ আয়োজনের দেশীয় সম্পদের ব্যাপক অপচয়। পরের দিন লস অ্যাঞ্জেলসে মার্কিনরা প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে খেলল গ্যালারির বিলাসবহুল স্যুটে উপস্থিত বিলিয়নেয়ার, বিল গেটসের মতো টেক-মোঘল, নানা ক্ষেত্রের তারকা ও বিখ্যাত ব্যুক্তিদের সমাবেশের সামনে, যাঁরা চড়া মূল্যে টিকিট কেটে মাঠে এসেছিলেন। সাধারণ গ্যালারির কিছু অংশ দর্শকশূন্যাই পড়ে রইল। তার সঙ্গে শুরু হয়ে গেল মাঠে ও গ্যালারিতে ওই বিকল্প জগতের সৌন্দর্য সৃষ্টি করার লড়াই। যা করার পথে মাঠের বাইরে প্রবল শক্তির সঙ্গে লড়াই করতে হয় ফুটবলার, কোচ, রেফারি, সমর্থক থেকে একাংশ ফুটবল কর্মকর্তাদেরও। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় যৌথভাবে আয়োজিত ২৩ তম বিশ্বকাপে ফুটবলের পাশাপাশি বারবার দেখা গেল এই অসম দ্বন্দ্বের বহু নিদর্শন। ‘ফিফা’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে চারটি কোয়ার্টার ফাইনাল, দুটি সেমিফাইনাল ও ফাইনাল, ছাড়াও শেষ ষোলর আটটির মধ্যে সাতটি ম্যাচ আয়োজনের দায়িত্ব অর্পণ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকারের প্রতি সংস্থার আনুগত্যের প্রমাণ দিল।
সন্দেহ: বৈষম্য মূলক ভিসা নীতি
‘রিল্যাক্স অ্যান্ড চিল!’ বলেছিলেন ‘ফিফা’-সভাপতি জিওভানি ইনফ্যান্তিনো। বিশ্বকাপের জন্য আয়োজক কমিটি যে-টাস্ক ফোর্স গঠন করে, নিজেকে তার চেয়ারম্যান নিযুক্ত করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আয়োজক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সোমালিয়ার রেফারি ওমর আব্দুলকাদির আর্তানকে নির্বাচিত রেফারি হওয়া সত্ত্বেও ভিসা দেওয়ার ব্যাপারে কড়া মনোভাব নিল। অথচ আর্তান একজন প্রতিষ্ঠিত রেফারি। ২০২৫-এই আফ্রিকান কনফেডারেশনের সেরা পুরুষ রেফারি মনোনীত হয়েছিলেন। যোগ্য রেফারিকে বিশ্বকাপ মঞ্চে ম্যা চ পরিচালনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করোতে চায়নি ফুটবল মহলের একাংশ। তাই কর্তারা মার্কিন প্রশাসনের কাছে সেই যুক্তি তুলে ধরে বিশেষ অনুরোধ করেন। কিন্তু ট্রাম্প সরকারের অভিবাসন নীতি অতি সংকীর্ণ ও নানা বৈষম্যের অভিযোগে অভিযুক্ত। ২০২৫-এই তারা সোমালিয়া-সহ বারোটি দেশের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে দিয়েছিল। শত যুক্তি প্রদর্শন আর অনুরোধেও যথারীতি ট্রাম্প প্রশাসনের বরফ গলল না। কোনও তথ্যপ্রমাণ পেশ না করেই, ট্রাম্প প্রশাসনের এক আধিকারিক বলে দেন, আর্তানের নাকি বহু নিষিদ্ধ সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সদস্যপদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে! আর্তানের জন্য এই বিশ্বকাপ অধরা মাধুরী রয়ে গেলেও, তিনি পূর্ণ বেতন নিয়ে বাড়ি ফিরলেন নায়কের মর্যাদায়।
আর্তান প্রসঙ্গ নিয়ে যখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘ফিফা’-কে চেপে ধরেছে, তখন ‘ফিফা’ সভাপতি সমস্ত প্রশ্ন নস্যাৎ করে বলেছিলেন, ‘রিল্যাক্স অ্যান্ড চিল’; তার মতে এই বিশ্বকাপ নাকি অন্তর্ভুক্তিকরণের দিক থেকে এক নজির তৈরি করে ফেলেছে!
শুধু আর্তানেই শেষ নয়, মার্কিন অভিবাসন দপ্তর যে-বারোটি দেশের ওপর ভ্রমণ-নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, তার মধ্যে ছিল বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন করা চারটি দেশ— ইরান, হাইতি, সেনেগাল, আইভরি কোস্ট। এর ফলে সেনেগালের সরকারি আলোকচিত্রী পর্যন্ত মাঠে ঢোকার সুযোগ পেলেন না! ভিসা সমস্যাসর জন্যর ইরান দলকে তাদের ১৫ জন টেকনিকাল কর্মী (ফিজিও, অ্যানালিস্ট, কর্তা ইত্যাগদি) ছাড়াই বিশ্বকাপ সফর করতে হল! এই চার দেশই ইউরোপের বড় লিগগুলোতে ফুটবলার রপ্তানি করে, যে-লিগগুলো থেকে বিরাট অর্থ আয় করে ‘ফিফা’। ‘ফিফা’-র পক্ষে কোনও আয়োজক দেশকে প্রতিযোগিতার জন্যয অভিবাসন নীতি বদলাতে বলা সম্ভব নয় ঠিক, তবে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর ফুটবলার, সহযোগী কর্মী ও সমর্থকদের জন্য কিছু বিশেষ ছাড় ও ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন ছিল।
এখানেই শেষ হল না ইরানের হেনস্থা। মার্কিন-ইজরায়েলের সঙ্গে ইরানের ভূ-রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও যুদ্ধের জেরে বিশ্বকাপে ইরানের সঙ্গে অতিথি নয়, শত্রুর মতো চরম দুর্ব্যবহার করল মার্কিন প্রশাসন। তাদের শিবির অ্যারিজোনা থেকে মেক্সিকোর তিজুয়ানায় সরিয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য করা হল। অথচ তাদের খেলা দেওয়া হয়েছিল লস অ্যঞ্জেলাস আর সিয়াটেলে। ম্যাচ শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে তাদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেওয়া হত। ইরান-কোচ আমির ঘেলোনই চেয়েছিলেন, তাঁর দলকে ম্যাচের পর পর্যাপ্ত বিশ্রাম পাওয়ার জন্য ক্যালিফোর্নিয়ায় অন্তত একটি রাত থেকে যেতে দেওয়া হোক। কিন্তু মার্কিন প্রশাসন সে-দাবি নাকচ করে দেয় ও হাড্ডাহাড্ডি ম্যাচের ঘণ্টা দু’য়েক পরই ইরানকে প্লেন ধরে তিজুয়ানায় ফিরে যেতে বাধ্য করে। এত কিছু সত্ত্বেও গ্রুপ লিগে অপরাজিত ভাবে শেষ করে ইরান। কিন্তু নকআউট পর্বে যাওয়া আর হয়ে উঠল না দুটো কারণে।

ইঞ্জুরি সময়ের তখন তৃতীয় মিনিট। সিয়াটেলে মিশর-ইরান ম্যাচ তখন ১-১। বক্সে উড়ে আসা একটি ফ্রিকিক এগিয়ে এসেও ফস্কালেন মিশরের গোলকিপার মোস্তফা শোবের, সেই বলে মহম্মদ ঘোবারানির শট মিশর গোলকিপারের গায়ে লেগে ফিরে এলে ফিরতি বলে ইরানীয় স্টপার শোজা খালিলজাদেহ জাল কাঁপিয়ে দেয়। পোল্যাফন্ডের রেফারি জাইমন মার্চিনিয়াক ভিডিও অ্যাসিসটেন্ট রেফারি (ভার)-এর সহযোগিতা নিয়ে অফসাইড ঘোষণা করে দেন গোলটিকে। পুরো ইরান দল তখন জয়সূচক গোল উদ্যাপন করছেন, যা তাদের প্রথমবারের জন্য নিয়ে যেতে পারত বিশ্বকাপ নকআউট পর্বে। কিন্তু ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা যায় খালিলজাদেহর বুটের ডগাটুকু শুধু এগিয়ে ছিল মিশরের শেষ ডিফেন্ডারের থেকে। এরকম সূক্ষ্ম সিদ্ধান্ত নিয়ে তো বিতর্ক হবেই। হলও তাই।
শেষপর্যন্ত যে-কারণে তিন ম্যাচে তিন পয়েন্ট পেয়েও ইরানের কপাল পুড়ল, তা হল আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে অস্ট্রিয়ার শেষ সময়ে করা গোল। যা গোল পার্থক্য সেরা আট তৃতীয় দলের মধ্যেক থাকার সম্ভাবনা শেষ করে দিল ইরানের। মার্কিন স্বরাষ্ট্র সুরক্ষা সচিব মারকোয়ে মুলিন গ্রুপ পর্ব থেকে ইরানের এই ‘বিদায়’ উদ্যাপন করে, সন্দেহ আর বিতর্ক আরও উস্কে দিলেন।
ইরানকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছিটকে দেওয়ার আগাম ‘ব্লু-প্রিন্ট’ কি তৈরি করে রেখেছিলেন আয়োজকরা?
আর-একটি ঔদ্ধত্য ট্রাম্প প্রশাসন দেখাল। ‘ফিফা’ কে দিয়ে হাইতি জাতীয় দলের কিট ও জার্সি থেকে দাসপ্রথার বিরুদ্ধে তাদের মুক্তিযুদ্ধ তথা ‘ব্যাটল অফ ভার্তিরেসের’ চিহ্ন মুছে ফেলতে বাধ্য করে। ১৮০৩-এর ১৮ নভেম্বর জাঁ জাক দেসালিনের বিপ্লবী দাস সেনা মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছিল নেপোলিয়নের সৈন্যবাহিনীকে। সেই মুক্তিযুদ্ধের চিহ্ন মুছে দিয়ে কি হাইতির মতো দেশগুলোর ওপর আবার নয়া ঔপনিবেশিক দাসত্ব আরোপ করতে চায় ট্রাম্প সরকার?

বৈষম্যবাদে আক্রান্ত সমর্থক-সংস্কৃতি
বেশিরভাগেরই কিনহাসা গিয়ে দেখার সৌভাগ্য হয়নি, তাদের জন্যই টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে উঠল সেই দৃশ্য। ঠিক যেন মনে হবে কিনহাসার প্যাট্রিস লুমাম্বার স্ট্যাচু! এস্তাদিও গোয়াদালাহারায় কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তথা বিপ্লবী স্বাধীনতা সংগ্রামী প্যাট্রিস লুমাম্বার স্ট্যা্চুর মতোই এক হাত তোলা ভঙ্গিমাতে ম্যাচ চলাকালীন ঠায় ৯০ মিনিট রঙিন স্যুট পরে দাঁড়িয়ে রইলেন এক ব্যক্তি। মিশেল এনকুকা এমবোলাডিঙ্গা গ্যালারিতে লুমাম্বার জীবন্ত স্ট্যাচু হয়ে, সারা বিশ্বকে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের বার্তা দিতে এসেছিলেন। কিন্তু কঙ্গো-কলম্বিয়ার ওই ম্যাচের পর আর কোনও ম্যািচে গ্যালারিতে দেখা গেল না এমবোলাডিঙ্গাকে!
বিশ্বকাপের বিকল্প জগত সৃষ্টিতে ফুটবলার, কোচ, সংবাদ-মাধ্যলমের সঙ্গে বহুত্ববাদী সমর্থক সংস্কৃতিরও একটি বিরাট ভূমিকা থাকে। খেলার সঙ্গে গ্যালারির দৃশ্য মিলিয়ে বিশ্বকাপের প্যাকেজ আরও আকর্ষক হয়, যা সারা বিশ্বে বিক্রি হয়ে বিশাল অর্থসমাগম ঘটায় ‘ফিফা’ ও আয়োজক দেশের কোষাগারে। তাহলে সেই সমর্থকদের ওপরই এত সন্দেহ আর বিধিনিষেধ কেন? এরই মধ্যে লস অ্যাঞ্জেলস ও সিয়াটেলে ইরানের ম্যাচ চলাকালীন গ্যালারিকে রাঙিয়ে তুলেছিলেন এক ইরানি যুবতী। দেশের স্বৈরশাসকদের হাতে নিহত ইরানের নারী স্বাধীনতার মুখ মাহসা আমিনির নাম লেখা জার্সি হাতে নিয়ে তিনি দিতে চাইলেন নারী স্বাধীনতার বার্তা। প্যালেস্টাইনের পতাকাও ওড়াতে দেখা যায় ইরানি সমর্থকদের।

’৯০ সালে ইতালিতে উদ্বোধনী ম্যাচে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে অঘটন ঘটানোর পর থেকে ক্যামেরুন সমর্থকরা বহু কৃচ্ছসাধন করে ইতালিতে আসতে শুরু করেন, গ্যালারি থেকে জাতীয় দলকে উৎসাহিত করার জন্য। মাঠে স্বপ্নের ফুটবল খেলছেন ফুটবলাররা, গোল করে কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে গিয়ে নাচ দেখাচ্ছেন রজার মিল্লা, আর গ্যালারিতে স্বকীয় স্টাইলে লোকনৃত্যের মাধ্যমে উদ্যাপন করছেন ক্যামেরুন সমর্থকরা, এই দৃশ্য বারবার দেখা গিয়েছিল ইতালিতে। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল সমর্থকদের সাম্বা নাচের থেকে যা কোনও অংশেই কম প্রাণবন্ত ছিল না।

কিন্তু বৈষম্যমূলক মার্কিন অভিবাসন নীতির জেরে এই বহু জাতীয় ও বহু সংস্কৃতির ফ্যান-কালচার প্রবলভাবে আক্রান্ত হল বর্তমান বিশ্বকাপে। ভিসা কড়াকড়ি, সীমান্তে স্বাস্থ্যপরীক্ষা প্রক্রিয়ায় ২১ দিনের এবোলা কোয়ারেন্টাইনের জাঁতাকলে পড়ে এমবোলাডিঙ্গার মতো বহু আফ্রিকান সমর্থক স্টেডিয়ামের ধারেকাছেই পৌঁছতে পারলেন না। পর্তুগালের সঙ্গে প্রথম ম্যাচে হিউস্টনে এমবোলিডাঙ্গার ভিসা না-মঞ্জুর করেছিল মার্কিন স্বরাষ্ট্র দফতর, এবোলা কোয়ারেন্টাইনের অজুহাতে। পরের ম্যাচে মেক্সিকোর মাঠে কোয়ারেন্টাইন শেষ করে গ্যালারিতে দেখা দিয়ে বার্তা দিতে পারলেও, আটলান্টায় গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে উজবেকিস্তানের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসন তাকে ভিসা দিতে অস্বীকার করল। কঙ্গো নকআউট পর্বের ছাড়পত্র অর্জন করে ইতিহাস সৃষ্টি করার পরও ইংল্যান্ডে বিরুদ্ধে একই স্টেডিয়ামে আবারও ভিসা না পাওয়ার জন্যে দেখা গেল না ‘লুমাম্বা ভিয়া’কে (লুমাম্বা জুনিয়র)! মার্কিন সরকার যখন শেষ পর্যন্ত অনড় থেকে তাঁর ভিসার আবেদন নাকচ করল, তখন কঙ্গো দূতাবাস এক যুব সমর্থককে এমবোলাডিঙ্গার মতোই লুমাম্বার জীবন্ত মূর্তি হিসেবে গ্যালারিতে প্রদর্শন করল। ৩৮৫ জন কঙ্গো সমর্থকের মধ্যেই মাত্র ১৫ জনের ভিসা আবেদন মঞ্জুর করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। তাই মাঠে ইংল্যান্ডের সঙ্গে মরণপণ লড়াই করে ১-২ হারলেও, গ্যালারি থেকে সেভাবে সমর্থন পেলেন না কঙ্গো ফুটবলাররা। স্কটল্যান্ডের বহু সমর্থকের ভিসাও না-মঞ্জুর করে মার্কিন সরকার। অথচ, ম্যাসাচুসেটস থেকে টেক্সাস, আম আমেরিকাবাসী আনন্দোৎসবের উষ্ণতায় ভ্রাম্যমান সমর্থকদের অভ্যর্থনা জানিয়েছে; যা রাগী, অভিবাসীদের প্রতি ঘৃণা মনোভাবাপন্ন, জাতি বিদ্বেষী মার্কিন নাগরিকের যে-ভাবমূর্তি হোয়াইট হাউস তৈরি করতে চেয়েছিল, তার সম্পূর্ণ বিপরীত। এই কারণে, আর এপস্টিন ফাইল নিয়ে দর্শকদের কটাক্ষ মিশ্রিত স্লোগান এড়াতে ফাইনালের আগে পর্যন্ত ট্রাম্পকে স্টেডিয়ামে দেখা যায়নি। ৭ জুলাই মার্কিন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইসিসি) এক এজেন্ট হিউস্টনে লরেঞ্জো সালগাদো আউরুজো নামে এক ৫২-বছরেরর মেক্সিকান অভিবাসীকে গুলি করে হত্যা করল! তার শেষ শ্রদ্ধা অনুষ্ঠানে উপস্থিত পরিজনদের সামনে নিহত সালগাদোর অতিপ্রিয় দুটি মেক্সিকোর জার্সি তুলে ধরলেন তার এক পুত্র। বহু অভিবাসী মেক্সিকান মনে করেন যে, টিকিটের অতিরিক্ত দাম ছাড়াও আইসিসি-র এজেন্টদের ভয়ের জন্যম গ্রুপ পর্যায়ের কিছু ম্যাচে গ্যালারি ভর্তি করতে পারেননি দর্শকরা।
’৯০ সালে ইতালিতে উদ্বোধনী ম্যাচে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে অঘটন ঘটানোর পর থেকে ক্যামেরুন সমর্থকরা বহু কৃচ্ছসাধন করে ইতালিতে আসতে শুরু করেন, গ্যালারি থেকে জাতীয় দলকে উৎসাহিত করার জন্য। মাঠে স্বপ্নের ফুটবল খেলছেন ফুটবলাররা, গোল করে কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে গিয়ে নাচ দেখাচ্ছেন রজার মিল্লা, আর গ্যালারিতে স্বকীয় স্টাইলে লোকনৃত্যের মাধ্যমে উদ্যাপন করছেন ক্যামেরুন সমর্থকরা, এই দৃশ্য বারবার দেখা গিয়েছিল ইতালিতে। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল সমর্থকদের সাম্বা নাচের থেকে যা কোনও অংশেই কম প্রাণবন্ত ছিল না।
কাঠগড়ায় ‘ফিফা’
বৈষম্যমূলক আয়োজন ব্যবস্থা করে এই বহুত্ববাদী সমর্থক-সংস্কৃতি ধ্বংস করার প্রচেষ্টায় ট্রাম্প প্রশাসনের সমস্ত সংকীর্ণ কৌশলের অংশীদার ছিল ‘ফিফা’ ও। বিশ্বকাপের কয়েকমাস আগে, গত ডিসেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘ফিফা’ শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করেছিলেন ইনফ্যান্তিনোরা! বিশ্বকাপের আগে থেকেই টিকিটের আকাশছোঁয়া দাম নিয়ে সরব ছিলেন ফুটবলপ্রেমীরা। আমেরিকার টিকিট পুনর্বিক্রয় আইনসিদ্ধ হওয়ায়, ম্যাচপিছু টিকিটের বাজারমূল্য আরও চড়ে যায়! টিকিটের নির্ধারিত মূল্য থেকে কয়েকগুণ বেশি হাজার-হাজার ডলার বাজার দর চড়ে যাওয়ায়। বহু ফুটবল সমর্থক স্টেডিয়াম বা গ্যালারি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। এপ্রিল মাসে, ‘ফিফা’-র ফাইনালের চারটি টিকিটের দাম পুনর্বিক্রয় বাজারে ২ মিলিয়ন ডলার রাখা নিয়ে ঠাট্টা করতে দেখা গিয়েছিল ‘ফিফা’ সভাপতিকে। যদিও ইনফ্যা্ন্তিনো পরিস্কার বলে দেন যে, টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘উদার’ আইনের কড়ায়গন্ডায় ফয়দা তুলতে ‘ফিফা’ ‘বাধ্য’! টিকিটের চড়া দাম নিয়ে ‘ফিফা’ র বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করে একটি ফ্যান-গোষ্ঠী। টিকিট বিক্রিকারী এক সাইটের দেওয়া হিসেব অনুযায়ী, ম্যাচ পিছু গড় টিকিটের দাম ছিল ছ’শো ডলার।
কয়েকদিন আগে প্রকাশিত হয় যে, ‘ফিফা’ নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ১৯ জুলাই ফাইনালের জন্য ৭,৩৮০ ডলারের ক্যাটাগরি-দুই বিভাগের ১২০০ টি টিকিট রেখে দিয়েছে পুনর্বিক্রয়ের জন্যয়। টিকিটের দাম-সহ দর্শকদের জন্য অতিপ্রয়োজনীয় স্টেডিয়ামে যাতায়াতের যানবাহন আর জলের বোতলের চড়া মূল্যও ‘ফিফা’ ও আয়োজকদের লাগামহীন অর্থলিপ্সার প্রমাণ। নিউইয়র্ক ও নিউজার্সির দুই আদালতে টিকিটের আকাশছোঁয়া দাম ও গ্যালারিতে টিকিট অনুসারে ঠিক জায়গায় বসতে পারা সংক্রান্ত বিষয় এক তদন্তের অংশ হিসেবে তলব করা হয়েছে ‘ফিফা’কে। এই চড়া মূল্যের জন্য গ্যালারি থেকে বিচ্ছিন্ন হন আম শ্রমিক-কর্মচারী সমর্থকরা।
স্টেডিয়ামের তাপমাত্রা নির্বিশেষে, সব ম্যাচের দুই অর্ধেরই মাঝখানে তিন মিনিটের জলপান-বিরতি নিয়েও তৈরি হয়েছে বিতর্ক। এর মধ্যেমও ‘ফিফা’ র অর্থলোলুপতার গন্ধ পেয়েছেন বহু ফুটবলার-কোচ থেকে বিশেষজ্ঞ-সমর্থকরা। ‘নিউইয়র্ক, মিয়ামি বা ক্যাালিফর্নিয়ায় বা মেক্সিকো সিটির মতো যেখানে তাপমাত্রা বেশি, সেখানে এই বিরতি যথাযথ, কিন্তু আটলান্টা, হিউস্টন, ডালাস, ভ্যানকুভার ইত্যাদি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত স্টেডিয়ামে এই বিরতি স্রেফ হাস্যকর’, মনে করেন অভিজ্ঞ আবহাওয়াবিদ এভার্টন ফক্স। তবে আমেরিকা বা ইউরোপের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে অবশ্যই তা একটি বিজ্ঞাপন বিরতি নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। এই টিভি সম্প্রচার স্বত্ব থেকেই ‘ফিফা’ কয়েক বিলিয়ন ডলার আয় করে থাকে!
এই অর্থলোলুপতা আর ক্ষমতালিপ্সাই ইনফ্যান্তিনোকে বারবার বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এনে ফেলে, ‘ফিফা’-র নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে! ২০১৮-তে তাঁকে দৃষ্টকটূভাবে ভ্লাদিমির পুতিনের স্তাবকতা করতে দেখা গিয়েছিল, ‘সারা বিশ্ব রাশিয়ার প্রেমে পড়েছে’ মন্তব্যের মাধ্যবমে। ’২২-এ কাতারের স্বৈরশাসকদের ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি, বহু পরিযায়ী শ্রমিকের শোষণ ও মৃত্যুর ও প্রতিবাদীদের বিনা বিচারে জেলে আটক থাকার খবর আলোড়ন ফেলা সত্ত্বেও। আর ’২৬-এ তিনি যা করে ফেললেন, তাতে চক্ষুলজ্জাটুকুও হারিয়ে ফেলেছেন বলে মনে করছে ফুটবল বিশ্ব।
নকআউটের প্রথম পর্বে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার সঙ্গে ম্যাচে মার্কিন দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। ফোলারিন বেলোগানকে সরাসরি লালকার্ড দেখান ব্রাজিলীয় রেফারি রাফায়েল ক্লাউস। ট্রাম্প বিষয়টি জানতে পেরেই সরাসরি কামান দাগলেন ৪৬-বছর বয়সি ব্রাজিলীয় রেফারির ওপর। সিদ্ধান্ত ভুল তো বললেনই, তার সঙ্গে ‘ফিফা’-র কাছে আবেদন করলেন এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে দেখার। সঙ্গে জুড়ে দিলেন তার সহজাত মন্তব্য ‘এই ব্রাজিলীয় রেফারি কিছুটা সন্দেহজনক, ওর অতীত তাই বলে!’ আর মার্কিন প্রেসিডেন্টের মন্তব্যেের পর ‘ফিফা’-র শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটি বিষয়টির ‘পর্যালোচনা’ করে বেলোগানের এক ম্যাচ সাসপেনশন তুলে তাকে প্রিকোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে খেলার অনুমতি দিয়ে দিল, সমগ্র ফুটবল মহলকে বিস্ময় হতবাক করে! ভাবুন তো, কলকাতা লিগেও কি কোনও খেলোয়াড় লালকার্ড দেখে পরের ম্যাচে খেলার ছাড়পত্র পেয়েছে কোনওদিন কোনও প্রভাবশালীর হস্তক্ষেপে?
‘আইএফএ’ বা সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন যতই সমালোচিত হোক-না-কেন, তারা এটা অন্তত করেনি কখনও, যা বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতায় অম্লান বদনে করে ফেলল ‘ফিফা’! এরপর ‘ফিফা’ ও ইনফ্যান্তিনো আলাদা বিবৃতি দিয়ে জানান, এই সিদ্ধান্ত ঘটনার পর্যালোচনা করে সম্পূর্ণ শৃঙ্খলা কমিটির নেওয়া। এর সঙ্গে মাঠে রেফারির সিদ্ধান্ত বদলের কোনও সম্পর্ক নেই। তবে ইনফ্যান্তিনো স্বীকার করেন যে, ট্রাম্প তাকে অনুরোধ করেছিলেন যে, বেলোগানের সাসপেনশনের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে দেখার জন্য । বেলোগানকে খেলতে দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-পত্র জমা দিল বেলজিয়াম, ‘ফিফা’ কে তুলোধনা করল উয়েফা। প্রশ্ন উঠল, বিশ্বকাপের মাঝপথে কী করে ‘ফিফা’ লালকার্ড-সাসপেনশনের আইন বদলাতে পারে? এরপর যদি কোনও রেফারি কোনও ফুটবলারকে বিতর্কিত লালকার্ড দেখান, তাহলে আবেদন করলে ‘ফিফা’ কি সেই সংশ্লিষ্ট ফুটবলারটিকে পরের ম্যা্চে খেলার অনুমতি দেবে? এসব ন্যা য্যফ প্রশ্নের কোনও উত্তর আজও পাওয়া যায়নি! উরুগুয়ের ইতিহাসবিদ ও ফুটবল লেখক এদুয়ার্দো গ্যালিয়ানো তাঁর ‘সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো’ বইতে লিখেছেন, “‘ফিফা’ র একটি নিজস্ব বিচার-ব্যবস্থা আছে, যা অনেকটা ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যারন্ডের’ হার্টস অফ কুইনের মতো। এই অন্যায় ব্যবস্থায় দোষীকে আগেই শাস্তি দেওয়া হয়, বিচার পরে হয়, যাতে পুরো ব্যাপারটাই ধামাচাপা দেওয়ার যথেষ্ট সময় পাওয়া যায়!’ এই বিশ্বকাপে ইরান, কঙ্গো বা বেলোগানের ই্যসুতে বেলজিয়ামের অবস্থা সেই বিচার-ব্যবস্থারই জ্বলন্ত উদাহরণ!
‘ফিফা’-র এই সিদ্ধান্তে বিভাজিত হয়ে গেল ফুটবলবিশ্ব। সোমালিয়ার রেফারি ওমর আর্তানকে ইউরো কাপ ’২৮-এ ম্যাচ পরিচালনা করতে দেখা যাবে, আর প্রতিযোগিতায় টিকিটের দামও বেঁধে দেওয়া হবে, ইতোমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে উয়েফা। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে ইউক্রেন আক্রমণের দায় বহিষ্কৃত রাশিয়া দলকেও ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে উয়েফা। বেলোগান ঘটনার পরই, প্রশ্ন উঠে যায় যে, বর্তমান আসরটি ‘ফিফা’ বিশ্বকাপ না ‘ট্রাম্প-বিশ্বকাপ’!
কিন্তু ফুটবল, বা বিশ্বকাপের সেই বিকল্প জগত সৃষ্টির শিল্পকলা থেমে থাকে নি! ৬ জুলাই সিয়াটেলের লুমেন ফিল্ডে বেলোগান-সহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র টিমের বিরুদ্ধে যখন খেলতে নামল বেলজিয়াম, তখন কিছু মার্কিন সমর্থক বাদে গোটা বিশ্ব রোমেলো লুকাকু-কেভিন ডি ব্রুনাদের পাশে। লুকাকুরা হেলায় ৪-১ গোলে মার্কিনদের উড়িয়ে দিয়ে বিশ্বকাপে শেষ আটে পৌঁছে গেলেন। আসলে এই বিকল্প জগতে, মাঠের ক্রীড়াশিল্পে বিশ্বের ‘সুপারপাওয়ার’-দের ক্ষমতা খুবই সীমিত। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শত ঔদ্ধত্য আর হুলিগানি হুমকি সত্ত্বেও মার্কিনরা আন্তর্জাতিক ফুটবলে এখনও চুনোপুঁটি। বড় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ করে চিন এখনও বিশ্বকাপ থেকে দূরে; আর রাশিয়ার কিছুটা বলার মতো অতীত সাফল্য থাকলেও, এখন বর্তমানে তারা বিশ্বকাপের বাইরে। কিন্তু যোগ্যতা অর্জনকারী গ্রুপে প্রথম হয়ে বিশ্বকাপে অভিষেক ঘটা কেপ ভার্দে, বা প্লে-অফ খেলে মূল পর্বে আসা কঙ্গো ডানা মেলে কিছুটা উড়তে পেরে দিয়ে গেল মুক্তির স্বাদ! মিশর, সেনেগাল বা যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানের লড়াই সবুজ মাঠে অনেক বেশি শৈল্পিক আঁচড় কেটে গিয়েছে। লাতিন আমেরিকা থেকে উঠে আসা লিওনেল মেসি বা কৃষ্ণাঙ্গ লেমিন ইয়ামাল, কিলিয়ান এমবাপেদের পায়ের তুলির টানে পেন্ডুলামের মতো দোলে সমগ্র ফুটবল বিশ্ব! বিস্ফোরণ ঘটিয়ে যান মরক্কোর ইসমাইল সাইবারি, নরওয়ের ভাইকিং ফুটবলার আর্লিং হালান্ড বা কেপ ভার্দের সিভনি লোপিশ কাব্রাল। যতই ফ্রান্সের কাছে হেরে, কৃষ্ণাঙ্গ হওয়ার জন্য এমবাপের পরিচিতি সত্তাকে প্রশ্ন করে বৈষম্যমূলক কটাক্ষ করেন প্যারাগুয়ের মহিলা সেনেটর সেলেস্তে অ্যামারিলা! এমবাপে তা স্বকীয় স্টাইলেই ড্রিবল করে এগিয়ে যান বহু দূরে। ‘প্যারাগুয়ে টিমের লড়াই ও আচরণের সঙ্গে এই মন্তব্য বেমানান। নিন্দনীয়, কারণ তা টিমকেই ছোট করে’! বিশ্বকাপের জগত জানাচ্ছে, এমবাপে-৮, বৈষম্যবাদীরা-০!
ভার: ‘চুলচেরা’ বিতর্ক
ভার নিয়ে বিতর্ক শুধু গ্রুপের ইরান-মিশর ম্যাচেই শেষ হল না। নকআউট পর্ব যত এগলো, ততই ম্যা চের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ‘ভার’-এর ভূমিকা প্রকট হল। আর তা খালি চোখের রেফারিংয়ের সমতুল্য্ বিতর্কের জন্ম দিল। সঙ্গে যুক্ত হল মাইক্রোচিপ লাগানো ‘ফিফা’ র নতুন স্মার্ট বলের নির্ণায়ক ভূমিকাও।
নকআউট প্রথম পর্বে পর্তুগাল-ক্রোয়েশিয়া ম্যামচের অন্তিম মুহূর্ত। গোনসালো র্যালমসের গোলে ইঞ্জুরি সময় ২-১ গোলে এগিয়ে গিয়েছে পর্তুগাল। গোল শোধের শেষ মরিয়া চেষ্টায় ঝাঁপালেন মদ্রিচ-পেরিসিচরা। পেরিসিচের ভাসানো সেন্টার পর্তুগিজ বক্সে পড়ল। হেড করতে লাফালেন স্ট্রাইকার ইগর ম্যা।তানভিচ। কিন্তু মিস করলেন, বল পর্তুগিজ ডিফেন্ডার রেনাটো ভিইগার মাথার পেছন দিকে লেগে ইওস্কো গাভারদিওলের কাছে গেল। গাভারদিওল পত্রপাঠ তা জালে পাঠিয়ে দিলেন। মিশরের বিরুদ্ধে ইরানের প্লেয়ারদের মতোই উদ্যাপনে মাতলেন ক্রোটরা। কিন্তু পর্তুগিজদের অফসাইডের আবেদনে সাড়া দিয়ে ‘ভার’-এর সহায়তা নিতে ছুটলেন রেফারি এস্পেন এস্কাস। এবং দীর্ঘক্ষণ পর্যবেক্ষণের পর নরওয়েজিয়ান রেফারি এসে নাটকীয়ভাবে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন— ইভান প্যানসিলিচের অফসাইডের জন্য গোল বাতিল। এবার দেখা গেল, পেরিসিচের সেন্টারের সময়ে প্যাসিলিচ অনসাইড ছিলেন। তাহলে অফসাইড হল কী করে? এখানেই বিস্ময়। ‘ফিফা’ ব্যবহৃত অ্যাডিডাসের স্মার্ট বলের মাইক্রোচিপ নাকি জানিয়েছে, যখন হেড করতে লাফিয়েছিলেন ম্যািতনভিচ, বল তার চুল স্পর্শ করে বেরিয়ে যায়, যদিও গতিপথ বদলায় নি। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই অফসাইডে দেখা যায় প্যা সিলিচকে, যিনি গোল না করলেও এই মুভের মধ্যেি ছিলেন! খালি চোখে রিপ্লে দেখে এই ‘চুলচেরা’ সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল অসম্ভব। স্মার্ট বলের সৌজন্যে এক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত দেখা গেল মাঠে; যার জেরে ছিটকে গেলেন মদ্রিচরা! ক্রোয়েশিয়ার ক্ষোভ স্বাভাবিক।
এরপর মিশর-আর্জেন্টিনা শেষ ষোলর ম্যাচ। দ্বিতীয়ার্ধের প্রায় মাঝামাঝি। ফুটবল বিশ্বকে বিস্মিত করে তখনও এক গোলে এগিয়ে মোহামেদ সালাহরা। কাউন্টার অ্যাটাকে ছিটকে বেরিয়ে গোল করলেন মিশরের মোস্তাফা জিকো। তাহলে কি ঘটতে চলেছে আর একটি অঘটন? কিন্তু রিপ্লে খুঁটিয়ে দেখে এসে গোল বাতিল করলেন রেফারি, ফাউলের জন্য। আর্জেন্টিনা গোলের সম্পূর্ণ অপর প্রান্তে, মুভ শুরুর সময়ে মিশরের মারওয়ান আত্তিয়া ফাউল করেছিলেন লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে! সম্পূর্ণ অপর প্রান্তে এই ফাউল হওয়ায়, মিশর প্রবল আপত্তি জানাল!


এখানেই শেষ নয়। ইঞ্জুরি সময়ে খেলা তখন ২-২। আর্জেন্টিনা বক্সে ঢোকার চেষ্টা করছেন মিশরের অধিনায়ক সালাহ। বাধা দিয়ে বল কেড়ে নিলেন হুলিয়ান আলভারেজ। শুরু করলেন প্রতিআক্রমণ। সেই বল থেকেই লউতারো মার্তিনেজের সেন্টারে হেড করে মিশরের জালে বল পাঠিয়ে আর্জেন্টিনাকে জিতিয়ে দিলেন এনজো ফার্নান্দেজ! মিশরের দাবি সালাহকে ফাউল করা হয়েছিল, যার জন্য তাদের পেনাল্টি প্রাপ্য ছিল! যদিও রিপ্লে দেখে মনে হয়েছে, এই দু’টি ক্ষেত্রে রেফারির সিদ্ধান্তে ভুল ছিল না, তবে অন্য একটি ক্ষেত্রে সালাহকে নিশ্চিত ফাউল না দিয়ে উলটো দিকে ফাউল দেওয়া হয়েছিল। নাটকীয় পট-পরিবর্তনের ম্যাচের পর রেফারিং নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগড়ে দেন মিশরের কোচ, অধিনায়ক, ফুটবলাররা। মিশর অভিযোগ জমা দেওয়ার পর ‘ফিফা’ এই ম্যাচের ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লাতেক্সেকে বিশ্বকাপের বাকি ম্যাচ থেকে সরিয়ে দেয়। আবার গ্রুপ-পর্বের ইরান ম্যাচে এই ভারের জন্যই লাভবান হয়েছিল মিশর।
কোচ হোসাম হাসান দাবি করেন, ‘টুর্নামেন্টের বিপণনের জন্য মেসি আর আর্জেন্টিনাকে রেখে দেওয়া প্রয়োজন। তাই রেফারি পুরো ম্যাচে পক্ষপাত মূলক সিদ্ধান্ত নিয়ে গেলেন!’ একই যুক্তি পর্তুগাল ও রোনাল্ডোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারত, যদিও মদ্রিচরা সরাসরি তা বলেননি। রেফারিং যাতে নিখুঁত হয়, রেফারির সিদ্ধান্তের জন্যর কোনও দলকে যাতে ভুগতে না হয়, সেই উদ্দেশ্যে চালু করা হয়েছিল ‘ভিডিও অ্যাসিসটেন্ট রেফারি’ বা ‘ভার’ ব্যহবস্থা। কিন্তু, উদ্দেশ্য প্রণোদিত রেফারিংয়ের মতো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ‘ভার’-এর প্রয়োগ যদি হতে থাকে, তাহলে মাঠের রেফারিং বিতর্ক সেই একই বৃত্তে ঘুরপাক খাবে। ইরান-ক্রোয়েশিয়ার বিদায় কি সেই বার্তাই দিয়ে গেল?


কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড-নরওয়ে ম্যাচেও বিতর্ক হল রেফারিং নিয়ে। নরওয়ের দাবি, জুড বেলিংহ্যাম গোল শোধ করার আগে, বল ওপরের স্পাই-ক্যামেরায় লেগে সামান্য দিক পরিবর্তন করে। যদিও এক্ষেত্রে স্মার্ট বলের মাইক্রোচিপে কোনও স্পর্শ ধরা পড়েছিল কি না, তা যাচাই করে দেখেননি রেফারি। দেখলে কি বেলিংহ্যােমের গোল বাতিল হতে পারত? আসল প্রশ্ন, স্পর্শের জন্য বলের গতিপথ বদলেছিল কি না।
দ্বিতীয়ার্ধে নরওয়ে কর্নার থেকে একটি গোল করে এগিয়ে যায়, কিন্তু রেফারি ভারের সহায়তা নিয়ে এসে গোলটি বাতিল করলেন। রিপ্লেতে দেখা যায়, বক্সের মধ্যে হালান্ড ইংরেজ মিডফিল্ডার ইলিয়ট অ্যান্ডারসনকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিচ্ছেন। তবে এটাও পরিস্কার যে, হালান্ড ফাউলটা করেছিলেন কর্নার কিক নেওয়ার আগেই, ফুটবল পরিভাষায় যাকে বলে ‘ডেড বল’! তাই নরওয়ে দাবি করে, এটি ফাউল নয়, ন্যায্য গোল! যদিও ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে!
দূষিত কাপ
ফাইনালের আগে নিউজার্সি শহরকে চাদরের মতো মুড়ে রেখেছে কানাডার দাবানলের দূষিত ধোঁয়াশা। এর মধ্যে খোলা মাঠে প্র্যাকটিস করতে গিয়ে বিপদে পড়েছে স্প্যানিশ দল। বিশ্বকাপকে ৪৮টি দলে বর্ধিত করে ‘ফিফা’ র অর্থ-ভাণ্ডার যতই ফুলে-ফেঁপে উঠুক, ইনফ্যান্তিনো যতই অন্তর্ভুক্তির অজুহাত দিন-না-কেন, বিজ্ঞানীদের মতে এই বিশ্বকাপ সর্বাধিক কার্বন নির্গমনকারী ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় পর্যবসিত হয়েছে। আমেরিকা-কানাডা-মেক্সিকো— একটি পুরো মহাদেশ জুড়ে, ষোলটি শহরে খেলা হওয়া পরিবেশ দূষণকেও রেকর্ড মাত্রায় নিয়ে গিয়েছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা। টিমগুলো ও তাদের সমর্থকদের হাজার-হাজার মাইল বিমান যাত্রা এর মূল কারণ। এই বিশ্বকাপে নয় মিলিয়ন টন কার্বন নির্গমন হয়েছে, যার ৮৫% বিমান যাত্রার ফলে হয়েছে বলে মনে করছেন আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা। যার প্রভাবে বর্তমান ফুটবল আবহকে তো দূষিত করলছেই, ভবিষ্যতেও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সংশ্লিষ্ট শহরগুলোর নাগরিকরা। এর মধ্যে উন্মুক্ত মাঠ ও স্টেডিয়াম ব্যবহার করে ‘ফিফা’ সমস্যাকে আরও জটিল করেছে। এর পাশাপাশি ‘ফিফা’ আরও সমালোচনার মুখে পড়েছে, খনিজ তেল ও গ্যা স উৎপাদনকারী সৌদি বহুজাতিক সংস্থা আরামকো ও কাতার এয়ারওয়েজের মতো বিশ্বের সর্বোচ্চ গ্রিনহাউস গ্যারস নির্গমনকারী ও মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী সংস্থাকে নিজের দীর্ঘ স্পন্সর তালিকায় যোগ করে।

অর্থনৈতিক ও সামরিক আগ্রাসন, বৈষম্য, বিদ্বেষ, দূষণের আবহেও কিন্তু বিকল্প জগত সৃষ্টি হয়ে চলেছে বিশ্বকাপে। ফুটবল ও বিশ্বকাপের এই অবিশ্বাস্য সহনশীলতার সাক্ষী ইতিহাস; যা ফ্যাসিজম, স্বৈর শাসকের ঔদ্ধত্য, দুর্নীতি ও কেলেঙ্কারি, সামরিক শাসন, পরিযায়ী শ্রমিকদের শোষণ ও লুঠ— সব আক্রমণ সামলেও ফুটবল, মাঠে ঘটিয়ে যেতে পারে তার শৈল্পিক মাধুর্যের বিকাশ। বিশ্ব মানচিত্রে নিজেদের অবস্থান চিহ্নিত করে হাত নেড়ে কেপ ভার্দে অধিনায়ক-গোলকিপার ভোজিনহার বার্তা বা সমস্ত হেনস্থা বুকে নিয়েও ইরানের অপরাজিত থাকা এই বিকল্প জগতের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে। বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েও এমবোলাডিঙ্গা দিয়ে যান মুক্তির আশ্বাস। মরুঝড় তুলে মরক্কো বা মিশর আগাম বার্তা দেয় ভবিষ্যত ফুটবল-বিশ্বে আফ্রিকার প্রাধান্যের। ইয়ামাল-মেসিদের শৈল্পিক কারুকার্যের প্রদর্শনী হবে সেই বিকল্প পৃথিবী অঙ্কনপ্রণালীর শেষ তুলির টানে…



