প্রিয় লামিন,
আমাদের দেখা হওয়া বড় ক্ষণস্থায়ী। আমাদের না-দেখা মুহূর্তরা দীর্ঘ। ইউনিসেফের ইভেন্ট, তোমার শৈশব, আমার লম্বা চুল, নাম্বার নাইন্টিন, সেই বাথটব— এত বছর পর কেমন ফিরে এল।
সময়ের চেয়ে সুন্দর আর কিছু নেই। সময়ের চেয়ে নিষ্ঠুরও কিছু নেই। তোমার এই উনিশ বছর, কৈশোরোত্তর উদ্দামে টগবগে ফুটতে থাকা রক্ত-সাফল্যের অসহ্য খিদে— এসব বড় মূল্যবান জিনিস। যত্নে রেখো। তোমার ঝুলিতে সাফল্য এসেছে অনেক। এত কম সময়ে, এই সাফল্য তোমাকে জৌলুস দিয়েছে, দিয়েছে পরিচিতি-খ্যাতি। তোমার নামের পাশে মানুষ বসিয়েছে ‘বিস্ময় প্রতিভা’ তকমা।
আরও পড়ুন: বোনের উদ্দেশে লেখা চিঠিতে স্বপ্নের দলিল রেখেছিলেন আইভরি কোস্টের ফুটবলার! লিখছেন রোদ্দুর মিত্র…

আমার স্মৃতি আজকাল ফিকে হয়ে আসে। কোনও এক এস্প্যানিওল ম্যাচে, লা-লিগা ডেকো— তাঁর হাতে হাত মিলিয়ে নেমে পড়া লাল-নীল জার্সি— আমাকে আগলে নিল এক লম্বা চুলের ব্রাজিলিয়ান। তখন সে সুপারস্টার। আমার কাছে সে যেন বিস্ময়! জানো, আমাকেও লোকে বলত, ‘বিস্ময় প্রতিভা’; শুধু আমাকে নয়, আরও কত এমন কিশোর এসেছিল। আমারই বন্ধু। আমি গোল করলে সেই লম্বা চুলের লোকটা আমাকে কাঁধে তুলে নিত। আমি হাত নাড়তাম। আমাদের বন্ধুত্ব— আবার আমার গায়ে আলবিসেলেস্তে জার্সি উঠলে সেই লোকটাই হয়ে যেত শত্রু। যেমন তোমার মুখোমুখি আমি।
এই দিনটা বড় অদ্ভুত লামিন। তোমার সাফল্যে আমি হাততালি দিয়েছি— ইউরো, ওই ঝলমল করে ওঠা তোমার বাঁ-পা, ফ্রান্স-ইংল্যান্ডকে উড়িয়ে ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া। আমার প্রাণপ্রিয় বার্সেলোনায় ১০ নম্বর জার্সি তুমি কাঁধে তুলে নিয়েছ তোমারই যোগ্যতায়। আমি দেখি, তোমার খেলা, তোমার মায়াবী সেই ট্রিভেলা পাস— হ্যান্সি ফ্লিকের বার্সেলোনায় তোমার একটু-একটু করে নায়ক হয়ে ওঠা আমাকে তৃপ্ত করে। আমার মনে হয়, বার্সেলোনা ঠিক মানুষদের হাতে আছে।

আমার বন্ধুরা চলে গেছে কবে। আমিও কাতালান পাড়া ছেড়েছি অনেকদিন। এই ক্লাব আমাকে সবকিছু দিয়েছে। একটা গ্রোথ হরমোন ইঞ্জেকশন দিয়ে শুরু, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ হওয়া দিয়ে শেষ। মাঝখানে ইতিহাস। সে ইতিহাস তোমাদের জন্য রেখে গেছি আমি, লামিন। যাতে বার্সেলোনাকে কখনও দীন না হতে হয়। যাতে বার্সেলোনাকে কেউ আঘাত না করতে পারে। আমি আমার সামর্থ্যে এই ক্লাবের গায়ে দিয়েছি বর্ম, সাফল্যের বর্ম। তোমার শ্রেষ্ঠ হয়ে ওঠা অবধি সে-বর্ম তোমায় আগলে রাখবে। আমি এই ক্লাবের জার্সি গায়ে একটা রোম ২০০৯ দেখেছি, ভ্যান ডার সারের পাশ দিয়ে সেই হেডে বল জালে জড়ানোর মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল— এ-ই তো জীবন— এ-ই সাফল্য! আবার আমি দেখেছি একটা বায়ার্ন ম্যাচ যেখানে আমার বুকের ভেতর দিয়ে আট গোলের ক্ষতদাগ পৌঁছেছে ক্লাবের ক্রেস্ট-এ। আমি দেখেছি ২০১১ ওয়েম্বলি, আমি দেখেছি ইংল্যান্ডের শ্রেষ্ঠ দলটাকে ছারখার করে দেওয়ার সেই রাত, আবার আমিই দেখেছি একটা অ্যানফিল্ড— একটা ০-৪ হার— ভেঙেচুরে যাওয়া স্বপ্নগোলক।
লামিন, সাফল্য আমাদের দিকভ্রান্ত করে দেয়। আমিও বুঝিনি ওই কিশোরবেলায়। আর ব্যর্থতা আমাদের টেনে আনে সাফল্যের পথে। সে টেনে আনায় কষ্ট আছে, যন্ত্রণা আছে, গ্লানি নেই। আমাকে লোকে বলে— ‘আই হ্যাভ কমপ্লিটেড ফুটবল’— আমি নাকি দুনিয়ার সব জিতে গেছি। আমার চোখে ভেসে ওঠে মারাকানার সেই রাতটা, যেদিন আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়ে আমার হাতের নাগাল থেকে ওই কাপটা নিয়ে চলে গিয়েছিল প্রতিপক্ষ। আমার মনে পড়ে, একটার পর একটা কোপা আমেরিকা। আমার ফুরিয়ে যাওয়া কান্না। আমার নামে আর্জেন্টিনার রাস্তায় বিদ্রোহী স্লোগান, পোস্টার। আমার ফিরে আসার কোনও সম্ভাবনা না-থাকা রাতে কেবল আমার পরিবারের কাছে মুখ গুঁজে শুধু টিকে থাকা, নিজেকে নিজের হাতে ঝাঁকিয়ে বাঁচিয়ে তোলা। আমি জীবনে যত ব্যর্থতা দেখেছি, তার সামনে সাফল্য নেহাতই কম।
এই দুই-ই আমাকে বিশ্বাস দিয়েছে। এগিয়ে যাওয়ার বিশ্বাস।

তোমার ভয় করছে লামিন? জীবনের প্রথম বিশ্বকাপ। জীবনের প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনাল? আমারও ভয় করত। আমি আমার দলকে জার্মান ট্যাঙ্কের সামনে চার গোলে গুঁড়িয়ে যেতে দেখেছি। আমি আমার দলকে ওই একটা ১১৩ মিনিটে মারিও গোটজের গোলে পরাস্ত হতে দেখেছি, আমি ফ্রান্সের গতির সামনে আমার দলকে হামাগুড়ি দিয়ে ফেলতেও দেখেছি, আবার আমি লুসেইলের রাতটাও দেখেছি, মারাকানার সেই কোপা জয়ের ভোরও দেখেছি। আমার ভয় কেটে গেছে। তোমারও কেটে যাবে একদিন। তুমি আজ সাফল্য দেখেছ। সময়ের নিয়ম মেনে দেখবে চূড়ান্ত ব্যর্থতা, এ-ই দুনিয়ার নিয়ম।
আজ আমরা মুখোমুখি। আমি জানি, আমার ফেলে আসা পতাকা তোমার কাঁধে। বার্সেলোনার ওই অক্ষয় দশ নম্বর জার্সি আমি তোমায় দিয়েছি। আর দিয়েছি ইতিহাস। কিন্তু লামিন, আমি একটা জিনিস তোমায় আজও দিইনি।

আজ আমি জীবনের সর্বশক্তি দিয়ে জিততে চাইব ম্যাচটা। সবকিছু জেতার পরেও আমার ভেতর রাক্ষুসে খিদে, এই খিদেই আমার জান, আমার প্রাণ, আমার আত্মা, আমার উনচল্লিশ বছরের শরীরকে রোজ মাঠে নিংড়ে নিচ্ছে এই খিদে। আমার সাফল্য, ব্যর্থতা, বিষাদ-হরষ— কোনও কিচ্ছুতে এই খিদেটা মরে যায়নি। তাই আমি আজও সর্বগ্রাসী খিদে নিয়ে মাঠে নামছি, তোমার প্রতিপক্ষ হয়ে হয়তো জীবনের শেষ ম্যাচে।
এই খিদেই একমাত্র, যা তোমায় অনেক অনেকগুলো বছর বাঁচিয়ে রাখবে লামিন।
আজ, এই ফাইনালের পর, আমি তোমায় দিয়ে যাব আমার এই শেষ শক্তিটুকু। আমার খিদে…
ইতি,
তোমাদের লিও



