সংবাদ মূলত কাব্য : পর্ব ৩৬

অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন

কলকাতায় ফেরার পর ‘পরিবর্তন’ পত্রিকায় প্রথমে ‘মরিচঝাঁপির উদ্বাস্তুরা ফিরে গিয়ে কেমন আছেন’ লেখাটি বের হল। আমার বাই নেমে নয়, অর্থাৎ নামে নয়। পরিবর্তন নিউজ ব‍্যুরোর টিম ওয়ার্কে লেখা হিসেবে বের হল। ১৯৭৮-এ ক্ষমতায় এসে বামফ্রন্ট সরকার তখনও, ১৯৮১ সালেও বলা চলে নবীন, মরিচঝাঁপির ঘটনাই বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে প্রথম বড় রকমের অভিযোগ, সে-কারণেই মনে হয় সম্পাদক অশোক চৌধুরী, সংযুক্ত সম্পাদক ধীরেন দেবনাথ আমার একার কাঁধে লেখাটি না-চাপিয়ে সমবেতভাবে লেখাটির দায়িত্ব নিতে চেয়েছিলেন। তবে কিনা সাংবাদিকতা, হয়তো সারা ভারতে তখনও অনেকটাই স্বাধীন এবং মুক্ত ছিল। হরবখত সরকারের সমালোচনা হত। ১৯৭৫-’৭৬ সালে জরুরি অবস্থার সময় ভারতীয় সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকতা তো আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছিল। ১৯৭৮ সালে যখন বামফ্রন্ট সরকারের যখন একবছর হল, তখন ‘পরিবর্তন’ পত্রিকার একটি সংখ‍্যার কভার স্টোরি, মানে প্রচ্ছদকাহিনি হয়েছিল, ‘বামফ্রন্ট কতটা মার্কসবাদী?’ কে লিখেছিলেন, মনে নেই। বিশ্বজিৎ সিংহ তখন ছিল ‘লোকসেবক’ পত্রিকার রিপোর্টার (পরে ‘আজকাল’ পত্রিকায়ও ছিল আমার সহকর্মী), পরিবর্তনেও নিয়মিত লিখত এবং পরিবর্তনে নিয়মিতভাবে দিত রাইটার্সের খবর। বিশ্বজিৎ এসে খবর দিল, রাইটার্সে পরিবর্তনের মরিচঝাঁপি লেখাটি নিয়ে খুব আলোচনা হচ্ছে।

এরপর ধারাবাহিকভাবে পরিবর্তনে চম্বলের লেখা বেরতে শুরু করল। আমার নামেই। চম্বলের মূল লেখাটি পরপর তিনটি কিস্তিতে বের হল, এরপর একটি সংখ‍্যায় বের হল, চম্বলের নারী ডাকাতদের নিয়ে আমার আর-একটি লেখা। ১৯৭৮-এর সেপ্টেম্বরে প্রথম বের হয়ে একবছরেই পরিবর্তন পত্রিকাটির প্রচার-সংখ‍্যা এক লাখ ছুঁইছুঁই হয়ে গিয়েছিল। চম্বল নিয়ে লেখাগুলি যখন বেরতে শুরু করে, তখন পরিবর্তনের প্রচার সংখ‍্যা দেড় লাখ হয়েছিল, এমনই শুনতাম।

এখন, এরকম প্রচার-সংখ‍্যা একটি নিউজ ম‍্যাগাজিনের, এটা অবিশ্বাস‍্য শোনালেও, সেই সময়টি ছিল অন‍্যরকম। তখন একটা কথা শোনা যেত, নিউজ ম‍্যাগাজিন বুম। সর্বভারতীয় ইংরেজি নিউজ ম‍্যাগাজিন ইন্ডিয়া টুডে, উইক, অনলুকার, ট‍্যাবলয়েড ব্লিৎজ এসব পত্রিকার বিপুল প্রচার ছিল। বাংলায় পরিবর্তনের আগে একেবারে বিলেতের টাইম ম‍্যাগজিনের ধাচে প্রথম যে পত্রিকাটি বের হয়, তার নাম ‘ধ্বনি’। হাতে নিয়ে চমকে উঠতে হয়। একেবারে দৃশ‍্যত ইংরেজি ‘টাইম’ ম‍্যাগাজিনের বাংলা সংস্করণ! তবে লেখাপত্রের গুণগত মান নিয়ে বলছি না।

ঠিক কী ঘটেছিল মরিচঝাঁপিতে? পড়ুন ‘সংবাদ মূলত কাব্য’ পর্ব ৩৫…

মনে হয়, সেটি কোনও প্রতিষ্ঠান থেকে নয়, অল্প কয়েকজনের উদ‍্যোগ ছিল, কিছুকাল পরেই বন্ধ হয়ে যায়। বাংলায় ট‍্যাবলয়েড পত্রিকা তখন বের হত ‘দর্পণ’, ‘বাংলাদেশ’। যথেষ্ট প্রচার ছিল এই পত্রিকাগুলির। ইংরেজিতে সমর সেনের সম্পাদনায় বের হত ‘ফ্রন্টিয়ার’। পরিবর্তনের পর তার ধাঁচেই বের হয়েছিল কয়েকটি বাংলা নিউজ ম‍্যাগাজিন।

‘পরিবর্তন’ বের হত ইত‍্যাদি প্রকাশনী থেকে, তার মালিকানা ছিল অশোক চৌধুরীর। ইত‍্যাদি প্রকাশনী থেকে আরও কয়েকটি পত্রিকা বের হত। পত্রিকাগুলির ভেতর খুবই জনপ্রিয় ছিল ‘খেলার আসর’ নামে খেলাধুলোর পত্রিকাটি। তার সম্পাদনা করতেন অতুল মুখার্জি। চিত্তদা, চিত্ত বিশ্বাস, যিনি ‘চিরঞ্জীব’ ছদ্মনামে আনন্দবাজার পত্রিকায় ছিলেন, তিনি খেলার আসরের দেখভাল করতেন। খেলার আসরে আমি অনেক ছড়া লিখেছি,এসব ছড়ার কয়েকটি আছে আমার ‘খেলাচ্ছড়া’ বইটিতে। ইত‍্যাদি প্রকাশনী থেকে সাহিত‍্যের মাসিক পত্র ‘শিলাদিত‍্য’ পরিবর্তনের আগে থেকেই বের হত, সম্পাদনা করতেন নারায়ণ সান‍্যাল। পরে বিমল কর ‘শিলাদিত‍্য’-র সম্পাদনা করেছেন। ইত‍্যাদি প্রকাশনীর ইংরেজি মাসিক পত্রটির নাম ছিল ‘পারস্পেকটিভ’, সম্পাদনা করতেন ভবানী সেনগুপ্ত, চাণক‍্য সেন ছদ্মনামে লেখালিখি করতেন তিনি। চণ্ডীদা, ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’-র চণ্ডী লাহিড়ী কার্টুন আঁকতেন পরিবর্তনে। তাঁর কার্টুনের নিচেই আধপৃষ্টা জুড়ে থাকত অম্লমধুর বিভাগ। তাতে ছড়া ও সমকালীন বিষয়ে থাকত মজাদার খুচরো লেখাপত্র।

চণ্ডী লাহিড়ী

পরিবর্তন-এর সেই সময়কার শারদ সংখ‍্যাগুলিও ছিল অভিনব। জীবনানন্দর অপ্রকাশিত রচনা হিসেব প্রথম উপন‍্যাস ‘জলপাইহাটি’ ছাপা হয়েছিল পরিবর্তনেই। পরিবর্তনে আমার সহকর্মী সুব্রতদা, সুব্রত রাহা জীবনানন্দর কন‍্যা মঞ্জুশ্রী দাশের কাছ থেকে উপন‍্যাসটি নিয়ে এসেছিলেন। আড়িয়াদহে সর্বমঙ্গলা স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন মঞ্জুশ্রী, ১৯৯৫ সালে প্রয়াত হয়েছেন মঞ্জুশ্রী। কৃষ্ণগোপাল মল্লিক তাঁর অধুনা প্রকাশনী থেকে বের করেছিলেন ‘অসীম রায়ের গল্প’। কমবয়সে সেই গল্পগুলি পড়ে মনে তাক লেগে গিয়েছিল। ‘দেশ’ পত্রিকায় তাঁর গল্প ‘অনি’ মুগ্ধ করেছিল। ‘দ্য স্টেটসম‍্যান’ পত্রিকায় চাকরি করতেন অসীম রায়। আমি স্টেটসম‍্যানে গিয়ে তাঁর কাছ থেকে ‘পলাশী আর কত দূর’ নামে একটি উপন‍্যাস নিয়ে এসেছিলাম একবার পরিবর্তন-এর শারদ সংখ‍্যার জন‍্য। সুধীর চক্রবর্তীর লেখকজীবনের সূচনাই হয়েছিল পরিবর্তন-এ লিখে। সুরসিক সুধীরবাবুর ডেইলি প‍্যাসেঞ্জারের ডায়েরির লেখাগুলি মনে পড়ছে। নিবারণ চক্রবর্তী ছদ্মনামেও লিখতেন তিনি। কৃষ্ণনগর কলেজে সুধীরবাবুর ছাত্র ছিলেন পরিবর্তন-এর সংযুক্ত সম্পাদক ধীরেন দেবনাথ। ধীরেনদা সুধীরবাবুকে মাস্টারমশাই বলে ডাকতেন। আমিও সুধীরবাবুকে মাস্টারমশাই বলে ডাকতাম।

‘পরিবর্তন’-এ আমার চম্বল লেখার প্রথম কিস্তি বের হওয়ার তিন-চার দিন পর এক ভদ্রলোক এলেন আমার সঙ্গে দেখা করতে। হাসিখুশি মানুষটির হাতে একটি ব্রিফকেস। করমর্দনের জন‍্য হাত বাড়িয়ে বললেন, আমি জাদুকর প্রদীপ দাস। আমি বুঝলাম, ইনিই চম্বল-বাগি মাধো সিংকে জাদুকর চম্বল সরকার বানিয়ে দিয়েছেন। মাধো সিংয়ের জাদুর গুরু। প্রদীপ দাস সিনিয়র পিসি সরকারের দলে ছিলেন। চা খেতে-খেতে কথা হল আমাদের। প্রদীপ দাস বললেন, দু-একবার মাধোর ম‍্যাজিক দেখতে গোয়ালিয়র, আগ্রার শো-তে গেছেন। (পরে ৯০ দশকের গোড়ায় মাধো সিং কলকাতাতেও ম‍্যাজিক দেখিয়ে গেছেন।) ব্রিফকেস খুলে প্রদীপ দাস বেশ কয়েকটি ছবিও আমাকে দিলেন। পুলিশের গুলিতে নিহত মান সিং, পুতলি বাইয়ের ছবি… জেপি-র সঙ্গে মাধো সিং, মোহর সিংয়ের আত্মসমর্পণের ছবি, এই সব। ছবিগুলি চম্বল লেখার পরের কিস্তিগুলিতে ছাপা হয়েছিল।

চম্বলের লেখাগুলি বের হওয়ার বেশ পরে, মাসখানেকের পর হঠাৎ একদিন দেখা করতে আসে একটি অল্পবয়সি, আমার থেকে বেশ ছোট ছেলে। দেখে বোঝা যায় শ্রমজীবী। আমাকে দেখেই একগাল হেসে ছেলেটি বলে, স‍্যর, আপনি আমার দাদির কথা লিখেছেন। এক দোস্ত আমাকে পড়ে শুনিয়েছে। আমি স‍্যার পুতলিবাইয়ের নাতি।

চিঠি এসেছিল একটা। চন্দননগর থেকে ওই পত্রলেখক কী করে যেন জেনেছিলেন আমি কাছেই শ্রীরামপুরে থাকি। গিয়েছিলাম। বৃদ্ধ পত্রলেখক, তাঁর স্ত্রী জানিয়েছিলেন, মাধো সিংয়ের গুরুদেব সন্ন‍্যাসীর সঙ্গে তাঁদের নিখোঁজ পর্বতারোহী ছেলের মুখের বড় মিল। আমার লেখায় ছিল, আমি আর সৌগত দু’জনেই হুগলি জেলা থেকে এসেছি জেনে ওই সন্ন‍্যাসী দুলে উঠেছিলেন, বিশেষত আমি উত্তরপাড়ার প‍্যারীমোহন কলেজে পড়েছি, শুনে। চন্দনগরেরই পর্বতারোহন সংগঠন— গিরিদূত (এখনও আছে?)। এই সংগঠনের সদস‍্য ওই বৃদ্ধ দম্পতির সন্তান পর্বতারোহনে গিয়ে হারিয়ে গিয়েছিলেন। বৃদ্ধা জননী শুধিয়েছিলেন, ডান ভুরুর ওপর একটু কাটা দাগ, দেখেছিলে, বাবা, দেখতে পেয়েছিলে? সৌগত ছিল পাশে, সে লাফিয়ে উঠে বলেছিল, হ‍্যাঁ, হ‍্যাঁ, ছিল, ছিল না মৃদুলদা..

চম্বলের লেখাগুলি বের হওয়ার বেশ পরে, মাসখানেকের পর হঠাৎ একদিন দেখা করতে আসে একটি অল্পবয়সি, আমার থেকে বেশ ছোট ছেলে। দেখে বোঝা যায় শ্রমজীবী। আমাকে দেখেই একগাল হেসে ছেলেটি বলে, স‍্যর, আপনি আমার দাদির কথা লিখেছেন। এক দোস্ত আমাকে পড়ে শুনিয়েছে। আমি স‍্যার পুতলিবাইয়ের নাতি। কলাবাগানে থাকি। পুতলিবাইয়ের মেয়ে তান্নো কলকাতার কলাবাগানে থাকতেন। তারই ছেলে। ছেলেটির নাম আমি ভুলে গিয়েছি। সে জানিয়েছিল, ইলেকট্রিকের কাজ করে সে। তাকে আমি খুব খাইয়েছিলাম। চা, ডিম-টোস্ট। আমাকে সেলাম ঠুকে ওয়েলিংটন-ধর্মতলার মোড়ের ভিড়ে মিশে যায় পুতলিবাইয়ের নাতি।