হিয়া টুপটাপ জিয়া নস্টাল : পর্ব ৪৯

আঁকার খাতা

ছোটবেলায় আঁকার খুব শখ ছিল আমার। বেশ ছোট বয়স থেকেই সে-শখ ছিল, কেননা আমি মনে করতে পারি, আমার স্মৃতিতে প্রথম যে-বাড়িটি আছে আমাদের, সেটি আমার গুণপনার দরুন আলতামিরা’র ছোট সংস্করণ হয়ে উঠেছিল। এমনকী, একবার বাড়ির মালিক ভদ্রলোক দেখে বেশ উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন। হাতের নাগালের দেওয়ালগুলো শেষ হয়ে যাওয়ায় ততদিনে মোমরং দিয়ে লাল মেঝেয় শিল্পকর্ম করতে শুরু করেছি। সে তবু জল দিয়ে মোছা যায়, কিন্তু দেওয়ালের কাজগুলো কালজয়ী হয়ে উঠল অচিরেই।

এই সময় নাগাদই দেওয়াল এবং মান-ইজ্জত বাঁচাতে আমাকে আঁকার খাতা কিনে দেওয়া শুরু করা হল। গড়িয়ার মোড়ে ছিল আমার দু’খানা প্রায়-দোকান, ‘সচ্চিদানন্দ গ্রন্থাগার’ আর ‘সনেট’। হাত ধরে সেখানে নিয়ে গিয়ে বাবা আঁকার খাতা আর মোমরঙের ১২টার সেট কিনে দিত। ওই খরিদ্দারিতে যে-আনন্দ পেতাম, তা জীবনে আর কিছুতে আজ পাই না। এক দু’খানা সংস্থার আঁকার খাতাই তখন পাওয়া যেত বাজারে। একটু মোটা মলাট, ভেতরে এক কি দু’দিস্তে ধবধবে সাদা কাগজ। বাবা-মা’র সামর্থ্যে ওইটুকু শখ ধরে যেত।

সমস্যা হল তখন, যখন মাত্র সাত কি ১০ দিনে সেসব খাতা ফুরিয়ে ফেলতে শুরু করলাম আমি। নেশাগ্রস্তের মতো এঁকেই চলতাম সারা সন্ধেবেলা। ছুটির দিনগুলোয় সকাল থেকে রাত। যা মনে আসত, আঁকতাম, যা দেখতে পেতাম চোখের সামনে, আঁকতাম। যা যা দেখতে পেতাম না, সেসবও আঁকতাম। বাড়িতে তখন মা’র ছাত্রছাত্রীদের নিয়মিত যাতায়াত, আত্মীয়-পরিজন আর পাড়াপড়শিরাও প্রায়শই আসেন যান। মুশকিলটা হল, তাঁরা আমার ওইসব খাতাভর্তি আঁকা দেখে অসম্ভব তারিফ শুরু করলেন। সেসব তারিফের একাংশ পেলে ভিন্সেন্ট-এর মতো শিল্পী আরও বেশিদিন বাঁচতেন নিশ্চিত।

জাকির হুসেনের সঙ্গে আলাপের আশ্চর্য গল্প!
পড়ুন ‘হিয়া টুপটাপ জিয়া নস্টাল’ পর্ব ৪৭…

আমার আঁকার জোশ গেল বেড়ে। দু’দিস্তের খাতা তখন বাঘের সামনে ইঁদুরছানা’র মতো, নিমেষে শেষ। মাসের শেষদিকে খাতার জোগানে টান পড়লে বাবা’র অফিসের প্যাডের কলম দিয়ে কারুকাজ জারি থাকত। কারণ মোমরংও শেষ ততদিনে। আঁকা তো নেশার ব্যাপার, অবসরে কাগজের প্যাকেট থেকে বের করে মোমরঙের গন্ধ উপভোগ করতে কী যে ভাল লাগত! স্কুলেও আমার সবচেয়ে প্রিয় সময় ছিল ড্রয়িং ক্লাস। ডিসেম্বর মাসে জন্মদিন, বাড়িতে খুব ছোটখাট জমায়েত। পাড়ার বন্ধুরা আর কাছের আত্মীয়দের বেশিরভাগই আঁকার বই আর রং উপহার দিতেন। সেসব বইয়ের কয়েকটায় আঁকা বিদ্যমান, রং নিজের মনের মতো করে নিয়ে হবে। কয়েকটায় আবার অদৃশ্য রংও আছে, জল বোলালেই ফুটে উঠবে। সেইসঙ্গে জলরঙের সেট। চ্যাপ্টা একখানা বাক্স, খুললেই বারো কি আঠারোখানা চৌকো জলরঙের শুকনো ট্যাবলেট, তাদের গায়ে ভেজা তুলি বুলিয়ে নিয়ে কাগজে চালালেই হল।

এই সব কিছু নিয়ে আমার একখানা আলাদা জগত ছিল তখন। বাড়িতে গানবাজনার পরিবেশ, বাবা সাংবাদিকতা নিয়ে ব্যস্ত। আমি কিছুই জানি না বড় হয়ে কী হব। আদৌ যে বড় হয়ে কিছু একটা হতে হয় সকলকে, সেটাই জানা নেই তখন। অনেকেই আঁকার খাতা দেখে বলছেন, ‘এ নির্ঘাত আঁকিয়ে হবে, মিলিয়ে নিও!’ কিন্তু সেসবও আমার মাথায় নেই। আঁকছি তো অনাবিল আনন্দ পাচ্ছি বলে, কিছু হওয়ার জন্য তো নয়।

এই করে কিছু বছর গেছে, ওই ভাড়া বাড়িতেই আছি তখনও। মাথায় খুনের মতো চেপে বসল জলরঙের নেশা। কিন্তু তখন আর সেই চ্যাপ্টা ট্যাবলেটের বাক্সে পোষাচ্ছে না। রীতিমতো সরু থেকে মোটা তুলির সেট আর জল রঙের ভারী শিশি একের পর এক কিনে দিতে হচ্ছে আমাকে। পরে, অনেক পরে বুঝেছি, আমার ওই নিজস্ব পৃথিবীটা যাতে কোনওদিন বেরঙিন না হয়ে যায়, সে জন্য বাবা আর মা অনেক রং ছেড়ে দিতেন নিজেদের।

সুবোধ দাশগুপ্ত

এরকম সময় নাগাদ একদিন আমাদের ভাড়াবাড়িতে একজনের প্রবেশ ঘটল। ঘোর শ্যামবর্ণ, দোহারা গড়ন, বেশ লম্বা, গম্ভীর কণ্ঠস্বরের অধিকারী, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। পরনে পাঞ্জাবি-পাজামা আর কাঁধে একখানা ঝোলা। বুকপকেটে, খেয়াল করলাম আমি, একখানা কলম গোঁজা, তার ডাঁটিটা বেরিয়ে আছে। যে-সে কলম হলে চোখে পড়ত না, কিন্তু ওটা আঁকার জন্য আলাদা গোছের কলম। সচ্চিদানন্দ গ্রন্থাগারে পাওয়া যায়, দেখেছি। দামি। মানুষটিকে দেখে চেনাও মনে হল। মনে পড়ল, মায়ের গানের আসরে এঁকে শ্রোতার আসনে মগ্ন হয়ে থাকতে দেখেছি বেশ কয়েকবার।

‘আরে, সুবোধদা যে, আসুন আসুন। কী সৌভাগ্য!’

বাবা’র সঙ্গে প্রথম যেদিন আমাদের ছোট ঘরটায় ঢুকলেন তিনি, মা’র মুখে হাসি আর এই কথাটুকু ফুটে উঠল। পরে জানলাম, তিনি বিখ্যাত চিত্রশিল্পী সুবোধ দাশগুপ্ত, বাবাদের ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় আর্ট ডিপার্টমেন্ট তাঁরই দায়িত্বে। ততদিনে পত্রপত্রিকায়, পুজোসংখ্যায় তাঁর অসামান্য সব রেখাচিত্র আমার দেখা হয়ে গেছে। সেই মানুষটি খোদ আমাদের বাড়িতে, এ আমার বিশ্বাস হল না। অবশ্য এমন অবিশ্বাস্য ঘটনা আমাদের ওই বাড়িতে মাঝেমধ্যেই ঘটে যেত।

একদিন এরকমই আমার কাজ দেখতে চাওয়ায় আমি একটা নতুন কেনা খাতার প্রথম পাতাটা এগিয়ে দিলাম। সাদা পাতা। দেখে বললেন, ‘এ কী, এ তো কিছুই আঁকিসনি এখনও’। আমি বললাম, ‘তুমি একটা কিছু এঁকে দাও সুবোধজেঠু’। কোনও কথা বললেন না এই আবদার শুনে। ঢিমেতালে কাপের চা-টুকু শেষ করে নামিয়ে রাখলেন, তারপর বুকপকেট থেকে সেই কলমখানা বের করে আঁকা শুরু করলেন, আমার খাতায়।

বাবা আলাপ করিয়ে দিলেন, প্রণাম করলাম। আমার আঁকার শখের কথা বাবা-ই বেশ ফলাও করে বললেন, আমার লজ্জা পাওয়া ছাড়া তখন করণীয় আর কিছুই নেই। কিন্তু তার একখানা সুফল ঘটে গেল অচিরেই। মাঝেমধ্যেই আমাদের বাড়িতে যাতায়াত করতে লাগলেন সুবোধ দাশগুপ্ত, যিনি ততদিনে আমার সুবোধজেঠু হয়ে গেছেন। সন্ধে পার করে আসতেন। দমদমে বাড়ি, বেশ রাত করে আড্ডা মেরে উঠে তবে ফিরতেন। চা-সিঙাড়া আর খোশগল্পের মাঝে, ‘অ্যাই ব্যাটা, নতুন কী আঁকলি দেখা দেখি’ বলে হাঁক পাড়তেন। আমি পাশের ঘরে ওই গুরুগম্ভীর ডাক শোনার অপেক্ষাতেই থাকতাম। সাম্প্রতিকতম ড্রয়িং খাতাটি নিয়ে গুটিগুটি পায়ে হাজির হতাম তাঁর সামনে। অত বড় একজন নামী শিল্পী, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সময় নিয়ে আমার আঁকা দেখতেন। শুধরে দিতেন, শিখিয়ে দিতেন, বাহবা দিতেন, বারণ করতেন। এ যে আমার কত বড় প্রাপ্তি, তা কি আর ঐটুকু বয়সে বুঝেছি? আজ বুঝি।

একদিন এরকমই আমার কাজ দেখতে চাওয়ায় আমি একটা নতুন কেনা খাতার প্রথম পাতাটা এগিয়ে দিলাম। সাদা পাতা। দেখে বললেন, ‘এ কী, এ তো কিছুই আঁকিসনি এখনও’। আমি বললাম, ‘তুমি একটা কিছু এঁকে দাও সুবোধজেঠু’। কোনও কথা বললেন না এই আবদার শুনে। ঢিমেতালে কাপের চা-টুকু শেষ করে নামিয়ে রাখলেন, তারপর বুকপকেট থেকে সেই কলমখানা বের করে আঁকা শুরু করলেন, আমার খাতায়। দেখতে-দেখতে তৈরি হল জঙ্গল আর গাছপালায় ঘেরা একটা পাথুরে টিলা, তার ওপর একখানা ছোট মন্দির, আর টিলার নীচে ঘোড়ার পিঠে চাপা একজন মানুষ। গোটা ছবিটা যেন ইতিহাসের কোনও প্রাচীন নগরী থেকে উঠে এসেছে। সবচাইতে বড় কথা, পুরোটা আঁকতে গিয়ে একবারও খাতা থেকে কলম তুলে দ্বিতীয়বার খাতায় ছোঁয়ালেন না তিনি। যে-টান দিয়ে শুরু করেছিলেন, সেই একটানেই পুরো ছবিটা শেষ করলেন তিনি। সুবোধ দাশগুপ্ত। এই বাংলার সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী।

সময় অনেক কিছুর দাম দিতে পারে না। সুবোধ দাশগুপ্তকেও তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা দিয়ে উঠতে পারিনি আমরা। আর আমার সেই খাতা? সে-ও বাড়ি বদলের ব্যস্ততার ভিড়ে কোথায় খোয়া গেছে। হারায়নি কেবল সুবোধজেঠুর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিস্মিত এক বালক, যার মধ্যে এঁকে চলার স্বপ্ন লুকিয়ে ছিল কোথাও। সেই স্বপ্নটা সে বাঁচিয়ে রাখতে পারেনি।