কলকাতার বেলুন বিলাস: পর্ব ২

Representative Image

রামচন্দ্রের উড়ান

উত্তর কলকাতার শিমুলিয়া অঞ্চলের কাঁসারিপাড়ার  রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পরিচয় বিবিধ। তিনি নবগোপাল মিত্রের ন্যাশনাল সার্কাসের ফ্লাইং ট্রাপিজ খেলোয়াড়। তিনি প্রিয়নাথ বোসের ‘গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস’-এর খেলোয়াড় এবং প্রশিক্ষক। তিনিই আবার গভর্নমেন্ট নর্মাল স্কুলে মল্লক্রীড়া বা শরীরচর্চার শিক্ষক। পরবর্তীতে গ্রেট ইউনাইটেড সার্কাস কোম্পানির পরিচালক পদ অলংকৃত করেছিলেন তিনিই। তবে এই লেখার আকাশ বিজয়ী নায়ক রামচন্দ্র উজ্জ্বল ‘প্রথম ভারতীয় অ্যারোনোট’ এবং ‘প্রথম প্যারাসুট অবতারণকারী’ ভারতীয় অভিধায়।

রামচন্দ্রের অনুরোধে স্পেনসার সাহেব ৫০০ টাকা দক্ষিণায় তাঁকে ‘বেলুনিং বিদ্যে’ শেখাতে রাজি হন। এই ব্যাপারে রামচন্দ্রের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন পাথুরিয়াঘাটার জমিদার গোপালচন্দ্র মুখার্জি। তারপর ১৮৮৯-এর ১০ এপ্রিল, আকাশে উড়লেন রামচন্দ্র, সঙ্গে আকাশে উড়ল কলকাতা। রামচন্দ্রের দৌলতে তৈরি হল ইতিহাস— প্রথম ভারতীয়ের বেলুন বিহার। ‘দ্য ভাইসরয়’ বেলুনে গুরু-শিষ্য স্পেনসার-রামচন্দ্র। নারকেলডাঙার ওরিয়েন্টাল গ্যাস কোম্পানির মাঠ থেকে বিকেল তিনটে তিরিশে যাত্রা শুরু করে কলকাতার আকাশ থেকে রামচন্দ্রের বেলুন আসে বারাসাতে। একঘণ্টার সফল উড়ানের পর বারাসাতের মাইল তিনেক দূরে একটি গ্রামে অবতরণ করে বেলুনটি। তারপর স্থানীয় জমিদার পিয়ারিমোহন রায়ের ভাইয়ের পাঠানো হাতিতে চেপে বেলুন-সহ দুই বেলুনবিদ যান চণ্ডীপুর। অকুস্থলে তাঁদের থেকে জমিদারবাবু হাজার টাকা পুরস্কার দাবি করেন, কারণ তাঁর ধারণা ছিল স্পেনসার সাহেবের প্রথম উড়ানের পর, তিনিই প্রথম সাহেবকে খুঁজে পেয়েছেন। কিন্তু ভুল ভাঙলে, ছ’টি টাকা নিয়ে তাঁকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। পরে তারা বারাসাত থেকে সন্ধ্যা সাতটার ট্রেনে কলকাতায় ফিরে আসেন।

রামচন্দ্রের বিজয়কেতন মাটি থেকে আকাশে এবং আকাশ থেকে মাটিতে ছড়িয়ে পড়ল অচিরেই। ‘বেঙ্গলি’ ঘোষণা করল— বাবু রামচন্দ্রই প্রথম বাঙালি নভশ্চর- ‘এরোনট’। ‘দ্য ইভনিং মেল’, ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ ইত্যাদির পাতা থেকে মানুষের মুখে বেলুনবাজ রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জয়জয়কার। আর রামচন্দ্র তাঁর অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে বলেন, এই অভিযানে তিনি খুবই খুশি, আকাশ থেকে কলকাতা নগরীর দৃশ্য দেখে তিনি  বিমোহিত। সঙ্গে দিলেন ভবিষ্যতে বেলুনে ভারত জয় করার ইঙ্গিত।

ভারতে প্রথম কে বেলুন উড়িয়েছিলেন? পড়ুন: কলকাতার বেলুন বিলাস: পর্ব ১

তবে রামচন্দ্র-ই কি প্রথম ‘বেলুনবিহারী বাঙালি’? এ-নিয়ে প্রশ্ন করেন কেউ-কেউ। ৮ জুন, ১৮৮৯-এর ‘স্টেটসম্যান’ সংবাদপত্রে বলা হয়— ‘সুরেন্দ্র বিনোদিনী’ খ্যাত নাট্যকার উপেন্দ্রনাথ দাস ১৮৭৮-এ প্রদর্শনীর সময়ে প্যারিস থেকে একটি বেলুনে আকাশে ওঠেন। কিন্তু উপেন্দ্রনাথ প্রথম আকাশে উঠলেও তিনি ছিলেন বেলুনের যাত্রী। কিন্তু বেলুন-চালকদেরই বলা হয় নভশ্চর। অতএব রামচন্দ্রের জয়ধ্বজা উড়তে থাকল।

এই রেশ কাটতে-না-কাটতেই ১২ এপ্রিল কাশীপুর ট্রাম কোম্পানির মাঠ থেকে বেলুনে পাঁচ হাজার ফিট উঠে, প্যারাসুট নিয়ে ঝাঁপ দিলেন স্পেনসার। কলকাতা দেখল প্রথম প্যারাসুট জাম্প। সফল স্পেনসার, উদ্বেল শহর। জানা যায়— এই অনুষ্ঠানের দর্শনী বাবদই স্পেনসারের লাভ হয় ১২,০০০ টাকা। সঙ্গে ছিল আরও প্রাপ্তি। ১৪ এপ্রিল পাথুরেঘাটার গোপাল মুখার্জি স্পেনসার এবং রামচন্দ্রকে এক নৈশভোজে আপ্যায়িত করেন।

এরপর গ্যাস কোম্পানির মাঠ থেকে ১৮ এপ্রিলের উড়ানে স্পেনসারের সঙ্গী ছিলেন রয়্যাল ক্যানাডিয়ান্সের লেফটেন্যান্ট কনিংহ্যাম। উদ্দেশ্য ভারতের প্রথম ‘এরিয়াল সায়েন্টিফিক ইনভেস্টিগেশন’ — অর্থাৎ বায়ুমণ্ডলের অবস্থা এবং বায়ুপ্রবাহের তীব্রতা পরিমাপ ইত্যাদির পরীক্ষা।

কলকাতার চর্চায় তখন ‘উড়ন্ত মানুষ’, ‘বেলুন সাহিব’, ‘বেলুন কা বাবু’ ইত্যাদি। আর কলকাতার সাংস্কৃতিক মুকুটে আরেকটি রত্ন যোগ করতে রামচন্দ্র ঘোষণা করলেন— ২৭ এপ্রিল ১৮৮৯ শনিবার, নারকেলডাঙার গ্যাস কোম্পানির মাঠ থেকে তিনি বেলুনবিহারের একক প্রদর্শনী করবেন। 

পুনরায় পৃষ্ঠপোষক পাথুরেঘাটার গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। রামচন্দ্র ক্রীত স্পেনসারের ‘দ্য ভাইসরয়’ স্বদেশি চেতনায় ‘সিটি অফ ক্যালকাটা’। রামচন্দ্রের কলকাতা। কলকাতার রামচন্দ্র।

এ-প্রসঙ্গে ২৭ এপ্রিল ‘বেঙ্গলি’-তে বিজ্ঞাপন—ANNOUNCEMENT EXTRAORDINARY GRAND BALLOON ASCENT THE FIRST NATIVE ATTEMPT IN INDIA.

BABU RAM CHANDRA CHATTERJEE THE FIRST INDIAN AERONAUT in his own balloon ‘THE CITY OF CALCUTTA’

বিজ্ঞাপনে জানা যায়, বিকেল সাড়ে চারটেয় গ্যাস কোম্পানির মাঠ থেকে বেলুনে উঠবেন রামচন্দ্র। বিডন স্কোয়ার অ্যামেচার কোয়াড্রিন্ড ব্যান্ড এই উপলক্ষে পরিবেশন করবে সংগীত। গেট খোলা হবে দুটোয়। শামিয়ানার নীচে সংরক্ষিত টিকিট— তিন টাকা, চেয়ার এক টাকা, সাধারণের জন্য সুলভ আসন চার আনা এবং দু’টাকার বিনিময়ে দেশীয় মহিলাদের জন্য ব্যবস্থা হল। জনগণের সুবিধার জন্য, ৬৬ পাথুরেঘাটা স্ট্রিট, ফ্রেন্ড অ্যান্ড কোং, ৬১ বেন্টিঙ্ক স্ট্রিট এবং অ্যালান অ্যান্ড কোং, ৮৫ ধর্মতলা স্ট্রিট এবং গ্যাস কোম্পানির গেট থেকে টিকিট কেনার এবং মাঠের প্ল্যান দেখার ব্যবস্থা হল। এই বিজ্ঞাপনটি প্রকাশ করে ‘বেঙ্গলি’ মন্তব্য করে, ‘রামচন্দ্রকে সর্বপ্রকারে উৎসাহিত করা আমাদের কর্তব্য।’ 

অন্যদিকে ঢাকা থেকে প্রকাশিত দ্বি-সাপ্তাহিক ‘দ্য বেঙ্গল টাইমস’ ১৮৮৯-এর ২৭ এপ্রিল লেখে— ‘যদি তাঁর কোনো ক্ষতি হয়, এবং আমাদের আশংকা সেটাই স্বাভাবিক, তা হলে যারা তাঁকে প্রশ্রয় দিচ্ছে তাদের একটি আত্মহত্যাকে প্রারোচিত করার দায়ে পড়তে হবে।…পূর্ব অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান ছাড়া এই ধরনের আকাশারোহণের প্রচেষ্টা, আমরা মনে করি, ভাগ্যকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলা এবং আইন-বলেই তা নিবারণ করা উচিত। আমাদের স্বদেশি বন্ধুরা বোধ হয় বীরত্ব আর বোকামির মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন।’

কিন্তু নির্ধারিত দিনে আকস্মিক ঝড়ে বাতিল হল উড়ান। বেলুনের গ্যাস বের করে দিয়ে সেটিকে রক্ষা করা  হয়। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে, রামচন্দ্র খেলা দেখাতে চাইলেন। কিন্তু স্পেনসারের অনুরোধে  তিনি বিরত হন। এই ঘটনায় রামচন্দ্রের হাজার টাকার বেশি ক্ষতি হয়।

হতাশ দর্শকদের উদ্দেশ্যে দুঃখপ্রকাশ করে রামচন্দ্রের চিঠি ছাপা হয় চৌঠা মে-র ‘বেঙ্গলি’-তে। তিনি কলকাতাবাসীর কাছে এই ঘটনার জন্য দুঃখপ্রকাশ করে এবং কৃতজ্ঞতা জানিয়ে জানান, তাঁর পরবর্তী  অনুষ্ঠান আগের টিকিটেই দেখতে পাবেন টিকিট গ্রহীতারা। 

এরপর চৌঠা মে রামচন্দ্র-র কারিকুরি দেখতে, নারকেলডাঙা প্রাঙ্গণে জড়ো হয়েছিল আট হাজার মানুষ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সেই দিন গ্যাস কোম্পানির সহযোগী পরিচালক জে. রেইড গ্যাস দ্বারা বেলুন ভরাট করার কাজে নিযুক্ত ছিলেন। গ্যাস কোম্পানির মাঠে সে-দিন উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় পুলিশ কমিশনার এবং বেশ কিছু বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তি। 

ছবিঃ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

‘স্টেটসম্যান’ থেকে জানা যায়, সে-দিন ‘সিটি অফ ক্যালকাটা’য় গ্যাস ভরার পর রঙিন কাগজের শিকলি ঝুলিয়ে তাকে সুশোভিত করেন বাহারি পোশাক-পরা রামচন্দ্রের সহকারীরা। রামচন্দ্রের পরনে ছিল হালকা রঙের স্যুট এবং টুপি। রামচন্দ্রের নিরাপত্তার জন্য পুরোহিতরা পূজাপাঠ করেন এবং বলিদান হয়েছিল।

অবশেষে বৈকাল পাঁচটা দশে সাদা স্যুট পরে, গলায় দূরবিন ঝুলিয়ে উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে টুপি নাড়িয়ে অভিবাদন জানিয়ে রামচন্দ্র আরোহণ শুরু করেন। একক অভিযানে প্রথম গগনবিহারী ভারতীয় এবং বাঙালি। সাহেবদের পাল্লা দিয়ে আকাশে এই দুঃসাহসিক অভিযান।

এই দেখে উপস্থিত দর্শকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ বললেন— রামবাবু আর নামতে পারবেন না। কিন্তু বায়ুর দোলায় ওঠা-নামা করতে-করতে দূরবিনে চোখ রাখা বাঙালিদের স্বস্তি দিয়ে রামবাবু নেমে এল একসময়ে। বেলুনটি বিকেল পাঁচটা দশ থেকে টানা ৪০ মিনিট শূন্যে অবস্থান করে সোদপুরের কাছে নাটাগড় গ্রামে অবতরণ করে। জনতার উচ্ছ্বাস— ‘জয় রামবাবুকি জয়।’ এরপর সোদপুর স্টেশনে পৌঁছে রাতের ট্রেন ধরে শিয়ালদা পৌঁছান তিনি। পরে বেলুনটি ব্যারাকপুরের ম্যাজিস্ট্রেট অম্বিকাচরণ মুখার্জি নিজ দায়িত্বে কলকাতা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।

শনিবার ১১ মে, ‘বেঙ্গলি’-তে এই বিষয়ে  রামচন্দ্রের নিজের লেখা প্রকাশিত হয়। রামচন্দ্রের একক অভিযান নিয়ে শঙ্কিত ঢাকার দ্বি-সাপ্তাহিক ‘দ্য বেঙ্গল টাইমস’ এই সফলতা নিয়ে সংবাদ পেশ করে বলে— “এই সেই রামচন্দ্র চ্যাটার্জি যাঁর মাথায় দুনিয়ার বিদ্রূপ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।…তিনি সব দুর্নাম ঝেড়ে ফেলতে পেরেছেন। ‘বাবু-বেলুনিস্ট’ তাঁর গত শনিবারের সফল আরোহণের পর সব নিন্দুকের মুখ বন্ধ করে দিয়েছেন।”

কলকাতার আকাশে বেলুন নতুন ছিল না, রামচন্দ্রের কৃতিত্ব ছিল স্বদেশিয়ানা এবং জাতীয়তাবাদ। যা বার্তা দিয়েছিল, বাঙালির সাহস এবং শৌর্যে, সাহেবদের চেয়ে কম নয়। রামচন্দ্র সেই ভাবনার পথিকৃৎ। রামচন্দ্রের প্রতিষ্ঠিত ‘চ্যাটার্জিস্ বেলুনিং কোম্পানি’ এবং সাক্ষাৎকারে ভারতব্যাপী উড়ানের পরিকল্পনার আভাস ইত্যাদি সেই সাহসিকতার পরিচয়।

প্যারাশুটে রামচন্দ্রের অবতরণ। ছবি সৌজন্য: লেখক

রামচন্দ্র একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন যে, মাঝ আকাশে বেলুন থেকে ঝাঁপ দেওয়ার জন্য স্পেনসার সাহেবের কাছে প্যারাসুটটি ধার চাইলে, সাহেব চাঞ্চল্যকর আত্মহত্যার অংশীদার হতে নারাজ বলে সেই অনুরোধ নাকচ করে দেন। তবে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রামচন্দ্র জানান যে, তিনি ইংল্যান্ড থেকে তিনি অবিলম্বে প্যারাসুট আনাচ্ছেন।

রামচন্দ্রের প্রশ্নাতীত দক্ষতা, পেশাদারিত্ব এবং সাহসিকতাই তাঁর বেলুনে ভ্রমণের পেশাকে সাফল্যমণ্ডিত করার সঙ্গে  তাঁকে জাতীয় নায়কের আসনে অধিষ্ঠিত করেছিল। উল্লেখ্য, বেলুনে চড়ে মানুষের গগন-বিহারের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করায় নারকেলডাঙার গ্যাস কারখানার প্রসঙ্গ আসে বারংবার। নারকেলডাঙার গ্যাস কোম্পানির মাঠটা এক সময়ে বেলুন-ফিল্ড হিসেবে পরিচিত ছিল।

রামচন্দ্রের সাফল্যে আনন্দপ্রকাশ করে ‘নেবুতলা ইয়ংমেনস্’ ক্লাবের সদস্যরা এক অভিনন্দনপত্রে বলেন, তাঁর কীর্তিতে অনেক ইউরোপীয়রা ঈর্ষাবোধ করবে, সেই সঙ্গে আশা ব্যক্ত করা হয়, শীঘ্রই তিনি প্যারাসুটে অবতরণ করে নতুন কীর্তি স্থাপন করবেন। তাঁকে অভিনন্দন জানান এবং উৎসাহ দেন হাওড়ার ম্যাজিস্ট্রেট কুরি। কিন্তু রামচন্দ্রের অসুস্থতার জন্য ২৪ মে হাওড়া ময়দানের  অনুষ্ঠানটি পরিত্যক্ত হয়। কিন্তু প্রথম বাঙালি নভশ্চর হিসাবে তিনি যথেষ্ট সম্মান এবং অর্থ দেশে না পাওয়ায় ক্ষোভপ্রকাশ করে ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’। 

এই একই বিষয় নিয়ে নাট্যকার রাজকৃষ্ণ রায় তাঁর ‘বেলুনে বাঙালি বিবি’ প্রহসনে প্রমীলা চরিত্রের বক্তব্যে লিখেছেন— “বাঙালি পুরুষ বেলুনে উড়লে বাঙালিরা তাকে উৎসাহ দেয় না, বরং নিরুৎসাহ করবার জন্যে ঠাট্টা বক্কিরে করে। তার সাক্ষী বাবু রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বেচারী প্রাণের মায়া ভুলে, আত্মীয়স্বজনের মায়া ভুলে বাঙালি জাতকে উঁচুতে তোলবার জন্যে বেলুনে চোড়ে উঁচুতে উঠলো, কিন্তু কটা বাঙালি বাহবা দিলে, দু’দশ টাকা দিয়ে সাহায্য করলে? আর ওদিকে স্পেনসার সাহেব এক পলকে বাঙালির কাছাবাঁধা লুকনো টাকাও টেনেটুনে লুটে নিয়ে চললো। ‘বাহা রে বাঙালি। সাহেবের ফাঁকির কাঙালি।’”

রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনের দ্বিতীয় একক উড্ডয়নের ঘটনা ঘটেছিল ১৮৮৯ সালের ২৭ জুন, এলাহাবাদের খুশরোবাগ [খসরুবাগ]-এ দশ হাজার মানুষের সামনে। এই উড়ানে কিছু ত্রুটির জন্য বেলুন উড়তে না চাইলে, রামচন্দ্র বেলুনের সঙ্গে লাগানো ঝুড়িটিকে অনতিবিলম্বে খুলে দিয়ে ইস্পাতের হুকটিকে ধরে ভাসতে-ভাসতেই আকাশ পথে পাড়ি দেন। সাদা প্যান্ট, বাদামি শার্ট আর  টুপি পরিহিত রামচন্দ্রের নিশ্ছিদ্র পেশাদারিত্বে এই ঝুঁকিপূর্ণ  কাজটিকে কুর্নিশযোগ্য সাহসিকতার সঙ্গে নিরাপদে বাস্তবায়িত করেছিলেন, যা তাঁর সাফল্যকে আরও উত্তুঙ্গ করে।

এ-প্রসঙ্গে ‘ইন্ডিয়ান ডেইলি নিউজ’-এ প্রকাশিত সংবাদ উদ্ধৃত করে ‘দ্য বেঙ্গলি’ লিখেছিল— “সন্ধ্যে সাড়ে ছ’টার সময় এলাহাবাদের আকাশে উড়েছিল, ‘দা সিটি অফ ক্যালকাটা’।…গ্যাসের অভাবে বেলুন আরোহণ যখন প্রায় বাতিল হওয়ার মুখে…দর্শকদের হতাশ করতে চাননি রামচন্দ্র। বেলুন সংলগ্ন গাড়িটি পর্যন্ত তখন বিচ্ছিন্ন করে শুধু বেলুনের নীচে সংলগ্ন লোহার রিঙে চেপে তিনি আকাশে উড়ে যান।… ২০,০০০ ফিট আরোহণ করেন এবং ট্র্যাক সোসাইটির প্রাঙ্গণে এসে নামেন।” রামচন্দ্রের অশ্বমেধের ঘোড়া অপ্রতিরোধ্য।

শনিবার ১১ মে, ‘বেঙ্গলি’-তে এই বিষয়ে  রামচন্দ্রের নিজের লেখা প্রকাশিত হয়। রামচন্দ্রের একক অভিযান নিয়ে শঙ্কিত ঢাকার দ্বি-সাপ্তাহিক ‘দ্য বেঙ্গল টাইমস’ এই সফলতা নিয়ে সংবাদ পেশ করে বলে— “এই সেই রামচন্দ্র চ্যাটার্জি যাঁর মাথায় দুনিয়ার বিদ্রূপ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।…তিনি সব দুর্নাম ঝেড়ে ফেলতে পেরেছেন। ‘বাবু-বেলুনিস্ট’ তাঁর গত শনিবারের সফল আরোহণের পর সব নিন্দুকের মুখ বন্ধ করে দিয়েছেন।”

এ-দিকে স্পেনসার ১৮৯০-এর গোড়ায় কলকাতা ফিরে আসেন, সঙ্গে বিবিধ অত্যাধুনিক হট এয়ার বেলুন, গ্যাস বেলুন এবং প্যারাসুট নিয়ে। ১৮৯০-এর ৮ ফেব্রুয়ারি টিভোলি গার্ডেন থেকে ঠিক পাঁচটা পাঁচ মিনিটে বেলুনে উঠে তিনি নিখুঁতভাবে প্যারাসুটে অবতরণ করেন।

রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনের দ্বিতীয় একক উড্ডয়নের ঘটনা ঘটেছিল ১৮৮৯ সালের ২৭ জুন, এলাহাবাদের খুশরোবাগ [খসরুবাগ]-এ দশ হাজার মানুষের সামনে। এই উড়ানে কিছু ত্রুটির জন্য বেলুন উড়তে না চাইলে, রামচন্দ্র বেলুনের সঙ্গে লাগানো ঝুড়িটিকে অনতিবিলম্বে খুলে দিয়ে ইস্পাতের হুকটিকে ধরে ভাসতে-ভাসতেই আকাশ পথে পাড়ি দেন। সাদা প্যান্ট, বাদামি শার্ট আর  টুপি পরিহিত রামচন্দ্রের নিশ্ছিদ্র পেশাদারিত্বে এই ঝুঁকিপূর্ণ  কাজটিকে কুর্নিশযোগ্য সাহসিকতার সঙ্গে নিরাপদে বাস্তবায়িত করেছিলেন, যা তাঁর সাফল্যকে আরও উত্তুঙ্গ করে।

এরপর আসরে রামচন্দ্র। এই প্যারাসুটের খেলায় এবারও সাহায্যে এগিয়ে এলেন গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। ১৮৯০-এর ২২ মার্চ ‘স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হল— First Parachute descent by a Native of India. বলা হল— শনিবার ২২ মার্চ টিভোলি গার্ডেন থেকে পার্সিভ্যাল, স্পেনসারের বাঙালি ছাত্র বাবু রামচন্দ্র চ্যাটার্জি ‘এমপ্রেস অব ইন্ডিয়া’য় উঠে কয়েক হাজার ফুট থেকে দর্শকদের সামনে প্যারাসুটের সাহায্যে অবতরণ করবেন। ছ’টায় অনুষ্ঠান শুরু হবে এবং অনুষ্ঠান শেষে স্পেনসার জনগণের উদ্দেশে ভাষণ দেবেন এবং রামচন্দ্রকে তাঁর সাফল্যের স্বীকৃতি স্বরূপ একটি মেডেল উপহার দেবেন। প্রবেশ মূল্য ১ টাকা। সংরক্ষিত আসন ৩ টাকা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন চৈনিক রাষ্ট্রদূত।

অনুষ্ঠানের দিন বিকাল পাঁচটা তিরিশে মিন্টো পার্কের কাছে অবস্থিত টিভোলি গার্ডেনসে ‘এমপ্রেস অব ইন্ডিয়া’ চেপে  ৩,৫০০ ফুট উচ্চতা থেকে স্পেনসার সাহেবের ‘দ্য এম্প্রেস অব ইন্ডিয়া’ থেকে প্যারাসুট নিয়ে লাফ দিলেন রামচন্দ্র। জানা যায়, তসরের এই প্যারাসুটটি রামচন্দ্রের দৈহিক সাযুজ্য অনুযায়ী প্রস্তুত হয়েছিল। তিনি নিরাপদেই ক্যাম্পবেল হাসপাতালের কাছে সুরিজ ট্যাঙ্ক পাথ লেনে একটি বাড়ির ছাদে অবতরণ করেন। তাঁকে দেখে জনতা আনন্দে উদ্বেল, চারদিকে ‘রাম বাবুকি জয়’ ধ্বনি। ব্রিটিশাধীন ভারতীয়দের অর্জনের খাতায় যোগ হল আরেকটি পাতা। এই কৃতিত্ব নিয়ে, পরের দিনের সংবাদপত্রে লেখা হয়।

‘এত দেরি করলেন কেন বেলুন থেকে প্যারাশুটে লাফাতে?’ এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন— “আরে ভায়া আর বোলো না, যতবার নামতে যাই, মনের ভেতর কেমন কেমন করে ওঠে। হাত সরিয়ে নিই প্যারাশুটের দড়ি থেকে। যখন দেখলাম অনেক বেশিই উঠে গেছি, তখন ‘জয় মা’ বলে ঝাঁপিয়ে পড়লাম।”

রামচন্দ্রের এই গগন যাত্রা এবং প্যারাসুটে  অবতরণের সাক্ষী ছিলেন সাহিত্যিক শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি লিখেছেন যে— “…বেলুন উঠছে তো উঠছেই, রামচন্দ্র আর ঝাঁপ দেন না।…আমাদের তো মুখ চুন। গোপাল মুখুজ্জের টাকা গেল, বেলুন গেল, আবার রামবাবুও গেলেন দেখছি।… হঠাৎ রামবাবু লাফ দিলেন, বেলুন আরও উপরে উঠে গেল, রামবাবু আকাশে পাক খেতে-খেতে এক-একবারে পঞ্চাশ-ষাট হাত নেমে আসছেন কিন্তু প্যারাসুট আর খোলে না। দর্শকদের হৃৎস্পন্দন বেশ কিছুটা বাড়িয়ে দিয়ে শেষ পর্যন্ত প্যারাসুট খুলল। ‘জয় রামবাবুকী জয়’—আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল সবাই। দুপুর রোদ্দুরে দু’হাত তুলে সবার নৃত্য— সে যা শোভা আমাদের তখন, যদি দেখতে হেসে বাঁচতে না।”

প্রত্যক্ষদর্শী সাহিত্যিক যোগীন্দ্রনাথ সরকারের বয়ান— ‘রামবাবুর পূর্ব্বে আর কোন বাঙ্গালী বেলুনে উঠিতে সাহস করেন নাই।…আমরা কয়েক জনে মিলিয়া তাঁহার বেলুনে চড়া দেখিতে গেলাম।…অল্পক্ষণ পরেই দেখিলাম, রামবাবুকে লইয়া সেই বেলুন শূন্যে লাফাইয়া উঠিল এবং দেখিতে দেখিতে একেবারে মেঘের কাছে উপস্থিত হইল।…অত বড় বেলুনটা দেখিতে দেখিতে একটা বলের আকার ধারণ করিল। তাহার পর বেলুন একখানা মেঘের মধ্যে প্রবেশ করিবার উপক্রম করিতেছে, এমন সময়, রামবাবু প্যারাসুটের দড়ি ধরিয়া লাফাইয়া পড়িলেন। লাফাইয়া পড়িবামাত্র আমরা যে ভয়ানক দৃশ্য দেখিলাম, তাহাতে ভয়ে আমাদের আপাদমস্তক কাঁপিতে লাগিল। কয়েক শত ফিট্ পর্য্যন্ত, একবার রামবাবু উপরে প্যারাসুট্ নীচে, আবার প্যারাসুট উপরে রামবাবু নীচে, এইভাবে ঘুরিতে ঘুরিতে নামিয়া সহসা প্যারাসুটটা খুলিয়া গেল। তখন আমাদের মনে আর কোন উৎকণ্ঠা রহিল না। রামবাবু ধীরে ধীরে নামিয়া আসিলেন। একজন বাঙ্গালীর এরূপ বীরত্ব দেখিয়া, উপস্থিত সকলেই, এমন কি, সাহেবরা পর্যন্ত ধন্য ধন্য করিতে লাগিল। আমরাও যেন হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিলাম।”

প্যারাশুটের সাহায্যে সাফল্যের সঙ্গে অবতরণের জন্য সে-দিন টিভোলি গার্ডেন্সে রামচন্দ্রকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে স্পেনসার সাহেব রামচন্দ্রের দক্ষতা এবং সাহসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করে, একটি মেডেল প্রদান করেন। প্রত্যুত্তরে, রামচন্দ্র সোনার জলে লেখা একটি অভিনন্দনপত্র স্পেনসারের হাতে তুলে দিয়ে, সাহেবের আকুন্ঠ ঋণ স্বীকার করেন। ধন্যবাদের সঙ্গে অভিনন্দনপত্রটি স্পেনসার গ্রহণ করেন। 

এর অল্পদিন পরেই ডাচ কর্তৃপক্ষের আহ্বানে সাড়া দিয়ে স্পেনসার কলকাতা ত্যাগ করেন। অন্যদিকে পেশাদার বেলুনবিদ রামচন্দ্র ভারতের বিবিধ প্রান্ত থেকে আমন্ত্রণ পান। ব্যয়সাপেক্ষ বেলুন প্রদর্শনীর হাজার-হাজার টাকা খরচ যোগাতে, পৃষ্ঠপোষক গোপাল মুখোপাধ্যায়ের পরামর্শ শিরোধার্য করে তিনি পশ্চিমে যান। তখন রামচন্দ্রের ‘সিটি অফ ক্যালকাটা’— ‘দ্য স্টার অফ ইন্ডিয়া।’ যেমনটা রামচন্দ্র নিজে, কলকাতার বাঙালিবাবু তখন ভারতীয় নক্ষত্র।

১৮৯০ সালের নভেম্বরে দিল্লির তিস হাজারি-তে তার বেলুন এবং প্যারাসুটের কৌশলে প্রীত নবাব জালাল-উদ-দৌলাহ মুহাম্মদ মুমতিয়াজ আলি খান তাঁকে নগদ ১০০ টাকা এবং একটি বহুমূল্য শাল উপহার দেন। সঙ্গে দিল্লির কমিশনার অকুণ্ঠ প্রশংসা করেন তাঁর। 

এরপর ১৮৮৯-এর ৮ মার্চ শিবরাত্রিতে  লাহোরের টাউন হল সংলগ্ন ময়দানে তাঁর সফল বেলুনবাজি। পরবর্তী গন্তব্য রাওয়ালপিন্ডি। রাওয়ালপিন্ডির পর ইন্দোর— ১৮৯১-এর নভেম্বরে। এরপর ইন্দোরের মহারাজার অনুরোধে তৎকালীন ভাইসরয়ের উপস্থিতিতে তিনি তাঁর ব্যোমযানের সাহায্যে আরোহণ এবং প্যারাশুটের সাহায্যে অবতরণের চমকপ্রদ কৌশল দেখান।

১৮৯২-এর ফেব্রুয়ারিতে আগ্রার প্রদর্শনী নিয়ে উচ্ছ্বসিত মার্চ, ১৮৯২-এর ‘সংবাদ প্রভাকর’— ‘বেলুনী বাবু রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবার আগ্রায় দর্শকদিগকে প্যারাসুট বাহাদুরি দেখাইয়া সন্তুষ্ট করিয়াছেন। এবার তিনি উচ্চ আকাশ হইতে লম্ফ প্রদানপূর্বক প্যারাসুট সাহায্যে অবলীলাক্রমে ভূমে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন।’

এরপর লখনঔ। এবং এপ্রিলে বারাণসীতে— সবজায়গায় নিজের অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন তিনি। প্রাপ্তি মান-সম্মান-অর্থ-খ্যাতি, বেলুন নিরাশ করেনি রামচন্দ্রকে আর রামচন্দ্র নিরাশ করেনি ভারতকে।  উল্লেখ্য, কলকাতা নিবাসী মেজর হ্যারি হব্সের স্মৃতিকথা। তিনি লিখেছেন— ‘রামচন্দ্রের সাহসী কন্যা তার বাবার সঙ্গে কয়েকবার বেলুনে উড়েছিল এবং প্যারাশুটের সাহায্যে অবতরণ করেছে।’

এ-প্রসঙ্গে দেশ পত্রিকায় একটি প্রবন্ধে লেখা হয়েছে—  “উনিশ শতকের একটি কালীঘাটের পটে দেখা যায়, প্যারাসুট হাতে এক মহিলা নেমে এসে একটি ঘোড়ার পিঠে বসতে যাচ্ছেন। ছবির ওপরে বাঁ দিকের কোণ দিয়ে আকাশে উড়ে যাচ্ছে সওয়ারিবিহীন হালকা বেলুন। নৃত্যলাল শীলের পঞ্জিকায় [১২৯৭] প্রকাশিত সংবাদের সঙ্গে মুদ্রিত ছবিটিতে দেখা যায় একজোড়া নরনারী বেলুনে চড়েছে। পঞ্জিকার খবরটিতে রামচন্দ্রেরও উল্লেখ ছিল। আরও একটি কালীঘাটের পটে টুপিধারী এক বেলুনারোহীর দর্শন পাই আমরা। টুপিধারী বলেই যে তিনি রামচন্দ্র নন, এ-কথা জোর দিয়ে বলা সম্ভব নয়। রামচন্দ্র পুরো সাহেবি পোশাকেই বেলুনে চড়তেন, টুপি পরতেন, তার উল্লেখ আছে। প্রথম প্যারাসুট অবতরণের দিন ‘he wore a close-fitting jacket, with violet shot trousers, and looked every inch an European to collars and cuffs.’”

কিন্তু ইতিহাসে বিস্মৃত যেই মেয়ে।

রামচন্দ্রের সাহসিকতার প্রসঙ্গে আসে পাথুরিয়াঘাটা রাজবাড়ির খোলা উঠোনে উন্মুক্ত রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার-এর সঙ্গে খেলা দেখানো। ভীতু দর্শকদের কাছে সাহসী রামচন্দ্র। বুদ্ধিজীবীদের উদ্দেশ্যহীন নিছক বেলুন প্রমোদের প্রশ্ন রামচন্দ্রকে ছুঁতে পারেনি।  একটি নেটিভ স্টেটের পাহাড়ে প্যারাসুট ল্যান্ডিংয়ের সময়ে তিনি গুরুতর আহত হন। কলকাতায় গোপালচন্দ্র মুখার্জির বাগানবাড়িতে শয্যাশায়ী রামচন্দ্র। আর সে-সময়ে কলকাতার আকাশে-বাতাসে— মিস ভ্যানটাসিল এবং তাঁর বেলুন। পরবর্তীতে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত অভিযাত্রী রামচন্দ্র ১৮৯২ সালের ৯ অগাস্ট গোপাল চন্দ্র মুখার্জির বাগান বাড়ি থেকে পাড়ি দেন অন্য দুনিয়ায়। রেখে যান বাঙালির সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।

উল্লেখ্য, তাঁর পদাঙ্কতেই আরও দু’জন বাঙালি বেলুনারোহণ করেন। প্রবোধচন্দ্র লাহা ১৮৯০-এর ১৫ ফেব্রুয়ারি কলকাতা থেকে স্পেনসারকে সঙ্গে নিয়ে ‘দ্য সিটি অফ ইয়র্ক’ বেলুনে যাত্রা। সঙ্গে যাত্রী ছিলেন, ওয়েলিংটন হোটেলের মিসেস ম্যাগরি, টিভোলি গার্ডেনস-এর হেনরি ডি কাস্টেলবার্গ, উৎসাহী তরুণ প্রবোধচন্দ্র এবং স্পেনসারের এক মুসলমান ভৃত্য। পরবর্তীতে ‘দ্য ভাইসরয় অফ ইন্ডিয়া’ বেলুনে চড়ে ৮-৩-১৮৯০-এ প্রবোধচন্দ্র-এর একক বিমান যাত্রা। কলকাতা থেকে ভারত প্রবোধচন্দ্রের ঝুলিতে লাভ-ক্ষতি, প্রসংশা-নিন্দা, সফলতা-বিফলতা আছে সবই।

তৃতীয় বেলুনাবাহী বাঙালি বিখ্যাত ব্যারিস্টার এবং মেট্রোপলিটন কলেজের বিজ্ঞাপনের অধ্যাপক যোগেশ চন্দ্র চৌধুরী। ১৮৯০-এর ২২ ফেব্রুয়ারি— এই বেলুন-অভিযান ছিল বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের জন্য। এর আগে উল্লেখ করেছি, স্পেনসার এবং লেফটেন্যান্ট কানিংহ্যামের বৈজ্ঞানিক বেলুন আরোহণের কথা।

‘স্টেটসম্যান’-এ প্রকাশিত যোগেশ চন্দ্র চৌধুরীর এই উড়ান নিয়ে জানা যায়, দক্ষ হাতে স্পেনসার বেলুনটি প্রায় ঘণ্টাখানেকের মতো নিশ্চল রাখেন, যাতে ফোটোগ্রাফ তোলা এবং বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষা করা যায়। যাত্রী মিস্টার কাপ, আকাশ থেকে নীচের দৃশ্যাবলির বেশ কয়েকটি এরিয়াল ছবি তোলেন এবং প্রফেসর চৌধুরী এবং মিস্টার নিভেন বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ করেন।

আজ আমাদের মধ্যে রামচন্দ্র নেই, নেই আলোচ্য নভশ্চররা। কিন্তু তাঁদের দেখানো পথে কলকাতা উড়ছে, নিজেকে ছাড়িয়েছে শ্রেষ্ঠত্বে। কলকাতা নিজের গণ্ডি ছাড়িয়ে দেশ থেকে বিদেশে। যা দেখিয়েছে, জাতীয়তাবাদ বা বাঙালিয়ানা কোনও মন্ত্রগুপ্তি বা প্রচারসর্বস্ব বাণী নয়, জাতীয়তাবাদ একটি যাপন। যার কারিগর রামচন্দ্র এবং রামচন্দ্ররা।

তথ্য ঋণ এবং কৃতজ্ঞতা
‘দেশ’ পত্রিকা ১৯৮৯—সিদ্ধার্থ ঘোষ এবং স্বপন বসু—উড়ল বেলুন গড়ের মাঠে।
‘কলের শহর কলকাতা’—সিদ্ধার্থ ঘোষ
‘কলিকাতার কাহিনী’—সুকুমার সেন
‘দ্য টেলিগ্রাফ’
‘বেঙ্গল হরকরা’, ১৮৫০-১৮৫১
‘ফ্রেন্ড অফ ইন্ডিয়া’, ১৮৩৬-৩৭, ১৮৪৯-৫০
‘দ্য ইংলিশম্যান’, ১৮৮৯-৯২
‘দ্য বেঙ্গলি’, ১৮৮৯-৯২
‘অমৃতবাজার পত্রিকা’, ১৮৮৯-৯২
‘স্ক্র্যাপ্স ফ্রম মাই ডায়েরি’—মেজর হ্যারি হব।
একশো কবির কলকাতা’— অমিতাভ চৌধুরী সরল দে।