সরণ

কাঁদছে না? কাঁদছে? উলটো করে ঝুলিয়ে রেখেছে তো চোখের সামনে! বাঁ-কানটা চেপে রাখা বালিশে, ডান কানে ভাল শোনে না, খুব ছোটতে একবার নদীতে চান করতে গিয়ে বালি ঢুকে গেছিল, কিন্তু এখন ডান কানে শুনতে পাচ্ছে তো! স্যালাইনের বোতলের ড্রিপ ড্রিপ, না কি এটা দেওয়ালের ঘড়ির আওয়াজ!

কান্নার শব্দ পাচ্ছে না কেন তবে! নার্স এগিয়ে আসছে তার দিকে, ‘হ্যাঁ দেখুন বাচ্চাকে, বলুন কী হয়েছে আপনার?ছেলে না মেয়ে?’ ‘আরেহ, নিভা?’ ‘চিনে ফেলেছিস’— ঠা ঠা করে হাসতে-হাসতে নিভা বাচ্চাটার পা দুটো ছিঁড়ে এগিয়ে দেয় তার দিকে, তারপর হাতটা একটানে আলাদা করে ফেলে, ছুড়ে-ছুড়ে মারছে আর বেডের ধারে লেগে ছিটকে যাচ্ছে এদিক-ওদিক, রক্ত মেঝে উপচে তার চটিটা ভাসাচ্ছে , কী কীহ!

চোখ, খুলতে পেরেছে?

আরও পড়ুন: ব্লাডি উইক। লিখছেন শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য…

চোখের ভেতরের সবটা অন্ধকার, বাইরেও এমন জমাট রক্তের মতো কালচে কেন! পেটে হাত রাখে সে, পেটটা ভারীই ঠেকে, ঠিক আছে সব? হড়হড় করে পেচ্ছাপের বেগ টের পায়। আলো না জ্বালিয়েও হিসি করতে পারে সে। এই দেড় বছরে বাথরুমের সুইচ মুখস্ত করতে পারেনি। বিছানায় বসে পেটের ভেতরটা ফাঁপা লাগে। মনে পড়ে, তার বাচ্চা হয়ে গেছে!

আশিস ঘুমের মধ্যেও বাচ্চাটার কথা মনে করে খাটের ধার ঘেঁষে বিপজ্জনকভাবে সোজা দাঁড়ির মতো শুয়ে আছে। দৃশ্যটা তাকে আশ্বস্ত করে না, ভোঁতা অস্বস্তিতে মুখের ভেতরটা টক লাগে। সে কি জানলা খুলবে?

হাসপাতালের সাদা পর্দার মতো আলো ঝুলে আছে বাইরে।

এরকমই এক ভোরে নিভা ফিরেছিল বাড়ি।

সাদা আম্বাসাডরের দরজা খুলতেই অর্ধেক শরীর বেরিয়ে আসে। কপালের ফ্যাকাশে হয়ে আসা ভাঁজ, কিন্তু ঠোঁটের কোনের ভাবলেশহীন তিলটা হাসা না-হাসার মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে আছে। মা তখনও রান্নাঘরের দরজায়। বাবা বোধ হয় সামনের সিটে। ঘুম লেপ্টে আছে আবছা টাউনশিপের দু’কামরা কোয়ার্টারগুলোতে। পিছনের চা বাগানে খোচাবস্তি্র এক-দু’জন পাতাতোলানিকে দেখা যায় দূর থেকে,বাবা কি ওদের দেখছে না ঘিস নদীর উপর ঝুলতে থাকা পাহাড়টা!

নিভার বাচ্চাটাকে ওরা নিয়ে গেছিল। বাবা কিছুই বলেনি। যে-বাড়ির লোকের গাফিলতিতে বাচ্চার মা মরেছে, তাদের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখতে চায় না ওরা। তার মাথার ভেতরে ঝিনঝিনে একটা অনুভূতি বেবাক দৌড়াদৌড়ি করে। প্রথম ঝাপটে সে বোঝে, নিভা মরে গেছে। এই বোঝার প্রক্রিয়ার মাঝেই মনে পড়ে মা তাকে দিয়ে হ্যারিকেনের চিমনি পরিস্কার করিয়েছে কাল, জিজ্ঞেস করায় জানিয়েছে, বাচ্চাকে সেঁক দিতে দরকার হবে।

গাড়ির আওয়াজ পেয়েই চিমনিটা বারান্দায় ঢোকার মুখে ফেলে চলে এসেছে, মা বেরনোর সময় পায়ে লেগে ভেঙে যেতে পারে… তার আজকে কলেজ যাওয়া হবে না… প্রফেসর রায়ের ক্লাস করা হবে না, উনি ক্লাসের পর দেখা করতে বলেছিলেন… বাবা এখনও নামছে না কেন গাড়ি থেকে! বাবলুদা স্টিয়ারিং থেকে হাত না সরিয়ে উশখুস করছে, বডি নামাতে ওর সাহায্য লাগবে, মা কে বলতে হবে, এসে গেছে নিভারা…

রবার গাছের মাথার দিকের সব পাতাই এখন লাল, ডুয়ার্সের সূর্য এই সকালেও বেশ জোশের সাথে আলো ফেলছে গাছগুলোর হরা-ভরা গতরে। তিস্তা ব্যারাজের কাজ শুরু হওয়ার পর-পরই এই টাউনশিপের গজিয়ে ওঠা। গাছগুলির বয়স এই বসতির থেকেও বেশি। এক-দুটো বাদে কোনও গাছই প্রায় কাটা পড়েনি কোয়ার্টার তৈরির সময়। ওদলাবাড়ির পশ্চিমদিকটা বেছে নেওয়া হয়েছিল, কারণ এখান থেকে ব্যারাজের দূরত্ব খানিক কম, টাউনশিপের পেছনের চা বাগান ঘিসের ধার ঘেঁষে মানাবাড়ি অবধি চলে গেছে গুটি-গুটি। চা বাগানের কুলিমজুররা বেশিরভাগই মদেশিয় বা গোর্খা। ওপারের বাঙাল যারা ঘাঁটি গেড়েছে এখানে, হয় ক্ষেতের কাজ করে নইলে দিনের হিসেবে ব্যারেজে কাজ করতে যায়। নিভা-আভার বাবাও শুরুতে সেভাবেই জুটে যায়, সে এইট পাশ জানার পর, গ্রুপ ডি-র চাকরি দিয়ে দেয় সাহেব। সেদিন থেকে আর ব্যারেজের ওই পারে যাওয়া হয়ে ওঠেনি অনিল রায়ের। তার দাদা জলপাইগুড়িতে থাকে। গ্রামের দিকে জমিজমা নিয়ে আছে। ওর এসব কাজ পোষাল না। বড় শহরে যেতে ভয় লাগে। ওদলাবাড়ির গা থেকে যে গঞ্জের ঘন গন্ধ বেরয়, তা তাকে স্বস্তি দেয়। কাকার সঙ্গে যখন এপারে আসে, তখন তার বয়স সাতের বেশি না, কোমরে একটা ত্যানা জড়িয়ে হাতিঘাস কাটার কথা আবছা মনে আসে, নতুন কলোনিতে থাকার সময় সে দূর থেকে টাউনশিপের বিশাল লোহার গেটটা দেখত আর ভাবত, কোন ফাঁকতালে এর ভেতরে সেঁধানো যায়। গেটের ভেতরে সে ঢুকেই পড়ে একসময়। পাকাপাকিভাবেই অনিল রায় নতুন কলোনি ছাড়ে, কাকা এবং তার চরুয়া নমশূদ্র আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মেলকামেলকি বন্ধ করে দেয়। বউ আর মেয়েরা ছাড়া আর কেউ তার আছে বলে সে মনে করে না। এই সকালে গাড়ির পিছনের সিটে বড় মেয়ের বডি নিয়ে সে বুঝে পায় না কাকে ডাকবে? নতুন কলোনির কাউকে কি খবর পাঠাবে?

‘দিদি বলবি, তোর থেকে এক বছর চারমাসের বড় আমি কুত্তি!’

‘কী বললি, তুই? গালি দিস আমাকে? শয়তানি, মর তুই!’

‘তুই মর, বাবা তোকে হাট থেকে নিয়ে আসচিল, তুই কেউ না আমাদের!’

‘তোকে ঘিসের চরে পুঁতব!’

নিভাকে তার দিদি বলতে ইচ্ছে করত না। প্রতি ক্লাসে অঙ্কে ফেল করে খাটের পায়া জড়িয়ে কাঁদত। কেমন করে বলবে দিদি! কুমিরডাঙা খেলাতেও কখনও জেতার দলে থাকে না। স্কুলে যেতেও চাইত না ওই দামড়া শরীর নিয়ে। স্কার্টের বাইরে বেরিয়ে থাকা ওর রোমশ পা নিয়ে ও বাড়িতে থাকতে স্বস্তি পেত। তার পিরিয়ড হওয়ায় যেদিন সেও স্কুলে গেল না, দুপুরে নিভা তাকে একটা বই দেখায়।পাতলা বই। চাঁদমামার চেয়েও পাতলা। দুপুরের বাতাস বলক দিয়ে উঠছিল জানালার পাশের নিমগাছে, সে শুয়েছিল পেট চেপে, শোয়া অবস্থাতেই সে নিভার হাত থেকে বইটা নেয়। লক্ষ্মীর পাঁচালির মতো রঙের পাতায় পাতায় ন্যাংটা মেয়ে-পুরুষ নানা রকম অদ্ভুত পোজে একজন আরেকজনের ঘাড়ে, কোলে বসে আছে। তার না-বোঝা-চোখ দেখে নিভা খিকিখিক করে, ‘লাগাচ্ছে।’ ছবি বুঝতে-বুঝতে সে বোঝে, তার প্যান্টির তলার ভাঁজ করে রাখা ন্যাকড়া ঝ্যাপঝাপ করে ভিজে যাচ্ছে রক্তে, পেটের নিচের সরসরে গরম ভাবটা আস্তে আস্তে গলায় ভেতর ধাক্কা দিলে সে উঠে কুয়ার পাড়ে বাথরুমে দৌড়য়। সেই তাড়াহুড়োয় সে তার মায়ের সরে যাওয়া দেখতে পায় না দরজার পেছন থেকে। কখন কীভাবে বিশু নিভার হাতে ওই বই গুঁজে দিয়েছে সবটা নিভার কাছ থেকে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে শুনে নেয় মা। বাথরুমের অন্ধকারে দাঁড়িয়েই সে শুনতে পায় নিভার পিঠে রুটিবেলনের ভোঁতা আওয়াজ। তার থাই গড়িয়ে রক্ত এঁকেবেকে পড়তে থাকে মেঝেতে আর সে অপেক্ষা করতে থাকে আওয়াজ বন্ধ হওয়ার।

শুকিয়ে খড়ি হয়ে ওঠা রক্ত ঘষটাতে থাকে সে। বিছানার চাদরের ওপরে ঘষা খেয়ে হাতের চামড়ায় জ্বালা করে।কনুইয়ের দিকটা তুলে ফুঁ দিয়ে চেয়ে মুহূর্তের মধ্যে কালশিটে নজরে আসে, তার আর মাথার ভেতরে দপ করে ওঠে, এই হাত নিভার, হাতে ফুঁ দিয়েও, ঠান্ডা ভাব টের পাচ্ছে না, জ্বলুনি কমছে না, সে নিভার হাত নিয়ে কী করবে! ফ্রিজের ট্রে-তে বরফ আছে? ঠাকুরের দুধ রাখা থাকে তো তার পাশে ,তার ছোঁয়া মানা, শাশুড়িকে বললে দেবেন নিশ্চয়ই, একটুকরো বরফ পাবে না সে! হাতের কালশিটেতে লাগাতে হবে, হাত নিভার, না, তার; এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না তার চেয়ে মনে পড়ছে একটা অন্য কথা , তাকে মেনে নিতে অসুবিধে হয়নি এদের, আধুনিক, শিক্ষিত পরিবারে বিয়ে নিয়ে জাতপাত মানা হয় না, কাস্ট নো বার, কিন্তু দেড় বছরে কোনওদিন ঠাকুরের সিংহাসন ছুঁতে দেয়নি তাকে আশিষের মা, সন্ধ্যাও দিতে দেয়নি, শঙ্খর আওয়াজ বাঁ-কান খাড়া করে শুনে সে বোঝে শাশুড়ি ঠাকুর ঘরে ,এই ফাঁকে সে ফ্রিজ খুলতে পারে। হাতটা এত ভারি হয়েছে এত! নাড়াতে পারছে না, ‘হাতটা সরা!’

‘তুই সরা!’

‘তুই, তুই, কুত্তি!’

‘ঘিসের চরে পুঁতে আসব!’

‘ঘিস-লিস-চেল, কোন নদী নিবি তুই?’

‘আমি লিস!’

তার লিস নামটা ভাল লাগত, খেলার সময় সে লিস নদীর মালিকানা নেবে। সন্ধ্যায় একটা একটা করে আলো জ্বললে, হ্যালোজেন চুঁইয়ে হলুদ রঙ নেমে আসে, টাউনশিপের সব গলিতে জাফরি কাটে রবারের ঝুরি, দূরে তাদের কোয়ার্টারের জানলা দেখা যায়, আর দেখা যায় বাঁধের ওই পারে বাগরাকোট পাহাড়ে এক-দুই মিটমিটে বাতি, নেপালি হাওয়াই চপ্পলে শব্দ করে সে তাড়া দেয় নিভাকে, বিশুর গ্যালগ্যালে হাসি পাকড়ে ধরে নিভার ‘দেরি হচ্ছে’ কবজি।

‘কালকের থেকে কলে জল আনতে যেন না যায় তুমার মেয়ে!’

‘ক্যান? কী হইছে?’

‘তুমি আমারে জিগাও? বাড়িত থাইকে গোটা দিন কর কী? নজর দিতে পারো না? কার সঙ্গে কী কইরে বেড়ায় তুমার মেয়ে জান না? বিশুর সাথে আশনাই করতে দেখতে ঠ্যাং ভাইংগে বাড়িত বসায়ে রাখব, বইলে রাখলাম।’

‘তুমার মেয়ে, তুমার মেয়ে কো ক্যান? মেয়েদের কি আমি বাপের বাড়িত থিকে আনছি? বিয়া দাও ওই বেহায়া মেয়ের, পেট বান্ধায়ে আসবে একদিন, চুনকালি পড়বে মুখে, তখন ছুটোটারও কিছু জুটবে না।’

অর্ধেক ডিম খেতে খেতে সে মায়ের চিৎকার শোনে, কী নোংরা-নোংরা কথা বলে মা! তাদের বাংলা স্যার বলেন, সুন্দর করে কথা বলাটা একটা শিল্প। প্রতিটা শব্দ ধীরে-ধীরে উচ্চারণ করবে। ফ্যাক করে হাসি পায় আভার। স্যারের বাড়িতে সবাই সুন্দর করে কথা বলে! জলপাইগুড়ি থেকে আসেন স্যার। কবিতা লেখেন পত্রিকায়, নিজেই বলেছেন। যদি উনি জানতেন আভাদের বাড়িতে সবাই কেমন করে কথা কয়! মা কথায়-কথায় শতেকখোয়ারি, জন্মের পাপ, বথুয়া বলে নিভাকে, তাকেও; মাকে একটুও সুন্দর লাগে না তার।

বাবার অফিসের সাহেবের ছেলের বিয়েতে যখন তাদের বাড়ির সবাইকে নেমন্তন্ন করেছিল, জ্বর আসছে বলে যায়নি আভা। আসলে সে ওদের সঙ্গে যেতে চায়নি। মা আর নিভা লাল লিপস্টিক মেখে, রজনীগন্ধা সেন্টের গন্ধ ছড়াতে-ছড়াতে গেছিল। ওরা চলে যাওয়ার পর কুয়ার পাড়ে বসে গলায় আঙুল ঢুকিয়ে বমি করে ছিল সে। তবু মাথার থেকে গন্ধ যাচ্ছিল না। কল্যাণীদের বাড়িতে পা দিলেই ওদের কাঠের মেঝে দেওয়াল থেকে একটা ধিমিধিমি গন্ধ পায় আভা, স্কুলফেরত ওদের বাড়ি যায় ও, ওই গন্ধটার টানেই তো, কল্যাণীর মা-র থেকে কী সুন্দর একটা গন্ধ বেরয়, ওদের বসার ঘরে যে লাল কার্পেট পাতা অমন কার্পেট সেও একদিন পাতবে তার বাড়িতে, কল্যাণীর মামাবাড়ি জলপাইগুড়িতে, ওখান থেকেই ওর মামা পাঠিয়েছে, হারমোনিয়াম আর কার্পেট। একদিনই দেখেছিল সে কল্যাণীর মামাকে! ফর্সা আঙুলগুলো হারমোনিয়ামের রিডে ঘুরছে, লোভীর মতো তাকিয়েছিল আভা। তার বাড়িতে কখনও আসবে ওইরকম হারমোনিয়াম! হাসতে গিয়ে গলায় ডিমের কুসুম আটকে আসে। নিভার যদি বিয়ে হয়, তাহলে সে ওর ভাগের ডিমটাও পাবে। রোজ সন্ধ্যায় দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে মশার কামড় খেতে হবে না শয়তানিটার জন্য।

নিভার বিয়ের সময় ব্যারেজের কাজ শেষের দিকে, বাবা ছুটি নিতে পারেনি বেশিদিন, তার মাধ্যমিক পরীক্ষা , টাউনশিপের অর্ধেক লোক জিনিসপত্র বাঁধাছাঁদা করছে, ফাঁকা হচ্ছে কোয়ার্টার, নিভা তিস্তা ব্যারেজের এই পারেই থাকল। ওদলাবাড়ি থেকে গেল মালবাজার। ঠিক ওইসময় থেকেই আভা জানত, তিস্তা ব্যারেজ পার করতে হবে। সেজন্যই মালবাজার কলেজে ভর্তি হয় না সে।

‘এইখানকার কলেজে ভর্তি হইলে, দেইখেশুইনে রাখতে পারতাম’— জাত মিলিয়ে সম্বন্ধ করে বিয়ে দেওয়া বড় জামাই বাবাকে বলেছিল। নিভাকে বলেছিল, ‘তোমার বোনের পাখা গজাইছে, দেখ কোন ছ্যামড়ার সাথে দিললাগি করবে বাবুদের শহরে গিয়া।’

পিডি কলেজে ভর্তির দিন অনিল রায় তার ছোট মেয়ের সঙ্গে জলপাইগুড়ি আসে। তফসিলি মেয়েদের হস্টেলে মেয়ের ট্রাঙ্ক নামিয়ে রেখে, বিকেলের বাসেই ফেরত চলে যায়।

‘বাচ্চা হওয়ার পর অমন হয়!’

‘তোমার হয়েছিল এমন, আমি হবার পর?’

‘আমার, না, ঠিক এতটা না, তবে ধকল তো মারাত্মক, সেরকম বুঝলে ডাক্তার দেখা, যদি কাউন্সেলিং-টেলিং…’

‘খুব অস্বাভাবিক আচরণ তো করছে না, ড্রাউজি থাকাটা ওষুধের কারণে হতেই পারে!’

‘একজন আয়া দেখতে হবে রাতের বেলাটার জন্য, বুকে দুধও আসচে না, ডাক্তারকে বলতে হবে তো সেটা, নাকি?’

‘হুম, কলেজ থেকে ফিরে যাব, আজ। তুমি নজর রেখো একটু।’

এখনও মায়ের সঙ্গে এত ডিটেইল আলোচনায় স্বচ্ছন্দ হয়নি আশিস। তার ক্ষেত্রে বাবা হওয়ার ব্যাপারটা পুরোটাই এত উত্তেজনার! অপেক্ষার! অথচ খানিক লজ্জা সে এখনও কাটিয়ে উঠতে পারে না, এমনকী, মায়ের সামনেও।

কিন্তু আভার আচরণ তাকে ভাবাচ্ছে, বাচ্চাটাকে ছুঁয়ে-ছেনে দেখার তার যে টলটলে ইচ্ছে, সারাক্ষণ বুকের মধ্যে হয়েই চলেছে, আভা তেমন করছে না তো! ওর দিদির প্রেগন্যান্সি রিলেটেড একটা স্যাড হিস্ট্রি আছে, কিন্তু সেও তো অনেকদিন হল!

খোচাবস্তির দীপন তামাং-এর বাড়িতে শুয়োর কাটত খালি। চামড়াছোলা গোলাপি শুয়োরগুলো ঠ্যাংঝোলা হয়ে দোল খায় বাঁশের খুঁটিতে। অন্যসময় হলে মা রান্নাঘরে ঢোকাত না মরে গেলেও। নিভার খাওয়ার ইচ্ছা, নোলা সকসকাচ্ছে, মা না করতে পারেনি। পোয়াতি মেয়ে, আহ্লাদে পেট ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এই ঘর, ওই ঘর। তাকেই মাংস কিনতে আসতে হয়। খাওয়ার সময় নিভার চোখের পাতার তিরতির কাঁপন মন দিয়ে দেখে সে, যেমন মন দিয়ে মাংস কাটা দেখে। নিভার জন্য মায়া-মায়া ভাব আনার চেষ্টা করেও একটা বিতৃষ্ণা টের পায়। চোখ নামিয়ে আনে থালায়, ঝোলে আদার গন্ধ পেতে থাকলে খাওয়ার ইচ্ছে চলে যায় তার।

তার ডান পাশে শুয়ে থাকে নিভা। সিলিঙে কোথাও ভীমরুল চাক করেছে। একটানা ভিনভিনানি ঢুকে পড়ছে বাঁ-কানে। নিভা কী বলছে শোনার চেষ্টা না করেও শুনতে পায় সে।

‘আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাইতে বলবি বাবাকে, বুঝলি!’

‘কেন? তোর বর তো নার্সিং হোমের টাকা দিয়ে গেছে!’

‘দরকার নাই, হাসপাতালেই যাব, সবার বাচ্চা হয়, আমারও হবে!’

‘হু!’

‘ওই টাকাটা দিয়ে একটা আলমারি কিনব, গোদরেজ!’

‘হু!’

‘এত তাড়াতাড়ি বাচ্চা কেন নিলি তুই?’

‘এইটা কি আমার হাতে? একটা সুতাও গায়ে রাখতে দেয় না, রোজ রাতে এমন ধামসায়…’

‘তুই কিছু বলতে পারিস না?’

‘কী বলব! কিছু বোঝার আগেই দেখি শরীর খারাপ বন্ধ হয়ে গেল!’

‘উফ! পিরিয়ড বলতে পারিস না?’

‘অত প্রিয়ড-ফ্রিয়ড বলতে পারব না, তোর মতো শিক্ষিত হই নাই!’

ডেলিভারির টাকা থেকেও আলমারি কেনার ধান্দা! এত লোভী নিভাটা। গা জ্বালা করে আভার। মালবাজার ওদলাবাড়ির বাইরে কখনও কোথাও গেল না! কিচ্ছু জানল না! বুঝল না।

বাবা বোঝেনি, নিভা কেন সরকারি হাসপাতালের জেদ ধরে ছিল। নিভার বর বোঝেনি,  নার্সিংহোমে কেন নেওয়া হয়নি তার বউকে। টাউনশিপের লোকেরা বোঝেনি, কেন মালবাজার না গিয়ে সাদা অ্যাম্বেসাডর ওদলাবাড়ি ফেরে নিভাকে নিয়ে। সে বোঝে, নিভার আলমারি কেনা জরুরি ছিল।

মাছের ঝোল দিয়ে মাখা ভাতগুলি তিন আঙুলে চটকাচ্ছে আভা। মুখের ফ্যাকাশে ভাবটা নেই। চুল পরিপাটি করে আঁচড়ানো। কে বলবে, তার বাচ্চা বুকের দুধ পাচ্ছে না তিনমাসের ওপর। সকালের আয়া এলে তবে আশিসের মা চানে যেতে পারে, বাসি কাপড় ছাড়ার সময়টুকু পাওয়া যায় না। অবাক হতে গিয়ে ক্রমশ রাগ হতে থাকে আর চোখ সরু হয়ে যায় রাগে। কেমন এই মেয়ের ধরন! বাচ্চা কি আর কারও হয় না! আভার ব্যবহারের কোনও ব্যাখ্যা পায় না আশিসের মা। প্রথম যেদিন জানতে পারা গেল, প্রেগনেন্সির কথা, তবে থেকেই কুঁকড়ে থাকে, ভয় তো হতেই পারে, তার নিজের হয়নি! কিন্তু আভা ঘর থেকেই বেরনো প্রায় বন্ধ করে দেয়, প্রায় রাতেই কান্নার আওয়াজ শুনতে পেত সে ছেলের ঘর থেকে। কানপাতা অর স্বাভাব নয়, কিন্তু তার কানের আওতায় এসব ঘটলে সেই বা কী করবে! এই জন্য সন্দেহ ছিল তার বরাবর। কালা বামুন আর কটা শূদ্দুর— কখনও বিশ্বাস নাই এদের। জাতপাত নিয়ে কথা বলতে রুচিতে বাধে। তেমন শিক্ষাদীক্ষাও না তার। কিন্তু তাই বলে নমশূদ্র মেয়ে ঘরে আনবে! তার মেজ বোন যখন চেপে ধরেছিল, এত মেয়ে দেখার পর শেষ পর্যন্ত ওদলাবাড়ির মেয়ে পছন্দ করল আশিস! কেমন পরিবার, কী জাত! সে শুধু বলেছিল, গরিব কায়স্থ পরিবারের মেয়ে, রেজিস্ট্রি করেই এক কাপড়ে সে মেয়ে ঘরে তুলবে। আশিসের কলেজেই পড়ে, তার মেনে নিতে কোনও সমস্যা নেই। মানিয়ে নেওয়া আভা, মেনে নেওয়া আভা তাকে স্বস্তি দিয়েছিল শুধুমাত্র তার বাপের পদবি রায় বলে। সেও কী কী করেনি আভাকে সব শিখিয়ে নিতে! মোচাঘন্ট, লাউবড়ি, মাছের কালিয়া, পোলাও, ইলিশ বিরিয়ানি, গোকুল পিঠে, পুডিং, ফ্রুট কাস্টার্ড— আশিস যা যা ভালবাসে সব হাতে ধরে শিখিয়েছে। আভার বিয়েতে পাওয়া লাল, গোলাপি শাড়িগুলো বিলিয়ে দিয়ে, ওকে পিচ, পেস্তা, ওয়াইন রঙের আভিজাত্য বুঝিয়েছে। আভা শিখতে দেরিও করেনি খুব। একসঙ্গে দিনবাজারে বহু দুপুর কাটিয়েছে ওরা, এই গলি সেই গলি ঘুরে।

এখন কোথাও যেতেও চায় না মেয়েটা। বাচ্চাটার যত্ন করতে শিখছে পারছে না! ওর মায়ের কাছ থেকে কিছু শিখতে পেরেছে কি না জানে না, অবশ্য ওই মহিলার সঙ্গে জীবনে একবারই দেখা হয়েছে আশিসের মায়ের। দ্বিতীয়বার দেখা হোক, এই ইচ্ছাও হয় না।

‘নিভা তুই আগুনের মালসার উপর দাঁড়িয়েছিস কেন?’

‘জানিস না, বাচ্চা হওয়ার পর সেঁক দিলে সুনা তাড়াতাড়ি ঠিক হয়, মা বলছে!’

‘তোর বাচ্চা হয়ে গেছে? কী রে হাসিস কেন?’

পা ফাঁক করে মালসার ওপর দাঁড়িয়ে আছে নিভা। শাড়িটা ঘের দিয়ে আছে জ্বলন্ত কয়লাভর্তি মালসা। নিভার মুখ থেকে ওর বোকা হাসিটা সরছে না। হাসতে-হাসতে নিভার শাড়িতে আগুন ধরে গেল মালসা থেকে, কোমরের নিচ থেকে গুটিয়ে চিমড়ে যাচ্ছে, যোনিতে আগুন ঢুকে পড়ছে, নিভা নড়ছে না কেন? মাংস পুড়ে থকথকে গোলাপি থেকে ক্রমশ কালো হয়ে ঝুলে পড়ছে, ‘নিভা সরে যা’, দু’পায়ের মধ্যিখানে আগুনের আঁচে উঠে বসে আভা। আগলহীন রক্তের ঢলে বিছানা ভিজতে থাকে আভার। বাঁশের পাতার মতো কাঁপুনি ধরে তার গায়ে। এক ধারসে ভিজতে থাকা কাঁথা বালিশের পুটুলির মধ্যে এই হাত-পা নাড়া মাংসের পিন্ডটা তার শরীরের থেকে বেরিয়েছে! চোখের ভাঙা টুকরোগুলো জুড়তে চায় আভা, ক্লান্ত মস্তিষ্ক হাল ছেড়ে দিতে থাকলে সে ছেতড়ে বসে থাকে খালি… মনিদুটো পাথরের মতো ভারি হয়ে আসে…

সে কখনও বারণ করেনি আশিসকে, হিসেবের ওই ঊর্বর দিনগুলো ছাড়া। সেদিন, সে না করেছিল। তার রুচিবান স্বামী তাকে জোর করেনি। কিন্তু রাতের কোন সময়টাতে সে জানে না, ঘুম ভেঙ্গে যায় ময়াল সাপের মত আশিষের হাতের চাপে, একটা শব্দও মুখ থেকে ছিটকে উঠতে পারে না, আশিসের হিসহিসানির নিচে চাপা পড়ে যায় ‘চাঁড়াল মাগি তুই আমায় না করিস? তোর চোদ্দপুরুষের ভাগ্য এ-বাড়িতে ঢুকতে পেরেছিস? আর কখনও না করবি ছোটলোক শালী?’ আশিসের শক্ত থাইয়ের তলায় তার পাদুটো থেকে মাংস আলাগা হয়ে আসে, ওর থাবায় আটকে থাকা মুখ হাঁ করে বাতাস নিতে চাইলে আশিস থাবা আরও টাইট করে, বেরিয়ে আসা চোখ দিয়ে সে অন্ধকার দেখে, ঘিসের বুকের অন্ধকার, বাগরাকোটের অন্ধকার, মানাবাড়ি চা বাগানের অন্ধকার! জলশূন্য ঘিস তার সমস্ত বালিপাথরসমেত তার যোনিতে ঢুকে পড়ে! গলে যাওয়া পায়ে  কখন সাড় এসেছিল, মনে নেই তার। ব্যথার কোঁকানিতে গলা চিড়ে আসতে চাইলে, নিজের থেঁতলানো ঠোঁট সে নিজেই চেপে ধরে।

জল শুকিয়ে গেলে ঘিসের বুকের পাথর ধারালো হয়ে যায়, খালি পায়ে ফুটে যাওয়া পাথরের কুচির খচখচানি জানান দেয়, ঘিসে জল বাড়বে আবার, পাথরের ধার কমে আসবে শ্যাওলায়। সে আর যাবে না জল দেখতে, খোচাবস্তির দীপন তামাংয়ের বাড়ির রাস্তা নিভা মনে রাখুক। কিন্তু শুয়োরের মাংসের স্বাদ মুখের ভেতর ঝলকানি দিয়ে ওঠে, চুলের গোড়ায় বিন্দু বিন্দু হাউস জমতে থাকে তার।

‘কী রে? গেছে সব গন্ধ?’

‘কীসের গন্ধের কথা কইস তুই?’

‘ক্যান? তুই শুনিস নাই কলেজের বান্ধবী তোরে কইছিল না, ওদের গায়ে তেলচিটা গন্ধ?’

‘আমাকে তো কয় নাই, যাদের কইসে তারা বুঝুক গা!’

ড্রেসিং টেবিলের সামনে বিভিন্ন রকমের পারফিউমের বোতল, আশিস সুগন্ধি উপহার দিতে ভালবাসে।

‘দেখিস না কত সেন্ট আমার?’

‘তাহলে এমন গন্ধ ক্যান ছাড়ে ক্যান?’

‘কেমন গন্ধ?’

‘বাইম মাছের ভর্তা খায়ে মুখ ধুইস নাই য্যান!’

‘এই সব ছোটলোকের মাছ এই বাড়িতে উঠে না, যাহ তুই এই খান থেকে, যাহ!’

‘তুইও চহ, কী নিবি তুই? ঘিস লিস না চেল?’

‘তুই কী নিবি?’

‘আমি নিব ঘিস!’

‘আমিও তাই!’

ঘিসের বুকে জল শুকিয়েছে। এক-দুটো সরু ধারা তিরতির করে বালি ভেজায় শুধু, তাদের দুই বোনের পা-ও ভেজে না তাতে। নিভার মুখটা সাদা লাগে চাঁদ পড়ে। বাঁধের ওপারে মড়া পোড়ায় কারা? খোচাবস্তির কেউ মরল? টাউনশিপের কেউ হলে জানা যেত! এগিয়ে যাবে সে? নিভার বর কেন ওখানে, কোলের বাচ্চাটা তো নিভার! কাঠগুলো ভেজা বলে এত ধোঁয়া হচ্ছে নাকি! ধোঁয়ার মধ্যে থেকে নিভার মুখ দেখা যাচ্ছে ,সব রক্ত বেরিয়ে যাওয়ার পর সাদা মুখ। নিভার বডিটা পোড়া অবধি অপেক্ষা করতে পারে না সে। চাঁদের রাতে সে চিনতে পারে না বাতাবাড়ি চা বাগান না মানাবাড়ি এটা! আশিস স্টিয়ারিং ঘোরাচ্ছে, ‘আভা, পড়ে আসা বিকেলে চা বাগান কী মার্ভেলাস লাগে! নরম আঙুলে পাতা তোলে মেয়েরা’, 

দীপনের বউ দায়ের কোপ দিচ্ছে শুয়োরটার ঘাড়ে, মানাবাড়ি বাগান থেকে বেরিয়ে আসছে পাতাতুলুনিরা, জোঁক ছেকে ধরেছে পা-গুলোয়, ‘কাপড়ে রক্ত লেগে আছে গো তোমাদের ,জলদি কর, জোঁক ছাড়াও’, লবণ খুঁজে পাচ্ছে না সে রান্নাঘরে, মাকে ডাকছে , মা থাবা দিয়ে ঘিসের বালি খুঁড়ছে কেন! বালি না? তবে কি লবণ! চোখের মধ্যে লবণ উড়ে এসে পড়ে, তিস্তা কি চেল কি ঘিস সে বুঝতে পারে না স্পষ্ট! ‘মার্ভেলাস ডুয়ার্সের এই পাহাড়-জঙ্গল’, আশিসের হাত ধরে আছে ওর দাদু, ওরা কি ক্রান্তির জঙ্গলের দিকে যাচ্ছে! ‘জলপাইগুড়ির কালচারটা নষ্ট করে দিল বাইরে থেকে আসা ছোটলোকগুলো!’ চুকচুক করছে আশিসের দাদু… আভার ডাক শুনতে পাচ্ছে না দু’জনের কেউ… খোচাবস্তির ওরা হাড়িয়া খাচ্ছে বড় পোস্ট অফিসের সামনে পাকা রাস্তার মাঝখানে, সরছে না কেন রাস্তা থেকে, গাড়ি চাপা পড়বে তো! চিনতে পারছে না ওরা আভাকে! মানাবাড়ি চা বাগান জলপাইগুড়ির পোস্ট অফিসের পিছনেই! এত দিন সে জানল না! মাথার ভেতরটা কেমন আউলায় যায়! দিশা পায় না আভা! সে কি তিস্তা ব্যারাজের এপারে চলে এসেছে না ওপারে!

আশিসের মা এই সময় পুজো করেন, দিনের বেলার আয়া আজ আসবে না বলে গেছে। আভা মন দিয়ে দেখে বাচ্চাটাকে। আশিসের মতোই চাপা রং, কালো চোখের মণি। গালে টোল পড়ে আশিসের মতোই। বাপের বাড়ি থেকে তো নিয়ে আসেনি সে, এই ছেলে আশিসেরই। হামা দিতে শিখেছে বাচ্চাটা। বালিশের ঘেরাটোপ দিয়ে গেছে আশিসের মা যত্ন করে। মেঝে আর খাটের মাঝে বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গা। ছোট-ছোট হাত পা এলোমেলো করে দিচ্ছে বালিশ, এক-একবার খাটের কিনারায় চলে আসছে বাচ্চাটা, আবার সরে যাচ্ছে, পড়ে যেতে পারে এখনই… খাটের ধারের স্ট্যান্ডটা ধরে দাঁড়িয়েছে , টলমলাচ্ছে… বালিশগুলো ঠিক করে দিলেই হত…

আভা জানলার বাইরের নারকেল গাছে বসা কাঠঠোকরার থেকে নজর সরাতে পারছে না…