ব্লাডি উইক

ঘড়ঘড় শব্দে পুলিশের ভ্যান এসে দাঁড়াতে ভিড় সচকিত হল। কালো জাল দেওয়া জানালার ওপাশে থমথমে অন্ধকার। পেটের ভেতর একটু পরেই এক-এক করে বন্দিদের ছুড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু ভ্যানটা ইতস্তত করতে-করতে দাঁড়িয়ে গেল। সামনের ব্যারিকেডে গিয়ে ধাক্কা মারার সাহস নেই। বাঁশের মাচা, মাঝে মাঝে টিন, তার গা বেয়ে ঝুলছে ছেঁড়া জামাকাপড়, লোহার বাক্স, ক্যানেস্তারা। প্রথম দেখায় মনে হবে নড়বড়ে। একটা লাথিতে ভেঙে পড়বে। কিন্তু কে না জানে, যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুকে হালকাভাবে নিতে নেই! ভ্যান থেকে নেমে ড্রাইভার আড়মোড়া ভাঙল, ‘আমি আর এগোচ্ছি না স্যার। ফালতু কাচ ভাঙবে। মুড়িমুড়কির মতো পাথর ছুড়ছে।’

লোকাল থানার ইনস্পেক্টর বিমল আইচের ভুরু কুঁচকে গেল। ধমকাতে গিয়ে থেমে ভাবল সে। তারপর পাশে দাঁড়ানো কনস্টেবলের কানে-কানে কিছু বলল। কনস্টেবলের চোখ বিস্ফারিত হল। কঠিন মুখে বিমল বলল, ‘যা বললাম করুন।’

‘লোকটাকে মেরে ফেলবে স্যার।’

‘যাতে না মারে তার জন্যই ব্যবস্থা নেওয়া।’ আর জবাবদিহি করবে না, এই ভঙ্গিতে মুখ ঘুরিয়ে নিল বিমল আইচ।

বিজবিজে রোদ কানের তলায় সইয়ে নিতে-নিতে ‘অমৃতকাল’ কাগজের সাংবাদিক সপ্তর্ষি কুণ্ডু প্রশ্ন করল, ‘কখন মুভ করবেন? এক ঘণ্টা হল দাঁড়িয়ে আছি। অফিস থেকে মাথা খেয়ে নিচ্ছে।’

রক্তাক্ত সূর্য মাথার ওপর। আগুনের হলকা নামছে। কপালের ঘাম মুছে আইচ বলল, ‘করব বললেই হয় না কি? ওয়াটার ক্যানন অ্যারেঞ্জ করতে কম ঝামেলা সইতে হয় না মশায়। তারপর প্রেস, হিউম্যান রাইটস। সব দিক বাঁচিয়ে না চললে— আপনারাই তো এতদিন আমাদের খিস্তি করে এসেছেন।’

‘ভেতরে মহিলা এবং শিশুদের ব্যাপারে কোনও প্রোটেকশন কি নিচ্ছেন?’

‘একটা গোটা সপ্তাহ ঢুকতে দেয়নি। আপনার মনে হয় ওদের মেয়ে বা বাচ্চাগুলো কমপ্লিসিট নয়? আরশোলার জাত মশায়— যাক গে ছাড়ুন ওসব। ব্যবস্থা তো নিতেই হবে।’

‘ভেতরে ঢুকে যদি দেখেন সামনে বাচ্চাদের এগিয়ে দিয়েছে?’

‘সেসবের জন্য মেজার নিতে হবে।’ রহস্যময় ভঙ্গিতে ভুরু নাচাল আইচ। ‘ক্রমশ প্রকাশ্য। থানায় আসুন আজ সন্ধেবেলা। মুড ভাল থাকলে এক্সক্লুসিভ দিতে পারি। একটা ভাল প্রোফাইল ছবি নেবেন কিন্তু!’

নবনগর বস্তির চারপাশ লোকে লোকারণ্য। ভিড়ের সামনে উঠে গেছে ব্যারিকেড। ভেতরে ঢোকার উপায় নেই। সেখানে কী হচ্ছে কেউ জানে না। লোকাল থানা দ্রোন ওড়াতে চেয়েছিল। পারমিশন মেলেনি। ভেতরে টেররিস্টরা থাকতে পারে। মাওবাদীরাও। গুলি করে দ্রোন নামালে সরকারি ক্ষতি।

সপ্তর্ষির চোখে পড়ল, কয়েক সার পুলিশবাহিনী একটার পর একটা বৃত্ত তৈরি করেছে। তাদের ফাঁকফোকর দিয়ে মেডিক্যাল ভ্যান, অ্যাম্বুলেন্স, মিডিয়ার গাড়ি। স্থানীয় লোকেরা আশেপাশে জটলায়। তাদের ধমক দিয়ে সরিয়ে দিলেও আবার ভিড় করছে। হাতে কাজ না থাকায় লুঙ্গি-গামছা পরা একজন আধবুড়োকে ধরল সপ্তর্ষি। লোকটা মাতব্বরের ভঙ্গিতে ভিড় নিয়ন্ত্রণ করছিল। ভাল স্টোরি না পেলে এরকম কয়েকজনের বক্তব্য ছাপিয়ে দেবে।

‘আপনি কি এখানকার বাসিন্দা?’

নাক খুঁটতে-খুঁটতে নির্বিকার লোকটা উত্তর দিল, ‘পাশের পাড়া।’

‘কিন্তু নবনগর বস্তির ভেতর আপনার যাতায়াত আছে?’

‘সে অনেক আগে ছিল। এখন যাই না। ওরা সব বাংলাদেশি। ইললিগাল। কোথায় ফেঁসে যাব!’

‘এই অচলাবস্থা কবে থেকে?’

সন্দেহের চোখে সপ্তর্ষিকে দেখতে-দেখতে লোকটা জিজ্ঞাসা করল, ‘কোন কাগজ?’ প্রেস কার্ড দেখার পর মুখ ভ্যাটকাল, ‘আপনার কাগজ লোকে পড়ে? ধুর মশায় যান তো, ফালতু সময় নষ্ট। আমি কিছু বলি তারপর গভমেন্ট টিকটিকি সবাই আমার গাঁড়ে লাগুক আর কি!’

লোকটা পিছু ফিরতে তার কাঁধে হাত দিল সপ্তর্ষি। নরম গলায় বলল, ‘নামধাম বলব না। বলুন না!’

ইতস্তত করে বেজার মুখে উত্তর দিল, ‘দিন সাতেক হয়ে গেল। মাঝরাতে আখাম্বা বাঁশের কেল্লা তুলে দিয়েছে। কাউকে ভেতরে অ্যালাও করছে না। দেখছেনই তো সব!’

‘বস্তির লোকেরাও বাইরে আসছে না?’

‘নাহ্‌। তার আগে অবশ্য খুবই আসত। যখন জল বন্ধ করে দিল ওদের, কারেন্টের তার কেটে দিল, কয়েকদিন হল্লা মাচিয়েছিল। প্রেস এসেছিল। মেডিক্যাল ক্যাম্প করেছিল ডাক্তাররা। খুব থানা-পুলিশ, এমএলএ, কোর্ট-কাছারি হল কয়েকদিন। তারপর যখন কিছুতেই কিছু হল না, সব থিতিয়ে গেল, তখন সবার আসা-যাওয়া বন্ধ হল। ওরাও ঝিমিয়ে গেল। তারপর একদিন রাত্রিবেলা বড়-বড় মাচা তুলে দিল।’ লোকটা পিছু ফিরে চেঁচিয়ে উঠল ভিড় উদ্দেশ্য করে। কাকে যেন ধমকাল। পুলিশের এক কনস্টেবল এসে তার কাঁধে হাত দিয়ে টেনে নিয়ে গেল দূরে।

সপ্তর্ষির ফটোগ্রাফার প্রবীর একপাশে দাঁড়িয়ে টুকটাক স্ন্যাপ নিচ্ছিল। এগিয়ে এসে নীচু গলায় বলল, ‘বাজে অবস্থা। মেডিক্যাল টিম সন্দেহ করছে ভেতরে কয়েকটা মাল মরে ঝড়ে গেছে।’

‘কেন?’

‘সাতদিন কেউ বাইরে বেরোয়নি। জল বন্ধ। খাবে কী? স্নান, টয়লেট, সব কীভাবে হয়েছে কেউ জানে না।’

‘তার আগে কীভাবে হচ্ছিল?’ এই বিটটা সপ্তর্ষি করেনি। সে কিছুই জানে না। আজ সকালে খবর পেয়েছে নবনগর বস্তিতে পুলিশ ঢুকবে। যে-রিপোর্টার এটা কভার করছিল, সে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে। চিফ রিপোর্টার তড়িঘড়ি পাঠিয়েছে তাকে। যেটুকু হোমওয়ার্ক, আসতে-আসতে করা।

‘তার আগে কাছের গঙ্গায় ছেলেপুলে স্নান করছিল। সেই জল থেকে ওদের চামড়ায় রোগ হচ্ছিল। সেই নিয়ে হইচই হয়েছে। মেডিক্যাল ক্যাম্প বসেছে। কর্পোরেশনের জলের গাড়ি আসছিল কিছুদিন। তারপর সেটাও বন্ধ হয়। এখন কেউ জানেই না, কীভাবে সাস্টেইন করছে ওরা।’

‘আশ্চর্য!’ বিড়বিড় করল সপ্তর্ষি। একটা আধ বর্গকিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বস্তির লোকজন একদিন সকালবেলা উঠে আবিষ্কার করল তাদের জল এবং ইলেকট্রিসিটি বন্ধ হয়ে গেছে। তারপর প্রশাসনের দরজায় হত্যা দিয়ে পড়ে থেকে যখন লাভ হল না, দুম করে এক রাত্রে নিজেদের গোটা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিল। গত সাতদিন বাইরের কাউকে ঢুকতে দেয়নি। জোর করে ঢুকতে গিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা উপহার পেয়েছে পাথর, অ্যাসিড বালব, পাঁকভর্তি ব্যাগ। দুজন পুলিশ আর একজন স্থানীয় মানুষ আহত হয়েছে। ভেতরে কি সত্যিই নাশকতামূলক কাজ চলছে? সাতদিন ধরে বাচ্চাবুড়োরা টিকে আছে কীভাবে?

একটা হল্লা উঠল। পিছু ফিরে দেখা গেল, স্থানীয় কাউন্সিলর আগরওয়াল বোলেরো থেকে নামছে। মুহূর্তে জটলা ঘিরে ধরল। ভিড় ঠেলে কোনওরকমে ভেতরে ঢুকতে গিয়ে সপ্তর্ষির কানে এল অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের প্রশ্ন।

‘স্যার সরকার কী স্টেপ ভাবছে?’

‘আপনারা কি আহতদের চিকিৎসার ব্যাপারে কিছু ভেবেছেন?’

‘এটাকে কি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ফেইলিওর হিসেবে দেখছেন?’

চোখ থেকে রেব্যান খুলে রুমালে কপাল মুছল আগরওয়াল। গাড়ির বনেটে হেলান দিয়ে গলা তুলল, ‘শুনিয়ে। আমার কথাটা মন দিয়ে শুনুন। ইয়ে লোগ, যাদের নিয়ে আপনারা এত ভাবছেন, এরা সব বাংলাদেশি। এদের গরিব ভাববেন না। আপনাদের নেক্সা গাড়ি আছে? এদের আছে—’

‘কিন্তু এদের নাম তো ভোটারলিস্টে উঠেছে।’ সপ্তর্ষি বলে উঠল। কেউ-কেউ সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল।

‘কীভাবে নাম ওঠে আপনারা জানেন না? এদের কারোর-কারোর বাপ-দাদা এখানে চলে এসেছিল। উন লোগোকে পাশ ইন্ডিয়ান পাসপোর্ট হ্যায়। আর বাকি যারা এখানে আছে, আপনারা খোঁজ নিন। কবে এসেছে।’

‘কিন্তু তার জন্য এদের জল বন্ধ করে দেওয়া কি লিগাল?’ ইংরেজি কাগজের একটা বাচ্চা মেয়ে প্রশ্ন করলে আগরওয়াল ঠান্ডা চোখে তাকে মাপল। পা থেকে মাথা। মেয়েটা অজান্তে এক পা পিছিয়ে গেল।

‘দেখিয়ে ম্যাডাম, জল আমি বন্ধ করিনি। যারা করেছে তাদের পুছতাছ করুন। আমি শুধু বলছি, এই লোকগুলোর ক্যারেকটার নিজেরাই দেখতে পাচ্ছেন। ব্যারিকেড তুলে দিয়ে ভেতরে মুক্তাঞ্চল ঘোষণা করে যারা, তাদের কি ঠিক লোক বলে মনে হয়? আমি পুলিশকে বলেছি বুলডোজার আনতে। ইয়ার্কি হচ্ছে না কি? ল অ্যান্ড অর্ডার নেই?’

‘কিন্তু তারপর কি জল আর ইলেকট্রিসিটি ভেতরে যাবে?’

‘আরে এক বাত বলে যাচ্ছেন!’ খেঁকিয়ে উঠল আগরওয়াল। ‘যে বন্ধ করেছে তাকে বলুন এসব।’

‘কে বন্ধ করেছে?’

‘আমি কী করে জানব? বাংলাদেশিদের ভেতরের ঝামেলা এসব। এরা ভোট কাকে দিয়েছে, কোন পার্টিকে, জানেন? আমি এদের কেন হেল্প করব?’

সম্মিলিত গুঞ্জন উঠল প্রেসের ভেতর, ‘এর ভেতর ভোট কেন আসছে?’ ‘আপনাকে যারা ভোট দেয়নি, তাদের হয়ে আপনি কাজ করবেন না?’ ‘এ তো অসাংবিধানিক।’ ‘যে নাগরিক নয় তারও জল প্রাপ্য।’ কিন্তু আগরওয়ালের কথা শেষ হয়ে গিয়েছিল। সে পুলিশকে ইঙ্গিত করল। খচাখচ ছবি উঠছিল তখন। পুলিশ এসে জটলা সরিয়ে দেবার সময়ে আগরওয়াল আবার গলা তুলল, ‘সরকার হিউম্যানলি দেখছে। মেডিক্যাল টিম এসেছে। কিন্তু আনলফুল অ্যাক্টিভিটি বরদাস্ত করা হবে না। ভেতরে যদি টেররিস্টরা থাকে, তাহলে পুলিশ ব্যবস্থা নেবে।’

ভিড় থেকে একটু দূরে সরে ইংরেজি কাগজের মেয়েটা নোট লিখছিল। সপ্তর্ষি তার পাশে দাঁড়িয়ে নীচু গলায় বলল, ‘আপনার মুখ চিনে রাখল কিন্তু।’

‘ছাড়ুন।’ বিরক্ত মুখে নোটবুক বন্ধ করল। “বুম নিয়ে যারা নেতাদের পেছনে ঘোরে, তাদের এসব ভয় থাকবে। ‘খবর সন্ধিক্ষণ’-এর অমিতকে দেখলেন? সারাক্ষণ সিম্পিং করে গেল। ‘দাদা আজ সন্ধেবেলা আপনার বাড়িতে যাব।’ অসহ্য! অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কী চাইছে বলুন তো? পুলিশ কর্পোরেশন সবার সঙ্গে কথা বলেছি। এরা চাইছে বস্তি থেকে রাস্তা অবরোধ হোক। নাহলে বাওয়াল করুক। তাহলেই উচ্ছেদ করে দেবে। কোন রিয়েল এস্টেট কত টাকার ইনভেস্টমেন্ট নিয়ে ওত পেতে আছে, সব রেকর্ড আছে আমার কাছে। ছাপতে না দিলে ব্লগ করে দেব।”

গনগনে রোদে মেয়েটার মুখ লাল। দাঁতে ঠোঁট টিপে আছে। দিমাগি নকশাল? শব্দবন্ধটা মনে হতে হেসে ফেলল সপ্তর্ষি। আসলে তো সবই পাপী পেটের সওয়াল। পাশের দোকান থেকে চা অফার করাতে মেয়েটা মাথা নাড়ল। ওর নাম মোহনা। চব্বিশ-পঁচিশের বেশি বয়স নয়। সবে বিট করছে। রক্ত এখনও গরম। প্রবীর সপ্তর্ষির পাশে দাঁড়িয়ে তোলা ছবিগুলোর কোয়ালিটি পরখ করছে।

মোহনা বলে উঠল, ‘জানেন, এসবের আগে আমি নবনগরে ঢুকে কভার করে এসেছি। লোকজন কীভাবে ছিল, ভাবতে পারবেন না।’

প্রবীর আর সপ্তর্ষি কৌতূহলী চোখে তাকাল। তারা নিজেরা কেউ ভেতরে ঢোকেনি। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ কাজে আসবে। পেছনে যান্ত্রিক ঘড়ঘড় আওয়াজে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, দুটো ওয়াটার ট্যাংক এসে দাঁড়িয়েছে। উদ্যত কামানের কালো গম্ভীর ফলা। স্থানীয়দের ভিড় থেকে হো হো করে আওয়াজ উঠল। বুম হাতে ছুটছে কয়েকজন। মাটিতে প্রায় শুয়ে পড়ে একজন ফটোগ্রাফার ছবি তুলছে। প্রবীর সেদিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল, ‘যত নাটকবাজি!’

‘কী দেখেছেন?’

সালোয়ার কামিজের ওড়না মাথায় জড়িয়ে নিল মোহনা। কোমরে হাত দিয়ে বলল, ‘নরকে যেভাবে থাকে মানুষ। কমন টয়লেটগুলো নোংরায় উপচে পড়ছে। গন্ধে হাঁটা যায় না। জল আনতে এক কিলোমিটার পাড়ি দিচ্ছে মেয়েরা। বাচ্চাদের গায়ে লাল চাকা-চাকা ঘা। সবাই ভোর হবার আগে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। কেউ জল আনতে। কেউ বাইরে গিয়ে প্রাতঃকৃত্য করতে। গঙ্গার ধারে সার বেঁধে বসে পড়ছে মানুষ। লজ্জাশরমের বালাই রাখলে চলবে না। মেয়েরা সন্ধের পর যাচ্ছে, যাতে দিনের আলোয় বেআব্রু না হতে হয়। আমি কয়েকজনের ইন্টারভিউ নিয়েছিলাম। আমিনা বিবি। মোস্তাফ রহমান। মানিনী আহমেদ। কারোর তিন পুরুষ এই বস্তিতে। কেউ মুর্শিদাবাদ-নদিয়া থেকে কাজের খোঁজে চলে এসেছে।’

‘কিন্তু এরা ব্যারিকেড তুলে দিল কেন?’

‘জানি না। আমি তিনবার এসেছি। দু’বার স্টোরি করেছি আর একবার আমার পার্সোনাল ব্লগ। এরা চুপচাপ হয়ে যাচ্ছিল। বাইরের লোকদের বিশ্বাস করত না। নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলত আর আমাদের দিকে আঙুল তুলে দেখাত। শেষবার এসেছি যখন, সন্ধেবেলা। গোটা বস্তি কুপকুপে অন্ধকারে ডুবে। এখানে-ওখানে ল্যাম্পের আলো জ্বলছে। সেই আলোয় ইতিউতি অস্পষ্ট মুখ উঁকি মারছিল। হলুদ, সন্দেহগ্রস্ত। হেঁটে যেতে ভয় লাগছিল আমার। আমার যে-সোর্স ছিল, সে বলল, ‘দিদি আপনি আর আসবেন না আপাতত কিছুদিন। আপনার জন্য আমাকেও সন্দেহ করছে ওরা।’ তারপর একদিন খবর পেলাম, বস্তির ভেতর বাইরের লোকের ঢোকা নিষেধ করে দিয়েছে। নিজেরাও বেরোচ্ছে না। মেডিক্যাল ক্যাম্প করেছিল যে-ডাক্তারদের অর্গ, সেখানে ফোন করলাম। তারাও অন্ধকারে। কিন্তু লোকগুলো খাচ্ছে কী? জল কোথায় পাচ্ছে?’ মোহনার গলা কেঁপে গেল। ‘বেঁচে আছে তো?’

প্রবীরের দিকে আড়চোখে তাকাল সপ্তর্ষি। যদি সত্যিই কোনও ক্যাজুয়ালটি ঘটে থাকে, বিরাট খবর। গত সাতদিন ধরে নবনগরের ভেতর থেকে কোনও শব্দ আসেনি। প্রাণের স্পন্দন আসেনি। যেন মাটির তলায় ঢুকে গেছে সবাই। না কি সবাই গণ-আত্মহত্যা করল? অথবা, আগরওয়াল যেমন বলে গেল, ভেতরে টেররিস্ট কাজকর্ম চলছে? পর পর কয়েকটা নাম সপ্তর্ষির অভ্যস্ত মনের পাতায় টেলিপ্রম্পটারের মতো ভেসে উঠল— খাগড়াগড়, কান্দাহার, নিউটাউন, আমেরিকান সেন্টার। তারপর নিজের মনে মাথা ঝাঁকাল। বেশি ভাবছে।

বিমল আইচ এগিয়ে এল সপ্তর্ষিদের দিকে। চাপা গলায় বলল, ‘পজিশন নিন। শুরু হবে।’

‘বুলডোজার?’

‘দেখতেই পাবেন।’ আইচ তাদের ফেলে এগিয়ে গেল।

‘কভার নিন আপাতত। কমপ্লিট কেওটিক পরিস্থিতি হতে পারে।’ মোহনাকে বলল প্রবীর।

মোহনা মাথা ঝাঁকিয়ে রাগী চোখে তাকাল। দিমাগি নকশাল, আবার মনে হল সপ্তর্ষির। সারাক্ষণ রেগে আছে। ‘এত সেফ খেলতে ভাল লাগে আপনাদের? কী ঘটছে, দেখছেন না? সভ্য দেশে হয় এমন?’

সপ্তর্ষি অন্যমনস্ক চোখে ব্যারিকেডের দিকে তাকাল। বস্তিতে ঢোকার তিনটয়ে এন্ট্রান্স। তিনদিকেই ব্যারিকেড। তাদের সামনে কাতারে-কাতারে পুলিশ। ধীর লয়ে পুলিশবাহিনী এগোচ্ছে। সতর্ক চোখে মেপে নিচ্ছে অ্যামবুশের সম্ভাবনা।

এসিপি শ্রীমন্ত পুরোহিত জিপের সামনে এসে দাঁড়াল। সপ্তর্ষির সঙ্গে ভাল খাতির আছে। কিন্তু এখন দেখলে চিনতে পারবে না। মাইক হাতে গলা তুলল, ‘নবনগরের বাসিন্দাদের বলছি। প্রশাসন রিকোয়েস্ট করছে, আপনারা ব্যারিকেড তুলে নিন। আমরা পিসফুলি ঢুকতে চাই। আমরা চাই না কোনওরকম অশান্তি হোক। আমরা অনুরোধ করছি, আমাদের ঢুকতে দিন।’

কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ। বস্তির ভেতর থেকে কোনও সাড়াশব্দ এল না। সপ্তর্ষি দাঁড়িয়েছিল মেডিক্যাল ভ্যানের গায়ে হেলান দিয়ে। প্রবীর ছবি তুলতে সামনে এগিয়ে গেছে। মোহনা ভিড়ের মধ্যে উধাও। ভ্যানের খোলা দরজার ভেতর এক বৃদ্ধ ডাক্তারবাবুকে বসে থাকতে দেখল সপ্তর্ষি। ভদ্রলোক ঘেমে উঠেছেন, গরমে এবং টেনশনে। সপ্তর্ষির দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করলেন, ‘ভালয়-ভালয় মিটে যাক সব।’

প্রেস কার্ড দেখিয়ে সপ্তর্ষি প্রশ্ন করল, ‘কী মনে হয়? মেডিক্যাল ইন্টারভেনশন লাগবে?’

ইতস্তত করলেন ডাক্তারবাবু। ‘জানি না, ওরা জলের সোর্স অন্য কোথাও থেকে পাচ্ছে কি না। না পেলে, সিরিয়াস অবস্থা হতেই পারে। কার কী কোমর্বিডিটি আছে—’

‘কিন্তু প্রশাসন তো চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে গত কয়েকদিন। বাইরে থেকে জল ঢোকার উপায় নেই। তাহলে সাস্টেইন করছে কীভাবে?’

‘আমি বলতে পারব না।’ মাথা নাড়লেন ডাক্তারবাবু। ‘নো কমেন্ট।’

‘হঠাৎ করে একটা কমিউনিটিতে এরকম জল বন্ধ করে দেওয়া কি মেডিক্যালি আনএথিকাল নয়?’

ভীত চোখে তাকিয়ে ডাক্তারবাবু বিড়বিড় করলেন, ‘আমায় এসব প্রশ্ন কেন করছেন? আমি কিছু জানি না।’

নিঃশ্বাস ফেলে ভ্যানের দরজা বন্ধ করল সপ্তর্ষি। ‘সাবধানে থাকবেন ডাক্তারবাবু। দিনকাল ভাল নয়।’ ডাক্তারবাবু নীরবে ঠোঁট চাটলেন।

শ্রীমন্ত পুরোহিত আরও দু’বার মাইকে অনুরোধ জানাল। কোনও ফল হল না। কয়েক মিনিট অপেক্ষার পর পুলিশবাহিনীর দিকে তাকিয়ে ঘাড় নাচাল।

সার বেঁধে পুলিশ, সাংবাদিক, মেডিক্যাল ভ্যান এগোচ্ছিল। তাদের পেছনে ওয়াটার ট্যাংক। আশপাশের বাড়ির বারান্দায় ছাদে লোকের ভিড়। সপ্তর্ষি দেখল, তার পাশে মোহনা উদয় হয়েছে আবার। চাপা গলায় বলল, ‘পেছন দিকটা ঘুরে এলাম। পুরোটা ব্লক। যদি পুলিশ লাঠিচার্জ করে, বেরোনোর রাস্তা নেই ওদের।’

‘খামোখা লাঠিচার্জ করবে কেন?’

‘রেজিস্টান্স কী আসে, কেউ তো বুঝছে না। আমার সোর্সকে ফোনে ধরার চেষ্টা করেছিলাম। সুইচড অফ। স্বাভাবিক। ইলেকট্রিক নেই। ফোন চার্জে দিতে পারছে না। অবস্থাটা বুঝছেন? গোটা বস্তিটা ব্ল্যাক হোল হয়ে আছে।’

তখন পেছন থেকে ঘড়ঘড় শব্দ হল। বুলডোজার আসছে। অভ্যেসবশত ঘাড় ঘোরাল সপ্তর্ষি ও মোহনা। এবং তারা পাথর হয়ে গেল।

বুলডোজারের নাকের ওপর একটা লোককে হাত-পা বেঁধে বসানো। সপ্তর্ষি চিনতে পারল— এই আধবুড়ো লোকটাকেই একটু আগে প্রশ্ন করছিল। পুলিশের সহযোগী হয়ে ভিড় সামলাচ্ছিল যে। লোকটার মুখ বাঁধা। চোখ ঠিকরে আসছে। ভয়ে কাঁপছে থরথর করে। মোহনা পাগলের মতো ছুটে গেল শ্রীমন্ত পুরোহিতের দিকে। ‘দিস ইজ ইনহিউম্যান। আপনারা করতে পারেন না।’

শ্রীমন্ত পুরোহিত প্রথম কথা বলতে চাইছিল না। মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছিল। চারপাশে প্রবল হট্টগোল আর ফ্ল্যাশলাইটের ঝলকানি। শেষে মোহনা তার বেল্ট ধরে প্রায় ঝুলে পড়ার উপক্রম করায় কঠিন গলায় বলল, ‘আমাদের ডিউটি করতে দিন ম্যাডাম। আপনারা কভার করুন।’

‘আপনারা এভাবে হিউম্যান শিল্ড বানাচ্ছেন—’

‘ভেতর থেকে যেভাবে পাথর ছুড়ছে, আপনার এত সিমপ্যাথি থাকলে নিজে ভেতরে ঢুকুন। কিছুক্ষণ পরে যদি বোম ছোড়ে, আমাদের দায়িত্ব নেই, আগে থেকে বলে রাখছি।’

‘আর এই ভদ্রলোকের সিকিওরিটি?’

‘ইনি কনসেন্ট দিয়েছেন। কাগজ দেখে নিন।’

আশপাশ থেকে চিৎকার উঠল। ‘কাগজের পেছন মারি। জোর করে সই করিয়েছে।’ স্থানীয় মানুষেরা ফুঁসছে। শ্রীমন্ত ইশারা করল। পুলিশ ছুটে গেল ভিড় হঠাতে। সপ্তর্ষির চোখে পড়ল, দূরে আগরওয়ালের বোলেরো গাড়ি দাঁড়িয়ে। গাড়ির ভেতর আগরওয়ালের থাকার কথা। কিন্তু কালো কাচের ওপারে কী হচ্ছে বোঝা যাচ্ছে না।

বুলডোজার ধীরে-ধীরে ব্যারিকেডের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ভিড় নিস্পন্দ। ব্যারিকেডের ওপাশ থেকে সার-সার চোখ কি দেখছে? অথবা দ্বিধাগ্রস্ত? পাথর ছুড়তে চেয়েও পারছে না কারণ বুলডোজারের সামনে হাত-পা বাঁধা তাদেরই চেনা কেউ। অথবা এসব কিছুই নয়। লক্ষ করার মতো কেউ হয়তো নবনগরের ভেতরে আর বেঁচে নেই।

তখন হঠাৎ করেই সপ্তর্ষির প্রবল তেষ্টা পেল। আগুনঝরানো আকাশের নীচে নো-ম্যানস ল্যান্ডে দাঁড়িয়ে তার মনে হল, কেউ যদি এখন তাকে এক ট্যাংক জল দেয়, পুরোটা ঢকঢক করে খেয়ে ফেলতে পারে এবং তারপরেও বুক শুকিয়ে কাঠ হয়ে থাকবে। আচ্ছা, যদি এমন হয় যে বুলডোজারের মোকাবিলা করতে অন্তত একজন নবনগরের পেটের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল? আসুক। সে এসে দাঁড়াক বুলডোজারের সামনে। তার নাকের ওপর ঝুলিয়ে রাখা লোকটার মুখোমুখি দাঁড়াক। যখন ধমক হুমকি অনুরোধ, কিছু দিয়েই তাকে সরানো যাবে না, তখন হটানোর শেষ রাস্তা হিসেবে জলকামানের প্রয়োগ হোক। প্রবল জলের তোড়ে ভেসে যাক নবনগর। যে-জল সরকার বন্ধ করে দিয়েছিল গত দেড় মাস, সেই জল এবার সরকারের হাত দিয়েই স্রোতে পরিণত হয়ে বস্তিটাকে ডুবিয়ে দিক। সেই জল আকণ্ঠ প্রাণ করে সপ্তর্ষি তবু এই মুহূর্তটা বেঁচে নেবে।

কয়েক মুহূর্তের জমাট নীরবতা। তারপর শ্রীমন্ত পুরোহিত গর্জে উঠল, ‘চার্জ!’