কোপাই ভার্সেস কুনুর  

এই যে সোনাঝুরির জঙ্গল থেকে একটু দূরে এমন একটা নিঝুম রিসর্ট, যার ধারেকাছে প্রকৃতি ছাড়া কিছু নেই— অনলাইনে বুকিং করতে গিয়ে প্রোফাইল ছবিটা দেখেই শিবাশিস ভালবেসে ফেলল রিসর্টটা। ওর মনে হল, ওখানে তো দিনের বেলায় এক-একটা পাতা পড়ার শব্দ শোনা যায়, আর রাতের অন্ধকারে দেখা যায় জোনাকির আলো। আহা, আগে তো এর সন্ধান পায়নি! দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে এতবার সে অথবা ওরা দুজনে  আসছে শান্তিনিকেতন। বছরে দু’বার তো অবশ্যই। শিবাশিসের পছন্দ নির্জনতা। আর দীপশিখা কখনও নির্জনতা চায়নি, এখনও না। শিবাশিস চেয়ে গেছে তাই, যে-কোনওরকম ভিড়ভাট্টা থেকে শত যোজন দূরে সর্বদা তার অবস্থান। কারণ একটা অবশ্যই আছে। দীপশিখাদের যৌথ পরিবারের বাড়িতে সর্বদা হই হই আর হট্টগোল, বিয়ের পর থেকে এতগুলো বছর ধরে শিবাশিস তো তাই দেখে এসেছে! একা থাকা কাকে বলে, দীপশিখার ঠিকুজিতে নেই। এখন তো শিবাশিসের সঙ্গে থাকাকেও সে একলা থাকাই ভাবে। আর শিবাশিস বহুজনের মধ্যে থেকেও বেশ একা হয়ে যেতে পারে। তবে শিবাশিসকে সঙ্গ দিতে মাঝে মাঝে তার ভিতরের ইচ্ছের বিরুদ্ধেও দীপশিখা আসে। বাধ্য হয়ে। যেমন এবার।

শ্রাবণের মাঝামাঝি। যখন শুধুই কালো মেঘের আনাগোনা বেড়ে গেল, শিবাশিস হঠাৎ একদিন বলে বসল, এভাবেই সে বরাবর বলে এবং হঠাৎই। ভেবেচিন্তে বলার লোক নয় সে আদৌ।

‘চলো দীপু, মাঝে টানা তিনদিন ছুটি একসঙ্গে। বৃষ্টি এবার নামল বলে। একটু চুপচাপ বসে শান্তিনিকেতনে বৃষ্টি দেখে আসি। সেই সুযোগে তুমি সোনাঝুরির হাটে যত ইচ্ছে ঘুরে নেবে।’

শিবাশিস ইচ্ছে করেই এই টোপটা দিল। দীপশিখা টোপটা খেলও। দীপশিখা জানে, বাধা দিলেও শিবাশিস এখন আর শুনবে না। তারও অনেক আবদার শিবাশিস রাখে। পছন্দের না হলেও। তবে ওর পছন্দের জায়গা তো সোনাঝুরির হাট অবশ্যই। পুজো সামনে। দুটো-একটা নতুন ডিজাইনের গুজরাটি কাজের শাড়ি-কুর্তি না কিনলেও, অন্তত ঘুরে-ঘুরে দেখা তো যাবে! তবু বলল, ‘বৃষ্টি চাইলেই কি হয় নাকি? এ কি সেই, ময়দা মাখা আছে, চাইলেই লুচি ভেজে দেব… এরকম ব্যাপার নাকি? তাছাড়া এই বয়সে হুটহাট বেরনোর নানা হ্যাপা! বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না?’

‘হোক-না একটু! বাড়িতে ভাল লাগছে না। অনেকদিন কোথাও তো যাইনি! মন উড়ু উড়ু করছে! চলোই না। একঘেয়ে পটল দিয়ে মাছের ঝোল আর ওল ভাতে থেকে ক’টা দিনের মুক্তি হোক।’

রিসর্টের কুকটা যে ভাল, আগেই ফোনে খবর নিয়ে নিয়েছে শিবাশিস। দোতলায় দুটো স্যুট। অনলাইনে বুক করতে গিয়ে দেখে সবই তখন ফাঁকা। এখন ঘোর বর্ষার সময়। কে আর এখানে ছাই আসবে? ভালই কাটবে তিনটে দিন নির্জনতার সঙ্গে ওঠা-বসা করে, ভেবে শিবাশিস একটু পুলকিত হয়ে ওঠে। কিন্তু দীপু? সে তো অস্থির হয়ে পড়বে, কথা বলার তৃতীয় কাউকে না পেয়ে। তার তো গিয়েই আলাপ করার মানুষ চাই। চাই বাইরে এসে গল্প করতে, কথা বলতে। নাহলে বাড়ি ছেড়ে এলাম কেন রে ভাই! কালকেই তাই ওকে নিয়ে হাটে যাবে, এটাও ভেবে নিল শিবাশিস। স্যুটগুলোর নাম হয়েছে নদীর নামে। ওদেরটা হল ‘কোপাই’। কুনুর, ময়ুরাক্ষী, অজয়— জেলার এক-একটা নদীর নামে স্যুটের নামগুলো রেখেছে। শিবাশিসের ভাল লাগছে দেখে যে গোটা রিসর্ট তখনও ফাঁকা। দুপুরের একটু আগেই পৌঁছে গেল। পোস্তর বড়া আর কচি পাঁঠার পাতলা ঝোলের অর্ডার করেছিল ফোনেই। সরু চালের ঝরঝরে ভাত। আর কী চাই! তারপর চমৎকার একটা ঘুম।

এবার শান্তিনিকেতন আসার আগে একটা খবর কিন্তু নিয়ে এসেছে শিবাশিস। আশ্রম-এলাকার মধ্যে একটা হেরিটেজ ওয়াক চালু হয়েছে। শুনেই দীপশিখা বলেছিল, ‘আবার নতুন করে শান্তিনিকেতন কী দেখবে? সবই তো হাজারবার দেখা। এত বছর ধরে আসছি। আর নতুন কীই-বা শুনব?’

‘না, না, বুঝছ না। কিছু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, লেখাপড়া-জানা ছেলেমেয়ে। গাইড। আশ্রম-এলাকার জায়গাগুলো শুধু দেখাবে না, সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও তথ্যগুলোও বলবে। একটা নতুন অভিজ্ঞতা হবে।’

ভাতঘুমের পর রিসর্টের দোতলার বারান্দায় বসে প্রথমদিনের বাকি সময়টুকু মেঘের আনাগোনা দেখেই কেটে যাবে ভেবেছিল ওরা। যাচ্ছিলও তাই। হঠাৎ শিবাশিসের হেরিটেজ ওয়াকের কথাটা মনে পড়ে। ওরা ঝটপট  তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ে। রিসর্ট থেকে ফোনের নাম্বার নিয়ে টোটো ডাকে। সোজা চলে যায় রবীন্দ্রভবনে, ওয়াক শুরু যেখানে। কাউন্টারে টিকিট নিতে গিয়ে শোনে, ‘এখন তো ওয়াক আর নেই! আবার কাল।’

শুনে রিসর্টে ফিরে আসবে বলে ওদের-নিয়ে-আসা টোটোতেই আবার উঠতে যাবে, এক অল্পবয়সি স্মার্ট যুবক ওদের কাছে এসে বলে, ‘স্যার, হেরিটেজ ওয়াক করবেন তো? আসুন আমার সঙ্গে। আমি সব দেখাব।’

‘না, না, এখন তো ওয়াক নেই। আমরা তো বিশ্বভারতীরটায় যাব।’

‘স্যার, ফিরে যাবেন না। আমি আপনাদের বাইশটা জায়গায় নিয়ে যাব। এই ভাইটাকে একটু ভরসা করুন।’

ওয়াক নয়, যুবক ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিজের টোটোতে সামান্য অর্থের বিনিময়ে আশ্রমের চারপাশটা ঘোরায় আর বলতে-বলতে যায় শান্তিনিকেতনের কথা। একটু শুনেই মনে হল, বই থেকে সে খুব মন দিয়ে ইতিহাসটা মুখস্থ করেছে। তবু ভাল লাগছে শিবাশিসের। শুরুই করল আবৃত্তি করার মতো গলা কাঁপিয়ে এরকম এক প্রস্তাবনা— ‘রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, আপন নিষ্ঠা দ্বারা ভালোবাসার দ্বারা যদি এই আশ্রমকে তোমরা বাইরের সমস্ত আঘাত থেকে আবৃত করে রাখতে পারো তাহলে তার চেয়ে বড় তোমাদের কাছ থেকে কিছু পাবার নেই।’

তারপর উপাসনাগৃহ থেকে যাত্রা শুরু করে আবার যে ওখানেই ফিরে আসবে, এরকমই জানাল যুবক। ঘুরতে-ঘুরতে আর ওর কথা শুনতে-শুনতে একেবারে তখন শেষের দিকে চলে এসেছে। ওরা দেখল গাছপালা আর সবুজে-ঢাকা শান্তিনিকেতনের আকাশ কালো হয়ে গেছে। যে-কোনও মুহূর্তে বড়-বড় বৃষ্টির ফোঁটা তড়বড়-তড়বড় শব্দে শুরু হল বলে। ওরা যুবককে তাড়া দিল শেষ করার জন্য। একটি রেলিং দিয়ে ঘেরা লাল বারান্দার বাড়ির সামনে ওরা তখন  দাঁড়িয়ে। পরিবারের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বাইরে লেখা। যুবক তখন বলছে, ‘এই বাড়িটা শান্তিদেব ঘোষের। পিতা কালীমোহন ঘোষ। ভাই সাগরময ঘোষ। মনে আছে আপনাদের সেই বিখ্যাত গান, ‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি…’? উনি গাইতেন।’

শিবাশিসেরও প্রিয় গান। বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। এরকম এক মুহূর্তে গানটির সমাপতনে ব্যাপারটা খুব প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়াল। কীভাবে যে হল, বুঝতে না পেরে শিবাশিস গুনগুন করে গাইতে শুরু করে, ‘ঘন মেঘে আঁধার হল দেখে ডাকতেছিল শ্যামল দুটি গাই…’।

ভিজে সপসপে হয়ে ফিরে ওরা যখন রিসর্টে প্রবেশ করছে, দেখল এক সদ্য-বিবাহিত নববধূকে নিয়ে এক সুদর্শন যুবক ট্রলি গড়িয়ে প্রবেশ করছে রিসর্টে। নববধূর কপালে নতুন সিঁদুরের বাহুল্য এবং ঝলমলে পোশাক দেখে দীপশিখা শিবাশিসের কানে-কানে বলল, ‘মধুচন্দ্রিমা।’

‘কথা বলার লোক তাহলে তুমি শেষ পর্যন্ত পেয়ে গেলে? বুঝতে পারছি, কারুর সঙ্গে কথা না বলতে পেরে, এরই মধ্যে তোমার পেট ফেঁপে উঠেছে!’

২
নবদম্পতিকে সরাসরি ওরা দোতলায় উঠতে দেখল। নিঃশব্দে ঢুকে গেল কুনুরে এবং কোনও কথা না বলে নিঃশব্দে ওরা দরজা বন্ধ করল। দোতলার দুটো স্যুটের মাঝে একটি কমন ড্রয়িংরুমে বসানো বড়-বড় সোফাসেট। শিবাশিস ওদের কোপাইয়ে ঢুকে ভিজে জামাকাপড় ছেড়ে এসে সোফায় বসে চায়ের অর্ডার দিয়ে সিগারেট ধরায়। দীপশিখা বাথরুমে। শিবাশিস চায়ে চুমুক দিয়ে ভাবে, তাহলে কি রিসর্টের দুপুরের নির্জনতাটা  চলেই গেল? আর এই যে জমিয়ে একটানা বৃষ্টিটা নেমেছে, চারদিক ভেসে যাচ্ছে, এটাও আর একা-একা উপভোগ করা যাবে না? ড্রয়িংরুমে বসে যেটুকু দেখা যায়— রাস্তা জলে থই থই, ভেসে আসছে ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা মাঝে মাঝে। বারান্দায় গিয়ে ভিজতে পারলে দেখা যেত সোনাঝুরি জঙ্গলের কাক-ভেজা সবুজ, ভিজে-যাওয়া গরু-ছাগল-পাখি। সন্ধ্যার মুখে টানা এই বিষণ্ণতাভরা বৃষ্টি সকলকে গ্রাস করেছে।

মাত্র দুটো ঘরে তো বোর্ডার, তাই চারজনকেই একসঙ্গে রাতের খাবার খেতে ডাকল কুক। নীচের ডাইনিং হলে। এতক্ষণে কোপাই আর কুনুর মুখোমুখি। ওদের দেখা পাওয়া গেল। যথারীতি নিঃস্তব্ধতা ভেঙে দিল কোপাই। দীপশিখা বলে, ‘কোপাই নদী খুব কাছে। দেখেছ তোমরা? আমরা কত বছর ধরে দেখে আসছি, খুব রোগা নদী। ঝোপেঝাড়ে এখন প্রায় বন্ধ। কুনুর তো এখান থেকে দূরে। এখন এই বৃষ্টিতে তার রূপ কেমন জানি না। তোমরা জানো হয়তো, কুনুর কিন্তু নদ। বা বলতে পারো উপনদ। মিশেছে বীরভূমের অজয়ের মতো বড় নদীতে।’

মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তোমাদের নতুন বিয়ে হল? নাম কী?’

শিবাশিস স্তব্ধ হয়ে আলটপকা দেখে নেয় দম্পতিকে। স্নান সেরে এসেছে। দুজনকেই খুব ঝরঝরে লাগছে। লাগারই কথা। আনত মুখে মেয়েটি আলতো হেসে বলে, ‘হ্যাঁ। আমি রোচনা আর ও অনিরুদ্ধ।’

আবার চুপচাপ। খাওয়া চলছে। কিন্ত দীপশিখাকে থামায় কে? এরই মধ্যে সে টুকটাক কথা বলে ওদের  অনেকটাই জেনে নিয়েছে। ওরা দুজনেই ব্যাঙ্গালোরে একই আইটি কোম্পানিতে চাকরি করে। ওখানেই প্রেম এবং মাত্র দু’দিন আগে হয়েছে বিয়ে। ছুটি পেয়েছে তিনদিন। অনেক দিনের শখ শান্তিনিকেতন আসা। এখান থেকেই আবার ওরা সরাসরি চলে যাবে ফ্লাইটে দমদম হয়ে চাকরির জায়গায়।

প্লেটে আলুর দম দেখে দীপশিখা বলে, ‘আরে, আলুর দমটা দেখতে তো ফাটাফাটি হয়েছে! জানি না খেতে কেমন হবে!’

শিবাশিস একটাও বাক্য বিনিময় করছে না দেখে দীপশিখা ওর দিকে তাকায়। ইশারা এই, ‘অর্থশূন্য হলেও অন্তত একটু হাই-হ্যালো করো!’ শিবাশিসকে যে ও পা থেকে মাথা পর্যন্ত তিরিশ বছর ধরে হাড়ে-হাড়ে চেনে!  তাই। এরকম অনেক পরিস্থিতিতে সে শিবাশিসকে অবশ্য রক্ষাও করেছে। শেষপর্যন্ত শিবাশিস গার্হ্যস্থ্য কথা কিছু বলার না পেয়ে বলে, ‘বৃষ্টি তো আজ রাতে থামবে না মনে হচ্ছে। অবশ্য আমরা চুপচাপ এখানে বসে বৃষ্টি দেখতেই এসেছি। তোমরাও দেখো। এনজয়! একদিন বিশ্বভারতীর হেরিটেজ ওয়াকটা করে নিয়ো। আর রোচনাকে বলছি, একদিন সোনাঝুরির হাটে যেতে। কিছু না কিনলেও ওখানে আদিবাসী মেয়েদের সঙ্গে গোল হয়ে বাজনার তালে-তালে একটু নাচে যোগ দিয়ে ভিডিয়ো তুলে রাখতে পারবে।’

একটানা অনেকগুলো কথা বলে দীপশিখার দিকে তাকিয়ে সে বলে, ‘কী দীপু, বৃষ্টি নামল তো? আমার কথার তখন গুরুত্ব দাওনি কিন্তু!’

এসব কথা বা জিজ্ঞাসাতেও, কিছুতেই কুনুরের তাপ-উত্তাপ ওরা দেখল না। বৃষ্টি, কোপাই-কুনুর, হেরিটেজ ওয়াক মায় ডিনারের খাবার-দাবার কেমন, এসব কিছুই না। ডিনার ঝটপট শেষ করে ছোট্ট একটি ‘গুড নাইট’  বলে ওরা উপরে চলে যায়। বেশি কথা বলতেও চাইছে না। কিছুটা লজ্জা, কিছুটা হয়তো সংকোচের জন্যও হতে পারে। খাওয়া শেষ করে শিবাশিস আগামীকালের ব্রেকফাস্টে কী খাওয়া যায় বলতে থাকে কুককে। কুনুর  তো কিছু না বলেই চলে গেছে। কোপাইয়ের সেখানে যৌথ সিদ্ধান্ত হয়, লুচি আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে সাদা আলুর শুকনো ছেঁচকি। ওদের এখন কোনও তাড়া নেই। ডাইনিং হলে একটু হাঁটাহাঁটি করে কোপাই যখন উপরে গেল, কুনুরের দরজা স্বভাবতই বন্ধ। অগত্যা কোপাই বারান্দায় যাওয়ার চেষ্টা করেও পারে না। অঝোরে বৃষ্টি  পড়ছে তখনও। দীপশিখা অবশ্য আর কারুর সঙ্গে কথা বলতে না পেরে কোপাইয়ে ঢুকে পড়ে। ও জানে, শিবাশিস এখন চুপ করে বসে থাকবে। কথা বলতে ওর কষ্টও হবে। তাছাড়া, সারাদিনে ওদের মধ্যে আর এখন ক’টাই-বা বাক্য বিনিময় হয়? সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে শিবাশিস সিগারেট ধরায়।

৩
কুনুরের বন্ধ দরজা দেখে এই মুহূর্তে দীপশিখা কী ভাবছে, শিবাশিস জানে না। তবে শিবাশিসের মনে কি  উঁকি দিচ্ছে না ওদের তিরিশ বছর আগের সেই দিনগুলোর খণ্ড-খণ্ড ছবি? মধুচন্দ্রিমা কী, তখন হয়তো ওরাও জানত না, তবে বিয়ের কিছুদিন পর পরই চলে গিয়েছিল রাঁচি হয়ে নেতারহাট। কিছুটা অনুরূপ উদ্দেশ্য নিয়ে। শিবাশিসের এখনও মনে পড়ে, নীল জমির উপর কালোয় ফুল-তোলা একটা ভয়েলের শাড়ি ছিল দীপুর। আর ওর পরনে তৎকালীন আধুনিক বেলবট্‌স প্যান্ট, হালকা আকাশি রঙের গোল গলার টি-শার্ট। ক্লিক থ্রি-র সেই ক্যামেরায় তোলা নেতারহাটে একটা সাদা-কালো ছবি এখনও ওদের পুরনো অ্যালবামে খুঁজলে পাওয়া যাবে। শিবাশিসের তখন ছোট চাকরি। কোনওরকমে একটু পয়সা জমিয়ে সেবার নেতারহাট যাওয়া সম্ভব হয় দিন তিনেকের জন্য। এত টাকার বিনিময়ে রিসর্ট ভাড়া নেওয়া তো দূরের কথা, একটা ছোট থাকার আস্তানা জোগাড় করতেই কত ভাবতে হয়েছে। পাহাড়ে, সমতলে, ঝরনায় শিবাশিস তুলে যাচ্ছিল দীপশিখার একের পর এক নানা ভঙ্গিমার ছবি। একদল যুবক দূর থেকে ওদের দেখতে পেয়ে এগিয়ে আসে শিবাশিসের দিকে। বলে, ‘আরে দাদা, আপনিই তো কেবল বউদির ছবি তুলছেন। আমরা আপনাদের দুজনের একটা ছবি তুলে দিই।’

শিবাশিসের মনে পড়ে, ছোটখাট দার্জিলিঙের মতো নেতারহাট যেতে হত পাহাড়ের মতো পথে ঘুরে-ঘুরে। আরও মনে পড়ে, ওরা সেবার ওই একই যাত্রায় গিয়েছিল দুটি বিখ্যাত ঝরনা দেখতে। হুড্রু আর জোনা। জোনা ফল্‌স দেখতে সিঁড়ি দিয়ে অনেক নীচুতে নেমে ভয় পেয়েছিল ওরা। দীপশিখার পরনে ছিল একটা সবুজ সিফন শাড়ি। তার ছবি তুলেছিল শিবাশিস, যে-ছবিতে শাড়ির ভিতর দিয়ে ওর একুশ বছর বয়সের শরীরের উপচে-পড়া যৌবন ধরা পড়েছিল, এখনও মনে আছে। আজ শিবাশিসের মনে দীপুর সেই শরীর যেন ইথার তরঙ্গে ভেসে আসে। ওরাও কি সেদিন চটপট আস্তানাতে ফিরে এসে অবিলম্বে দরজা বন্ধ করেনি? এমনকী খাওয়ার টেবিলে না গিয়ে? আজ যেমন কুনুর প্রায়ই করছে এবং আরও দু’দিন তাই করবে। দীপশিখার ঝরনা দেখা শেষ হয়, কিন্তু শিবাশিসের দীপশিখাকে দেখা যেন আর ফুরোয় না। অনেক রাত পর্যন্ত শিবাশিস সোফায়  শুয়ে-বসে এসব ভাবে আর সিগারেট খেয়ে যায়।

কোপাইয়ে যখন সে প্রবেশ করে, দীপশিখা ঘুমে কাদা। শিবাশিস আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ে এবং কিছুক্ষণের মধ্যে সেও গভীর ঘুমে চলে যায়। বৃষ্টি থামল কি না, আর দেখেওনি।

৪
পরের দিন সকালে তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙে যায় দীপশিখার। গত রাতে শিবাশিস কখন কোপাইতে ঢোকে, সে  জানতেই পারেনি। সকালে ঘুম থেকে উঠে দীপশিখা একাই বারান্দায় যায়। যাওয়ার সময়ে এক পলকে দেখে নেয়, কুনুরের দরজা বন্ধ। এই সাতসকালে দরজা বন্ধ থাকারই তো কথা! ঝকঝকে রোদ্দুরে শান্তিনিকেতনের আকাশ-বাতাস আরও সবুজ এবং উজ্জ্বল লাগে দীপশিখার। সব বিছুই যেন সদ্য স্নান সেরে গা-ঝারা দিচ্ছে। আজ সোনাঝুরির হাটবার। সে তো যাবেই। কুনুরের দুজনকেও সঙ্গে যেতে বলবে না কি? সন্তানতুল্য তো ওরা! বলাই যায়। ঠিক হবে তো বলা? সাত-পাঁচ ভেবে আর এগোয় না। তাছাড়া, দেখা হলে তবে তো বলবে!

শিবাশিসকে সঙ্গে নিয়ে হাটে আজ ও যাবেই। দুপুরের খাবার রিসর্টে বন্ধ করে সোনাঝুরির কোনও একটা হোটেলে খেয়ে নেবে। কুনুরের অনিরুদ্ধ আর রোচনা ওদের সঙ্গে গেলে নাহয় চারজনে একত্র লাঞ্চ সেরে নিত জমিয়ে কথা বলতে-বলতে! কিন্তু…। কুককে ফোন করে আপাতত দু’কাপ নয় এক কাপ চাইয়েরই অর্ডার দেয়। শিবাশিসকে কি ডাকবে? একবার ভেবেও শেষপর্যন্ত ডাকে না। কত রাতে ঘুমোতে গেছে কে জানে! ও আরও একটু ঘুমোক। এখানে তো আর কাজের তাড়া নেই! চায়ে চুমুক দিয়ে দীপশিখা সোফায় বসে ভাবে,  এবারের শান্তিনিকেতনে থাকাটাই কেমন অন্যরকম লাগছে। কেন সে জানে না। এত বড় ফাঁকা রিসর্ট। কথা বলার কেউ নেই। সাধারণত ও যেখানেই যাক, এত মানুষের সঙ্গে আলাপ করে ফিরে আসে যে পরেও অনেকদিন ধরে তাদের সঙ্গে আলাপ থেকে যায়।

একই ফ্লোরে এবার এমন দুটো পরিবারের থাকা, যারা চরিত্রে পরস্পরের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর। কুনুরে  থাকে নবদম্পতি, মাত্র দু’দিন আগে যাদের বিয়ে হয়েছে। আর বিবাহিত জীবনের তিরিশ বছর পার করে দেওয়া শিবাশিস-দীপশিখা রয়েছে অন্যদিকে কোপাইতে। কুনুর তো নিজেদের মধ্যেই থাকছে সর্বদা। তাই তো  থাকার কথা, সে দীপশিখা যাই মনে করুক। খুব প্রয়োজন না হলে তারা ওদের সঙ্গে কথা বলবে না, এটাই কাঙ্ক্ষিত। কেন বলবে কথা?

দীপশিখা আরও কত কথা ভাবে। ওরা যেমন কুনুর দেখে অনেকটা সময় পিছিয়ে গিয়ে সেইদিনগুলোর কথা মনে করছে বার বার, অন্যদিকে ওরাও কি কোপাইকে দেখে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে না? বলছে অবশ্যই। এটা ঠিক, কারুর মনের মধ্যে কে আর তেমন করে ঢুকতে পারে? তবু ওরাও কি পাশাপাশি আমাদের দেখে ভাবছে না ভবিষ্যতের দিনগুলোর কথা? যেসব দিনে একদা গিয়ে ওরা পৌঁছাবে? যখন ওদের  মধ্যেও আর বলার কোনো কথা থাকবে না! যখন কেবলই ওদেরও বলতে হবে, ‘বৃষ্টি দেখতে এসেছি’! ওরাও এরকমই ভাবছে হয়তো-বা। বা ভাবছে না। সোফায় বসেই কোপাইয়ের দরজা খোলার শব্দ শোনে দীপশিখা। শিবাশিস উঠেছে। ও কুককে ফোন করে আরও দুটো চা বলে। এবার একসঙ্গে দুজনে খাবে চা। কুনুর উঠলে ওদের জন্যও বলত। ওঠার কোনও লক্ষণও পাচ্ছে না। না পাক। চা দেওয়ার সময়ে কুক জানিযে গেছে, ‘ওরা আজ  সকালের ব্রেকফাস্টও বলেনি। কেবল আপনারা। ন’টার মধ্যেই চলে আসবেন।’

শিবাশিসও একবার বারান্দা ঘুরে এসে সোফায় বসে চায়ে চুমুক দেয়। বলে, ‘আজ সকালটা দারুণ, না?’

‘হ্যাঁ। আজ হাটে যাব কিন্তু। এখানের লাঞ্চ অফ করে দাও।’

৫
কোপাই আর কুনুর এভাবেই আরও দু’দিন ওই রিসর্টে থাকে। সারাদিনে হয়তো একবার কোপাই-কুনুর একত্রে ডাইনিং হলে মুখোমুখি বসেছে। কোনওদিন তাও হয় না। কুনুর, কোপাইয়ের কাছে জানতে চায় না কিছুই। বিশেষত কোপাইয়ের দীপশিখার কাছে। ওরা এখন শিবাশিসের নির্জনতা বা বৃষ্টি দেখাতেও কোনও আকর্ষণ বোধ করে না। ওরা এই মুহূর্তটা নিয়ে ভাবে। কোথায় হাট, কোথায় আদিবাসীদের সঙ্গে নাচ, কোথায় হেরিটেজ ওয়াক— কিচ্ছু ওরা এখন জানতে চায় না। বৃষ্টির পর শান্তিনিকেতন কতটা জীবিত হল, সোনাঝুরি কতটা সবুজ হল, ওরা এসব বুঝতে বা শুনতে চায় না। একটু দূরে গিয়ে খোয়াই দেখার আগ্রহও নেই। কুনুরের দরজা সর্বদা বন্ধ কেন, তার উত্তর দিতে ওরা প্রস্তুত নয়। ওরা আজ কোথায় ব্রেকফাস্ট করবে, কোথায় করবে লাঞ্চ, কেনই-বা কাউকে ওরা বলতে যাবে? কুনুর চায় কুনুরের মতো করে থাকতে। কোপাইয়ের মতো করে নয়। ওরা আরও চায়, কোপাই থাকুক কোপাইয়ের মতো। কুনুরের মতো করে নয়। তবে কুনুর ঠিক এই মুহূর্তে জানেও না, ওরা সত্যি আসলে কী চায়। কুনুর এসব জানতে-জানাতে, বুঝতে -বোঝাতে আসেওনি এখানে। অন্তত এই কয়েকটা দিন। কুনুর যেখানেই মিশে যাক, ওরা এখন যে-নদীতে মিলেমিশে একাকার, সে-নদী তো আপন বেগে পাগল পারা। তন্দ্রাহারা।

কোপাই যতোই সরু নদী হোক আর কুনুর হোক উপনদ, পাঠক, আমাদের এই জীবনের গল্পে দুটো নদী কেমন যেন পাকেচক্রে এসে গেল। অন্য কিছু নয়। তবে এই ক’দিন চলুক-না কোপাই আর কুনুরের মধ্যে নিভৃতে একে অন্যকে জরিপ করার কাজ। একজন পিছিয়ে গিয়ে জীবনের খণ্ডচিত্র ভাবুক, আর একজন  কিছুক্ষণের জন্য হলেও এগিয়ে ভাবতে তো পারে ভবিষ্যতের দিনগুলোর কথা!

এই ফাঁকে আমরা, আসুন, কেটে পড়ি।